সরকারের উচিত ছিল গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ; বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গণভোটের প্রয়োজন এবং আবশ্যিকতার বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত ছিল।...

নির্বাচন ঘুরে-ফিরে এলেও ‘গণভোট’ কিন্তু আমাদের জীবনে ঘন ঘন আসে না; যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সত্তরের দশকের শেষ দিকে একবার আয়োজন করেছিলেন গণভোট; এবং সে ভোটে ৯৮ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়েছিল। সে ভোটের পর ১৯৯১-এ রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় গণভোট; সেখানেও ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। আপাতত আর কোনো গণভোটের কথা স্মরণ করতে পারছি না। দীর্ঘ বিরতি আর অনভ্যাসের কারণে বিষয়টি আমাদের জীবনচর্চায় না থাকায় গণভোট ধারণাটি গণমানুষের কাছে পরিষ্কার থাকার কারণ নেই। বিশেষ করে দেশে শিক্ষার হার এবং সামাজিক সচেতনতা আর দায়বদ্ধতার মাত্রা এতটাই নিম্নপর্যায়ে, যেখানে সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে নিজ দায়িত্বে খোঁজখবর করে গণভোটের আদ্যোপান্ত জেনে নেবেন, তেমনটি আশা করা যায় না। তাছাড়া এবারের গণভোটের আয়োজন যথেষ্ট জটিল; খুব স্বল্প কথায় যা পরিষ্কার করাও সহজ নয়। এমতাবস্থায় জটিলতার বিষয়গুলোকে একবার সামনে আনা যাক-
ক. যতদূর জানা যায়, ২০২৪-এর পট-পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বিশেষ কমিটি কর্তৃক রচিত ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদনের জন্যই এবারের ‘গণভোট’। যে খসড়া নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার একাধিক বৈঠক আয়োজন করেছে। নিশ্চয়ই রাজনৈতিক দলগুলোকে সনদের খসড়া প্রদান করা হয়েছে; দীর্ঘ আলোচনার পর তারা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। বিভিন্ন দল সেখানে বিভিন্নরকম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে; এবং উত্থাপিত আপত্তিগুলো পরিবর্তনসাপেক্ষে সনদে সম্মতি জানিয়েছে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, এবারে সরকার বিষয়টি গণভোটে দিয়েছে জনসাধারণের মতামতের জন্য, হ্যাঁ-না ভোটের জন্য। আমার জানা নেই ‘জুলাই সনদ’-এর খসড়াটি জনসমক্ষে সরকার প্রকাশ করেছে কি না। যদি প্রকাশ করা না হয়ে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে ভোট দেব?
খ. গণভোট নয়, গণভোটের বিষয়গুলোকে আমাদের কাছে আগে উপস্থাপন করা দরকার, তার পর ভোট চাইলে ভালো হয়। তা না হলে এ ভোট সাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে হবে। জনগণকে আস্থায় নিয়েই তাদের গণভোটে আহ্বান করা উচিত।
গ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গণভোট’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাই হচ্ছে; কিন্তু সরকারি প্রচারমাধ্যম এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে যে ধরনের প্রচারণা চলছে, তাতে এ কথা স্পষ্ট, সরকার আমাদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। প্রধান উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজনকে আমি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলতে শুনেছি। অন্যদিকে আইন উপদেষ্টাকে বলতে শুনলাম, আমরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যে কোনোটাতে ভোট দিতে পারব, তাতে নাকি সরকারের কিছু বলার থাকবে না। এ অবস্থায় আমরা সাধারণ মানুষ কি বিভ্রান্ত হচ্ছি না!
ঘ. সেদিন দেখলাম দেশের একটি প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি বলেছেন, যারা ‘না’ ভোট দেবে তাদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই! তাদের নাকি দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে; এমতাবস্থায় আমাদের কি ভোট দেওয়া উচিত? নাকি বাধ্যতামূলকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটই দিতে হবে? যদি তাই হয়, তাহলে কেন ভোটের আয়োজন করে অর্থসম্পদের অপচয় করা?
ঙ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির কোনো কোনো নেতাকে দেখেছি ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলতে। তথ্যপ্রবাহের এ সময়ে তথ্যের যেমন অভাব নেই, তেমনি প্রোপাগান্ডারও তো কমতি নেই! আমরা আস্থা রাখব কীভাবে! বিএনপি নেতাদের কথায় আস্থা রাখলাম; পরে যদি বলা হয়, ওসব কথা সব ‘এআই’ দিয়ে বানানো; আখেরে আমরাই কি বিপদে পড়ব না?
চ. রাজনৈতিক দলগুলো যখন ‘খসড়া দলিল’ পাঠ-পর্যালোচনা করেও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে আমরা বিস্তারিত না জেনে, না বুঝেই কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেব? যখন সাধারণ মানুষের ওপর দেশ থেকে বিতারিত করার মতো ভীতি ও চাপ বিদ্যমান?
ছ. বিএনপি মহাসচিবসহ একাধিক নেতা গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’ তারা বলেছেন, তাদের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ খসড়ায় বিবেচনা করা হয়নি; এ ছাড়া এ সনদে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি, ইত্যাদি।
জ. জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট তেওয়ার জন্য প্রচার শুরু করেছে। বিশেষ করে এনসিপি তো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে গণভোটের প্রচারে অধিক তৎপর দেখতে পাচ্ছি; যদিও জুলাই সনদ প্রকাশনা অনুষ্ঠান যখন ঘটা করে বাস্তবায়িত হলো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে, সে আয়োজনে এনসিপি নেতাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি; এমনকি তারা সেদিন ঢাকাতেও উপস্থিত ছিলেন না; সনদে তারা স্বাক্ষরও করেননি।
ঝ. বিগত ১৭ মাসের বাস্তবতা এবং সরকারের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় দেশের সাধারণ মানুষ কতটা আস্থা রাখতে পারছে এ সরকারের ওপর? বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পতিত এবং সম্প্রতি ঘোষিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল সরকারের কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে যে ধরনের প্রচার নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে; সেখানে সাধারণ মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প কী?
ঞ. যখন অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না, সেখানে সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানানো কতটা যুক্তিযুক্ত?
রাজনীতিকরা যখন জনগণকে প্রধান শক্তি বলে মান্যতা দিয়ে থাকেন; সেই জনতা জনার্দনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কি উচিত? আসুন ছোট্ট একটা কবিতা পড়ে আলোচনার ইতি টানি-
তোমাদের হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত নিঃশব্দ ধ্বনিত হয়
বুকে ও মগজে নৈঃশব্দ্যের আর্তনাদে লজ্জিত বাঙ্ময়
দেয়ালের প্রতিটি ইটের পতনে চিত্রিত হয়
ঈশ্বরের হাসিমাখা মুখ থেকে একেকটি দাঁত ভূতলে বালুকাময়!...
(মানবতার ঈশ্বর।। ফরিদ আহমদ দুলাল)
সবদিক বিবেচনা করে সবিনয়ে বলতে চাই, সরকারের উচিত ছিল গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ; বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গণভোটের প্রয়োজন এবং আবশ্যিকতার বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত ছিল; তাতে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতো। তা না হলে এ গণভোটের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব
[email protected]



