ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আইভরি কোস্টের মুখোমুখি জার্মানি, দেখুন একাদশ জোড়া রেকর্ডের সামনে মেসি সুইডেনকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিল নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় ম্যাচের আগে ইংল্যান্ড শিবিরে ধাক্কা বিশ্ব বাবা দিবস আজ ধর্ষণের অভিযোগে ইমামকে গণপিটুনি, পরে পুলিশে হস্তান্তর ব্রায়ান ব্রোবির জোড়া গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে নেদারল্যান্ডস অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নামার আগে আর্জেন্টিনা শিবিরে দুঃসংবাদ এক দিনে দ্রুততম দুই গোল নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারাল বাংলাদেশ উল্লাসের পরদিন ৪০ টন স্মৃতি ছুটিতে গ্রামে গিয়ে ডাকাত হামলায় আহত এসিল্যান্ডসহ ৬ জন মেসির ফাউল: ফিফায় আলজেরিয়ার নালিশ ঈশ্বরগঞ্জে আ.লীগের সাবেক এমপির ফ্যাক্টরিতে লুটপাট ১১ মামলার আসামি বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা বুলবুল আটক বম সম্প্রদায়ের এক অসুস্থ নারীকে হেলিকপ্টারযোগে উদ্ধার করল সেনাবাহিনী উত্তরায় ভূমি গ্যালারিতে চিত্রপ্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোনালদো-মেসিদের মতো খেলো, অলিম্পিকে ভালো ফল চাই: প্রধানমন্ত্রী ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে গোপনে মরিয়া ছিলেন ট্রাম্প প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরেও যাবেন: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যুক্তরাজ্যকে নেতৃত্বের ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অসাধারণ কৃতিত্ব: ৮ মাসে কোরআন হিফজ, সংবর্ধিত আল-আমীন ব্রাজিল ম্যাচ জেতায় মাথা ন্যাড়া করলেন আর্জেন্টিনার সমর্থক ফরিদপুরে ‘গে গ্রুপ’ ইস্যুতে ৩ জন আটক জামায়াত গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল ব্যস্ত জীবন, ভার্চুয়াল বিনোদন: আমরা এখন কোন পথে? লেবাননে হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা তেহরানের রাবি প্রেসক্লাবের সভাপতি ধ্রুব-সম্পাদক জিসান বরিশাল বিভাগ এসএসসি ১৯৮৬ বাংলাদেশর দিনব্যাপী নৌ-বিহার আগস্টে টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ

ভারতের রাজনীতিতে আবার উত্তাপ

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ভারতের রাজনীতিতে আবার উত্তাপ
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

সংসদের অন্দরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বই বা একটি বক্তৃতাকে ঘিরে নয়। এটি আসলে শাসক ও বিরোধীর মধ্যকার বিশ্বাসের সংকট, সংসদীয় শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক আক্রমণের সীমারেখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরীক্ষাক্ষণ...

অতি সম্প্রতি ভারতের সংসদের বাজেট অধিবেশনের আবহে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে ওঠে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক একটি বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু গত সপ্তাহে শুক্রবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে সরকার আনুষ্ঠানিক নোটিস দেবে। অভিযোগ- ভারতের লোকসভায় একটি অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ‘দেশ বিক্রি’ ইত্যাদি মন্তব্য করেছেন, যা সংসদের মর্যাদাহানিকর। রাহুল গান্ধীকে আজীবন নির্বাচন লড়াইয়ের বাইরে রাখার দাবিও তুলেছেন বিজেপি নেতারা।

এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি Four Stars of Destiny। কংগ্রেস নেতা দাবি করেছেন, বইটিতে ২০২০ সালের ভারত-চীন সীমান্তসংকটের সময় প্রধানমন্ত্রী দায় এড়িয়েছেন, এমন ইঙ্গিত রয়েছে। বিজেপি শিবিরের অভিযোগ, এ দাবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা।

‘নিয়মভঙ্গ’ অভিযোগে সরকারের নোটিস সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কিরেন রিজিজু বলেছেন, ‘তিনি (রাহুল) একটি অপ্রকাশিত বই থেকে অবৈধভাবে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এটি স্পষ্ট নিয়মভঙ্গ। পাশাপাশি বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে দেশ বিক্রি প্রভৃতি অর্থহীন মন্তব্য করেছেন।’ তার বক্তব্য, এ আচরণ সংসদের রীতি ও মর্যাদার পরিপন্থি।

রিজিজু আরও জানান, সরকার নিজে একটি প্রস্তাব আনার কথা ভেবেছিল। কিন্তু বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে ব্যক্তিগত সাংসদ (প্রাইভেট মেম্বার) হিসেবে ‘সাবস্ট্যানটিভ মোশন’ আনায় আপাতত সরকার তার নিজস্ব প্রস্তাব স্থগিত রেখেছে। রিজিজুর ভাষায়, ‘প্রস্তাবটি স্পিকারের কাছে গৃহীত হলে আমরা লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব, এটি প্রিভিলেজ কমিটি, নাকি এথিক্স কমিটিতে পাঠানো হবে, নাকি সরাসরি সদনে আলোচনা হবে।’

সরকারি শিবিরের এ অবস্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের পর্যায়ে নেই। সংসদীয় প্রক্রিয়ার কঠোর পথ ধরেই এগোতে চাইছে বিজেপি।

সরল ভাষায়, এটি এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব যা স্পিকার গ্রহণ করলে তা নিয়ে বাধ্যতামূলক আলোচনা ও ভোটাভুটি হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রস্তাব কার্যকর হয়। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ ও সংসদীয় নিয়মাবলি মিলিয়ে লোকসভার সদস্যদের শৃঙ্খলাভঙ্গ বা গুরুতর অসদাচরণের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে।

নিশিকান্ত দুবে তার নোটিসে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার ধারাবাহিক অপকর্ম’-এর অভিযোগ তুলেছেন এবং আজীবন নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য ঘোষণাসহ বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। যদিও আজীবন নির্বাচনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রশ্নে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে: এটি কেবল লোকসভার সিদ্ধান্তে সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে বিতর্ক আছে।

নারাভানের বই ঘিরে বিতর্ক- এই সমগ্র বিতর্কের সূচনা রাহুল গান্ধীর সেই বক্তৃতা, যেখানে তিনি জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির উল্লেখ করেন। জানা গেছে, ‘ফোর স্টারস অব ডেসটিনি’ পাণ্ডুলিপিটি ২০২৩ সাল থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনুমোদনের অপেক্ষায়। জেনারেল নারাভানে এখনো বইটি প্রকাশ করেননি এবং প্রকাশের আগেই এর পিডিএফ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ায় দিল্লি পুলিশ মামলা দায়ের করেছে।

রাহুল গান্ধী লোকসভায় বইটির একটি মুদ্রিত কপি দেখিয়েছিলেন। তার দাবি, বইয়ে সীমান্ত সংকটের সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নের মুখে ফেলাবে। বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, এই দাবি ‘অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাবস্ট্যানটিভ মোশনের মাধ্যমে সদস্য বহিষ্কারের নজির রয়েছে। ২০২৩ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে নগদ-প্রশ্ন কেলেঙ্কারির অভিযোগে লোকসভা এথিক্স কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সদনের ভোটে বহিষ্কার করা হয়। সে ক্ষেত্রেও সাবস্ট্যানটিও মোশন ব্যবহাত হয়েছিল।

এ ছাড়া বিরোধীরা অতীতে উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভা চেনারম্যান জগদীপ ধানখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা নোটিস দিয়েছিল। বর্তমানে লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধেও অনাস্থা আনার কথা শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ, সাবস্ট্যানটিক মোশন কেবল শাসক দলের অস্ত্র নয়, বিরোধীরাও প্রয়োজনে এ পথ বেছে নিয়েছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্পষ্টভাবে এনডিএর হাতে। ফলে স্পিকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে এবং ভোটাভুটি হলে ফলাফল কোন দিকে যাবে, তা আন্দাজ করা কঠিন নয়। ইতোমধ্যেই রাহুল গান্ধীর বক্তৃতার কিন্তু আপ স্পিকার ‘এক্সপাঞ্জ’ করেছেন। অর্থাৎ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিত নেয়, সভাপতির দৃষ্টিতে বক্তব্যের কিছু অংশ সংসদীয় শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে।

তবু বহিষ্কার চূড়ান্ত ও বিরল শাস্তি। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন উঠতে পারে অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া কি এতটাই গুরুতর অপরাধ যে তা সদস্যপদ কেড়ে নেওয়ার মতো শাস্তি ডেকে আনবে?

কংগ্রেসের পাল্টা সুর: বিজেপির কড়া অবস্থানের জবাবে রাবুল গান্ধী সাংবাদিকদের উদ্দেশে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, ‘আপনারা এখনো পুরোপুরি বিজেপির চাকর হননি। অন্তত কিছুটা নিরপেক্ষতা দেখান। প্রতিদিন ওদের দেওয়া শব্দ নিয়ে অনুষ্ঠান চালাবেন না। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে. সি. ভেনুগোপালও বলেছেন, ‘আমরা কোনো প্রস্তাবে ভীত নই। আমাদের ফাঁসি দিতে চাইলে তাতেও প্রস্তুত।’

এ ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, কংগ্রেস বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই দেখছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করায় বিরোধী নেতাকে চুপ করাতে সংসদীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংসদের মর্যাদা বনাম বাকস্বাধীনতা: এখানেই মূল প্রশ্ন; সংসদের মর্যাদা রক্ষার দায় ও সদস্যের বাকস্বাধীনতার সীমানা কোথায় মিলিত হয়। সাংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ সংসদ সমস্যদের বক্তব্যের স্বাধীনতা দেয়, তবে সেই স্বাধীনতা ‘সংসদের নিয়মাবলি ও স্থায়ী আদেশের অধীন। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ অবাধ নয়।

অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি, তা যদি সত্যিই অনুমোদনবিহীন হয় তবে তা নৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্ন কি রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে মীমাংসিত হওয়া উচিত, নাকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে? বিশেষত যখন বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংকটের মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে জড়িত।

আগামীর পথ: এখন নজর স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তের দিতে। তিনি যদি নিশিকান্ত দুবের সাবস্ট্যানটিভ মোশন গ্রহণ করেন, তবে তা নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি অবশ্যম্ভাবী। সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রিভিলেজ কমিটি বা এথিক্স কমিটিতে পাঠানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ সংঘাত আগামী সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী রাজনীতিকে আরও তার করবে। রাহুল গান্ধীকে ঘিরে বিজেপির আক্রমণাত্মক কৌশল যেমন সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে পারে, তেমনি কংগ্রেসও এটিকে ‘গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে।

সংসদের অন্দরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বই বা একটি বক্তৃতাকে ঘিরে নয়। এটি আসলে শাসক ও বিরোধীর মধ্যকার বিশ্বাসের সংকট, সংসদীয় শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক আক্রমণের সীমারেখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরীক্ষাক্ষণ।

শেষ পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর সদস্যপদ থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে সংখ্যার অঙ্ক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু যে প্রশ্নটি বৃহত্তর সংসদের ভিতরে মতভেদের জায়গা কতটা প্রসারিত থাকবে। তার উত্তর নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সংযমের ওপর। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এ এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

এথিক্স কমিটির তদন্ত: কমিটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিশদ অনুসন্ধান চালায়। প্রয়োজনে সাক্ষী ডাকা হয়, প্রাসঙ্গিক নথি খতিয়ে দেখা হয় এবং অভিযুক্ত সাংসদকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। সব তথ্যপ্রমাণ বিচার করে কমিটি একটি রিপোর্ট তৈরি করে, যেখানে সুপারিশ উল্লেখ থাকে।

লোকসভায় রিপোর্ট: এ রিপোর্ট লোকসভায় পেশ করা হয়। যদি কমিটি মনে করে সাংসদ দোষী এবং বহিষ্কারের সুপারিশ করে, তা হলে সেই সুপারিশ গ্রহণের জন্য সভায় প্রস্তাব আনা হয়। উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন গেলে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।

অতীত বিতর্ক: রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে সরাটের একটি আদালত ফৌজদারি মানহানির মামলায় তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়। অভিযোগ ছিল, ‘মোদি’ পদবি নিয়ে মন্তব্যের জেরে এই মামলা। জন প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ৮(৩) ধারায় বলা আছে, দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলে সাংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য ঘোষিত হন। সেই সূত্রেই তার লোকসভার সদস্যপদ খারিজ হয়।

তবে রাহুল গান্ধী পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। শীর্ষ আদালত সাজা স্থগিত রাখায় তার সাংসদ পদ পুনর্বহাল হয় এবং তিনি ফের সংসদে যোগ দেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশিকান্ত দুবের নোটিস কতদূর গড়ায়, তা নির্ভর করবে সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কের ওপর। তবে বিধি মেনে এগোলে বহিষ্কার সম্ভব এ কথা স্পষ্ট।

নিশিকান্ত দুবের অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিদেশি সংস্থা, যেমন সোরোস ফাউন্ডেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউএসএআইডি-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও আমেরিকার মতো দেশে নিয়মিত সফর করেন। তার বক্তব্য, এসব যোগসূত্র দেশের স্বার্থবিরোধী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। সেই কারণেই তার সংসদীয় সদস্যপদ বাতিল এবং আজীবন নির্বাচনে লড়াইয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তোলা হয়েছে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?
এস এম নাজের হোসাইন

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।...

নিত্যপণ্যের বাজারে গেলে অনেক দোকানে দেখা যায় বড় বড় ড্রামে ভরা খোলা ভোজ্যতেল। ক্রেতা-ভোক্তারা ছোট বোতল বা পাত্র নিয়ে আসেন, দোকানি ড্রাম থেকে মেপে তেল ঢেলে দেন। অনেকের কাছে এটি স্বাভাবিক দৃশ্য। একজন নিম্নআয়ের মানুষ যখন খোলা তেল কিনছেন, তখন তার প্রধান চিন্তা থাকে, ‘কম দাম’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি যে দাম দিয়েই তেল কেনেন না কেন, সেটা আদৌ নিরাপদ কি না, তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বা ভিটামিন আছে কি না, কিংবা সেটি যে ড্রামে সংরক্ষণ করা হয়েছে তা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত, এসব জানার কোনো সুযোগই তার নেই।

বাংলাদেশে ভোজ্য তেল প্রতিদিনের পুষ্টি চাহিদার এক অপরিহার্য উৎস। অথচ যে তেল মানুষের শরীরে শক্তি ও পুষ্টি জোগানোর কথা, সেটাই এখন স্বাস্থ্য বিপন্নের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভোজ্য তেলের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে খোলা ড্রামের তেল। এসব তেল পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয় পুরোনো নন-ফুডগ্রেড প্লাস্টিক ড্রাম, অনেক আগেই যেগুলো রাসায়নিক, লুব্রিকেন্ট বা শিল্পকারখানার অন্যান্য পদার্থ বা কাঁচামাল বহনে ব্যবহৃত হয়েছে। পরে সামান্য ধুয়ে মুছে সেই একই ড্রামে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত তেল বাজারজাত করা হচ্ছে। এই প্লাস্টিক ড্রাম পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের ফলে ভোজ্য তেল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো এটি কি শুধু অব্যবস্থাপনা, নাকি সরাসরি ভোক্তার জীবনের সঙ্গে প্রতারণা?

এখানেই ভোক্তার অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ ভোক্তারা প্রতিদিন এমন একটি বাজারব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে পণ্যের মান, উৎস, সংরক্ষণ পদ্ধতি কিংবা পুষ্টিগুণ, কোনোটিই নিশ্চিত নয়। খোলা তেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এতে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে এবং সেই ভেজাল শনাক্ত করাও কঠিন। ভোজ্য তেলের এসব ড্রামে কোনো প্রকার লেবেল এবং উৎস শনাক্তকরণ তথ্য না থাকায় তেল সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ তেল কিনছেন ও ব্যবহার করছেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ খোলা তেলে মিলছে না প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা ভোজ্য তেলের ৫৯ শতাংশ নমুনায় ভিটামিন ‘এ’ অনুপস্থিত। এক-তৃতীয়াংশ নমুনায় প্রয়োজনের তুলনায় কম ভিটামিন পাওয়া গেছে। মাত্র ৭ শতাংশ নমুনা সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ ভোক্তা টাকা দিয়ে এমন একটি পণ্য কিনছেন, যা আইন অনুযায়ী মানসম্মত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। যে তেল মানুষের পুষ্টির ঘাটতি কমানোর কথা, সেটাই উল্টো অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের (গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নয়) মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় খোলা তেলের নামে পুষ্টিহীন পণ্য বাজারে চলতে দেওয়া মানে জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। ‘‘ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩” অনুযায়ী ফুডগ্রেডবিহীন প্যাকেজিংয়ে তেল বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকার বিভিন্ন সময়ে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের কড়া নির্দেশনা জারি করলেও মাঠপর্যায়ে এই সিদ্ধান্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ ভোক্তারাই ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈষম্যও স্পষ্ট। দরিদ্র মানুষ খোলা ভোজ্য তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অর্থাৎ অনিরাপদ তেলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সমাজের অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। একটি দরিদ্র পরিবার দাম দিয়ে তেল কিনলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যহানি, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আকাশচুম্বী চিকিৎসা ব্যয়ের মাধ্যমে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন।

এই চক্রাকার সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নীতিমালার বাস্তবায়ন। প্রথমত, অস্বাস্থ্যকর ও নন-ফুডগ্রেড ড্রামে ভোজ্য তেল পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারে প্রাপ্ত সব তেল ফুডগ্রেড বোতল, পাউচ বা নিরাপদ প্যাকেজিংয়ে বাজারজাত বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, বাজার তদারকি, ল্যাব টেস্ট এবং উৎস শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তাদের মধ্যে অনিরাপদ খোলা তেল ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরতে বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আর এ লক্ষ্যে সরকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিতভাবে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। ভোক্তার অধিকার নিয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে, কারণ ভোক্তার স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্য তেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) 
[email protected]

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন
ড. খলিলুর রহমান

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।...

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা, প্রকাশ্যে অপমান এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো আবারও একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গণপিটুনি ও জনতার বিচার (মব জাস্টিস) ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়; বরং এগুলো এমন এক দায়মুক্তির সংস্কৃতির লক্ষণ, যা ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন রূপে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যে, কত ঘন ঘন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, আইনবহির্ভূত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয়, লিঙ্গ, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, কোনো নাগরিককে জনতা, স্বঘোষিত ন্যায়বিচারক বা আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ব্যক্তিদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনানুগ প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রসিকিউটর মামলা পরিচালনা করবেন এবং আদালত নির্ধারণ করবেন কে দোষী আর কে নির্দোষ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে না।

বিশেষ করে গত ১৮ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় নারীদের ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে কোন আইনের বলে একজন সাধারণ নাগরিক অন্য কাউকে প্রকাশ্যে আটকে রাখতে, আক্রমণ করতে বা অপমান করতে পারেন? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ: এমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

যখন এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে এবং বারবার ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অনিবার্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে–বাংলাদেশ কি এখনো আইন দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান এবং জনতার শক্তির মাধ্যমে?

এই বিপজ্জনক প্রবণতার প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ নারীর ক্ষমতায়ন, কন্যাশিশুর শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্জনগুলো এ ধরনের সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ও।

বাংলাদেশ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এবং শিশু অধিকার সনদের (CRC) সদস্য রাষ্ট্র। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের সহিংসতা, বৈষম্য, নির্যাতন, শোষণ এবং অবমাননাকর আচরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) সদস্য এবং জাতিসংঘ সনদের সেই মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ, যা মানবিক মর্যাদা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।

অতএব, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সাংবিধানিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করা, শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়া এবং রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো জনতানির্ভর আইন প্রয়োগের সংস্কৃতির দৃশ্যমান স্বাভাবিকীকরণ। বহু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা নাগরিকরা হয়রানি, হুমকি, হামলা এবং প্রকাশ্যে অপমানের শিকার হয়েছেন। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটবে। কিন্তু সে প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসনের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের মতো নয়, এ সরকার জনগণের ভোট থেকে সরাসরি বৈধতা অর্জন করেছে। ফলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

অতএব, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যেকোনো ঘটনায় সরকারকে দ্রুত, দৃঢ় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা মতাদর্শগত সহানুভূতি নির্বিশেষে অপরাধীদের আদালতের মুখোমুখি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো প্রায়ই ঢাকাস্থ বিভিন্ন পশ্চিমা দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। প্রকাশ্য বিবৃতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উদ্বেগ প্রকাশ ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর অনেক বাংলাদেশি লক্ষ্য করেছেন, পরিস্থিতির প্রতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। নারী নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং অন্যান্য কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা একই ধরনের দৃশ্যমান উদ্বেগ বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পায়নি। বিশেষ করে কূটনৈতিক মহলের কিছু অংশ, ঢাকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার প্রতিনিধির নীরবতা অনেকের দৃষ্টিতে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে–বিশেষ করে ইউনূস প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক হোক বা না হোক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে এটি বৈধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা এর সর্বজনীনতার ওপর নির্ভর করে। ক্ষমতায় যারাই থাকুক, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিন্দিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর হামলা সরকারপক্ষ, বিরোধী দল কিংবা নাগরিক সমাজ–যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মানবাধিকার তখনই নৈতিক শক্তি হারায়, যখন তা পক্ষ বাছাই করে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের নেতাদের সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা কখনোই দলীয় বা রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে না।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস, জনস্বাস্থ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এসব অর্জন ধরে রাখতে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা নির্বাচনি বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং সব নাগরিকের সমান সুরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার।

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যতের দাবিদার, যেখানে কোনো নারী প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ভয়ে থাকবে না, কোনো শিশু সহিংসতার শিকার হবে না, কোনো নাগরিক যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি পাবে না এবং কোনো সরকার–নির্বাচিত বা অনির্বাচিত–জবাবদিহি এড়াতে পারবে না।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হোক। দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান হোক। বাছাই করা মানবাধিকার চর্চার অবসান হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব, সাবেক জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি

মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়
সোনিয়া তাসনিম

শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য...

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ২০২৪-২০২৫ অনুযায়ী, সে সময়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে শিক্ষার ব্যয়ের অঙ্ক ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বাংলাদেশি টাকায় ব্যয়কৃত ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ ব্যয়ের অর্থের পরিমাণ, হাজার ৭৯ কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ১২২ টাকা হিসাবে) চমকে গেলেন? এত দ্রুত চোখ গোলাকার করলে হবে না কারণ, কেবল বিশাল ব্যয় নয়, সংখ্যার দিক থেকেও এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের মেধা বগলদাবা করে পাড়ি জমাচ্ছে দূরদেশের পথে

আপাতদৃষ্টিতে একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যায় কারণ, অ্যামাজন, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কর্মীর সংখ্যা যেখানে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সেটা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গর্ব তবে এই অহমের তাজকে ছুঁয়ে দিতে আমরা কি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বিশাল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? যদি হয়েও থাকি তবে কেন?

গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, ব্যক্তিগত উন্নতির আকাঙ্ক্ষার এই আনন্দযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের উন্নয়নের পথে বিশাল হুমকি পরিস্থিতি বিচারে একে আমরা বলতে পারি মেধা পাচার যা নীরবে বয়ে আনতে পারে জাতীয় জীবনের জন্য এক গভীর বিপর্যয়

যদি কোনো তরুণকে প্রশ্ন করা হয়, কেন সে বিদেশে পড়তে আগ্রহী? তাহলে চটজলদি অনেক বিষয় আমাদের সামনে চলে আসবে একজন মেধাবী ছাত্রের কাছে এখন বিদেশ পাড়ি দেওয়া কেবল উচ্চশিক্ষা লাভ নয়, পাশাপাশি যে বিষয়গুলো তাকে এই পদক্ষেপে আগ্রহী করে সেগুলো হলো, সম্মানজনক পরিবেশ তথা নিরাপত্তা, যোগ্যতার মূল্যায়ন, দক্ষতার সঠিক ব্যবহার মূলত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, একজন তরুণকে যখন ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও লম্বা সময় ধরে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেরাতে হয় এবং তার যোগ্যতার বিপরীতে লবিং সংস্কৃতি জোড়ালো হয়ে ওঠে, তখন দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মক্ষেত্র নির্বাচনে সে স্বভাবতই হতাশ হয়ে পড়ে

মূলত, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে উন্নয়ন হয়নি শিক্ষার মানসহ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গুণগত দক্ষতা বর্তমানে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে হারে বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার নীতিমালা এর গুণগত মান

পড়াশোনার পরিবর্তে শিক্ষালয়গুলো অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চামহলের আঁকড় হয়ে উঠছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব, গেস্টরুম কালচার, ভিন্নমত দমনএমন সব বিষয় রীতিমতো এখন অভিভাবক থেকে শিক্ষার্থীমহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মেধার বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের নৈতিক জায়গা থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে কেউ প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কিছু ভাবতে গেলে তাকে প্রতিহত করা হচ্ছে, যার কারণে একজন প্রকৃত মেধাবী ক্রমশ এটি অনুধাবন করে, যেখানে ট্রেন্ডিং কাঠামো উপস্থিত, সেখানে নিজেকে প্রমাণ করা সম্ভব নয় আর এই ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতাই তাকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভিন্ন ভাবনায় ধাবিত করতে বাধ্য করে

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোভাবে পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করেও দুশ্চিন্তার অবসান নেই কারণ, একজন শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ওপর তার চাকরির ব্যাপারটা নির্ভর করে না যেমন, পলিটিক্যাল সায়েন্স কিংবা ইংরেজি বিষয়ে একজন স্নাতক ডিগ্রিধারীকে দেখা যায় ব্যাংকিং সেক্টরের কাজ করতে অথচ এখানে তার শিক্ষাগত ্যাকগ্রাউন্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে যখন কাউকে নিজের প্রকৃত মেধার বিপরীতে নিয়োজিত হতে হয়, তখন সেখানে ডিমোটিভেশন কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক আমাদের দেশে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অভাব বিশ্ববাজারের বহুমাত্রিক প্রতিয়োগিতায় অবতীর্ণ হতে অক্ষম অপরপক্ষে আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামও আন্তর্জাতিক মাপকাঠি অনুযায়ী প্রণীত হয় না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয় রাজনৈতিক পালাবদল, নির্লজ্জ রাজনৈতিক আগ্রাসনের কারণে শিক্ষার্থীদের অহেতুক দুর্ভোগ পোহাতে হয়

এবার আসা যাক শিক্ষকদের বিষয়েশিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর এখন যদি কারিগরের কারিগরি প্রশিক্ষণেই গোলমাল থাকে, তবে? আমাদের শিক্ষা খাতের বিষয়টা এখানে এমনই গোড়াতেই গলদ যাকে বলে কী করে? দেশের ইউনিভার্সিটিগুলোর ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রফেসর এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ চাটুকারিতার প্রভাবে অনেক অযোগ্য লোকেরা অলংকৃত করে তুলছেন, যার খেসারত শিক্ষার্থীদের মেটাতে হয় পাশাপাশি আমাদের এখানে পুঁথিগত শিক্ষাটাকেই মূল ভিত্তি বলে বিবেচনা করা হয় কারিগরি শিক্ষা থাকে উপেক্ষিত অথচ হাতে-কলমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না হলে দক্ষ জনশক্তি তথা দক্ষ মেধার বিকাশ ঘটা অসম্ভব এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা কেন যেন সব সরকারের অগোচরেই থেকে যায় সঙ্গে দেশে গবেষণাভিত্তিক কাজগুলো করা যতটুকু কঠিন, সীমিত আবার ততটুকু জটিলও যে কারণে এখন কেবল ডাক্তার, প্রকৌশলী নয় বরং গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সৃজনশীল তরুণরা ভিনদেশে পাড়ি জমাতে উদগ্রীব

যেখানে সময়ের গতিতে দাঁড়িয়ে আজকের বিশ্ব ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন দেখে, সেখানে আমাদের মেধাবী তরুণরা একগাদা সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরির আশায় এখানে-ওখানে ধরনা দিয়ে বেড়ায় প্রচলিত সেকেলে ধারা থেকে কেন যেন আমাদের শিক্ষা কর্মব্যবস্থার যথাযথ মুক্তি মিলছে না কোনোভাবেই আমরা আজ ড্রোন প্রযুক্তি থেকে নানা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য দেশের বাইরে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে নিজেদের আধুনিক করে তুলতে চাই অথচ এই বিনিয়োগের অর্ধেকটাও যদি নিজ দেশের গবেষণা খাতে করতাম, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারাটা হয়তো অন্যরকম হতো যেখানে গবেষণা থেকে উদ্ভাবন স্বাধীনচর্চার রাস্তা এতটা বন্ধুর, সেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জায়গা থেকে দুর্বল হবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই

এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয় কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না একটি প্রগতিশীল জাতি গড়ে উঠতে দরকার দক্ষ মানবসম্পদ একজন মানসম্মত ডাক্তার কিংবা গবেষক গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের একটা লম্বা সময়ের শ্রম অর্থ ব্যয় করার পর তারা যখন অন্য দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে, তখন তা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের বুক ফুলিয়ে তুললেও পরোক্ষভাবে ক্ষতিটা আমাদেরই হয় আর আমাদের প্রচলিত অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি একজন শিক্ষার্থীর মগজে এই নীতিটাই ঠুঁসে দেয়যোগ্য হলেই দেশ ছাড়তে হবে কারণ, এখানে ভবিষ্যৎ নেই

মূলত, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেকেই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করলেও প্রকৃতপক্ষে মিলেছে শুভংকরের ফাঁকি যেখানে আশা করা হয়েছিলরিভার্স ব্রেইন ড্রেইনহবে, সেখানে বাস্তব ছিল পুরোটাই উল্টো রাজনৈতিক পট বদলালেও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা, মন্থর গতির সরকারি নিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় তরুণ শিক্ষার্থীদের হতাশা একই রকম রয়েছে ফলে ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে

সরকার বদলে মুখ পরিবর্তন হয়, কিন্তু ভাগ্য বদলায় না আমজনতার মসনদে থাকা শক্তি বারবার জনগণের স্পন্দন বুঝতে ভুল করে ফেলে, নচেৎ এড়িয়ে যায় আমাদের যুবসমাজ যেখানে তাদের দক্ষতা প্রমাণে উদগ্রীব, সেখানে সময়সীমা বেঁধে বেকার ভাতার মূলা ঝুলিয়ে নিলে তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক ভাতা বা রেশন হয়তো সাময়িক সমাধান দেবে, পূর্ণাঙ্গ সমাধন নয় অতএব, প্রতিশ্রুতি এবং কার্যক্রমের মধ্যে সুষম মেলবন্ধন ঘটানো প্রয়োজন এই দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারের

মেধাবী এই সমাজকে দেশের কাজে লাগাতে হলে তাদের জন্য একটি দক্ষ ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ড অনুযায়ী তাকে কাজে নিয়োগ দিতে হবে বদলাতে হবে দেশের প্রচলিত সেকেলে শিক্ষা কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে সমর্থন করে এমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে ছোটবেলা থেকেই স্কুলে কারিগরি কর্মশালা স্থাপন করতে হবে ছেলেমেয়েরা পুথিগত বিদ্যা আর বাস্তবভিত্তিক বিদ্যাকে এতে করে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে শিখবে

সর্বোপরি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য ভুললে চলবে না, ভবিষ্যতের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নে দক্ষ পারদর্শী তরুণ প্রজন্মের এখন নিজ দেশের মাটিতে শেকড় গেঁড়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি

লেখক: প্রাবন্ধিক কলাম লেখক

রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
আবু আহমেদ

পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে নতুন এএমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে...

বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক শতাংশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য লাখ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার কোটি টাকা বিশাল রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে কারণ বর্তমানে দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ইউনিটের দাম পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে লেনদেন হয়েছে হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে সূচকের এই বড় উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিমা কোম্পানি

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা 

 

 

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এতে বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা দরকার বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে

পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায় একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে ভালো সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায় বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে

বাজেটে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে নতুন এএমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার নগর অবকাঠামো উন্নয়নে মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে সরকারি বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বন্ড, অবকাঠামো ফান্ডের ব্যবহার বাড়ানো হবে, যাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমে বিনিয়োগের সুযোগ বাণিজ্যিক কাঁচামালের পরিসর বাড়াতে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা যায় বিদ্যমান লাইসেন্স কার্যকর করা, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে

দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে অনাবাসী বাংলাদেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে লেনদেনের পর শেয়ার অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা

লেখক: অর্থনীতিবিদ চেয়ারম্যান, আইসিবি

ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
রায়হান আহমেদ তপাদার

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।...

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও তীব্র কূটনীতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ১৪ জুন যৌথভাবে এ ঘোষণা দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও একযোগে এ ঘোষণা সম্প্রচার করা হয়। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, যা ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। অবশ্য এই সময় থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উভয়ের পক্ষ থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত দুই দফা হামলায় ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশকেই লক্ষ্যবস্তু করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা হিসেবে বাহরাইন, জর্দান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে উদ্দেশ করে হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো হলেও বলা হয়েছে, ইরান আর হামলা না করলে তারাও হামলা চালাবে না। সে ক্ষেত্রে ইরানের এই মুহূর্তের অন্যতম দাবি হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানকে সংগত কারণেই এর জবাব হিসেবে ইসরায়েলে হামলা চালাতে হচ্ছে, যা একটি সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিছুদিন ধরে এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। সর্বশেষ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার পর এক টেলিফোন কথোপকথনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন যে, তাদের কারণে যদি ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবে না, তাদের একাই চলতে হবে। প্রায় দুই মাস ধরে একটি চুক্তিস্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনেক দেনদরবার চলছে। ইসলামাবাদ থেকে শুরু হওয়া আলোচনাটি এখন ইউরোপের জেনেভায় গিয়ে ঠেকেছে। এ সময়ের মধ্যে ট্রাম্প বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন, একটি চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দুই পক্ষই। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েল রয়েছে অন্ধকারে। জানা গেছে, তারা নানাভাবে এ চুক্তির বিষয়বস্তুগুলো নিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং একটি চুক্তিস্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য যত দূর কূটকৌশল অবলম্বন করা দরকার, এর সবটাই করে যাচ্ছে। লেবাননে এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসরায়েলের এ ধরনের অবস্থান এ যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে চাওয়াকে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। এ যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ নানা চাপে জর্জরিত। সে দেশের জনমত এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা দ্বিধাবিভক্ত, রয়েছে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক চাপও। এসব সামাল দিতে এখন তারা যুদ্ধবিরতি অবস্থাকে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে ইতি টেনে মান রক্ষার সর্বশেষ চেষ্টা করছে। ইরানকে তারা যতটা একা ভেবেছিল এবং তাদের সামর্থ্যকে যতটা খাটো করে দেখেছিল, এমনটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি, বরং চীন ও রাশিয়ার রহস্যজনক ভূমিকাটা এখানে অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সুতরাং, এ যুদ্ধে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হওয়া বেশ কঠিন। একটি চুক্তিস্বাক্ষরের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোয় ইরানের অবস্থান একে আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে। হরমুজ প্রণালিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা তাদের সামর্থ্যের ভালোই প্রমাণ দিয়েছে। এখন দর-কষাকষিতে ইরান এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে যুদ্ধকালে, এমনকি যুদ্ধপূর্ব সময়ে তারা যেসব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়। এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় ইরানের শত শত কোটি জব্দ ডলার ফেরত চাওয়া ছাড়াও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিকে তারা চুক্তিস্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব দাবি সামনে আনা হয়েছে, তা হচ্ছে–ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে হবে এবং তারা ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যদি হস্তান্তর করতেই হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই কেন করতে হবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর কোনো সদুত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি এখন এমন একপর্যায়ে রয়েছে যে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো যেতে পারে–এমন বিষয়ে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে। আর সেটি করা গেলে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না–এমন শর্ত আরোপ করার আর প্রয়োজন হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য বারবারই বলা হচ্ছিল যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে ইচ্ছুক নয়, বরং তারা পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করতে চায়। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল দিকটি হচ্ছে, ইরাকযুদ্ধের মতো করে তারা ইরানযুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল।

ইতিহাসের এই পুনরুত্থান ঘটাতে গিয়ে তারা হোঁচট খেয়েছে, ইরানকে ইরাকের মতোই দুর্বল ভেবেছে এবং বড় ভুল করেছে। সবচেয়ে সহজ কাজটিকে তারা অনেক জটিল করেছে এবং সেটা ইসরায়েলের স্বার্থে দেখতে গিয়েই তারা করেছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতি চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনাই যদি করে থাকতেন, তাহলে হয়তো তার স্বপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কিছুটা বৈধতা থাকত। কিন্তু বিষয়টিকে করা হয়েছে শুধু ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রভাগে রেখে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র যখন এ চুক্তি থেকে সরে আসে, তখন ইরানের বিরুদ্ধে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ ছিল না, ছিল শুধু নেতানিয়াহুর প্ররোচনা। ট্রাম্প সে ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন। চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এ দফায় নির্বাচিত হয়ে একই ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সর্বশেষ দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ ক্ষেত্রে মৌলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি আগের মতোই উন্মুক্ত করে দেবে। সেই সঙ্গে এ সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘটবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে। অবশ্য এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ইরান শর্তগুলো মেনে চললে তাদের জব্দকৃত কিছু সম্পদ অবমুক্ত করাসহ মার্কিন অবরোধ কিছু সময়ের জন্য তুলে নেওয়া হবে, যেন ইরান আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছু রাজস্ব সঞ্চয় করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এখানে ইসরায়েলের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয় এবং তাদের দাবি হচ্ছে, বর্তমানে এনিয়ে কী হচ্ছে না হচ্ছে, এর কিছুই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জানাচ্ছে না। এমন অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা স্মারক সই এবং পরবর্তী সময়ে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বিষয়টি এমন যে, এই মুহূর্তে নিজেদের স্বার্থে একটি চুক্তির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সরে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার শঙ্কা থেকেই যাবে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ইসরায়েলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্তভাবে নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ খুবই সংকুচিত। সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করেই ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সবটাকেই গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। তবে চুক্তি হোক আর না-ই হোক, ইসরায়েলকে তাদের বর্তমান আগ্রাসী অবস্থায় রেখে শুধু ইরানকে নিবৃত্ত করতে যাওয়াটা ইরানকে আবারও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শক্তি সঞ্চয়ের তাড়া দেবে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য 
[email protected]