বাইরের শক্তিগুলো কেন্দ্রকে দুর্বল করে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা– যেমন উঁচু মাত্রার দুর্নীতি– স্বস্তিদায়ক মধ্যপন্থিদের সরিয়ে দিয়ে ক্রমশ বেড়ে যাওয়া বিশৃঙ্খল সহিংস পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিশেষে ইরানি ‘রিয়েল’ হয়তো স্থিতিশীল হবে, কিন্তু সামাজিক যে কাঠামো ভেঙে পড়ছে তা সহজে মেরামত করা যাবে না। ইরানি শাসকরা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পশ্চিমা জোট ব্যবহার করছে অর্থনৈতিক যুদ্ধকে। এই দুইয়ের মাঝে ইরানিদের এখন চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। এর ফলে ইরানিরা তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।…

ইরানের মুদ্রা রিয়েলের মান রেকর্ড পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের বাজার বন্ধ করে দেওয়াকে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই সংকীর্ণ প্রচলিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। ওয়াশিংটন ও তেলআবিবে এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে যাতে বলা হচ্ছে, ইরানি শাসকদের দিন শেষ। ইরানের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন নয়, বরং অনেক জটিল।
আমরা ইরানে রাজনৈতিক বিপ্লব দেখছি না। বরং ইরানি সমাজের একটা অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়ায় মরিয়া ভাব দেখা যাচ্ছে। ইরানকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ করে ফেলার কারণে ইরানি মধ্যবিত্ত শ্রেণি অমানবিক জীবনযাপন করছে। তাদের এখন নাভিশ্বাস উঠছে। অর্থনীতির এই মৃত্যুর খবর অবশ্য গোপন নেই।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বানিয়ে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করছে। ইরানের তেল রপ্তানিকে পশ্চিমারা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইরানের শিক্ষক, নার্স, আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঞ্চয়ের ওপর টান পড়ছে। এই আঘাত বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
২০১২-২০১৯ সালের মধ্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বার্ষিক ১৭ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে মধ্যবিত্তের সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ যারা একসময় ইরানি সমাজের উন্নত, মধ্যপন্থি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন, তারা ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণিতে নেমে এসেছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধ ইরানি রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে ‘নিরাপত্তাই-প্রথম’, এই অবস্থানে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছে। যখন জরুরি পণ্যগুলো– অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে খাদ্য–বিলাসপণ্য হয়ে ওঠে, তখন অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামো শুধু ভেঙে পড়ে না; বহিরাগত শক্তির দ্বারাও সে আক্রান্ত হয়।
নিঃসন্দেহে এই অর্থনৈতিক অবরোধ বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চাপের অংশ। ইরানের মাটিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সরাসরি সামরিক আক্রমণ ইরানকে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তার কথা সবার আগে বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
ইরানি অর্থনীতির সামরিকীকরণের ওপর আমাদের গবেষণা থেকে বুঝতে পেরেছি, বাইরের হুমকির কারণে ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র অজুহাতে ইরান তার সম্পদের ওপর নিজেদের দখলকে আরও কঠোর এবং নিষ্কণ্টক করতে চাইছে।
বৈশ্বিক আগ্রাসন সংস্কারকে উৎসাহিত করে না, সংস্কারের শ্বাসরোধ করে। উপরন্তু মোসাদের (ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা) সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিবৃতি, যেখানে বলা হয়েছে, ইরানি বিক্ষোভকারীদের তারা সমর্থন করবে, ইরানিদের অর্থনৈতিক অভিযোগকে সামনে নিয়ে আসে। ইরানের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের বিদ্রোহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ন্যায্যতা পেয়ে যায়।
পশ্চিমা নীতি-নির্ধারকরা প্রায়ই ধরে নেন, কোনো সমাজকে যদি যথেষ্ট জোরে চেপে ধরা যায়, অবধারিতভাবে তাহলে সেই দেশের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটবে। কিন্তু আমাদের দুই দশক ধরে পরিচালিত গবেষণা একে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। আমরা দেখেছি, কোনো দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করা হলে জাতীয় স্বার্বভৌমত্বকে ঘিরে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। গৃহযুদ্ধ এবং সামরিক অভ্যুত্থানের ঝুঁকি হ্রাস পায়। তবে এক্ষেত্রে বিদেশি শক্তিগুলো একদিকে নাগরিক বিশৃঙ্খলা এবং অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের ‘প্রেসার কুকার’ (বিপুল চাপ) হিসেবে কাজ করে।
এসব দেশে নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ কখনো নতুন সরকার আনে না; বরং তা সমাজে ও রাষ্ট্রে আরও মেরূকরণ ঘটায় এবং রাষ্ট্রকে অনিরাপদ করে তোলে। একজন নাগরিক যখন দেখেন মুদ্রার মান অর্ধেকে নেমে এসেছে, তখনই পরিকল্পিত দুর্নীতির খবর চাউর হয়। বিদ্রোহের সুযোগ শূন্যে নেমে আসে।
ডিজিটাল সমাজে বৈষম্য লুকানো অসম্ভব। ‘দরিদ্র মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ এখন বাস্তবে তাদের নিজস্ব দুর্ভোগ এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট ছায়া অর্থনীতি থেকে অভিজাতরা কতটা লাভবান হচ্ছে, সেই ব্যবধানটা দেখতে পাচ্ছে।
আসলে অর্থনীতির পতন নয়, ভবিষ্যতের দাবি মেটাতে হবে। ইরানি জনগণের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা আর পশ্চিমাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি কৌশলের সমস্যা হলো, তারা সমাজের সেই অংশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে যারা একটি স্থিতিশীল, সংস্কারবাদী এবং কম সংঘাতপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম।
বর্তমানে রাস্তায় থাকা বিক্ষুব্ধ ইরানিরা তাদের দেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলার দাবি করছেন না, তারা তাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং সম্মিলিত শাস্তির অবসান দাবি করছে; যা তাদের জীবনকে শূন্য করে দিয়েছে।
বাইরের শক্তিগুলো কেন্দ্রকে দুর্বল করে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা– যেমন উঁচু মাত্রার দুর্নীতি-স্বস্তিদায়ক মধ্যপন্থিদের সরিয়ে দিয়ে ক্রমশ বেড়ে যাওয়া বিশৃঙ্খল সহিংস পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
পরিশেষে ইরানি ‘রিয়েল’ হয়তো স্থিতিশীল হবে, কিন্তু সামাজিক যে কাঠামো ভেঙে পড়ছে তা সহজে মেরামত করা যাবে না। ইরানি শাসকরা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পশ্চিমা জোট ব্যবহার করছে অর্থনৈতিক যুদ্ধকে। এই দুইয়ের মাঝে ইরানিদের এখন চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। এর ফলে ইরানিরা তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে অবরুদ্ধ সমাজের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ইরানে। যতদিন সম্মিলিত শাস্তির নীতি প্রকৃত কূটনীতির দ্বারা প্রতিস্থাপিত না হবে, অস্থিরতা আরও গভীর হবে।
লেখক: জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবার্গের ‘সেন্টার ফর নিয়ার অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ (সিএনএমএস) এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সে’ মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির অধ্যাপক।
দ্য মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

