ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন অনুষ্ঠান হবে জুনের শেষ সপ্তাহে ঝিনাইদহে মোটরসাইকেল চোরচক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত—হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হবে, ভারত সীমান্তেও পরিকল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যারা বলে ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ তাদের থেকে সতর্ক থাকুন: প্রধানমন্ত্রী রংপুরের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৬৬৫ নারী নাসার আর্টেমিস থ্রি মিশনের নভোচারীদের নাম চূড়ান্ত নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে দুই শ্রমিক নিহত শেষ যাত্রা জানাজায়, মাঝপথেই থেমে গেল জীবন সাজেকে বিজিবির বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ পিটারসেন অটোমোটিভ মিউজিয়াম অটোমোবাইল ডেস্ক সময় টিভির এমডি জোবায়েরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ZEEHO Bangladesh ও Riding School BD-এর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৮০৭ প্রবাসীর হাতে যাচ্ছে এনআইডি হেরোইনসহ মা-বাবা ও ছেলে আটক, বাড়িতে আগুন সমুদ্রের নিচে চীনের নতুন ডেটা সেন্টার সোনারগাঁয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে মেঘনায় গোসল, দুই স্কুল ছাত্রের মৃত্যু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ৫ শতাংশের বেশি সোনারগাঁয়ে মেঘনায় গোসলে নেমে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে ৫টি ‘রিভারাইন পেট্রল ভেসেল’ স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরে স্যামসাংয়ের নতুন ল্যাপটপ গুরুদাসপুরে শিশু ধর্ষণ মামলায় বৃদ্ধের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড টাঙ্গাইল মেডিকেলে হঠাৎ পরিদর্শন, অসন্তোষ প্রকাশ প্রতিমন্ত্রী টুকুর চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুল ফিডিংয়ে ১৬ শিক্ষার্থী অসুস্থ দুর্নীতির মামলায় আবেদপুত্র সিয়ামের বিচার শুরু যাত্রা ও সার্কাসে অশ্লীলতা বরদাশত নয় : সংস্কৃতিমন্ত্রী আজকে যে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে নির্দ্বিধায় বলতে পারে: প্রধানমন্ত্রী যে জগৎ মানুষের অপেক্ষায় আছে চট্টগ্রামে এইডস ঝুঁকি বাড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা মাধবদীর ‘মমতা’ সিনেমা হল বিক্রির বিজ্ঞাপন
Nagad desktop

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. ইফতেখারুজ্জামান দুদককে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান করতে চাই

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০১:০১ পিএম
আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৪০ পিএম
দুদককে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান করতে চাই
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান। অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য। রাষ্ট্র সংস্কারে দুর্নীতি দমনে তার কমিশনের প্রস্তাব, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অগ্রগতি, এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতাসহ নানা বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস

খবরের কাগজ: আপনার নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশন থেকে সাংবিধানিক ও স্বাধীন দুদক গড়ার লক্ষ্যে ৪৭টি সুপারিশ করা হয়। এগুলো বাস্তবায়নে আপনার আশাবাদ জানতে চাই।
ইফতেখারুজ্জামান: অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে রাষ্ট্র সংস্কারের একটা বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমি আশাবাদী। কারণ সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আশার কথা হচ্ছে, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর বেশির ভাগের ব্যাপারে প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। কিছু ছোটখাটো রিজারভেশন আছে। সেগুলো ব্যাখ্যা করার পর তাদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য হয়েছে। আমাদের বেশকিছু সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো স্বল্প মেয়াদে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে এবং দুদকের প্রতিপালনযোগ্য, বাস্তবায়নযোগ্য। সেগুলো সরকারের কাছে ফেব্রুয়ারিতে হস্তান্তর করেছি। সরকারের অঙ্গীকার আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। তবে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাইনি সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না। আশা করছি, খুব শিগগিরই হয়তো সে প্রক্রিয়া সরকার শুরু করবে। 

খবরের কাগজ: আপনার কমিশনের কতটি সুপারিশ আশু বাস্তবায়নযোগ্য? 
ইফতেখারুজ্জামান: দুদক সংস্কারে কমিশন প্রস্তাবিত ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই আশু বাস্তবায়নযোগ্য। এর মধ্যে দুদককে শক্তিশালী করা, কার্যকর ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কমিশনারদের পদ বাড়ানো, নিয়োগ, সার্চ কমিটি, আইনের সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি ও প্রণোদনার মতো নানা সুপারিশ রয়েছে। এসব সুপারিশ অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন- দুদকে উচ্চপর্যায়ে নিয়োগ। সচিব ও মহাপরিচালক পদ- যাদের সাধারণত আমলাতন্ত্র থেকে নিয়োগ করা হতো। এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রস্তাব হয়েছে। যাতে করে একটা সীমারেখার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ আমলাতন্ত্র বা প্রশাসন থেকে আসতে পারবে। 

দ্বিতীয়ত দুদক কমিশনের কিছু কার্যপদ্ধতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। কারণ অনুসন্ধানের নামে কার্যপদ্ধতিকে দীর্ঘ করা হয়। এতে করে দুর্নীতিবাজরা অনেক সময় পার পেয়ে যায় বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশি সময় লাগে। দেখা গেছে, দুর্নীতির যেকোনো অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর দুদকের মাঠপর্যায়ের তদন্ত শুরু করা হয়; যা আইনে অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে নেই। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনুসন্ধান পর্বটা বাতিল করে সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটির কার্যক্রমকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে। সেটা গৃহীতও হয়েছে। 

দুদকের কোনো সদস্য বা কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বরখাস্ত করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। আমরা চাই দুদক একটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। আমরা বলেছি দুদকের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এমন হতে হবে; যা সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্কেলের থেকে আলাদা, পর্যাপ্ত প্রণোদনামূলক। প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের যাতে ওনারশিপ তৈরি হয়। সেই লক্ষ্যে একদিকে কর্মকর্তাদের প্রণোদনা দেওয়া অন্যদিকে কার্যক্রমের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তাব রেখেছি। দুদকের কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে গঠিত কমিটিকে আমরা নিয়োগ বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি বলেছি। এই কমিটি ৬ মাস পরপর সংস্থাটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। এরপর কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে সেগুলো বিশ্লেষণে একধরনের গণশুনানি করবে। তাতে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন। ফলে দুদকের একটা জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি হবে। আশা করছি, এগুলো বাস্তবায়িত হলে দুদক কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। 

খবরের কাগজ: ঢাকার বাইরে দুদকের কার্যক্রম উন্নয়নে আপনার কমিশনের পরিকল্পনা কী?
ইফতেখারুজ্জামান: ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলায় এখন পর্যন্ত দুদক মানের কোনো কার্যালয় নেই। যেখানে কার্যালয় আছে সব জায়গায় আদালত নেই। স্পেশাল আদালত যেটা হওয়ার কথা সেগুলো আমরা প্রস্তাব করেছি। দেশের যেসব জেলায় এখনো হয়নি, পর্যায়ক্রমে সেসব জেলায় দুদকের কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। লক্ষ্য দুদকের কার্যক্রমকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। আর কার্যালয় রয়েছে এমন জেলাগুলোতে আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। জরুরি ও গুরুতর মামলাগুলোর জন্য যাতে সাধারণ মানুষকে ঢাকায় আসতে না হয়। 

খবরের কাগজ: জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। গত এক বছরে ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে জনমনে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে?
ইফতেখারুজ্জামান: জুলাই ঘোষণাপত্র যেটা হয়েছে, তাতে আন্দোলনের মাধ্যমে সবার স্বপ্নের যে জায়গাটা সেটা ক্যাপচার করা হয়েছে। মোটাদাগে এটা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের সর্বজনীন ঘোষণা। এটি নিয়েও নানা ধরনের বিতর্ক হয়েছে। এটা ২০২৪ সালের আগস্টেই হতে পারত। কেন তা ঘোষণা করা হলো না। আমি বলব, একটি ঘোষণার মাধ্যমে তো আর সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয় না। দেরিতে হলেও এই ঘোষণা ঐতিহাসিক। এক অর্থে এটা ভালো। কারণ সরকারের উদ্যোগে এতে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের পর মতামত দিয়েছে। এ ঘোষণায় থাকা অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে বর্তমান ও পরবর্তী সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

মনে রাখতে হবে, দেশের বিশেষ প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল তিনটি। সেগুলো হলো- জুলাই আন্দোলনের হত্যাকারীদের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়াটা ইতিবাচক। এই বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেও আবার কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা প্রত্যাশিত ছিল না। বিশেষ করে আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের সঙ্গে ভায়োলেন্স হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে সত্যিকারের বিচার হচ্ছে, না প্রতিশোধ হচ্ছে? আশা করব, বিচারটা যেন বিচারই হয়, প্রতিশোধের পর্যায়ে না যায়। এছাড়া একই মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে একসঙ্গে ঢালাওভাবে আসামি করে মামলা করা, জামিন না হওয়া- এসব ঘটনা আসল অপরাধীদের জবাবদিহিতে আনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না সেটাও বিবেচনার বিষয়। বিচারপ্রক্রিয়া যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, স্বচ্ছতার মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। আশার দিক হলো, এবারই প্রথম আদালতের এজলাস থেকে বিচার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে লাইভ ব্রডকাস্ট করা হচ্ছে। ফলে দেশবাসীর পাশাপাশি বিশ্ববাসী দেখতে ও জানতে পারছে- এটা ইতিবাচক।

খবরের কাগজ: জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনা কীভাবে এগোচ্ছে? 
ইফতেখারুজ্জামান: ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিশন গত ৩১ জুলাই দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠক শেষে জুলাই সনদের খসড়া দলগুলোকে দিয়েছে। শিগগিরই সনদটির পূর্ণাঙ্গ খসড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। বিগত দিনে দলগুলোর অঙ্গীকার লঙ্ঘনের চর্চা আমরা দেখেছি। ফলে এবারের এ সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও তৃতীয় পর্যায়ের বৈঠক করছি। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অংশীজনরা যাতে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হন। এবারের বৈঠক শেষে সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সই নেওয়া হবে; যার মধ্যদিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে জুলাই সনদ। এ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ওপর নির্ভর করছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হবে। অনেকেরই প্রত্যাশা- নির্বাচনের আগেই সনদ বাস্তবায়ন যেন শুরু হয়। তবে যেসব ইস্যুতে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রয়োজন, সেগুলো বাস্তবায়ন নির্বাচিত সরকার ও সংসদ ছাড়া সম্ভব নয়। 

খবরের কাগজ: রাষ্ট্র সংস্কারে মোট ১১টি কমিশন গঠিত হলেও মাত্র ৬টি কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের উদ্যোগ নেয় সরকার। বাকি কমিশনগুলোর সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে সরকার ঐকমত্য কমিশনকে কী জানিয়েছে?
ইফতেখারুজ্জামান: ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে প্রথম দফায় গঠিত ৬টি কমিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে সরকার। বাকি ৫ কমিশনের কাজগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ ওইসব কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগেই পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে ওইসব কমিশনের প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার বাইরে রাখায় সমালোচনা রয়েছে। আমি মনে করি, ওই কমিশনগুলোর প্রতিটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও তাদের প্রস্তাবিত সুপারিশমালা নিয়ে বাস্তবে তেমন আলোচনা হয়নি। মূলত সব কমিশনের সুপারিশই বাস্তবায়ন করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার, যারা আগামী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। কাজেই কোনো না কোনো উপায়ে এই ৫ কমিশনের প্রস্তাবগুলোও রাজনৈতিকভাবে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ নারী সংস্কার কমিশনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলপাড় করা হলো। অনাচারের মাধ্যমে এই কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল করার দাবি তুলেছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো। সে ক্ষেত্রে সরকার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি, যেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আর সরকারের নীরবতায় নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ইকোসিস্টেম নষ্ট হলো। এসব ঘটনার প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেও সংসদে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে প্রত্যাশা পূরণ হলো না। একইভাবে শ্রম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই এবং কমিশনগুলোর সুপারিশের বাস্তব অগ্রগতিও জানা যাচ্ছে না।  
অন্যদিকে শিক্ষা ও ব্যবসা খাতের সংস্কারে কোনো কমিশনই হয়নি! ফলে প্রশ্ন উঠেছে; অথচ শিক্ষা খাতকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন। আর ব্যবসা খাত; ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের ব্যবসা কিন্তু কর্তৃত্ববাদ বিকাশে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের কারণে দেশের ব্যবসা খাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের সম্পদ ও অর্থ লুটপাট হয়েছে। ব্যাংকিং খাত জবরদখল হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, অল্প সময়ে বিদেশে পাচার হয়েছে ২৪০ মিলিয়ন ডলার। এসব দুর্নীতি যারা করেছেন, রাষ্ট্রে সম্পদ জবরদখল করেছেন- তাদের অন্যতম হাতিয়ার ছিল রাজনীতি, আমলাতন্ত্র আর ব্যবসা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। কাজেই ব্যবসা খাতকেও সংস্কারের আওতাভুক্ত করা উচিত ছিল। 

খবরের কাগজ: দেশজুড়ে চলমান মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকারের তৎপরতা ও পদক্ষেপ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ইফতেখারুজ্জামান: আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশে বিগত দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং যে ধরনের অরাজকতার ঘটনা আমরা দেখেছি তা খুব অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের পর সব দেশে এমনটাই হয়। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনী; তাদের অনেকে কর্তৃত্ববাদ বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনেও জড়িত ছিল। পরে তারা এক ধরনের পলাতক অবস্থায় চলে গেছে। তাদের নৈতিক দৃঢ়তা, পেশাগত দায়িত্ব পালনের মোরাল অথরিটি তারা হারিয়েছে। ফলে সারা দেশেই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সেই অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ার চেষ্টা চলছে। 

খবরের কাগজ: স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরেও এ দেশে দুর্নীতি রোধ করা যায়নি। দুর্নীতির লাগাম টানতে সরকারগুলোর ব্যর্থতার মূল কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: বাংলাদেশে যে দুর্নীতি, সেটা একচ্ছত্র বলে কিছু নেই। এটা ধারাবাহিক হয়ে আসছে। সব রাজনৈতিক দল, যারা যখন ক্ষমতায় ছিল দুর্নীতিতে জড়িত ছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগের সময় গত ১৫-১৬ বছরে এটা একটা চূড়ান্ত জায়গায় গেছে, কিন্তু এটার দায় আওয়ামী লীগের একার নয়। রাষ্ট্র কাঠামো দখলের জন্য আদালতসহ তাদের ত্রিমুখী যে শক্তিগুলো ছিল, সেগুলো সবসময়ই কেন্দ্রে ছিল। অন্যদিকে অতি ক্ষমতাহীন বিশেষ মহলের এক ধরনের অরাজকতা, অনেক ক্ষেত্রে হযবরল পরিস্থিতি, মব সন্ত্রাস দেখা গেছে। এর মধ্যে আবার অনেক সুযোগসন্ধানী ঢুকে পড়েছে। বছরজুড়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মতোই নতুন যে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটেছে তারাও সেই পুরনো প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করেছে। 

খবরের কাগজ: দেশজুড়ে অরাজকতার এসব ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন ছিল?
ইফতেখারুজ্জামান: পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি মোকবিলায় আসলে সরকারের চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমুখী। তাই প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়তো ডেলিভারি সম্ভব হয়নি। তবে সরকারের প্রয়াশের ঘাটতি ছিল না। কোনো বিশেষ ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হওয়ার পর প্রশাসন তৎপর হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকায় অনেক ঘটনা তারা সামাল দিতে পেরেছে। সার্বিক নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে যথাযথ ভূমিকা পালনে ঘাটতি দেখা গেছে।

খবরের কাগজ: সম্প্রতি কয়েকজন উপদেষ্টার পিএস, এপিএসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। আটজন উপদেষ্টা সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন একজন সাবেক সচিব। এসব ঘটনায় আপনার মন্তব্য কী?
ইফতেখারুজ্জামান: কর্তৃত্ববাদের অন্যতম উপাদানই ছিল দুর্নীতি। লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি করে প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করা, পেশাগত দেউলিয়াপনা করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা। তাদের পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল নতুন বাংলাদেশে এসব আর থাকবে না, উত্তরণ ঘটবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং সবার প্রত্যাশার বিপরীতে সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার এপিএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটা প্রত্যাশিত ছিল না। যে দুটি অভিযোগ উঠেছে দুদক সেগুলো তদন্ত করছে। অভিযুক্তদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা হবে। 

একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, যিনি একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। তিনি যে কথাটি বলেছেন, সরকারের আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনিশ্চিত তথ্য তার কাছে আছে- তার এটুকু বলাই তে যথেষ্ট নয়। অথচ এখন আর তাকে যোগাযোগ করে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ব্যক্তি বলেছেন, এসব তথ্য গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের হাতেও আছে। তিনি কীভাবে জানলেন যে, গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তথ্যগুলো আছে? তাহলে সাবেক এই আমলার আমলাতন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ, ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ- এটা ভালো লক্ষণ না। কারণ এ তথ্য তার হাতে যাওয়ার কথা নয়। এ তথ্য সরকারের হাতে থাকার কথা এবং দুদকের কাছে যাওয়ার কথা, অভিযোগ হওয়ার কথা। যাই হোক, সেটা হয়নি। তার উচিত হবে অনতিবিলম্বে সেসব তথ্য সরকারের হাতে, দুদকের হাতে হস্তান্তর করা। আর সেটা যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা তার একধরনের পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি। হয়তো তিনি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য এ ধরনের ঘোষণার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ বা তার দলের নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ কাজটা করেছেন। 

খবরের কাগজ: গত ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম; যা ২০২৩ সালে ছিল ১০ম। এমন অবনতির কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: এ দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের যে উপাদান সেগুলো কার্যকর ছিল না। দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্সের’ যে ঘোষণা- সেটা কাগজে-কলমে ছিল, বাস্তব প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা তাদের ছিল না। অন্যদিকে রাষ্ট্রকাঠামোর দখলে থাকা দুর্নীতিবাজদের বিচার তো দূরের কথা বরং সুরক্ষা দেওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে দুদকসহ পুরো বিচার প্রক্রিয়া অকার্যকর অবস্থার সুযোগ নিয়েছে অভিযুক্তরা। রাষ্ট্র ও জনগণের পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তির দায়িত্ব পালনে নিস্ক্রিয়তা দেখা গেছে। সেই অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে, নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। হুট করে ম্যাজিক্যালি দুর্নীতিতে দেশের অবস্থান উন্নতির দিকে যাবে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। 

খবরের কাগজ: ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা নতুন দল এনসিপি গঠন করেছেন। এতে কী তারা লাভবান হয়েছেন? 
ইফতেখারুজ্জামান: বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ দেশে যে আন্দোলনটা হয়েছে, সেটা ঐতিহাসিক বিশাল অর্জন। সেই ফোর্স (তরুণদের) থেকে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ অত্যন্ত ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় মনে করি। এটাকে আমি স্বাগতও জানাই। কিন্তু ইতোমধ্যে দলটির তরুণরা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ কাজে নিজেদের জড়িয়েছেন। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ে নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন নেতা ইস্তফাও দিচ্ছেন। অথচ দল গড়ার পর এসব তরুণ যে রোল মডেলটা অনুসরণ করছে, সেটা এদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অর্থ ও পেশিশক্তির রোল মডেল। যেটা থেকে তাদের দূরে থাকা, প্রত্যাখ্যান করার কথা ছিল। বিপরীতে তারা অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে আত্মঘাতী অবস্থানে যাচ্ছে। তবে এখনো সময় আছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ যত অভিযোগ- এ ধরনের ঘটনা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের কাছে নিজেদের কাজের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে পারলে তাদের মধ্যেও সম্ভাবনা রয়েছে।

খবরের কাগজ: নতুন এই দলটির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা রাজনীতিতে নবীন। তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে তাদের দায় কতখানি? 
ইফতেখারুজ্জামান: কারও বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ও বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকলে সেটা দেখা বা ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের। কিন্তু যদি কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ থাকে সেটা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে ঘটনা তদন্ত করবে দুদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিনে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের ফলে আন্দোলনে থাকা বিজয়ী শক্তির রাজনীতিবিদ ও তরুণরা নিজেদের ক্ষমতায়িত ভাবছে। অনেকে অতি ক্ষমতায়িত ভাবছে। তাদের অনেকে মনে করছেন, ‘১৬ বছর বঞ্চিত ছিলাম। এখন আমাদের চাই’- এই যে বিষয়টা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি দলটির কিছু নেতা-কর্মীর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর দলটির অনেক নেতার মধ্যে হতাশাও দেখা গেছে। সহযোদ্ধাদের ভূমিকায় তারা বিব্রত। এনসিপির নেতাদের অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতেও দেখা গেছে। কাজেই কিছু ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কারণে পুরো আন্দোলনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়।  

খবরের কাগজ: দলটিকে কিংস পার্টি বলার কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: বিভিন্ন দলের নেতারা তাদের কিংস পার্টি হিসেবে অভিহিত করছেন। কারণ দলটির সহযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথমে তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। এখনো দু’জন সেখানে আছেন। সে কারণে অনেকেই তাদের ওই নামে ডাকেন। তবে এ ধরনের কিংস পার্টি দেশে নতুন নয়। আগেও হয়েছে, দেখেছি আমরা। এ ধরনের বিতর্ক দূর করতে এনসিপির দায়িত্ব হলো এটা পরিষ্কার করা যে, যে দুজন সরকারের রয়েছেন দলে এবং রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কী? অথবা ঘোষণা দিয়ে সরকারে থাকা ওই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ করে সরাসরি রাজনীতি চলে আসা। 

খবরের কাগজ: প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানের আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য কতটা অনুকূল মনে করছেন?
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাচন তো হতেই হবে। নির্বাচন আমরা আশা করি। নির্বাচনটা কতখানি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে, সেটা অনেক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। যেমন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ভোটের দিন পর্যন্ত সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু দলনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। দলগুলোর মধ্যে কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব কাজ করবে কিনা। নির্বাচন কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে- এসব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ধারণা, বর্তমান কমিশন আগের তিনটি কমিশনের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। কারণ এ কমিশনের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। ফলে এ নির্বাচন কমিশনকেও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।  

খবরের কাগজ: নানা জনমত জরিপের তথ্য- আগামী সংসদ নির্বাচন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হলে বিএনপি জয়ী হবে। দেশ গঠনে এ দলটির সক্ষমতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? 
ইফতেখারুজ্জামান: অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করতে না পারলে ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন সম্ভব নয়। এই দলটির যে পলিটিক্যাল ট্র্যাক রেকর্ড- সেটা থেকে তারা সরে আসবে মানুষ এমনই প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশে যে দুর্নীতি, সেটা টানা একচ্ছত্রভাবে হয়েছে এমন নয়, এটা ধারাবাহিক হয়ে আসছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগের সময় গত ১৫-১৬ বছরে এটা একটা চূড়ান্ত জায়গায় গেছে, কিন্তু এটার দায় আওয়ামী লীগের মনোপলি ছিল না। সব রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। কাজেই সেই ট্র্যাক রেকর্ড থেকে বিএনপি সরে আসা উচিত। তাদের নেতৃত্ব পর্যায় থেকে সেটা বাস্তবায়িত হলে অন্য ধরনের নতুন সরকার বিএনপি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে আশা করি।  

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, মন্তব্য করুন।
ইফতেখারুজ্জামান: পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি দেখছি না। কিছু হত্যা মামলায় ঢালাওভাবে সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে; যা অপ্রত্যাশিত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ট্যাগিংসহ নানা যুক্তিতে অনেকের অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে, অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। এসব কারণে গণমাধ্যমে প্রত্যাশিত পরিবেশ ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। তবে আগের মতো হুমকির পরিবেশ না থাকায় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মন খুলে কথা বলতে পারছে, সাংবাদিকরাও লিখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরব। এ ছাড়া গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী রিপোর্ট দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সার্বিকভাবে গণমাধ্যমের ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে। 

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের আকাশসমান প্রত্যাশা ছিল। তারা কতটা পূরণ করতে পেরেছে?
ইফতেখারুজ্জামান: প্রত্যাশিত অর্জন হয়নি। সব সরকারের মতো এ সরকারেরও কিছু ব্যর্থতা রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এরকম একটা সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকে। অন্যদিকে পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের চ্যালেঞ্জ ছিল বেশি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্ষমতার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে। কিছু সফলতাও সরকারের রয়েছে। যেমন ব্যাংকিং খাত একটা গ্রুপের হাতে কলাপস ছিল। ৯টি ব্যাংক জবরদখল ছিল। সেই খাতকে অনেকটা টেনে তুলে আনতে পেরেছে। এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগেও অগ্রগতি রয়েছে। দেশের অনেক জটিল কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও এ সরকার ইতিবাচক অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।

খবরের কাগজ: অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও খবরের কাগজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
ইফতেখারুজ্জামান: খবরের কাগজকেও ধন্যবাদ।

বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
মহিদুল ইসলাম হাওলাদার

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উচ্চাভিলাষী বাজেট রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট খুব কমই দেখা গেছে।

 

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতিকে গতিশীল করার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মূল প্রশ্ন হলো–এই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ কোটিরও বেশি। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় প্রায় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতা এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ অথবা অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতার কারণে এ অর্থ প্রত্যাশিত মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতাও সে আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে তার চাপ সরাসরি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়বে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্যসংকট এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব ও ঋণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

আমার বিবেচনায় বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো–উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহে সম্ভাব্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতও নিয়মিতভাবে বড় আকারের ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক গভীর ও শক্তিশালী। ফলে তারা সহজেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই একই ধরনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন।

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, সুস্থ ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়, এই বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সভাপতি, জাতীয় পার্টি, মাদারীপুর জেলা শাখা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর
গাজীউল হাসান খান

চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না।...

মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমেই এখন এক বহুমুখী ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। শুধু পশ্চিমা রাজনৈতিক আধিপত্য নয়, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এ পরিবর্তনের ধারা শুরু হতে দেখা গেছে নব্বইয়ের সূচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই। দ্বিকেন্দ্রিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলনির্বিশেষে বিভিন্ন শক্তির অভ্যুদয় ক্রমে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তাতে বিশ্বব্যাপী কারও একচ্ছত্র আধিপত্যের পরিবর্তে বরং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের বিকাশ কিছুটা সহজসাধ্য হচ্ছে এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামরিক দিক থেকে নিরাপত্তার বিষয়গুলো জোরদার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে কারণে ভারতের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা সীমান্ত পথ রক্ষা করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অতি উৎসাহী কিছু ব্যক্তি কখনো বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ এবং পাশাপাশি ভারতের স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোকে রক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকল্পে এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অখণ্ডতা কিংবা সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে তার লালমনিরহাটসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য বিমান ঘাঁটিসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজ অতি দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত সমস্যা ভারতের অরুণাচল রাজ্যের সঙ্গেও তার প্রতিবেশী চীনের রয়েছে। কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের কোনো স্থায়ী সমাধান বা অবসান আজও হয়নি। এ অবস্থায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশেষ করে গাজাসহ ফিলিস্তিন-ভিত্তিক ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও তার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সার্বিক উন্নয়ন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, অবিলম্বে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় তাকে বলেছেন যে, চীনের উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মসূচির কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শেষের দিকে চীন সফরে যাচ্ছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে বহু কারণে এ দেশের পরলোকগত নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বিশেষ করে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বিনির্মাণের ক্ষেত্রে চীন আমাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। সে কারণে বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিতে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিপ্লব-উত্তর বিগত প্রায় ৭৭ বছরে চীন তার পঞ্চশীলা নীতি অনুযায়ী ভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির বরখেলাপ। কিন্তু গত বছর চীনের প্রণীত ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সূচিত হয়েছে বিরাট পরিবর্তন। গণচীনের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, তাতে জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায়ে তুলে আনা হয়েছে। সে হিসেবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখন অনেক গুরুত্ব লাভ করেছে। সে কারণে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামরিক ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। তাতে অভ্যন্তরীণ এবং এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ চীনের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এবং উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে উন্নয়নকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নকে অগ্রসর কিংবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন তিনটি বিষয় নির্ধারণ করেছে। সেগুলো হচ্ছে: কৌশলগত গঠনশীল স্থিতিশীলতা (Constructive Strategic Stability), বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (Gobal Development Initiative) এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (Global Security Initiative)। এর মাধ্যমে তারা আগামী ১০ বছর অর্থাৎ ২০৩৫ সালের মধ্যে আধুনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার পক্ষপাতি। তাই তারা এখন থেকেই প্রচার করছে যে, নিরাপত্তা হচ্ছে উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। সে শর্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নিরাপত্তাবেষ্টনী বা বলয় গড়ে উঠতে পারে। সে প্রস্তাবিত নিরাপত্তাবলয় শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা জগতের নিরাপত্তাব্যবস্থা ন্যাটোর মতো হবে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথভাবে গড়ে তোলা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিভিন্ন অঞ্চলিক উদ্যোগ, ব্যবস্থা কিংবা চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।

ওপরে উল্লিখিত প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান-ধারণা থেকেই একদিন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠন করা হয়েছিল। এ সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল ২০০১ সালের ১৫ জুন। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, তাজিকস্তান, কিরঘিজস্তান ও উজবেকিস্তানকে নিয়ে এ সহযোগিতা সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। পরে ভারত পাকিস্তান ও বেলারুশ তাতে যোগ দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঠেকানোও এর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে চীনের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোদার করার পরিকল্পনা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য হতে পারে সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসন ঠেকানো। চীন ক্রমে ক্রমে তার প্রতিবেশীদের নিয়ে সে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাজার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা এবং ডলারের আধিপত্যরোধ করার জন্য চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংস্থা ব্রিকস গঠিত হয়েছিল। তাতে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয় ২০১১ সালে। যুক্তরাষ্ট্র এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এখনো এ প্রতিষ্ঠানে ততটা অবদান না রাখতে পারলেও বিশেষ করে চীন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার কারণে ব্রিকস এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারত ব্রিকস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে পারে। তখন তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ইরান। তা ছাড়া বাংলাদেশও বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তা বিশেষভাবে নির্ভর করবে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।

চীন বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক বিএপি সরকার চীনের সঙ্গে অতীতে একযোগে কাজ করেছে অত্যন্ত নির্ভরতার সঙ্গে। শহিদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এটি চীনের সরকার এবং জনগণের কাছে নিঃসন্দেহে একটি গভীর আস্থা ও সম্মানের বিষয় হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন, যা আইনসঙ্গতভাবে তিনি করতে পারেন না। সেসব চুক্তি পরে অকার্যকর হয়ে গেলেও তার কিছু কিছু বিষয় চীনকে অখুশি করেছে বলে জানা যায়। অনেকে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র কারও বন্ধু হতে পারে না। এ কথা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অনেক বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। সে কারণে তার সঙ্গে সাবধানে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করেতে হবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন, নতুন উন্নয়ন ও নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন এখন অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের তিস্তা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার পর্যায়ে কাজ করেছে। তা ছাড়া, লালমনিরহাটে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ব্যাপারেও অনেক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা রয়েছে চীনের। একমাত্র তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেই প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রয়োজন বাংলাদেশের। প্রতিরক্ষা ও অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল কর্মপরিধি, যাতে অর্থ ও কারিগরি জ্ঞান কিংবা দক্ষতা সবকিছুই প্রয়োজন হবে ধাপে ধাপে। বর্তমান অবস্থায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের সংগ্রাম সফল হোক। এক নতুন যুগের সূচনা করুক তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
[email protected]

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না।...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দামও এক দফায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়েছে। এখন মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা উসকে যাবে। এমনকি বাজারে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অনেকটা হিমশিম পর্যায়ে উঠতে হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সংস্কারমূলক পরামর্শের কারণে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, ডলারের বিনিময় হার– সবকিছুই জ্বালানি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–বিশ্ববাজারে ওঠানামা থাকলেও দেশে কেন বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে? কেন সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না? এবং এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি অনেকেই ২০ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলবে বিধায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অবশ্য প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির বিভিন্ন ইউনিট। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশের সংকটকালীন সময়ে বিএনপি কখনোই ভালোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। বিদ্যুতের দাম বাড়বে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।’ 

অনেকেই আছেন যারা একসময় বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে টেলিভিশনসহ রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় তুলত, তাদের কেউ কেউ এখন সরকারের কেবিনেটে আছেন। তারা সরকারে থাকার অজুহাতে হয়তো মুখ বন্ধ করে আছেন এই মুহূর্তে। আমরা মনে করি তারা যদি সরকারে না থাকত নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ঝড় তুলতেন টকশোয় কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে।

বাজেট ঘোষণার আগেই বিদ্যুৎ ও জ্বালিানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব ফেলছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অন্যান্য দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়? অনেক দেশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিছু দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর কমিয়ে দেয়, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কম পড়ে। কিছু দেশ পরিবহন খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়। অনেক উন্নত দেশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি প্রদান করে।

আবার অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা তাদের অর্থনীতিকে তুলনামূলক কম প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বিস্তার এখনো সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি কর্মচারী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের আয় একই থাকে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। যদি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী–সবকিছুর দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়বেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা হারাতে পারে, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হতে পারে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, যা চাকরির সুযোগও সীমিত করে। চতুর্থত, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মধ্যবিত্তের একটি অংশও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। যারা কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এখন আমাদের মাথায় একটি বিষয় খুব ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো বাজেটের পর পরিস্থিতি কী হতে পারে? সরকার কি যথাযথভাবে সবকিছু সামাল দিতে পারবে? সাধারণত বাজেটের সময় সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক সমন্বয় করে। যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা আমদানিনির্ভর খাতে নতুন কর আরোপ বা শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সরকার যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে কিছুটা চাপ লাঘব হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের বিশেষ ইফেক্ট সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, একটি খাতে মূল্য বৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে অন্য সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করা, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখা। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না। বাজেট-পরবর্তী বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থের মধ্যে সরকার কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।...

নতুন সরকার কেমন বাজেট প্রণয়ন করে এবং কোন কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। প্রস্তাবিত বাজেট এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট হতে যাচ্ছে, এটি অনুমান করা গিয়েছিল। বাজেটে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরান্তে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। একটি দেশের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়সংবলিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ৫০১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নতুন সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম।

দেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে বেকার সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে চায়। এসব প্রতিটি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। অনেক দিন ধরেই এ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় নেই। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতকে দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত রেখে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা যায় না। নতুন সরকার এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে।

চলমান দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে ৭ শতাংশ সরল সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ তহবিল থেকে কীভাবে ঋণ বিতরণ করা হবে, কারা সেই ঋণ পাবেন–এসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত ঋণখেলাপি এবং নানা আইনি সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের ক্লিন (ঋণখেলাপিমুক্ত) দেখাচ্ছেন, তারা যদি এ বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন, তাহলে বিশেষ ঋণদান তহবিল শুধু ব্যর্থ হবে তাই নয়, এটি ব্যাংক খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ দেশে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব রয়েছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি অথবা বিদেশি নাগরিক যদি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন, তাহলে তাদের ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।

বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা বিরাজ করছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এ বছর জুনের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আগামী অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিট অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই এর প্রভাব পড়বে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না বলে দেশ ক্রমাগত বিদেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেও ভালো নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়াতে হবে। আর উচ্চ হারে করারোপের পরিবর্তে করজাল বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সাধারণ করদাতারা যাতে কর প্রদানে আগ্রহী হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের কম। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। এ জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এ হার দ্রুততর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যেসব প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কয়েক বছর আগে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, সাধারণত কয়েকটি বিশেষ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। এগুলো হচ্ছে–প্রকল্প অনুমোদনকালে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালন নিয়োগে বিলম্ব এবং অনুমোদিত প্রকল্পের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণে অথবা ক্রয়ে বিলম্ব। এ ছাড়া প্রতিবারই দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। অর্থবছরের শেষের দুই মাস অর্থাৎ মে ও জুনে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়িত প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষুণ্ন হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বছরের শুরু থেকেই দ্রুততর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রণীত বাজেট সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করা।
 
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও বিগত অন্তর্বর্তী 
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?
দীপু মাহমুদ

বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।...

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। রাষ্ট্র কাদের জন্য ব্যয় করতে চায়, কাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাবে–তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিচার করতে হলে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো–বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিশু কি এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, শিশু কি এই বাজেটে দৃশ্যমান?

প্রথম দর্শনে উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হতে পারে। বাজেটের আকার বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে কেবল বরাদ্দের অঙ্ক দেখলে চলবে না। কারণ শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ নয়, বরং ‘শিশুদের প্রয়োজন কতটা দৃশ্যমান হলো’।

বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন, বিশেষ করে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় অধিক বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল–শিশুদের জন্য বরাদ্দকে দৃশ্যমান করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটের ভেতরে এমনভাবে শিশুদের উপস্থিতি থাকতে হবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় শিশুদের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ফল অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের কতটা শিশুদের জন্য? শিশু সুরক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন, পথশিশুদের সেবা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ কত? সামাজিক সুরক্ষার বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অংশ কতটা রয়েছে?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজেটে শিশুদের জন্য আলাদা লক্ষ্য ও দৃশ্যমান বরাদ্দ না থাকলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে শিশুরা প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষা তখন পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট চাহিদা আড়ালে থেকে যায়।

একই ধরনের প্রশ্ন মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? অর্থনীতিবিদ ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।

ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলতে হলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং সাপোর্ট এবং মানসিক বিকাশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই প্রারম্ভিক বিনিয়োগ কতটা দৃশ্যমান?

শিক্ষা খাতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বাজেটে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগকে আধুনিকায়ন বলা যায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা, যা শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক বোধকে বিকশিত করে।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে শিশুরা কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের আলোচনায় গ্রন্থাগার, শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এসব বিষয় কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।

শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অথচ গবেষণা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে বিনিয়োগ তার সারা জীবনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে শিশু পুষ্টিতে বিনিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তবে শিশুর প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশু সুরক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয় বাজেট আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের খেলা, অবসর, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিনোদনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় শিশুদের আনন্দের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বলি, পুষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।

শিশু কেবল পরীক্ষার্থী নয়। সে খেলবে, গল্প পড়বে, ছবি আঁকবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াবে। আনন্দও শিশুর অধিকার। শিশুবান্ধব সমাজ কেবল শিশুদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না, তাদের আনন্দময় শৈশবও নিশ্চিত করে।

একইভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বাজেটে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্নও রয়ে যায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন শিশু অধিকার প্রশ্নের অংশ। শিশুরা ক্রমশ অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি রয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

শিশুদের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক বিকাশ বলতে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নাগরিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো মূল্যবোধের বিকাশকে বোঝানো হচ্ছে। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি করে। কিন্তু শিশুর ভেতর নেতৃত্বে এই দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

শিশুদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করি–‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ।’ কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরও নাগরিক। তাদের অধিকার ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখা যায় না। তাদের নিরাপত্তা, আনন্দ, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আজকের, এই মুহূর্তের।

তাই শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন কেবল আগামী দিনের মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন নয়, এটা আজকের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শিশুবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্র শিশুদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা আছে। কিন্তু প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বলছে, মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, শিশুদের দৃশ্যমানতায়। সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার কিংবা স্বাস্থ্য খাত–সব ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান বরাদ্দ এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জিডিপি, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুখী, কতটা সৃজনশীল এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাজেটকে শুধু শিশুবান্ধব হলেই চলবে না, শিশুদের জন্য দৃশ্যমানও হতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক