‘ডোনরো মতবাদ’ নির্মমভাবে চালু করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন বছর শুরু করল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮২৩ সালের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী মনরো মতবাদকে আবার ফিরিয়ে আনলেন। জানুয়ারির ৩ তারিখে তিনি ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা চালান।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেলেন। এভাবে নতুন করে শুরু হলো সেই অন্ধকারের তত্ত্ব–ডোনরো মতবাদ।
গত এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র তিন মহাদেশের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই আক্রমণ পশ্চিম গোলার্ধের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯ ডিসেম্বর এবং আবার ১০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় বোমা হামলা চালাল। ইসলামিক স্টেটের সেসব সদস্যকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাল, যারা ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের দুজন সৈনিক এবং তাদের দোভাষীকে হত্যা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের যে ২০০০ সৈনিক সিরিয়ার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো দখল করে রেখেছেন, এই দুই সৈনিক ছিলেন সেই দলের। এই সৈন্যদের ছায়ায় যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সাল থেকে সিরিয়ার তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল উত্তোলন করছে। এই তেল বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র তার কোষাগার স্ফীত করে চলেছে।
‘বড়দিনের উপহার’ হিসেবে ট্রাম্প আফ্রিকার বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ নাইজেরিয়াতে বোমা হামলা চালান। সেখানে তার কথায়, খ্রিস্টানদের ‘বাঁচানোর’ উদ্দেশে বেশ কয়েকজন ‘জিহাদি’কে হত্যা করা হলো। তখন তিনি সতর্ক করে দিলেন, ‘খ্রিস্টানদের হত্যা করা হলে’ আবার নাইজেরিয়ায় হামলা চালানা হবে।
ট্রাম্প এরপর এশিয়ার দিকে তার আগ্রাসী থাবা বাড়ালেন। তিনি ইরানিদের বললেন ‘প্রতিবাদ করে’ যেতে আর ঘোষণা করলেন, ‘আপনাদের জন্য সাহায্য আসছে’। ইরানে এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয় ২৮ ডিসেম্বর। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেখানে এখন ব্যাপক বিক্ষোভ ও দাঙ্গা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ইরানে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে: প্রথমত, বিশ্বে তেলের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আর জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার যেন একমাত্র মুদ্রা হিসেবে গণ্য হয়, সেটা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের প্রভাব সীমিত রাখা।...
বলা হয়, ডোনরো মতবাদ হচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মতবাদ। পশ্চিম গোলার্ধকে পদানত রাখার যুক্তরাষ্ট্রীয় আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই মতবাদের উদ্ভব ঘটে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এটি হচ্ছে মূলত বিশ্ব-দখল-প্রকল্প।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানকে যে হুমকি দিচ্ছিলেন, সেই হুমকি তিনি তীব্র থেকে তীব্রতর করছেন। তেহরানের সঙ্গে সব আলোচনা বাতিল করে দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে যে দেশগুলো ব্যবসা করবে, তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইরানি সরকারের আচরণের অজুহাতে ‘খুব শক্তিশালী’ সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন।
দক্ষিণ আমেরিকায়, অর্থাৎ ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের অবৈধ আক্রমণের ফলে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। ট্রাম্প বায়না ধরেছেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলাকে তিনি ‘চালাবেন’। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি তেল মজুত রয়েছে এই ভেনেজুয়েলায়, এটা প্রমাণিত সত্য। ওয়াশিংটনের বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী মতবাদে এই তেল সম্পদই গুরুত্ব পাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করে ট্রাম্প তা আরও স্পষ্ট করলেন।
ট্রাম্পের শ্যেনদৃষ্টি এখন পড়েছে গ্রিনল্যান্ডের ওপর। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটা আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ধারণা করা হয়, এখানে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত আছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ড মার্কিন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ট্রাম্প ডেনমার্ককে বলপ্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন এবং ‘তারা (গ্রিনল্যান্ড) পছন্দ করুক বা না-ই করুক’, ট্রাম্প দ্বীপটিতে আক্রমণ করার সামরিক পরিকল্পনা করছেন। প্রসঙ্গত, ইসরায়েলের ভূমিগ্রাস (গাজা) আর গণহত্যার অতি উৎসাহী এক সমর্থক, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন সোমবার (১২ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নকক্ষে (প্রতিনিধি সভা) একটি বিল উত্থাপন করেছেন। এই বিলে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে: প্রথমত, বিশ্বে তেলের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আর জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার যেন একমাত্র মুদ্রা হিসেবে গণ্য হয় সেটা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের প্রভাব সীমিত রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী এলিটদের এ সবই নতুন উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মনে পড়ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের কথা। সে সময় ওয়াশিংটন বিশ্বব্যাপী সার্বভৌম দেশগুলোর তেলের ওপর নির্ভর করার জন্য শাসন পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) নীতি চালু করেছিল।
তেলসর্বস্ব নীতি
তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৯ সালের মার্চে সিআইএ সিরিয়ায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে সহায়তা করেছিল। অনেক পরে ২০১৪ সালে সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে যুক্তরাষ্ট্র তার সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছে। এখন খোলামেলাভাবে ইরানে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে। এ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানকে ওয়াশিংটনের হুমকি দেওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত।
সাম্রাজ্যবাদী অজুহাত
রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসার আগে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ছিল। ১৯৭৬ সালে প্রথমে সীমিত আকারে তা রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসা হয়। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতি শাভেজের অধীনে আরও জাতীয়করণ করা হয়। এর আগেই ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা শুরু করে। ২০১৪ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের অধীনে এই নিষেধাজ্ঞা অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ওবামা সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলোও দখল করে নেন।
তেলের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র নানা কারসাজির মাধ্যমে অনেকগুলো সরকারকে উৎখাত করে। অজুহাতও ছিল অদ্ভুত- সন্ত্রাসবাদ থেকে মাদক পাচার পর্যন্ত। সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছিল সিরিয়া ও লিবিয়ার বিরুদ্ধে। মাদক পাচারের কথা বলে অভিযুক্ত করা হয় ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়াকে। আর এখন গণতন্ত্রের গলা চেপে ধরা হচ্ছে বলে ইরানকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। হাস্যকর হলেও গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার জঘন্য অভিযোগে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে। ওই অস্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল শুধু সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ এবং দখলদারত্বকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য।
গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে এখন ট্রাম্প এমন একটি অভিনব যুক্তি দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক আইনে যার নজির নেই। সেই যুক্তিটা হচ্ছে: এলাকাটি ‘মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ’, সুতরাং এটি আমাদের দখল করতে হবে।
ট্রাম্প মাদুরোকে যে অপহরণ করলেন, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো অপরাধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করেছে এবং তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। ১৯৯০ সালে অপহরণ করা হয় পানামার ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি ছিলেন। অপহরণ করা হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হাইতির রাষ্ট্রপতি জ্যঁ-বার্ট্রান্ড আরিস্টাইডকে, যিনি হাইতি থেকে ফ্রান্সের দ্বারা লুট করা কোটি কোটি ডলার ফেরত চেয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অভ্যুত্থান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে-দেশে যুক্তরাষ্ট্র সিআইয়ের মাধ্যমে যে রেজিম চেঞ্জ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এনেছে, সেই তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। কয়েক ডজন হবে। বেশির ভাগ রেজিমের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল লাতিন আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্র এটা করেছে তেল ও খনিজ সম্পদের লোভে। গত মাসে ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে সেটা নতুন কিছু নয়। সহজেই মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ভীষণ ভয় পাচ্ছে।
ওয়াশিংটন হয়তো আশঙ্কা করছে, ইরানকে আক্রমণ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল কূপগুলোতে বোমা হামলা চালাতে পারে। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের বাজারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে নিয়ন্ত্রণ আছে তা ব্যাহত হতে পারে। ইরান ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশ এবং জর্ডানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে।
সিরিয়া ও লিবিয়ার তেল ক্ষেত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দখলে রয়েছে। নতুন করে দখল করেছে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র। পরবর্তী লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড ও নাইজেরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো। এই ক্ষেত্রগুলোর সবই আসলে ইরানের পাল্টা আক্রমণের কথা বিবেচনা করে দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো আক্রান্ত হলেও যাতে ওই সব এলাকা থেকে তেলের সরবরাহ ঠিক থাকে আর চীনের অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে বেকায়দায় ফেলা যায়; এই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা।
নতুন করে মনরো মতবাদের ওপর ভিত্তি করে যে ‘ডোনরো ডকট্রিন’ বা মতবাদকে সামনে নিয়ে আসা হলো, এই হচ্ছে তার লক্ষ্য। শুধু পশ্চিম গোলার্ধ নয় বরং সমগ্র বিশ্বকেই যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যে পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোর ঘটনা থেকে বোঝা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা কতটা বিস্তৃতি আর সাফল্য পায়।
(সংক্ষেপিত)
লেখক: নিউইয়র্ক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব অঞ্চলের রাজনীতি ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের অধ্যাপক। অসংখ্য একাডেমিক ও সাংবাদিকতাধর্মী নিবন্ধের লেখক। তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘ইসলাম ইন লিবের্যালিজম’।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


