দেশের নাগরিক হিসেবে জুলাই সনদকে আমি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখি। কারণ, জুলাই সনদ আমাদের আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে কীভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটাবে, রাষ্ট্রের সংস্কারগুলো কীভাবে হবে এবং কী পর্যায়ে হবে- সে ব্যাপারে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ঐকমত্য পোষণ করেছে। এনসিপিসহ আরও কয়েক দল সনদে স্বাক্ষর করেনি। তবে স্বাক্ষর করেনি, এটা শেষ কথা নয়। তারা আরও কিছু অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছে। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলে নিশ্চয়ই তারা স্বাক্ষর করবে। আমি তাদের ভূমিকাকে কখনো গৌণ করে দেখতে চাই না। কারণ, গণ-অভ্যুত্থানে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের অবশ্যই বিশেষ কোনো দাবি থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা জাতীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলে। ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কখনো কেউ পরাজিত করতে পারে না।
আমাদের জাতীয় নির্বাচনও ঐক্যবদ্ধভাবে করতে হবে। তাহলে আগামীর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবেই। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আমরা বর্বর জীব থেকে সভ্যতার দিকে যাচ্ছি। এটাও আমাদের বিশেষ অর্থে বুঝতে হবে। সভ্যতা নিয়ে একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী বলেছেন, মানবসভ্যতা বিকাশের, মানবসমাজ বিবর্তনের তিনটি ধাপ আছে। সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে সভ্যতা। পৃথিবীতে সভ্যতা তখন থেকে ধরা হয়- যখন থেকে অক্ষর বা বর্ণমালা আবিষ্কৃত হয়েছে। তাহলে মানবজাতি অনেক আগে থেকেই সভ্য জগতে প্রবেশ করেছে। আমাদের নানা উত্থান-পতনের কারণে, বিশেষ করে গত ১৬ বছরে আমাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। সেই অন্ধকারের অবসান হয়েছে এবং নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেই অর্থে তিনি বলেছেন যে, আমরা সভ্য সমাজে প্রবেশ করেছি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনের ছাপানো অনুলিপি ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হয়। এরপর ৫ মার্চ পুলিশ সংস্কার কমিশন ছাড়া অপর পাঁচটি কমিশনের প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ স্প্রেডশিট আকারে ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কারবিষয়ক ৭০টি, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক ২৭টি, বিচার বিভাগ সংস্কারবিষয়ক ২৩টি, জনপ্রশাসন সংস্কারবিষয়ক ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারবিষয়ক ২০টি সুপারিশ ছিল। এসব সুপারিশের ওপর মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের মতামত কমিশনের কাছে পাঠায়। এরপর শুরু হয় দফায় দফায় আলোচনা। ওই আলোচনার ভিত্তিতে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমতসহ ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ প্রণীত হয়।
আমার মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকার যে অভিষেক হয়েছে ঐকমত্য কমিশন সেগুলো বেশি বিবেচনা করবেন। যদি সেটা অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে এনসিপি স্বাক্ষর করবে। এমনকি বামদলগুলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের কিছু বক্তব্য আছে। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নিলেই সবাই স্বাক্ষর করবে। কেন তারা জুলাই সনদে সই করবে না, তার কারণগুলো সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছে তারা। জুলাই সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি, তাদের পক্ষ থেকে সংশোধনীগুলো সন্নিবেশিত হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী যে, সব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করবে। যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা সবাই স্বাক্ষর করবে। আমি মনে করি, এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ।
মানুষের মতো রাষ্ট্রেরও জন্মের পর বিকাশ এবং বিনাশ আছে। জন্মকালীন দুর্বলতাও থাকে, সেই দুর্বলতা দূর করা দরকার। কিন্তু জন্মটাকে অপমান ও অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সে ধরনের ঘটনাই ঘটেছে এবার। নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টার কারণে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর-প্রক্রিয়ায়। স্বাক্ষর হলো, আনুষ্ঠানিকতা হলো এখন অপেক্ষা গণতন্ত্রের। যারা স্বাক্ষর করেনি তাদের দায় কম, কিন্তু যারা স্বাক্ষর করেছে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার। আগামী দিনে সেটিই করতে হবে দেশের জনগণকে।
একটি দেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরে, গণবিপ্লবের পরে এক ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করে। আমরা সেখান থেকে পুরো মুক্ত নই। আমরা এটাকে নৈরাজ্য না বললেও, এখানে নানা ধরনের নাশকতা হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ নানাভাবে দেশের মানুষের সমস্যার মধ্যে ফেলবে এবং চেষ্টা চালাচ্ছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। সে জন্য আমি বারবার বলেছি যে, এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। সে জন্যই পুলিশ, র্যাবের ওপর নির্ভর করলে হবে না। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের সঙ্গে নিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে। আমরা যদি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, যেভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তা যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তাহলে কোনো নাশকতাই আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। সাময়িকভাবে নাশকতা করতে পারবে, কিন্তু বেশি দিন করতে পারবে না। আমাদের আরেকটি কথা হলো- নির্বাচনটা যত দ্রুত সম্ভব করে ফেলা ভালো। নির্বাচিত সরকার যদি হয়, তাহলে স্থিতিশীলতা দ্রুত আসবে। আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচিত সরকার নয়। এখানে তাদের পুরো কর্তৃত্ব তারা দেখাতে পারছে না। সে কারণে আমি মনে করি, জাতীয় ঐক্যবদ্ধভাবে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারি এবং সেটা করতে পারলেই আমাদের অন্য সংকটগুলো কেটে যাবে। সেজন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


