আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় হয়েছে। আমাদের দেশের সরকার চাচ্ছে তাকে দেশে এনে রায় কার্যকর করতে। এ বিষয়টা কীভাবে তারা করতে পারে- সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। প্রথমত; তারা ভারতের কাছে অনুরোধ করবে তাকে দেশে পাঠাতে। নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারতে গিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে তিনি কথাবার্তা বলে এসেছেন। এনিয়ে বাইরে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা হচ্ছে না। আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার চিঠি লেখার কথা শুনেছি। তিনি চিঠি লিখছেন বলে আন্দাজ করা হচ্ছে। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। আইন উপদেষ্টা বলছিলেন, সে ক্ষেত্রে একটা আইনি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক আদালত আছে, তাদের মাধ্যমে বা জাতিসংঘের মাধ্যমে তাকে ফেরত পাঠানো- এ রকম করা যেতে পারে। আবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনিভাবে তেমন কিছু নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যেটা করা উচিত তা হলো- কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো।

ইতোমধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে এবং সবাই বলছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো দরকার। তার মানে এই নয় যে, ভারত ইতিবাচক সাড়া দেবে। একেবারেই না। বরং সবাই মনে করছে, অদূর ভবিষ্যতেও ভারত কোনোরকম সাড়া দেবে না। ইতিবাচক সাড়া দেবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। তার মানে এই নয় যে, সরকার যা করণীয় তা করবে না। তার মধ্যে চিঠিপত্র লেখা, মৌখিকভাবে বলা, ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বলা, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বলা যেতে পারে। এটা একবার নয়, একাধিকবার করা যেতে পারে। ফল হলো কি হলো না, তার জন্য অপেক্ষা না করে যা করণীয় তাই করতে হবে। মোটামুটি এটা নিশ্চিত যে, আপাতত এটা থেকে কোনোরকম সাড়া পাওয়া যাবে না ভারতের কাছ থেকে। তার বড় কারণ, এ সরকারের সময় ধরে নিচ্ছি আর কয়েক মাস। সে কারণে ভারতের ওপর চাপ তেমন একটা নেই।
নতুন সরকার এলে তারা কী করবে সেটা দেখে তার পর বুঝতে পারা যাবে যে, তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে। সুতরাং সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া মনে হয় না কোনো কিছু আশা করা যায় বা কেউ আশা করতে পারে। এর মধ্যে রাজনীতি জড়িয়ে আছে। সে রাজনীতির পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সুতরাং, সব ধরনের সম্ভাবনার বিষয়টি খোলা রেখে চিন্তাভাবনা করতে হবে আমাদের। নতুন সরকার এলে নতুন বাস্তবতা কী হয় তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
এখন নির্বাচন যাতে সঠিক হয়, সেটাই সবার করা উচিত। সেদিকে সবার দৃষ্টি থাকা উচিত। সরকারকে সে ব্যাপারে সহযোগিতা করা উচিত। সরকারকে বিভ্রান্ত পথে পরিচালিত করা যাবে না। সরকারের প্রচেষ্টা যদি ভালো হয় তাহলে সেই প্রচেষ্টাকে সবারই সহায়তা দেওয়া উচিত। আমি মনে করি সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার পরে কী হতে পারে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু ভালো একটা নির্বাচন হলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। নতুন সরকার এসে এ বিষয়গুলোতে আরও বেশি নজর দেবে, আরও সতর্ক হবে, এটুকু আশা করা যায়।
আমাদের যে আইনি কাঠামোগুলো আছে, সেগুলো খুব ত্রুটিপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা এমনভাবে ব্যবহার করছেন যে, তার জন্য কথাকথিত স্বৈরতন্ত্র সুযোগ পেয়েছে বা স্বৈরতন্ত্র তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টি অনেকটা এ রকম যে, যারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন, তারাও স্বৈরতন্ত্র গড়ে তুলতে পারেন। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। তার পর নির্বাচনব্যবস্থা যদি সঠিকভাবে না হয় তখন স্বৈরতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
আমাদের এখানে যা ঘটেছে, বেশির ভাগ লোক সেভাবেই তা দেখছেন। সুতরাং, আমাদের কাঠামো পাল্টালেই যে স্বৈরতন্ত্র হবে না- তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আইনের কতগুলো সীমাবদ্ধতা থাকে। যারা আইনটাকে প্রয়োগ করেন তাদের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সে জিনিসটা কেমন হবে। আইনকে বিভিন্নভাবে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করা যায়। সুতরাং আইন করে সবকিছু নিশ্চিত করা যায় না। তার পরও আইনে যদি ত্রুটি থাকে, সেই ত্রুটিগুলো দূর করা খুবই জরুরি। যাতে স্বৈরাচার ফিরে আসতে না পারে। যত আইনই আমরা করি না কেন- এটা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। এটা নির্ভর করে মানুষের স্বদিচ্ছার ওপর। আমাদের জনগণের নজরদারির ওপর। তারা যদি যথেষ্ট সতর্ক হন, তারা যদি যথেষ্ট সোচ্চার হন- তাহলে স্বৈরাচার দানা বাঁধতে পারে না। সুতরাং সেগুলোর ওপর মানুষের যে মনন সেখানে পরিবর্তনের বিষয় আছে।
কারণ, আমাদের দেশে আমাদের মানুষের মধ্যে একটা বড় অংশ হলো তারা দৈনন্দিন রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করে না। তারা বেশির ভাগ দিন আনে দিন খায়। প্রতিদিনের যা আয়-উপার্জনের ব্যাপার, তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তারা রাজনীতি নিয়ে অত গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না। নির্বাচনের সময় এলে চিন্তা করে। সুতরাং ওই যে একটা ফাঁক থেকে যায়, সারাক্ষণ সতর্কতা নেই- সেটার সুযোগ নিয়ে স্বৈরতন্ত্র গড়ে ওঠে। সেজন্য আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে
এখন সে ক্ষেত্রে যদি সাধারণ মানুষ যথেষ্ট না হয়, সাধারণ জনগণ যখন পারছেন না তখন এই দায়িত্বটা বেশি বর্তায় কাদের ওপর- যারা আমরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করি। তাদের ওপরে এ দায়িত্ব বর্তায়। তার পর আমরা যারা সাংবাদিক আছি, তাদের ওপরে দায়িত্বটুকু বর্তায়। তারা গণমানুষের মতামতকে সামনে নিয়ে আসে। তার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক যে নেতৃবৃন্দ আছেন তাদের নিয়মিত সতর্ক করে দেওয়া এবং তারা যে ভুল পথে চলেছে, তাদের সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য সচেষ্ট হওয়া। এ জিনিসগুলো আমাদের দেশে যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে করি না। সেটার কারণেই সুযোগ পেয়েছে স্বৈরতন্ত্র শক্ত হয়ে দাঁড়াবার। কাজেই আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্যদিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকাব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় আছি। দেশে নতুন সরকার এসে কীভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে বা অগ্রসর হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

