ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নাটোরে এক গ্রামে ৪ শতাধিক জামাইয়ের বাস! ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যু নয়নের খাল খননে নয়ন কি জুড়াবে এবার? বিশ্বকাপে মিশরকে প্রথম ম্যাচ জয় উপহার দিয়ে উচ্ছ্বসিত সালাহ ঘরছাড়া মানুষের বাস্তবতা ও বৈশ্বিক দায়িত্ব আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে ভাইরাল ভেড়া অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই চুয়েট হলে চলন্ত ফ্যান ছিঁড়ে পড়ায় আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা ‘মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি’- ড্রেসিংরুমে ইরানের বার্তা যার শেষ পরিণতি হবে জাহান্নাম চকরিয়ায় সৌদিয়া বাস উল্টে আহত ৭ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে ঈশ্বরগঞ্জে কৃষকদের পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে আগুন অসংক্রামক রোগের আগ্রাসন মোকাবিলায় ৩৫ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে অভ্যন্তরীণ রুটে ১৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় গুজব মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিং সেল ২৪ ঘণ্টা সক্রিয়: তথ্যমন্ত্রী শিবপুরে বসুন্ধরা শুভসংঘের সেলাই মেশিন বিতরণ সাতকানিয়ায় মিলল মহাবিপন্ন হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১৬টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ২য় পত্র খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নোবিপ্রবিতে শিক্ষামন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনবল নিয়োগ, পদ ১১১ মালয়েশিয়া থেকে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাঙ্গায় শিক্ষার্থীর সঙ্গে অসদাচরণ, মাদরাসাশিক্ষক আটক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধরিয়ে দিলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা রাবি ছাত্রদলের বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর রামগঞ্জে স্কুলছাত্র মেহেদী হত্যা মামলায় হল সুপারসহ গ্রেপ্তার ২ স্কটল্যান্ডকে হালকাভাবে নিচ্ছে না ব্রাজিল: লুকাস পাকুয়েতা আনোয়ার ইব্রাহিমের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেরপুরে পিকআপভর্তি ভারতীয় মদসহ আটক ৩

গণভোট: কার জন্য এবং কেন?

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম
গণভোট: কার জন্য এবং কেন?
ফরিদ আহমদ দুলাল

সরকারের উচিত ছিল গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ; বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গণভোটের প্রয়োজন এবং আবশ্যিকতার বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত ছিল।...

নির্বাচন ঘুরে-ফিরে এলেও ‘গণভোট’ কিন্তু আমাদের জীবনে ঘন ঘন আসে না; যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সত্তরের দশকের শেষ দিকে একবার আয়োজন করেছিলেন গণভোট; এবং সে ভোটে ৯৮ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়েছিল। সে ভোটের পর ১৯৯১-এ রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় গণভোট; সেখানেও ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। আপাতত আর কোনো গণভোটের কথা স্মরণ করতে পারছি না। দীর্ঘ বিরতি আর অনভ্যাসের কারণে বিষয়টি আমাদের জীবনচর্চায় না থাকায় গণভোট ধারণাটি গণমানুষের কাছে পরিষ্কার থাকার কারণ নেই। বিশেষ করে দেশে শিক্ষার হার এবং সামাজিক সচেতনতা আর দায়বদ্ধতার মাত্রা এতটাই নিম্নপর্যায়ে, যেখানে সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে নিজ দায়িত্বে খোঁজখবর করে গণভোটের আদ্যোপান্ত জেনে নেবেন, তেমনটি আশা করা যায় না। তাছাড়া এবারের গণভোটের আয়োজন যথেষ্ট জটিল; খুব স্বল্প কথায় যা পরিষ্কার করাও সহজ নয়। এমতাবস্থায় জটিলতার বিষয়গুলোকে একবার সামনে আনা যাক-

ক. যতদূর জানা যায়, ২০২৪-এর পট-পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বিশেষ কমিটি কর্তৃক রচিত ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদনের জন্যই এবারের ‘গণভোট’। যে খসড়া নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার একাধিক বৈঠক আয়োজন করেছে। নিশ্চয়ই রাজনৈতিক দলগুলোকে সনদের খসড়া প্রদান করা হয়েছে; দীর্ঘ আলোচনার পর তারা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। বিভিন্ন দল সেখানে বিভিন্নরকম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে; এবং উত্থাপিত আপত্তিগুলো পরিবর্তনসাপেক্ষে সনদে সম্মতি জানিয়েছে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, এবারে সরকার বিষয়টি গণভোটে দিয়েছে জনসাধারণের মতামতের জন্য, হ্যাঁ-না ভোটের জন্য। আমার জানা নেই ‘জুলাই সনদ’-এর খসড়াটি জনসমক্ষে সরকার প্রকাশ করেছে কি না। যদি প্রকাশ করা না হয়ে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে ভোট দেব?

খ. গণভোট নয়, গণভোটের বিষয়গুলোকে আমাদের কাছে আগে উপস্থাপন করা দরকার, তার পর ভোট চাইলে ভালো হয়। তা না হলে এ ভোট সাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে হবে। জনগণকে আস্থায় নিয়েই তাদের গণভোটে আহ্বান করা উচিত।

গ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গণভোট’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাই হচ্ছে; কিন্তু সরকারি প্রচারমাধ্যম এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে যে ধরনের প্রচারণা চলছে, তাতে এ কথা স্পষ্ট, সরকার আমাদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। প্রধান উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজনকে আমি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলতে শুনেছি। অন্যদিকে আইন উপদেষ্টাকে বলতে শুনলাম, আমরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যে কোনোটাতে ভোট দিতে পারব, তাতে নাকি সরকারের কিছু বলার থাকবে না। এ অবস্থায় আমরা সাধারণ মানুষ কি বিভ্রান্ত হচ্ছি না!

ঘ. সেদিন দেখলাম দেশের একটি প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি বলেছেন, যারা ‘না’ ভোট দেবে তাদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই! তাদের নাকি দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে; এমতাবস্থায় আমাদের কি ভোট দেওয়া উচিত? নাকি বাধ্যতামূলকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটই দিতে হবে? যদি তাই হয়, তাহলে কেন ভোটের আয়োজন করে অর্থসম্পদের অপচয় করা?

ঙ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির কোনো কোনো নেতাকে দেখেছি ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলতে। তথ্যপ্রবাহের এ সময়ে তথ্যের যেমন অভাব নেই, তেমনি প্রোপাগান্ডারও তো কমতি নেই! আমরা আস্থা রাখব কীভাবে! বিএনপি নেতাদের কথায় আস্থা রাখলাম; পরে যদি বলা হয়, ওসব কথা সব ‘এআই’ দিয়ে বানানো; আখেরে আমরাই কি বিপদে পড়ব না?

চ. রাজনৈতিক দলগুলো যখন ‘খসড়া দলিল’ পাঠ-পর্যালোচনা করেও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে আমরা বিস্তারিত না জেনে, না বুঝেই কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেব? যখন সাধারণ মানুষের ওপর দেশ থেকে বিতারিত করার মতো ভীতি ও চাপ বিদ্যমান?

ছ. বিএনপি মহাসচিবসহ একাধিক নেতা গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’ তারা বলেছেন, তাদের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ খসড়ায় বিবেচনা করা হয়নি; এ ছাড়া এ সনদে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি, ইত্যাদি।

জ. জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট তেওয়ার জন্য প্রচার শুরু করেছে। বিশেষ করে এনসিপি তো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে গণভোটের প্রচারে অধিক তৎপর দেখতে পাচ্ছি; যদিও জুলাই সনদ প্রকাশনা অনুষ্ঠান যখন ঘটা করে বাস্তবায়িত হলো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে, সে আয়োজনে এনসিপি নেতাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি; এমনকি তারা সেদিন ঢাকাতেও উপস্থিত ছিলেন না; সনদে তারা স্বাক্ষরও করেননি।

ঝ. বিগত ১৭ মাসের বাস্তবতা এবং সরকারের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় দেশের সাধারণ মানুষ কতটা আস্থা রাখতে পারছে এ সরকারের ওপর? বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পতিত এবং সম্প্রতি ঘোষিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল সরকারের কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে যে ধরনের প্রচার নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে; সেখানে সাধারণ মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প কী?

ঞ. যখন অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না, সেখানে সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানানো কতটা যুক্তিযুক্ত?

রাজনীতিকরা যখন জনগণকে প্রধান শক্তি বলে মান্যতা দিয়ে থাকেন; সেই জনতা জনার্দনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কি উচিত? আসুন ছোট্ট একটা কবিতা পড়ে আলোচনার ইতি টানি-

তোমাদের হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত নিঃশব্দ ধ্বনিত হয়
বুকে ও মগজে নৈঃশব্দ্যের আর্তনাদে লজ্জিত বাঙ্ময়
দেয়ালের প্রতিটি ইটের পতনে চিত্রিত হয়
ঈশ্বরের হাসিমাখা মুখ থেকে একেকটি দাঁত ভূতলে বালুকাময়!...
(মানবতার ঈশ্বর।। ফরিদ আহমদ দুলাল)

সবদিক বিবেচনা করে সবিনয়ে বলতে চাই, সরকারের উচিত ছিল গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ; বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গণভোটের প্রয়োজন এবং আবশ্যিকতার বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত ছিল; তাতে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতো। তা না হলে এ গণভোটের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব
[email protected]

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে
গোলাম মোহাম্মদ কাদের

দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।...

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার প্রারম্ভে এ বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক বাজেট কী তা পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। তবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বলতে উনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। তা ছাড়া সব শ্রেণির মানুষের জন্য মোটামুটি যে যা চেয়েছে তা দেওয়ার অঙ্গীকার বাজেটভুক্ত করেছেন। সে হিসেবে বাজেটটি নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও জনতুষ্টিমূলক বা সবাইকে খুশি করার বাজেট বলা যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা। যার মোট পরিচালন ব্যয় ৬,২১,৯২৫ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ সংগ্রহ কীভাবে হবে: রাজস্ব আহরণ ৬,৯৫,০০০ টাকা, অনুদান ৬,১৫০ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ১,০৯,৮৫০ টাকা, অভ্যন্তরীণ ঋণ ১,২৭,০০০ টাকা। মোট অর্থ সংগ্রহ ৯,৩৮,০০০ টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটের অগ্রাধিকার বলতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; করব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা। সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ, মধ্যবিত্ত ও নতুন করদাতাদের জন্য কর কাঠামোয় কিছু সংস্কারের সম্ভাবনা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৬৮,৩০,০২৪ কোটি টাকা।

নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্কে রেয়াত দেওয়া হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বাজেট প্রস্তাবনায় নানা ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সবকিছুই করা হয়েছে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে যে আয়ের ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে, তা খুবই অনিশ্চিত।

পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, রাজস্ব আহরণের ধারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬-এর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আয় হয়েছে ৩,২৬,৯২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে একই হারে আয় হলে বছর শেষে আয় হতে পারে প্রায় ৩,৯২,৩১৪ কোটি টাকা বা এর চেয়ে অল্প কমবেশি।

করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে টিআইএন, বিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ফলে আগামী অর্থবছরেই বড় ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পাওয়া সহজ হবে না।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। গণমাধ্যমে ৮ জুন ২০২৬, টিআইবির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে খুনের সংখ্যা ৬০৫, অপহরণ ১৯৬ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচলে ভয় পায়। কারণ যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা বিরাজমান। এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা থাকছে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে ৪০০টির মতো মিল-কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল, যার অধিকাংশই শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২৯.০১.২৬)। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী। নতুন মিল-কারখানা স্থাপন শূন্যের কোঠায়। মূল্যস্ফীতি বেশি এবং এটা ঊর্ধ্বগামী। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২। সার্বিক পরিস্থিতির ফলে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ; আইএমএফ বলছে, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ; এডিবি বলছে, ৪ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। (সূত্র ১২ জুন ২০২৬, খবরের কাগজ)

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ওপরে বর্ণিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের সমর্থক বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার বহাল না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার আইনিভাবে হরণ করা হলে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা জেল, জুলুম এবং নির্যাতন-নিপিড়নের মাধ্যমে দমন করে রাখা হলে এই বিরাট জনগোষ্ঠী সব সময় তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তা ছাড়া, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি।

ধারণা করি, বর্তমান সরকার আর একটি বিষয় তেমনভাবে বিবেচনায় আনেনি। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও সারের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তা ছাড়া সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ দিয়েও অনেক সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা করছে। কেউ কেউ এটা ২ শতাংশ পর্যন্ত কমবে বলে প্রাক্কলন করেছে। এক কথায় বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে বলা যায়। জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। দেশে জ্বালানি সরবরাহ সহজলভ্য করতে গেলে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রয় করতে হবে। সে অর্থ বরাদ্দ বাজেটে আছে বলে মনে হলো না। তেল এবং গ্যাস সঠিক মূল্যে বিক্রয় করতে গেলে সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হবে। কৃষকদের যদি ভর্তুকিমূল্যে এবং সময়মতো সার সরবরাহ করা না হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে আশঙ্কা আছে বড় ধরনের খাদ্যসংকট তৈরির। সে বিষয়টিও বাজেটে আলোকপাত করা হয়নি।

প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় প্রস্তাবিত বাজেটে দেখানো হয়েছে ৬,২১,৯২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ সম্পূর্ণ ব্যবহার করার পরও অতিরিক্ত ২,২৯,৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি হবে। অর্থাৎ সরকার পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণের পরও দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে ২,২৯,৬১১ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ফলে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হবে। সে বিচারে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলা যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, বাস্তবায়নের ব্যত্যয়গুলো পরে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা থাকবে।

আমরা মনে করি, দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

কে কাকে শক্তি জোগায় বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়
আনু মুহাম্মদ

দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে।...

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচির নামে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পরিচালিত সন্ত্রাস, দখল, যুদ্ধ, গণহত্যা ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ‘বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর’ শিরোনামে যৌথভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন। এগুলো হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল’।

এ রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষা থেকে দেখানো হয়েছে–এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এখনো আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি, প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে প্যালেস্টাইনে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যা অব্যাহত আছে।

২০০১-এর আগে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আল-কায়েদা বা তালেবান ধারার কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। একপর্যায়ে এ অঞ্চলে বিরাট জৌলুস নিয়ে আবির্ভূত হয় আইসিস। যারা তাদের ভাষায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে তারা যেন আচমকা হাজির হয়। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করে। তবে কখনোই ইসরায়েলে হামলা করেনি। তারা আরও বিভিন্ন দেশে একের পর এক মুসলমানসহ ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী মানুষদের আক্রমণ করতে থাকে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করে বীরত্ব দেখাতে থাকে। হঠাৎ  করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয়ের কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়ার ফলে এ দেশগুলোর মানুষকে নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিন পক্ষ–সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের আসল অপরাধ স্বৈরশাসন ছিল না, ছিল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিল। সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই তাদের ওপর গোস্বা ছিল। গাদ্দাফি জীবনের শেষপর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে কথিত পুঁজিপন্থি কিছু সংস্কারের পথে গেলেও তার বড় অপরাধ ছিল সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফি সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভাড়াটিয়া উগ্রপন্থিদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদের কাছে সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদি আরব-ইসরায়েল অক্ষের বিরোধিতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য সে কারণে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদি-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইসরায়েলকে শক্তি জোগানো এবং ইরানকে কাবু করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র জোগানের ওপর ভর করেই এসব উগ্রপন্থি গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিসের পেছনে তাদের ও মিত্র দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলারসহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেলেন। পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী তথ্য যুক্তি দিয়ে সঠিকভাবেই দেখান যে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় মৌলবাদ, সব মৌলবাদের জন্মদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথাগত বিচারে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র অনেক দিকই চিহ্নিত করা যায়। যেমন–অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, সড়ক পথের বিস্তার ঘটেছে অনেক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়, আমদানি-রপ্তানি দুটোই বেড়েছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গার্মেন্টস বড় সাফল্য তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল মজুত তৈরি করেছে, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও মডেল অনেক বিস্তৃত হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, মোবাইল ইন্টারনেট শহর-গ্রামে যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে পেশাগত ও অর্থনৈতিক নতুন নতুন সুযোগ বেড়েছে, জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অনেক; যদিও মানুষের যথেষ্ট এবং নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হয়নি। মানুষের সচলতা বেড়েছে।

এ সমৃদ্ধির গতি ও ধরনের কারণে প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হয়েছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এর সামাজিক ও পরিবেশগত খেসারতও বেশি। নদীনালা, খালবিল, বন শিকার হয়েছে দখল ও বিপর্যয়ের। বৈষম্য বেড়েছে। এ সময়কালেই দেশে একটি অতি-ধনিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত চোরাই টাকার মালিকদের বিত্ত এবং দাপট বেড়েছে বহু গুণ। ঢাকা শহরে এখন একই সঙ্গে বিত্তের জৌলুস এবং দারিদ্র্যের নারকীয়তা দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে। চোরাই কোটিপতির সংখ্যা যখন বেড়েছে তখন মাথাগণনায় দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা বা কোনোভাবে টিকে থাকার আয়সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা চার কোটির বেশি। যদি দারিদ্র্যসীমায় শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই অমানবিক জীবনে আটকে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যতসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। দেশে তাদের কর্মসংস্থান নেই। বিদেশেও তাদের জীবন ও জীবিকা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। অন্যদিকে এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ হলেও তা কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক ও নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।

কয়েক দশকে নারীর দৃশ্যমান সচলতা স্পষ্টতই অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই নারী। শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও উপার্জনমুখী কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। গ্রাম-শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের শিশু ও নারীর অবস্থা তুলনায় আরও বেশি নাজুক। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করা, নারী ও শিশু পাচারের সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে একদিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর জৌলুস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিভীষিকা, একদিকে সম্ভাবনার বিকাশ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি দখলদারদের দাপটে জননিরাপত্তার বিপর্যয় একটি নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশকে নিক্ষেপ করেছে। দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে। তাদের বর্ম হিসেবেই ধর্ম ও ধর্মপন্থি গোষ্ঠী ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতাও এ সময়ে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?
এস এম নাজের হোসাইন

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।...

নিত্যপণ্যের বাজারে গেলে অনেক দোকানে দেখা যায় বড় বড় ড্রামে ভরা খোলা ভোজ্যতেল। ক্রেতা-ভোক্তারা ছোট বোতল বা পাত্র নিয়ে আসেন, দোকানি ড্রাম থেকে মেপে তেল ঢেলে দেন। অনেকের কাছে এটি স্বাভাবিক দৃশ্য। একজন নিম্নআয়ের মানুষ যখন খোলা তেল কিনছেন, তখন তার প্রধান চিন্তা থাকে, ‘কম দাম’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি যে দাম দিয়েই তেল কেনেন না কেন, সেটা আদৌ নিরাপদ কি না, তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বা ভিটামিন আছে কি না, কিংবা সেটি যে ড্রামে সংরক্ষণ করা হয়েছে তা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত, এসব জানার কোনো সুযোগই তার নেই।

বাংলাদেশে ভোজ্য তেল প্রতিদিনের পুষ্টি চাহিদার এক অপরিহার্য উৎস। অথচ যে তেল মানুষের শরীরে শক্তি ও পুষ্টি জোগানোর কথা, সেটাই এখন স্বাস্থ্য বিপন্নের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভোজ্য তেলের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে খোলা ড্রামের তেল। এসব তেল পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয় পুরোনো নন-ফুডগ্রেড প্লাস্টিক ড্রাম, অনেক আগেই যেগুলো রাসায়নিক, লুব্রিকেন্ট বা শিল্পকারখানার অন্যান্য পদার্থ বা কাঁচামাল বহনে ব্যবহৃত হয়েছে। পরে সামান্য ধুয়ে মুছে সেই একই ড্রামে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত তেল বাজারজাত করা হচ্ছে। এই প্লাস্টিক ড্রাম পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের ফলে ভোজ্য তেল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো এটি কি শুধু অব্যবস্থাপনা, নাকি সরাসরি ভোক্তার জীবনের সঙ্গে প্রতারণা?

এখানেই ভোক্তার অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ ভোক্তারা প্রতিদিন এমন একটি বাজারব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে পণ্যের মান, উৎস, সংরক্ষণ পদ্ধতি কিংবা পুষ্টিগুণ, কোনোটিই নিশ্চিত নয়। খোলা তেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এতে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে এবং সেই ভেজাল শনাক্ত করাও কঠিন। ভোজ্য তেলের এসব ড্রামে কোনো প্রকার লেবেল এবং উৎস শনাক্তকরণ তথ্য না থাকায় তেল সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ তেল কিনছেন ও ব্যবহার করছেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ খোলা তেলে মিলছে না প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা ভোজ্য তেলের ৫৯ শতাংশ নমুনায় ভিটামিন ‘এ’ অনুপস্থিত। এক-তৃতীয়াংশ নমুনায় প্রয়োজনের তুলনায় কম ভিটামিন পাওয়া গেছে। মাত্র ৭ শতাংশ নমুনা সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ ভোক্তা টাকা দিয়ে এমন একটি পণ্য কিনছেন, যা আইন অনুযায়ী মানসম্মত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। যে তেল মানুষের পুষ্টির ঘাটতি কমানোর কথা, সেটাই উল্টো অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের (গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নয়) মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় খোলা তেলের নামে পুষ্টিহীন পণ্য বাজারে চলতে দেওয়া মানে জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। ‘‘ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩” অনুযায়ী ফুডগ্রেডবিহীন প্যাকেজিংয়ে তেল বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকার বিভিন্ন সময়ে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের কড়া নির্দেশনা জারি করলেও মাঠপর্যায়ে এই সিদ্ধান্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ ভোক্তারাই ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈষম্যও স্পষ্ট। দরিদ্র মানুষ খোলা ভোজ্য তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অর্থাৎ অনিরাপদ তেলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সমাজের অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। একটি দরিদ্র পরিবার দাম দিয়ে তেল কিনলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যহানি, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আকাশচুম্বী চিকিৎসা ব্যয়ের মাধ্যমে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন।

এই চক্রাকার সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নীতিমালার বাস্তবায়ন। প্রথমত, অস্বাস্থ্যকর ও নন-ফুডগ্রেড ড্রামে ভোজ্য তেল পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারে প্রাপ্ত সব তেল ফুডগ্রেড বোতল, পাউচ বা নিরাপদ প্যাকেজিংয়ে বাজারজাত বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, বাজার তদারকি, ল্যাব টেস্ট এবং উৎস শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তাদের মধ্যে অনিরাপদ খোলা তেল ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরতে বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আর এ লক্ষ্যে সরকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিতভাবে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। ভোক্তার অধিকার নিয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে, কারণ ভোক্তার স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্য তেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) 
[email protected]

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন
ড. খলিলুর রহমান

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।...

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা, প্রকাশ্যে অপমান এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো আবারও একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গণপিটুনি ও জনতার বিচার (মব জাস্টিস) ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়; বরং এগুলো এমন এক দায়মুক্তির সংস্কৃতির লক্ষণ, যা ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন রূপে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যে, কত ঘন ঘন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, আইনবহির্ভূত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয়, লিঙ্গ, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, কোনো নাগরিককে জনতা, স্বঘোষিত ন্যায়বিচারক বা আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ব্যক্তিদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনানুগ প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রসিকিউটর মামলা পরিচালনা করবেন এবং আদালত নির্ধারণ করবেন কে দোষী আর কে নির্দোষ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে না।

বিশেষ করে গত ১৮ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় নারীদের ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে কোন আইনের বলে একজন সাধারণ নাগরিক অন্য কাউকে প্রকাশ্যে আটকে রাখতে, আক্রমণ করতে বা অপমান করতে পারেন? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ: এমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

যখন এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে এবং বারবার ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অনিবার্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে–বাংলাদেশ কি এখনো আইন দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান এবং জনতার শক্তির মাধ্যমে?

এই বিপজ্জনক প্রবণতার প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ নারীর ক্ষমতায়ন, কন্যাশিশুর শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্জনগুলো এ ধরনের সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ও।

বাংলাদেশ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এবং শিশু অধিকার সনদের (CRC) সদস্য রাষ্ট্র। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের সহিংসতা, বৈষম্য, নির্যাতন, শোষণ এবং অবমাননাকর আচরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) সদস্য এবং জাতিসংঘ সনদের সেই মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ, যা মানবিক মর্যাদা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।

অতএব, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সাংবিধানিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করা, শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়া এবং রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো জনতানির্ভর আইন প্রয়োগের সংস্কৃতির দৃশ্যমান স্বাভাবিকীকরণ। বহু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা নাগরিকরা হয়রানি, হুমকি, হামলা এবং প্রকাশ্যে অপমানের শিকার হয়েছেন। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটবে। কিন্তু সে প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসনের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের মতো নয়, এ সরকার জনগণের ভোট থেকে সরাসরি বৈধতা অর্জন করেছে। ফলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

অতএব, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যেকোনো ঘটনায় সরকারকে দ্রুত, দৃঢ় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা মতাদর্শগত সহানুভূতি নির্বিশেষে অপরাধীদের আদালতের মুখোমুখি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো প্রায়ই ঢাকাস্থ বিভিন্ন পশ্চিমা দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। প্রকাশ্য বিবৃতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উদ্বেগ প্রকাশ ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর অনেক বাংলাদেশি লক্ষ্য করেছেন, পরিস্থিতির প্রতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। নারী নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং অন্যান্য কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা একই ধরনের দৃশ্যমান উদ্বেগ বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পায়নি। বিশেষ করে কূটনৈতিক মহলের কিছু অংশ, ঢাকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার প্রতিনিধির নীরবতা অনেকের দৃষ্টিতে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে–বিশেষ করে ইউনূস প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক হোক বা না হোক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে এটি বৈধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা এর সর্বজনীনতার ওপর নির্ভর করে। ক্ষমতায় যারাই থাকুক, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিন্দিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর হামলা সরকারপক্ষ, বিরোধী দল কিংবা নাগরিক সমাজ–যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মানবাধিকার তখনই নৈতিক শক্তি হারায়, যখন তা পক্ষ বাছাই করে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের নেতাদের সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা কখনোই দলীয় বা রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে না।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস, জনস্বাস্থ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এসব অর্জন ধরে রাখতে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা নির্বাচনি বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং সব নাগরিকের সমান সুরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার।

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যতের দাবিদার, যেখানে কোনো নারী প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ভয়ে থাকবে না, কোনো শিশু সহিংসতার শিকার হবে না, কোনো নাগরিক যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি পাবে না এবং কোনো সরকার–নির্বাচিত বা অনির্বাচিত–জবাবদিহি এড়াতে পারবে না।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হোক। দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান হোক। বাছাই করা মানবাধিকার চর্চার অবসান হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব, সাবেক জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি