ভ্লাদিমির পুতিনের দিল্লি সফরের বৃত্তান্তে প্রবেশ করার আগে একবার ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের ঐতিহাসিক সূত্রপাতের দিকে নজর বুলিয়ে নেওয়া যাক। ভারতের স্বাধীনতার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রথম উৎসাহ দেখায় সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া। সেই উৎসাহে সাড়া দিয়ে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তিন সদস্যের এক প্রতিনিধি দলকে মস্কো পাঠান। সেই দলটিতে ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক, যিনি পরে ভারতের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, কলকাতার কৃতবিদ্য পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা এবং ভারতের প্রথম ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ সচিব, কলকাতারই সুবিমল দত্ত (যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও সামলেছেন)। এই তিনজনের হাতে নেহরুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন জোসেফ স্টালিন। ভারত-রাশিয়ার সম্পর্কের সেই শুরু।

এর পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের জুন মাসে সোভিয়েত রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট তথা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্রেজনেভ আসেন ভারত সফরে। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসনে ইন্দিরা গান্ধী। তাদের মধ্যে ২৫-বছরের চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার মধ্যে অর্থনীতি থেকে প্রতিরক্ষা- প্রায় সব বিষয়ই স্থান পায়। এখানে বলা প্রয়োজন, ভারত ও রাশিয়া বারবার প্রমাণ করেছে দুটি দেশ পরস্পর পরস্পরের দুর্দিনের বন্ধু। পাকিস্তানের সঙ্গে দু-দুটি যুদ্ধে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া।
এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এবারের দিল্লি সফরকে শুধু একটি রুটিন বার্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখলে ঠিক হবে না। যখন বিশ্বজুড়ে বড় বড় শক্তির মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে, তখন এ সফর দেখিয়ে দিয়েছে, ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখনো শক্ত, স্থিতিশীল এবং পরস্পরের জন্য সহায়ক। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে, ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে নিজস্ব স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি ক্ষেত্রে। পশ্চিমা বাজারে বাধা পাওয়ায় রাশিয়া তেল কম দামে বিক্রি করতে শুরু করে। ভারত, যার বিপুল জ্বালানি প্রয়োজন, সেই সুযোগ কাজে লাগায়। এতে ভারতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর রাশিয়া পায় একটি স্থায়ী ক্রেতা দেশ। যদিও সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু ভারতীয় সংস্থা রুশ তেল কেনা কমিয়েছে, তবুও দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া এ বাণিজ্য পথ ভবিষ্যতে আরও অনেক পণ্যের আদান-প্রদানে কাজে লাগতে পারে।
এটা শুধু তেল কেনাবেচা নয়। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে। রাশিয়ার নতুন বাজার প্রয়োজন, আর ভারতের প্রয়োজন সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। তাই এ সম্পর্ক উভয়ের জন্য লাভজনক।
প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও জ্বালানি:
সম্পর্কের তিন মূল ভিত্তি
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে বড় স্তস্ত হলো প্রতিরক্ষা। ভারতের প্রায় ৬০.৭০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়া বা সোভিয়েত উৎসের। ফলে স্পেয়ার পার্টস, আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ প্রয়োজন। নতুন RELOS লজিস্টিক্স চুক্তি সামরিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করবে, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে ভারতের প্রবেশাধিকার বাড়াবে।
বাণিজ্যেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যের লক্ষ্য স্থির করেছে। রুপি-রুবল লেনদেন ব্যবস্থায় জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিষেধাজ্ঞার বাধা এড়ানো যায়। এমনকি RuPay ও Mir পেমেন্ট সিস্টেমকে যুক্ত করার কথাও আলোচনা হয়েছে। রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্যের সম্ভাবনা বাড়াতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ক্ষেত্রে রাশিয়া ভারতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টরসহ পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ক্ষেত্রেও যৌথ কাজের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পুতিনের সফর যদিও বন্ধুত্বপূর্ণ আবহে ভরপুর ছিল। মোদির ব্যক্তিগত আতিথ্য, উপহার ছিল। তবুও এ সফরের প্রধান অর্থ রাজনৈতিক। ভারত ও রাশিয়া বুঝে নিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন হলেও তাদের মূল স্বার্থ এখনো মিলছে। ভারতের প্রয়োজন রাশিয়ার প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সস্তা জ্বালানি। রাশিয়ার প্রয়োজন ভারতকে পাশে রাখা, যাতে তার চীন-নির্ভরতা কিছুটা কমে।
এ সম্মেলন দেখিয়ে দিয়েছে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক কেবল লেনদেনভিত্তিক নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল এবং বাস্তবতার ওপর দাঁড়ানো। পরিবর্তিত বিশ্বে ভারত নিজের পথ নিজেই ঠিক করছে: কখনো আমেরিকার সঙ্গে, কখনো রাশিয়ার সঙ্গে, কিন্তু সব সময় নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে।
এর পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য আফগানিস্তান নিয়ে বহু পুরোনো আন্তর্জাতিক ধারণাকে নাড়া দিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা দুনিয়া যেখানে এখনো তালেবানকে সন্দেহের চোখে দেখে, সেখানে পুতিন একেবারে বিপরীত সুরে বললেন: তালিবান সরকার বাস্তবতা, তারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ মন্তব্য শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় না। পাকিস্তানের কথিত ‘বর্ণনা’ও এতে ভেঙে পড়ে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে আফগান তালেবান পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে আশ্রয় দিচ্ছে, অস্ত্র দিচ্ছে এবং পাকিস্তানে হামলা চালাতে সাহায্য করছে। টিটিপির আক্রমণ ২০২২ সালের পর থেকে বাড়তেই থেকেছে। এ অস্থিরতার মুহূর্তে পুতিনের মন্তব্য পুরো তর্কপথই বদলে দিল।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তালিবান দৃঢ়ভাবেই আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখেছে এবং তা চোখে পড়ার মতো। এটাকে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে। কারণ এটিই বাস্তবতা।’ পাশাপাশি তিনি যুক্ত করলেন, ‘আফগান সরকার সন্ত্রাসবাদ ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে: আইএসআইএল এবং অন্যদের বিরুদ্ধেও।’
এ বক্তব্য পাকিস্তানের অভিযোগকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে। যদি তালেবান সন্ত্রাস দমন করে থাকে, তাহলে টিটিপি হামলার দায় কার? পুতিন কার্যত কাবুলের পক্ষে দাঁড়ালেন, পাকিস্তানের ধারাবাহিক অভিযোগকে দুর্বল করে দিলেন।
এ প্রেক্ষাপট আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ রাশিয়া ইতোমধ্যেই প্রথম বড় শক্তি হিসেবে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মস্কো নিয়মিত তালেবান প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে কথা বলছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে রাশিয়া নতুন আঞ্চলিক অংশীদার খুঁজছে এবং তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান সে তালিকায় উঠে এসেছে।
পুতিন আরও বলেছেন, আফগানিস্তানের কর্তৃপক্ষ অপিয়াম উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে এবং তারা মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। ওরকম সরল অথচ দৃঢ় মন্তব্যে পুতিনের উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার, আফগানিস্তানের ভেতরে প্রভাব ধরে রাখতে হলে বর্তমান শাসকদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে কাবুলের সম্পর্ক যখন ইতিহাসের তলানিতে। সীমান্তে গুলিবিনিময়, অন্তর্ভেদী হামলা, শীতকালে অর্ধলক্ষাধিক আফগান শরণার্থীকে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার- তখন পুতিনের এ বক্তব্য দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এ প্রেক্ষাপটে পুতিনের দিল্লি সফর আরও গভীর অর্থ বহন করে। ২৩তম ভারত, রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলন যেন পুরোনো প্রতিরক্ষা, জ্বালানি সহযোগিতার বাইরে গিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন বাণিজ্য-চিত্রে দাঁড় করাল। বহু দশক ধরে এ সম্পর্ক অস্ত্র কেনা আর জ্বালানি সরবরাহের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আজ অবস্থান বদলেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং রাশিয়ার বদলে যাওয়া আমদানি, চাহিদাকে কাজে লাগানো। গত বছর দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, কিন্তু এর ৯০ শতাংশই রাশিয়া থেকে ভারতে তেল, কয়লা, সার ও হীরা আমদানির কারণে।
বিপরীতে ভারত রাশিয়ায় পাঠিয়েছে মাত্র ৪.৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এ বিরাট বৈষম্য এখন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য সমস্যা।
অপ্রত্যাশিতভাবে পর্যটন দুই দেশের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ই-ভিসা, সরাসরি বিমান, ভারতীয় সংস্কৃতি উৎসব; সব মিলিয়ে রাশিয়ায় ভারতীয় পর্যটক দ্রুত বাড়ছে। রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ মিলিয়ন ভারতীয় পর্যটক আনার লক্ষ্য স্থির করেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো শ্রম। রাশিয়ায় নির্মাণ, প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স ও উৎপাদন শিল্পে শ্রমিকের ভয়াবহ সংকট। ভারত ও রাশিয়া মিলে এখন একটি আনুষ্ঠানিক শ্রম কাঠামো তৈরি করছে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ অন্তত ৭০ হাজার ভারতীয় কর্মী রাশিয়ায় কাজ করতে পারেন। পুতিনের মন্তব্য, তালিবানকে দেওয়া সমর্থন এবং দিল্লি সফর- সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক খেলা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ, আফগানিস্তানে নতুন বাস্তবতা এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য-রূপান্তরের উদ্যোগ, এসব কিছুর মধ্যেই রাশিয়া নতুন জায়গা খুঁজছে। ভারতের জন্যও এটি সুযোগ। নিজের রপ্তানি বাড়ানো, বাজার বিস্তার করা এবং বহুমেরু বিশ্বে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতাকে আরও শক্ত করা। এ সফর কেবল কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্পর্কের নতুন রূপরেখা।
ভ্লাদিমির পুতিন নয়াদিল্লিতে অবতরণ করার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একাধিকবার সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলেছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে খবর। উপমহাদেশে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের জকি সংগঠনগুলোর কথাও উঠে এসেছে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

