ট্রাম্প বিশ্ব মানচিত্রের সম্ভাবনাময় জায়গাকে চিনতে একটুও ভুল করেনি। যে কারণে বিদেশের মাটি, সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এসব কিছুই তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে। যেমন মেক্সিকোর কথাই বলি, ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে গালফ অব আমেরিকা রাখেন। এখানেও ট্রাম্প ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিটাই অনুসরণ করেছেন।....
নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্বরাজনীতিতে তুমুল ঝড় তুলেছে মার্কিন প্রশাসন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে আমেরিকার মাটিতে তার বিচার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া দেশটির বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলনে তোড়জোড় শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
তাদের এই আধিপত্যবাদ বিশ্বরাজনীতির আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক রীতিনীতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এমনকি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলুন।’
ভেনেজুয়েলায় যে ঘটনা ঘটেছে তা কলম্বিয়া, কিউবা, ইরান, মেক্সিকো, ডেনমার্কের মতো দেশগুলোর কপালে চিন্তার রেখা টেনে দিয়েছে। ট্রাম্পের নিশানায় কে কখন পড়বেন তা বলা মুশকিল। এই উদ্বেগ এখন ভর করেছে বিশ্বরাজনীতিতেও। কখনো ট্রাম্পের কাছে নিশানা করা দেশের মাটি, তেল, খনিজ সম্পদ কবজায় করে নেওয়ার জন্য যত ধরনের দোষ চাপিয়ে দেওয়া যায় তাই তিনি করছেন। তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসন, মাদক ও অবৈধ অভিবাসী—এগুলোর দোহাই দিয়ে নিশানা করা দেশগুলোকে প্রায়ই হুঁশিয়ারি দিয়ে থাকেন।
২০২৩ সালে তিনি দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ক্ষমতা ছাড়ি, ভেনেজুয়েলা তখন ভাঙনের মুখে ছিল। আমরা যদি তখন ওটা দখল করে নিতাম, তাহলে একদম পাশের বাড়িতেই দরকারি সব তেল পেতাম।’ তার তেল দখলের যুক্তি সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, মাদুরোকে যে ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হামলা ও অপহরণ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইন বা মার্কিন আইনের ক্ষেত্রে দুর্বল। বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে একই কথা বলছেন। বরং এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা হরণের এক কালো ব্যবস্থা।
বিশ্বরাজনীতিতে একক প্রভাব বলয় সৃষ্টি করায় কর্তৃত্ববাদী, ক্ষমতাধর ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য। আমরা লক্ষ করেছি, ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পর থেকেই বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রে অনিয়মতান্ত্রিক ও অন্যায়ভাবে বুলডোজার চালিয়ে দেশগুলোর ভিত্তি আরও দুর্বল করেছেন। এতে সেসব দেশে ধ্বংসযজ্ঞ, রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কোনোভাবেই আর সমাধান করা যায়নি। যার রেশ এখনো বয়ে নিতে হচ্ছে। নতুন করে ভেনেজুয়েলার ঘটনা সেই আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প তার এক বক্তব্যে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এসব এলাকা বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে চীন বিরল খনিজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে। ভবিষ্যতে মেরু অঞ্চলের বরফ গললে এ অঞ্চল হয়ে উঠবে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ট্রাম্প বিশ্ব মানচিত্রের সম্ভাবনাময় জায়গাকে চিনতে একটুও ভুল করেনি। যে কারণে বিদেশের মাটি, সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এসব কিছুই তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে।
যেমন মেক্সিকোর কথাই বলি, ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে গালফ অব আমেরিকা রাখেন। এখানেও ট্রাম্প ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিটাই অনুসরণ করেছেন। অবশ্য মেক্সিকান কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করে ট্রাম্প বলছেন, মাদক ও অবৈধ অভিবাসীর প্রবেশ ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট কাজ করছে না। এজন্য মাদকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এদিকেও চোখ তুলে তাকিয়েছে ট্রাম্প। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় সেখানে তেল সরবরাহ ভেঙে পড়লে দেশটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর বিনিময়ে কিউবা, ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ তেল পেতো। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে তাদের প্রভুত্ব কায়েম করতে চায়। ট্রাম্পের নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে ভেনেজুয়েলার সাজানো রাষ্ট্র নড়বড়ে করে দিতে একবিন্দুও কুণ্ঠাবোধ করেননি। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাও আজ ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ত’ হয়ে আছে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলায় মানবিক বিপর্যয় এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলার যুক্তরাষ্ট্রের বল প্রয়োগ কিছুতেই এ সংস্থা শক্ত কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সাইমন বলিভারের (মুক্তিদাতা) রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়াসহ অন্যান্য দেশ আজ নব্য উপনিবেশবাদের আগ্রাসনে পর্যুদস্ত। জন লক ও রুশোর মতো উদারপন্থি চিন্তাবিদদের বিপ্লবী ধারণা তার হৃদয়ে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়েছিল। তার লক্ষ্যই ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আমেরিকা তৈরি করা। সাইমন বলিভারের লাতিন আমেরিকাকে আজ মার্কিনিদের কাছে দাসত্ব করতে হচ্ছে এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই তাদের কাছে। যে শাসকই বুক ফুলিয়ে বা মাথা উঁচু করে আমেরিকার প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাকেই মুখোমুখি হতে হবে এ ধরনের গ্লানিকর পরিস্থিতির। এসব দেশের শাসকরা বৈশ্বিক রীতিনীতির বাইরে না গেলেও অনেক সময় মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। যদিও তারা জানেন, এগুলো করে তাদের কোনো লাভ হবে না। কারণ, মার্কিন ব্যবস্থার বিপরীতে যাওয়ার স্পর্ধা কারও নেই। ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য একবিংশ শতাব্দীর নব্য উপনিবেশবাদকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। যদিও পরোক্ষ উপনিবেশবাদের নজির হরহামেশা লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থাৎ ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে চাপের মধ্যে রেখেছে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো। আজ থেকে ২০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে ঠিক যেমন ব্রিটিশরা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ছলে বলে কৌশলে তারা এসব রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। উপনিবেশবাদী শোষণের বহু বছর পরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করি এর প্রভাব রয়েই গেছে। আবার নতুন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা শুরু করেছেন তা বিশ্বরাজনীতির জন্য ভয়ংকর বার্তা ছাড়া সুফল কিছু বয়ে আনবে বলে আশা করা যায় না। তার এই শাসক তুলে নেওয়ার কৌশল নীতি বিশ্বরাজনীতিতে নেতিবাচক ক্ষমতা চর্চার এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। বিশ্বে শান্তি বজায় থাকুক, ট্রাম্প প্রশাসনের বোধোদয় হোক। যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলুক সেটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ, বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ প্রাপ্ত (পল্লি উন্নয়ন) এবং স্থানীয় সরকার গবেষক


