ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণে বাঙালি জাতীয়তাবাদীর উন্মেষ ঘটে এবং শেষ পরিণতিতে জাতীয়তাবাদের বিভক্তিতে পৃথক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, স্বাধীন বাংলাদেশ। বুর্জোয়া রাজনীতি মূলত ক্ষমতারই রাজনীতি। ক্ষমতাই একমাত্র লক্ষ্য। ওই লক্ষ্য পূরণে হেন অপকীর্তি নেই যেটা করতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ হয়।...

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্মযোগ বা ধর্মের ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। যুগযুগান্তর ধরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালেই সেটা মোটাদাগে ধরা পড়বে। জাতীয়তাবাদী মহাত্মা গান্ধী অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তার চরম শত্রুও তাকে সাম্প্রদায়িক বলতে পারবে না। তবে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ ধর্ম এবং রাজনীতিকে যুগলবন্দি করেছিলেন। সেটা আত্মঘাতী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দেশভাগ এবং হিন্দুত্ববাদীদের হাতে তার নৃশংস হত্যা সেটাই প্রমাণ করে। উপমহাদেশ বিভক্তির মূলে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল ছিল ধর্ম। ধর্মকে উপলক্ষ করেই দেশভাগ সম্পন্ন হয়েছিল। জাতির মোড়কে প্রধান দুই ভ্রাতৃপ্রতীম সম্প্রদায়ের উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনে এবং নৃশংস দাঙ্গায় সম্পন্ন হয়েছিল মর্মান্তিক দেশভাগ।
পাকিস্তান এবং ভারত সৃষ্টিতে জাতি পরিচয়ে ধর্মকেই অবলম্বন করা হয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে জাতিভেদ সামনে আসেনি ওই ধর্মেরই টানে। বহুজাতি ও ধর্মাবলম্বীর ভারতে স্ব স্ব ধর্ম ও জাতীয়তাকে ‘ভারতীয় জাতীয়তার’ কুশলী বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রাধীনে ব্যতিক্রম বাঙালি জাতি। জাতি পরিচয় বিলুপ্তি মেনে নেয়নি। ধর্মীয় পরিচয়কে অতিক্রম করে ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণে বাঙালি জাতীয়তাবাদীর উন্মেষ ঘটে এবং শেষ পরিণতিতে জাতীয়তাবাদের বিভক্তিতে পৃথক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, স্বাধীন বাংলাদেশ। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ কেবল ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না। স্বাধীন দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও ছিল নিষিদ্ধ। যেটি ভারত কিংবা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই নেই। ১৯৭৪ সালে ভারত ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানভুক্ত করলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেনি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সচল এবং সক্রিয় থাকায় ক্রমাগত তীব্রতর হয়ে ভারতের শাসনভার এখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের করতলগত। নির্বাচনের মাধ্যমে পরপর তিনবার হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি ক্ষমতায় আসীন। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তারা ক্ষমতায়। বাস্তবতা হচ্ছে বহু ভাষাভাষী ও সম্প্রদায়ের দেশ ভারতে হিন্দুরাষ্ট্র বাস্তবায়ন যে সম্ভব নয়, এ সত্যটি বিজেপি সরকার ভালো করেই জানে। হিন্দুরাষ্ট্রের ওই প্রচার নির্ভেজাল ভোটেরই রাজনীতি মাত্র। তাই বলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা কিন্তু থেমে নেই। বহুত্ববাদকে ভেঙে একক হিন্দুত্ববাদী অপতৎপরতা চলছে দেশজুড়ে। গো-রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক নৃশংস বর্বরতা অবিরাম ঘটে চলেছে। গো-হত্যা, গো-মাংস বহন ও রক্ষণের বানোয়াট অভিযোগে মানুষ হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বিজেপির শাসনামলজুড়ে। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যের ক্ষমতা বিজেপির নেই সেসব রাজ্যের ওপর গো-হত্যা বন্ধের কড়া হুমকি দিয়ে আসছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী উগ্রবাদীরা।
মহাত্মা গান্ধী গো-রক্ষার জন্য নানাবিধ কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। খেলাফতের সঙ্গে চুক্তি করে অকপটে বলেছেন, ‘মুসলমানদের ছুরির কবল থেকে গো-মাতাকে রক্ষায় তিনি ওই চুক্তি করেছিলেন’। গো-রক্ষার প্রচার-প্রচারণায় সারা ভারত চষে বেরিয়েছেন। গান্ধী অহিংসায় বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘গো-রক্ষার নামে হিংসার আশ্রয় নেওয়া যাবে না’। তিনি আরও বলেছেন, তিনি নিজে গো-সেবা করলেও, আমিষাশী মুসলমান ও খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ যারা গো-মাংস খায় তাদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। একাজ অন্যায়। তিনি স্বীকার করতেন এবং বলেছেন, ‘ভারতবর্ষ কেবল হিন্দুদের দেশ নয়। এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। তাদের প্রত্যেকের নিজস্বতাকে সম্মান করতে হবে’। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করে চলেছে। অর্ডিন্যান্স পর্যন্ত জারি করেছে। যেটি ভারতের জাতির জনক গান্ধীর আদর্শ ও নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী।
আপাত দৃষ্টিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দলের মতপার্থক্য ভিন্ন বলেই মনে হবে। অনেকে কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবেও গণ্য করে। অথচ এ কংগ্রেস দলের শাসনামলেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছিল। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বিপরীতে কংগ্রেস সরকার তখন মৌলবাদীদের ঘৃণিত অপকীর্তির তামাশা দেখেছিল মাত্র। স্বীয় কর্তব্য পালনে পুরোমাত্রায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল কংগ্রেস সরকার। সে দায় বা অভিযোগ থেকে কংগ্রেসের পরিত্রাণের উপায় নেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে সহিংস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দায়ও কংগ্রেস সরকারের ওপরই বর্তায়। সে দায় কংগ্রেসেকে বহন করতেই হবে।
প্রবল পরাক্রম বিজেপিকে রুখতে গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতায় বিজেপিবিরোধী ব্রিগেট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যার মূল উদ্যোক্তা পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ব্যতীত সব রাজনৈতিক দল বিজেপি ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে লড়ার ডাক দিয়েছিল। কংগ্রেস বলেছিল নির্বাচনে নয়, নির্বাচন পরবর্তী ঐক্যের কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিবিরোধী জোট গঠনে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ এর আগে লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বিজেপি জোটে শামিল হয়ে বিনিময়ে হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যে শূন্য অবস্থান থেকে বিজেপির রাজ্য ক্ষমতা লাভ মমতার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। পশ্চিম বাংলায় বিজেপির ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধি ঘটছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের অবস্থান তলানিতে ঠেকেছে। এরকম পরিস্থিতিতে মমতার প্রতিপক্ষ বিজেপি ঠেকানোর ভূমিকা নেওয়া খুবই স্বাভাবিক। নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে বিজেপি ঠেকানো ছাড়া তার গতি নেই। বামফ্রন্ট সরকারের প্রবল বিরোধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষয়িষ্ণু বামফ্রন্টকে আর প্রতিপক্ষ মনে করছেন না। তৃণমূলের প্রতিপক্ষ এখন কংগ্রেস কিংবা বামফ্রন্ট নয়, বিজেপি।
সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস প্রকাশ্যে অসম্প্রদায়িকতার মুখোশ এঁটে থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার অনেক নমুনা কিন্তু তাদের অপ্রকাশ্য থাকেনি। বিগত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তুরুপের নতুন চাল চালিয়েছিল। যেটি নির্ভেজাল বিজেপির অনুসরণে। কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হরিশ রাওয়াত প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলে অযোধ্যায় একটি বিশাল রামমন্দির নির্মাণ করবেন তারা। রাওয়াত দাবি করেন, আগেরবারও যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনো রামমন্দির নির্মাণের জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তারা। তিনি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলে বলেছিলেন, বিজেপি রামমন্দির বিষয়ে আন্তরিক নয়। রামমন্দির বিষয়ে তাদের অবস্থান কপট। বিজেপিতে অনৈতিক লোকে ভরা। অনৈতিক লোক পুরুষোত্তম রামের ভক্ত হতে পারেন না। তার এ প্রতিশ্রুতি কংগ্রেস দলীয় কি না জিজ্ঞেস করা হলে হরিশ রাওয়াত বলেন, ‘রামমন্দির বিষয়ে আমার বক্তব্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে। কংগ্রেসের তরফে সেটির বিষয়ে কোনো আপত্তি করা হয়নি।’ ভোটের রাজনীতির অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের পার্থক্য আর রইল কোথায়!
আমাদের দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়ার সামরিক সরকার সেটা বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। পাশাপাশি শাসনতন্ত্রের চার স্তম্ভ থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধান থেকে বিদায় করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় অপর সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ প্রবর্তন করেছিলেন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। এরশাদ-পরবর্তী অসামরিক শাসকরা সেটার পরিবর্তন তো পরের কথা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন। এমনকি সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক ধারা পাল্টে সাম্প্রদায়িক ধারা সংবিধানভুক্ত পর্যন্ত করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রবল উত্থান ঘটেছে বর্তমান সরকারের মদতে। জঙ্গি মৌলবাদীরা গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করে না। করে না নির্বাচনি ব্যবস্থায় শাসক বদলের ধারাও। তলোয়ার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলই তাদের লক্ষ্য। হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে সাম্প্রদায়িক শিক্ষার নানা উপকরণ যুক্ত করা হয়েছিল। হেফাজতিদের যেরূপ আশকারা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকারের শাসনামলে তারই ধারাবাহিকতা চলছে জামায়াতের নির্দেশনায়।
বুর্জোয়া রাজনীতি মূলত ক্ষমতারই রাজনীতি। ক্ষমতাই একমাত্র লক্ষ্য। ওই লক্ষ্য পূরণে হেন অপকীর্তি নেই যেটা করতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করতেও ছাড়ে না। মুখে অসাম্প্রদায়িকতার আওয়াজ তুললেও ক্ষমতার মোহে সবই জায়েজ করে নেয়। ক্ষমতা একমাত্র ক্ষমতার মোহেই তথাকথিত দক্ষিণপন্থি রাজনীতি নীতি-আদর্শের ধার ধারে না। কবি নজরুল ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘হায়রে ভজনালয় তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়’। আমাদের দক্ষিণ এবং চরম দক্ষিণপন্থার রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে অমনটা অনায়াসে বলা যায়।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
[email protected]

