শিক্ষার সংকট কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। সমস্যাকে অবহেলা না করে, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিহার করে যদি সত্যিকার অর্থে সমাধানের পথে হাঁটা যায়, তবেই শিক্ষা বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হতে পারে। অন্যথায় উন্নয়নের গল্পের আড়ালে এই সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও গভীর ঝুঁকি তৈরি করবে।...
.jpg)
একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। প্রচলিত প্রবাদ আছে, 'যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত'। এটি শুধু নৈতিক কোনো বক্তব্য নয়, এটি যুগ যুগ ধরে একটি পরীক্ষিত সত্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এ সত্য অস্বীকার করে না। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থী ভর্তি বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার অগ্রগতি এবং নীতিগত কিছু সংস্কারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছিল। শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিমাণগত উন্নয়ন ঘটেছে।
তবে এই অগ্রগতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য সংকট, যা বারবার শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। উন্নয়ন ও সংকট-এ দুই বিপরীত বাস্তবতার সহাবস্থানই আজ বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। প্রায়ই এমন কিছু মারাত্মক সমস্যা সামনে আসে; যা কেবল শিক্ষাকেই নয়, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থায়নের অভাব, চাকরির বাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্য এবং শহর-গ্রাম বৈষম্যের মতো অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব মেরামত না হলে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের আসল ভূমিকা রাখতে পারবে না।
সম্প্রতি নতুন শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, কর্মমুখী ও যুগোপযোগী করা হবে। গতানুগতিক ধারার শিক্ষার কারণে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে-এ বিষয়টি তিনি উপলব্ধি করে মতামত ব্যক্ত করেন। তাই এখন থেকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা দক্ষ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারে।' এমনকি নতুন কলেজ, বিষয় বা প্রতিষ্ঠান চালুর নানা দাবি এলেও কর্মসংস্থানের বাস্তব চাহিদা ও বাজারের উপযোগিতাকে প্রাধান্য দিতে হবে বলে মতামত দেন।
পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভিত্তি দুর্বল হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনটি মূল বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে-কারিকুলাম (যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম), ক্লাসরুম (কার্যকর পাঠদান) ও কনসিস্টেন্সি (সারা দেশে মানের সামঞ্জস্য)। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধারার মধ্যে মানগত সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে বাস্তবসম্মত এবং ন্যায্য। কিন্তু এর যথাযথ বাস্তবায়ন ঘটানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে আমরা কাগজে-কলমে অনেক ভালো কথা শুনে আসছি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও চেয়ারে বসেই মনে হচ্ছিল সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন। দিনশেষে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে আমরা আবারও হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছি। তারপরও নতুন এই সরকারের কাছে তথা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আশা করতে চাই যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে যেন অগ্রাধিকার পায়। শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনের প্রচেষ্টা যেন অগ্রাধিকার পায়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ সংক্রান্ত নানা ধরনের সংবাদ আমরা গণমাধ্যমে নিয়মিত দেখি। আমি নিজেও এ বিষয়ে অনেকবার লিখেছি। শিক্ষা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দক্ষতার পরিবর্তে সার্টিফিকেট অর্জনে বেশি মনোযোগ দেয়, ফলে চাকরির বাজারে 'স্কিল গ্যাপ' তৈরি হয়। ইন্টার্নশিপ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও সফট-স্কিল উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় এখন অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। এ বিষয়ে বিভিন্ন লেখালেখি, সেমিনার এবং সিম্পোজিয়ামে বেশ বড়ভাবেই আলোচনা স্থান পেয়েছে।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ-সুবিধায় অসমতা রয়েছে। শহরাঞ্চলে উন্নত ইন্টারনেট, লাইব্রেরি ও কোয়ালিফাইড শিক্ষকের সুযোগ থাকলেও গ্রামে এসব অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছে না। গবেষণাধর্মী শিক্ষা, চিন্তাশীল পড়াশোনা ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কম থাকাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আমরা জানি শিক্ষায় সুনির্দিষ্টভাবে অনেক সমস্যা রয়েছে। এক লেখায় সমস্যাগুলো তুলে ধরা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব মেধাবীদের হতাশ করে তোলে। অনেকদিন থেকে রাজনীতি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের কারণেই শিক্ষা প্রশাসনে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগব্যবস্থা প্রভাবিত হয়ে থাকে, যা স্বাধীন ও চিন্তাশীল শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করতে বাধা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে, যা শিক্ষার গুণগত মান ও উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে পরিবর্তন ও সংস্কারের মধ্যদিয়ে গেছে। প্রতিটি সরকারই তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ও লক্ষ্য অনুযায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একটি সুশিক্ষিত, সচেতন ও উদারনৈতিক প্রজন্ম গঠনকে বাধাগ্রস্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সংকীর্ণ ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এসব ভিন্ন সংকটের মূল কারণ খুঁজতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে শিক্ষা এখনো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা সংস্কার উদ্যোগ অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর ও রাজনৈতিক চিন্তানির্ভর হয়ে পড়ে। যিনি দায়িত্বে আসেন, তার ভাবনা অনুযায়ী পরিবর্তন আনার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয়। একটি সুস্পষ্ট, শক্তিশালী ও কার্যকর শিক্ষা আইন না থাকায় এই সমস্যা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রভাব শুধু পাঠ্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায়ও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে প্রায়শই মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা একটি বড় ভূমিকা পালন করে। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য বা পরিচয় অনেক সময় নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় অদক্ষ ও অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে ব্যাহত করছে।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষার সংকট কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। সমস্যাকে অবহেলা না করে, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিহার করে যদি সত্যিকার অর্থে সমাধানের পথে হাঁটা যায়, তবেই শিক্ষা বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হতে পারে। অন্যথায় উন্নয়নের গল্পের আড়ালে এই সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও গভীর ঝুঁকি তৈরি করবে।
লেখক: অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

