ইসরায়েল যে ভয়াবহ নৃশংসতার ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তা অতীতের কোনো ঘটনা নয়। তারা আধুনিক সেনাবাহিনী এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে মাধ্যমে অব্যাহতভাবে যুদ্ধাপরাধ করে চলেছে। একটি জাতিকে নির্মূল করে দিচ্ছে। অনাহার রাখার কুকর্ম করছে আর এর সবই করছে পশ্চিমা গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ধ্বজাধারীদের সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে।
ইসরায়েলের এই গণহত্যার বিশেষ একটি ধরন আছে। তারা গণমাধ্যম ও প্রচার-প্রোপাগান্ডাকে আগ্রাসনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। এই কৌশল গণহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধকে খুব সহজেই বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করছে। যুদ্ধাপরাধ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে তথ্য গোপন করার কাজে তারা লিপ্ত রয়েছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানুষের যে সহানুভূতি রয়েছে, তাকে নিরুৎসাহিত করছে।

গণহত্যা চালানোর এই বিভ্রান্তিকর কৌশলের অংশ হিসেবে ইসরায়েল হেন কিছু নেই যে করছে না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সামনে গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের জবাব দেওয়ার কূটকৌশল অবলম্বন করছে। সেই কৌশলটি হলো, ইসরায়েল কোনো ঘটনা ঘটালে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য ইসরায়েল এবং তার দোসর আমেরিকা অপপ্রচার শুরু করে দেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই হচ্ছে কৌশলগত দিক থেকে ইসরায়েল এগিয়ে থাকার রহস্য। একই সঙ্গে দেশটি দিনের পর দিন ফিলিস্তিনি জনগণের জীবনের ভিত্তি এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে চলেছে।
ইসরায়েলের গণহত্যার মূলনীতি হলো, অপকর্ম করে যেতে হবে আবার তা অস্বীকারও করতে হবে। এই অস্বীকৃতির ভাষাটা এমন, ‘গাজায় কেউ ক্ষুধার্ত নেই। বিশ্ব গাজার যে হৃদয়বিদারক ছবি ও ভিডিও দেখছে তা বানানো, অতিরঞ্জন মাত্র। গাজার মানুষ বিলাসবহুল সামুদ্রিক খাবার পর্যন্ত উপভোগ করে।’
গাজার একটি পুরোনো রেস্তোরাঁর মেন্যু অথবা স্থানীয় শিশুদের সুখী সুন্দর বানানো ছবি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে বোঝায় যে, গাজার মানুষ তো প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাস করছে। শিশুদের ক্ষুধার্ত রাখার বিষয়ে মিত্ররা দেশটিকে মাঝে মাঝে সতর্ক করে দেয়। কিন্তু গোরস্থানকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং কবর থেকে লাশ উঠে আসার মতো ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেবে ইসরায়েল?
আসলে ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ ২১ শতকের গণহত্যার একটি মারাত্মক দিক। গণহত্যার জন্য ‘শত্রুরাই দায়ী’ এমন ন্যারেটিভ সামনে নিয়ে আসা হয়। এই দায় চাপানো হয় পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর। কতটা নির্মম তা বিবেচনা না করে গণহত্যাকারী শাসকদের যুদ্ধাপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। হামাস যুদ্ধে ‘মানবঢাল’ ব্যবহার করছে অভিযোগ তুলে সব ফিলিস্তিনিকে টার্গেট করেছে ইসরায়েল। হামাসের সামরিক কেন্দ্রগুলোয় আক্রমণ করার নামে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এই হামলাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বানোয়াট ম্যাপ, ছবি ইত্যাদি ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনিদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য তাদের মানবিক গুণাবলিকে কেড়ে নিয়ে দানব বা জম্বি বলছে। গণহত্যাকে জায়েজ করার এটাই হচ্ছে ইসরায়েলি কৌশল। এই অপকৌশলের মূল কথাটা হচ্ছে, ফিলিস্তিনিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে তাদের নিজেদের জন্য, ইসরায়েলের কোনো দোষ নেই।
ইসরায়েলি খেলাটা হচ্ছে, হামাস বা ফিলিস্তিনিদের দায়ী করে তাদের ওপর নৃশংস হামলা চালাতে হবে। বিশ্বকে বোঝাতে হবে, ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই নিজেদের হাসপাতালে বোমা মারছে, স্কুল ধ্বংস করছে, মা ও শিশুদের ওপর গুলি চালাচ্ছে এবং নিজেরাই সাহায্যপ্রার্থীদের হত্যা করছে।
ফলে, বিপন্ন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদের ইসরায়েলের এই মিথ্যা দাবিকে খণ্ডন করার জন্য সব সময় ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ইসরায়েল এভাবেই মূল গণহত্যা থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এক ধরনের নিখুঁত বয়ান তৈরি করে তারা বাস্তুচ্যুত শিবিরের শিশুদের হত্যা করাকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। প্রয়োজনে আবার নাকি কান্নার ভান করে দুঃখ প্রকাশ করছে।
ইসরায়েলি গণহত্যার আসলে পরিষ্কার একটি নীলনকশা আছে। সেই নীলনকশার নির্দেশিকা অনুসারে ফিলিস্তিনিদের ওপর নৃশংস হামলাকে আপনার যৌক্তিক মনে হতে পারে। তারা বলে, যদি আমরা এটি না করি তাহলে নিজেরাই হুমকির মুখে পড়ব। ফিলিস্তিনিরা আমাদের ধ্বংস করতে চায় এবং আমাদের তাই আত্মরক্ষার জন্য তাদের ওপর হামলা চালাতে হবে। আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি কোনো হুমকি এলে আমরা তা সহ্য করব না।
পশ্চিমাদের চুপ করানোর জন্য তারা তাদের ওপর অতীতে সংঘটিত নৃশংসতার কথা তুলে ধরে। প্রতিটি নতুন যুদ্ধাপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ জন্য বানোয়াট অজুহাতের ওপর ভিত্তি করে তারা অব্যাহতভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। কখনো কখনো কী ঘটেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাটকও করে।
এভাবেই তারা হাসপাতালে বোমা হামলা চালিয়েছে, সাহায্যপ্রার্থী ফিলিস্তিনি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার কর্মীদের হত্যার ন্যায্যতা দিয়েছে। এভাবে তারা একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন ও রোম ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলছে, তারা এই অপরাধ করেই যাচ্ছে। আর এটা করার জন্য ওই দেশগুলোর কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছে বলেও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।
গণহত্যার এই নীতি যে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে তা হলো, এই একবিংশ শতাব্দীতে কীভাবে একটি হাসপাতালের ওপর বোমা হামলাকে আপনি ন্যায্যতা দেবেন? একটি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে বোমা ফেলে আপনি বিশ্বকে কী বলবেন? মসজিদ, গির্জা, প্রাচীন মঠ বা ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত অজুহাত কী হতে পারে? আপনি কীভাবে বিশ্বকে ব্যাখ্যা করবেন যে আপনার সেনাবাহিনী একটি কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আর কবর থেকে লাশ উপড়ে ফেলেছে?
বহুতল আবাসিক ভবনে বোমা হামলার আগে তারা গল্প বানায়। সেই গল্পটা হচ্ছে ওই ভবনগুলোয় জঙ্গিদের ঘাঁটি রয়েছে। তারা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর নজরদারি করার জন্য গোয়েন্দা ক্যামেরা বসিয়েছে অথবা সেখান থেকে রকেট ছোড়া হয়েছিল। এরকম অভিযোগ দিয়েই তারা ফিলিস্তিনিদের সমাবেশ এবং তাঁবুগুলোয় বোমা হামলা চালিয়েছে।
বেসামরিক নাগরিকদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ ক্ষুধার্ত রাখা, চিকিৎসাসেবা, শিশুখাদ্য, নারীর স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা এবং পানীয় জল থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও সহজ একটি যুক্তি তারা ব্যবহার করে। সেটা হলো, তাদের ভাষায়, ফিলিস্তিনি ‘জঙ্গিরা যে সাহায্য দেওয়া হয়েছে তা চুরি করে নিয়ে গেছে।’
একবিংশ শতাব্দীতে গণহত্যাকে জায়েজ করতে হলে মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা এবং যে বয়ান তৈরি করতে হয় তা হলো- ‘আমরা বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার জন্য লড়াই করছি’, ‘এ লড়াই ভালো বনাম মন্দের লড়াই’, ‘আলোর শক্তি এবং অন্ধকারের শক্তির মধ্যকার সংঘর্ষ।’ ইসরায়েল ঠিক এসবই করছে।
কিন্তু ইসরায়েল যদি এভাবে বয়ান তৈরি আর গণহত্যা চালাতে থাকে তাহলে ‘আন্তর্জাতিক আইন’, ‘জেনেভা কনভেনশন’ বা ‘মানবাধিকারের’ মতো শব্দগুলো উচ্চারণ করা থেকে দেশটির বিরত থাকা উচিত।
একবিংশ শতাব্দীতে গণহত্যা করতে হলে পশ্চিমা শক্তিকেন্দ্রগুলোর কৌশলগত সমর্থনের প্রয়োজন হয়। সমগ্র বিশ্বের কাছে দৃশ্যমান নৃশংসতাকে পশ্চিমারা ধারাবাহিকভাবে আড়াল করে থাকে। ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ইসরায়েলের গণহত্যাকে এভাবেই ধামাচাপা আর বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন গণহত্যার মধ্য দিয়ে একটি জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করে যাচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক-লেখক
ইউরোপীয় অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
মিডলইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


