গাজায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান হামলা, যে হামলায়ে ১০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, এতে প্রমাণিত হয় যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থাটি আসলে কতটা ভঙ্গুর। ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটাই প্রথম যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন নয়, বরং গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বার বার ঘটেছে। এতে বোঝা যায়, শক্তিশালী প্রয়োগব্যবস্থা আর দৃঢ় পরিকল্পনা ছাড়া এই যুদ্ধবিরতি আসলে নামেমাত্র যুদ্ধবিরতি।
ইসরায়েল বলছে, রাফায় আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সেনা) বাহিনীর ওপর হামাসের গুলিবর্ষণ থেকে এবারের সহিংসতার শুরু। রাফা এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। ইসরায়েল জানিয়েছে এখানে হামাসের আক্রমণে আইডিএফের সংরক্ষিত এক সেনা নিহত হওয়ার পর সংঘাত শুরু হয়। কিন্তু হামাস এই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। ইসরায়েল গাজা সিটি এবং খান ইউনিসে বাড়তি হামলা চালিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায়। উভয়পক্ষই তাদের নিজস্ব স্বার্থ অনুসারে এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থার অস্পষ্ট কাঠামো বাস্তব ঘটনাকে ভুলভাবে তুলে ধরছে। সুযোগ করে দিচ্ছে যা খুশি করার।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার ২০ দফা পরিকল্পনার মধ্যে যুদ্ধবিরতির কথা আছে। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলি বাহিনীর আংশিক পিছু হটা আর জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের অবসানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উদযাপন করা হয়েছে। তবে মূল সমস্যা যা থেকে গেছে তা হলো, ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি একটা অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা। এতে যুদ্ধ শেষ করার স্পষ্ট সময়সীমা, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা কিংবা কীভাবে তা কার্যকর হবে; সেসবের বিশ্বাসযোগ্য কোনো উপায়ের কথা বলা নেই।
তা ছাড়া যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তৃত পরিকল্পনা করা হয়নি। গাজা থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, গাজায় একটি টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন- এসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এসব পদক্ষেপের স্পষ্ট রূপরেখা বা তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধান না থাকায় ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে, হামাস জিম্মিদের ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত তারা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। হামাস এই জিম্মি-সংক্রান্ত শর্তটি পূরণের চেষ্টা করছে। হামাস, তাদের পক্ষ থেকে ইসরায়েল বিরুদ্ধে জিম্মি ইস্যুটি ব্যবহার করার অভিযোগ করেছে। হামাস বলছে, সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অজুহাত হিসেবে জিম্মি ইস্যুটি সামনে এনেছে ইসরায়েল।
এদিকে গাজার অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো ভেঙে পড়ছে। দুই বছরের অব্যাহত যুদ্ধের ফলে গাজার মানুষ ইতোমধ্যে মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত; খাদ্য, পানি এবং ওষুধের তীব্র সংকটের সম্মুখীন। অন্যদিকে সাহায্য নিয়ে আসা কনভয়গুলো রাজনৈতিক দরকষাকষি এবং মাঝেমধ্যে অবরোধের শিকার হচ্ছে।
গাজার বাইরে, পশ্চিম তীরজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এই এলাকায় কয়েকদিন ধরে ইসরায়েলি বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘাত তীব্র হয়েছে। ইসরায়েলের ডানপন্থি সরকার যদি এই সংঘাতকে উৎসাহিত করে, তবে এই উত্তেজনা বর্তমান যুদ্ধবিরতির সীমাবদ্ধতার দিকে আরও মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং দেখা যাবে যে, সংঘাত আবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণভাবে প্রসারিত হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ, জেডি ভ্যান্স এবং মার্কো রুবিওর উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তারা একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ২০০ সেনা মোতায়েন করেছে এবং উভয়পক্ষের ওপর যুদ্ধবিরতি মেনে চলার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পৃক্ততাকে ইতিবাচক এবং মার্কিন সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়, তবু এই উদ্যোগ সংঘাতের নতুন ধারা বা চক্রকে বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের বিবৃতিগুলো সংযম অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছে কিন্তু জবাবদিহির ক্ষেত্রে অবদান রাখছে খুবই কম। নতুন প্রতিষ্ঠিত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটির যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই বা প্রয়োগ করার ক্ষমতা নেই। মিসর এবং কাতার তাদের মধ্যস্থতার ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে, তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তা কোনো অর্থবহ শান্তি পরিকল্পনা নয়, বরং এক ধরনের অস্থায়ী শান্তি পরিকল্পনা। এর ফলে উভয়পক্ষই পরবর্তী সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন রোধ করা অথবা এই লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে যেকোনো সামান্য উসকানিতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
প্রতিটি গুলি বিনিময়, প্রতিটি বিতর্কিত হত্যার প্রত্যাবর্তন এবং প্রতিটি অযাচাইকৃত অভিযোগ অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তুলবে। এতে শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা, আপসরফার সম্ভাবনাকে আরও সীমিত করে দেবে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার মৌলিক ত্রুটিগুলো বেশ স্পষ্ট। একে এমন একটি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা উচিত, যা মূল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে শুধু লক্ষণগুলোর চিকিৎসা করছে। গাজা এখনো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত এবং সামাজিকভাবে আহত। ইসরায়েল এখনো শক্তিশালী সামরিক অবস্থানে রয়েছে, যুদ্ধবিরতিকে অর্থপূর্ণ পরিবর্তনের পরিবর্তে কৌশলগত বিরতিকাল হিসেবে দেখছে।
যুদ্ধবিরতিকে একটি টেকসই কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে হলে কেবল মার্কিন চাপ এবং ট্রাম্পের ২০ দফার অস্পষ্ট রূপরেখার মাধ্যমে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে এটিকে শক্তিশালী করতে হবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে অবশ্যই স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, পুনর্গঠন ও প্রত্যাহারের স্পষ্ট সময়সীমা এবং নিরাপত্তা ও মানবিক প্রবেশাধিকারের বাধ্যতামূলক গ্যারান্টি থাকতে হবে। এই উপাদানগুলো ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত হবে না আর তা সহিংসতার চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবে। ফলে, পরিণাম হিসেবে সব শেষে দেখা যাবে, আরেকটি যুদ্ধের পথ তৈরি হচ্ছে।
লেখক: যুক্তরাজ্যের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

