বর্তমান সময়ে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের উত্তরসূরিদের জন্য অসিয়তনামা রেখে যাওয়া সুযোগ নেই। তবে লিখে না গেলেও তারা তাদের অসিয়ত রেখে যান তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে। তাদের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জীবনাচার উত্তরসূরিরা গভীরভাবে পর্যক্ষেণ ও অনুসরণ করতে পারলেই সফলতার পথ পেয়ে যেতে পারেন।...
ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর। তার পুরো নাম জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। জন্মগ্রহণ করেছিলেন বর্তমান উজবেকিস্তানে ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। সম্রাট বাবর মঙ্গোলিয়ান শাসক তৈমুর লং-এর ষষ্ঠ বংশধর ছিলেন। মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের রক্তধারা তার শরীরে প্রবহমান ছিল। ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট বাবর তুষারসমৃদ্ধ অঞ্চল হিন্দুকুশ অতিক্রম করে আফগানিস্তানের কাবুল দখলের মধ্যদিয়ে এশিয়ায় তার সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। এর পরে একের পর এক যুদ্ধে স্থানীয় এবং অন্য ভূখণ্ড থেকে আগত শাসকদের পরাজিত করে ভারতবর্ষে তার সুবিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে লোদি রাজবংশের শাসক ইব্রাহিম লোদিকে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে পরাজিত করে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে সম্রাট বাবরই সর্বপ্রথম কামান ব্যবহার করে রণকৌশলের নবদিগন্তের সূচনা করেন। ইব্রাহিম লোদির পরাজয়ের মধ্যদিয়ে দিল্লি সালতানাতের বিলুপ্তি ঘটে, উত্থান ঘটে মোগল শাসনের।
সম্রাট জহিরউদ্দিন বাবর কেবল একজন রণকুশলী শাসকই ছিলেন না, ছিলেন একজন অসাধারণ পণ্ডিত ব্যক্তিও। তিনি একাধারে উঁচুমানের কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন। তার সভাসদদের মধ্যে অনেক জ্ঞানীগুণী পণ্ডিত ব্যক্তির সমাবেশ ঘটেছিল। ‘বাবরনামা’ নামে তুর্কি ভাষায় যে আত্মচরিত তিনি লিখে গেছেন, তা ইতিহাসের অন্যতম সম্পদ হিসেবে আজও বিবেচিত। ওই গ্রন্থে বাবর তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সম্রাট বাবর মৃত্যুবরণ করেন ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুটি তথ্য প্রচলিত আছে। প্রথম তথ্যানুযায়ী, বাবরের পুত্র হুমায়ুন বাল্যকালে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জীবন সংশয় দেখা দেয়। সম্রাট জায়নামাজে বসে আল্লাহ তায়ালার কাছে ফরিয়াদ করেন, তার জীবনের বিনিময়ে পুত্র হুমায়ুনকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য। এরপর ধীরে ধীরে হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সম্রাট বাবর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। দ্বিতীয় তথ্য মতে, ইব্রাহিম লোদির মা খাদ্যের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তারই বিষক্রিয়ায় বাবর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। এ দুটি তথ্যের একটিও ঐতিহাসিক দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ভারতবর্ষের জলবায়ুর সঙ্গে সম্রাট বাবরের স্বাস্থ্য খাপ না খাওয়ায় তিনি অসুস্থ হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর আগে বাবর তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী পুত্র হুমায়ুনের উদ্দেশে একটি অছিয়তনামা লিখে যান। তাতে তিনি লেখেন- ‘হে আমার বৎস, হিন্দুস্থানে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক বাস করে। আর মহান আল্লাহর এটি একটি বড় নেয়ামত যে, তিনি তোমাকে এ অঞ্চলের বাদশাহ বানিয়েছেন। নিজের সে বাদশাহির দায়িত্ব পালনে তোমাকে নিচের কথাগুলো স্মরণে রাখতে হবে-
১. ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে মনে একেবারেই স্থান দেবে না। ধর্মীয় জজবা ও প্রথার খেয়াল না করে সবার প্রতি ইনসাফ করবে।
২. গ্রাম ও জনপদ ধ্বংস করে দেওয়া থেকে সর্বদা বিরত থাকবে। যেন লোকেদের মনে তোমার জন্য স্থান তৈরি হয়। তারা যেন শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতায় তোমার অনুগত হয়ে যায়।
৩. কোনো সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ধ্বংস করবে না। সবার প্রতি সর্বদা ইনসাফ করবে। বাদশাহ ও প্রজার মধ্যে সম্পর্ক যেন বন্ধুসুলভ হয়। দেশে যেন শান্তি ও নিরাপত্তা চলে আসে।
৪. ইসলামের প্রসার জুলুম-অত্যাচারের পরিবর্তে মমতা ও অনুগ্রহ দ্বারাই বেশি হতে পারে।
৫. শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে সর্বদা এড়িয়ে চলবে। নতুবা এর ফলে ইসলাম দুর্বল হয়ে যাবে।
৬. প্রজাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে বছরের বিভিন্ন মৌসুমের মতো মনে করবে। যেন হুকুমত অসুস্থতা ও দুর্বলতা থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে। (সূত্র: ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন: হাজার বছরের ইতিহাস; মুফতি মুহাম্মাদ পালানপুরী; পৃষ্ঠা: ২০৩-২০৪)।
সম্রাট বাবরের এ অছিয়তনামা কেবল তার পুত্র হুমায়ুনের উদ্দেশে লেখা হলেও তা পরবর্তী সব শাসকের বেলায়ই প্রয়োজ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। কেননা, সফল শাসক ও সমরবিদ জহিরউদ্দিন বাবর তার এ অছিয়তনামার মধ্যদিয়ে ভারতবর্ষের মতো এক সুবিশাল অঞ্চলের ভবিষৎ শাসকদের সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে গেছেন। ছয় দফার এ অছিয়তনামা একজন শাসক বা সরকারপ্রধানের জন্য আলোকবর্তিকাও বটে। যা অনুসরণ করলে কীভাবে রাজ্যের সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষদের আস্থা অর্জন করে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়, একজন শাসক তার দিকনির্দেনা পেয়ে যেতে পারে; যদি তিনি তা আত্মস্থ করতে পারেন।
বর্তমান সময়ে রাজার ছেলে রাজা হওয়ার প্রথার প্রায় অবসান ঘটেছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এখনো রাজতন্ত্র টিকে আছে। অন্য যেসব দেশে রাজা-রানির অস্তিত্ব আছে তা একেবারেই আলঙ্করিক। রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। ব্রিটেনের রাজা বা রানি সম্বন্ধে একটি কথা প্রচলিত আছে- ‘রাজা বা রানি কোনো ভুল করতে পারেন না।’ কথাটি শুনলে যে কারও মনে হতে পারে, রাজা-রানি বোধকরি সব কাজ নির্ভুলভাবে করেন। বস্তুত তা নয়। যেহেতু রাষ্ট্রীয় কাজে কোনোরকম হস্তক্ষেপের ক্ষমতা তাদের নেই, তাই তাদের ভুল হওয়ারও সম্ভাবনা নেই।
বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারপ্রধানদের আনুষ্ঠানিকভাবে তার উত্তরসূরি মনোনয়নের সুযোগ নেই। তবে ‘পরিবারতন্ত্র’ বলে যে শব্দটি সাম্প্রতিকালে চালু হয়েছে, তা সে উত্তরাধিকার মনোনয়নের ধারণা থেকেই। নেতা অনুষ্ঠানিকভাবে তার উত্তরাধিকার ঘোষণা না করলেও জনগণ বুঝতে পারে, কে হতে যাচ্ছেন রাষ্ট্র, সরকার বা দল-প্রধানের উত্তরাধিকার। তবে সম্রাট বাবরের মতো উত্তরাধিকারীর জন্য অছিয়তনামা লিখে যাওয়োর সুযোগ তাদের থাকে না।
তাহলে সেসব রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা বা রাজনীতির দিকনির্দেশনা পাবেন কী করে? রাজনৈতিদক এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যারা পিতা কিংবা মাতার সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেন বা তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে পারেন, তারা কিছুটা দিকনির্দেশনা পেয়ে যান। পিতা-মাতার কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণের মাধ্যমে তারা পৌঁছতে পারেন সফলতার চূড়ায়। পারিবারিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী। তিনি তার পিতা প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়-আশয় ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন। ফলে যখন দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হলো, অল্পদিনেই সবকিছু সামলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে তার পুত্র রাজীব গান্ধী সে সুযোগ পাননি। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর স্বীয় দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ তার পুত্র রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন রাজীব গান্ধী পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ভারতের মতো সুবিশাল পরিসরের উড়োজাহাজ-রাষ্ট্রটিকে সঠিকভাবেই পরিচালনা করেছিলেন। যদিও ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামপুদুরে তামিল বিদ্রোহীদের এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হওয়ার ফলে তার তিনি তার পথ পরিক্রমণ শেষ করে যেতে পারেননি। প্রশ্ন উঠতে পারে, ইন্দিরা গান্ধী তো কোনো অছিয়তনামা লিখে যাননি, কিংবা পুত্র রাজীব তার শাসক মায়ের রাজনৈতিক সান্নিধ্যও পাননি। তাহলে তিনি ভারতের মতো বহু জাতি, ধর্ম ও বর্ণের জনঅধ্যুষিত রাষ্ট্রটি কীভাবে পরিচালন করতে পারলেন? এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় মা ইন্দিরা গান্ধীর কর্মকাণ্ডের নজির রাজীব গান্ধীর জন্য অছিয়তনামার কাজ করেছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
উপমহাদেশে পিতার উত্তরাধিকারী আরেক রাজনীতিবিদ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। রাজনীতিবিদ পিতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে তিনি দেখেছেন শিশুকাল থেকেই। বেনজির ভুট্টো তার আত্মকথা ‘ডটার অব দ্য ইস্ট’-এ সে কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত, তখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জেড এ ভুট্টোকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে জাতিসংঘে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে লবিয়িং করতে। সে কাজে সহায়ংতা করতে ভুট্টো তার কন্যা বেনজিরকে ডেকে এনেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারতের সিমলায় পাকিস্তান-ভারত দ্বিপক্ষীয় যে বৈঠক হয়েছিল, ভুট্টো তার মেয়ে বেনজিরকে বিশেষ সহকারী হিসেবে তাতে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিষয়ে সেটা ছিল বেনজির ভুট্টোর হাতেখড়ি। পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে খুন করার পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্বে আসেন তার পত্নী নুসরাত ভুট্টো। একপর্যায়ে বেনজির আসীন হন পিপিপির নেতৃত্বের আসনে। সরকারপ্রধান হিসেবে বেনজিরও তার জার্নি সমাপ্ত করতে পারেননি। ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন তিনি।
ইন্দিরা, রাজীব এবং বেনজির ভুট্টো পারিবারিক সূত্রে রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তারা কিন্তু এগিয়ে গেছেন তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতার কারণেই। তাদের পিতা-মাতারা কোনো অছিয়তনামা লিখে যাননি। তাহলে তারা কোথায় পেলেন রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির দিকনির্দেশনা? পূর্বাহ্নেই বলেছি, বর্তমান সময়ে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের উত্তরসূরিদের জন্য অছিয়তনামা রেখে যাওয়া সুযোগ নেই। তবে লিখে না গেলেও তারা তাদের অছিয়ত রেখে যান তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে। তাদের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জীবনাচার উত্তরসূরিরা গভীরভাবে পর্যক্ষেণ ও অনুসরণ করতে পারলেই সফলতার পথ পেয়ে যেতে পারেন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক


