রবিবার বিকেলেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে কমিশন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের দুই শীর্ষ আমলাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ভোট ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হয়ে গেছে। এই সময়ে কমিশনের হাতে বিশেষ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে।...

পশ্চিমবঙ্গের আকাশে আরও একবার নির্বাচনের মেঘ ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ধুন্ধুমার লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলা। শাসক শিবিরের আত্মবিশ্বাস, বিরোধীদের আগ্রাসন আর ভোটারদের নীরব পর্যবেক্ষণ–সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে রাজ্যজুড়ে। প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার মধ্যদিয়েই সেই উত্তাপ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সবার নজর একদিকে–কোন পথে যাচ্ছে বাংলা।
শাসকদল বা তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য স্পষ্ট। ক্ষমতা ধরে রাখা। বঙ্গেশ্বরী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দল ইতোমধ্যেই সংগঠনকে চাঙা করে তুলতে মাঠে নেমে পড়েছে। উন্নয়নের বার্তা, সামাজিক প্রকল্পের সাফল্য, এবং ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ ধরনের আবেগঘন স্লোগানের ওপর ভর করেই তৃণমূল তাদের লড়াই সাজাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিজেপির লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন, বাংলায় প্রথমবারের মতো ক্ষমতার স্বাদ নেওয়া। গত বিধানসভা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বিজেপিকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জোরালো উপস্থিতি, সাংগঠনিক বিস্তার এবং তৃণমূলবিরোধী ভোটকে একজোট করার কৌশল–সবই একসঙ্গে কাজে লাগাতে চাইছে তারা।
তবে রাজনীতির আড়ালে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে কি আদৌ কোনো ‘গোপন সমঝোতা’ রয়েছে? রাজনৈতিক মহলের একাংশে এই জল্পনা নতুন নয়। কখনো সাংসদদের অবস্থান, কখনো কোনো ইস্যুতে আপাত নমনীয়তা–এসব থেকেই এ সন্দেহ উসকে ওঠে। কিন্তু আপাতত বাস্তব রাজনীতির অঙ্ক বলছে, মাঠের লড়াই যথেষ্ট তীব্র এবং সরাসরি।
এ দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝখানে কোথায় দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস? পরপর বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর তারা এখনো নিজেদের জমি খুঁজে পেতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাংলায় বামদের কিছুটা পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত মিললেও তা কতটা ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যুবসমাজের একাংশের মধ্যে বামপন্থি আদর্শের প্রতি নতুন আগ্রহ তৈরি হলেও, সংগঠনের দুর্বলতা এবং ভোট মেশিনারির (যারা মাঠে দাঁড়িয়ে ভোট করাতে পারেন) অভাব বড় বাধা।
কংগ্রেসের অবস্থাও প্রায় একই রকম। একসময়ের শক্ত ঘাঁটি আজ অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। জোট রাজনীতির ওপর নির্ভরতা এবং স্বাধীনভাবে লড়ার সক্ষমতা–এ দুইয়ের মধ্যে দোলাচলই তাদের প্রধান সমস্যা।
সব মিলিয়ে, বাংলার ভোট সমীকরণ এখনো বহুমাত্রিক। প্রধান লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি হলেও, তৃতীয় শক্তির উপস্থিতি পুরো অঙ্কটাকেই অনিশ্চিত করে তুলছে। প্রার্থী ঘোষণার এই প্রাথমিক পর্ব শেষ হলে, শুরু হবে আসল প্রচারযুদ্ধ। যেখানে শব্দ, স্লোগান আর কৌশলের সংঘর্ষেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের বাংলার পথ।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ও ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত জানিয়েছেন, এবারের ভোটে বাংলার দীর্ঘদিনের নির্বাচনি সংস্কৃতি বদলানো হবে এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন বরদাশত করা হবে না। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলায় প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে হিংসার অভিযোগ ওঠে; পঞ্চায়েত, লোকসভা বা বিধানসভা—সব ক্ষেত্রেই বিরোধীরা নির্বাচনি সন্ত্রাসের কথা বলে। বিশেষ করে বিজেপি অভিযোগ করে, তৃণমূল কংগ্রেস আমলে তাদের বহু কর্মী এলাকা ছাড়া হয়েছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তর মন্তব্য তাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, ভোটের প্রতিটি ধাপ কড়া নজরদারিতে থাকবে এবং কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে পুনরায় ভোটগ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
লড়াইয়ের অভিমুখ–খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়া বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বহুদিনের রাজনৈতিক স্টান্ট। আগেও এই একই রাজনৈতিক স্টান্ট রাজ্যবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু রাজ্য-কেন্দ্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখে দেখে বঙ্গবাসী এও সম্যক উপলব্ধি করতে পারে যে, দিল্লির গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে বাংলার তৃণমূল নেতৃত্বের এক আপাত-গোপন, অথচ সুগভীর সম্পর্ক তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই রয়ে গেছে। যার ফলেই দুই সাড়া বছর লোকদেখানো কাদা ছোড়াছুড়ি সত্ত্বেও রাজ্যে নানাবিধ অপকর্ম করেও বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় থাকতে পারে তৃণমূল। এই সেটিংয়ের কথা সারা দেশ জানলেও, বিজেপি ও তৃণমূল নেতৃত্ব কখনো তা স্বীকার করে না। বিজেপির প্রার্থী তালিকায় ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতার বিরুদ্ধে শুভেন্দুর নাম ঘোষণা আসলে এটাই প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা যে, আসলে বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে কোনো গোপন সেটিং নেই।
বাংলায় বিজেপি ও তৃণমূলের সম্পর্ক নিয়ে বহু মানুষ একটি মিথকে বিশ্বাস করেন। তা হলো, বিজেপি-তৃণমূল সেটিং রয়েছে। এই মিথ একদিনে গড়ে ওঠেনি। এরও ইতিহাস রয়েছে। একদা বিজেপির সঙ্গে জোট করে লোকসভা ভোটে লড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রে এনডিএ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে জোট ভেঙে গেলেও বিভিন্ন ও বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনাক্রমে এই সেটিং তত্ত্ব জগদ্দল পাথরের মতো বসে যায় বাংলা ও বাঙালির একাংশের মনে। তাদের মনে বারবার প্রশ্ন উঠতে থাকে, মোদি-শাহরা কি আদৌ বাংলার ব্যাপারে সিরিয়াস। নাকি তলে তলে আঁতাত রয়েছে। এ তত্ত্ব নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বারবার বলেছেন বামরাও।
ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর প্রার্থিতা মূলত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। ভোটের আগে তিনি অমিত শাহকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বিজেপি বাংলায় সত্যিই পরিবর্তন আনার জন্য সিরিয়াস। দলের ভেতরেও বহু নেতা চাইছিলেন নির্বাচনের আগে তৃণমূলের কিছু নেতাকে সিবিআই-ইডি আটক করানো হোক, যাতে সেটিং তত্ত্ব ভেঙে যায়। তবে ঝাড়খণ্ডে আগের পরিস্থিতি দেখার পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আর ঝুঁকি নিতে চায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে ভবানীপুরে শুভেন্দুর প্রার্থীতা কার্যত কেন্দ্রে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। গত বৈঠকে অমিত শাহ ও নীতিন গঙ্গোইয়ার শুভেন্দুর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছেন তার অবস্থান জানতে। জানা গেছে, দুজনেই শুভেন্দুকে বলেন, ভবানীপুরে আমাকে প্রার্থী করলে দলের সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা ঘটবে তা হলো, সাধারণ মানুষের কাছে এই মেসেজ চলে যাবে বিজেপি এবার সিরিয়াস। কেউ আর সেটিংয়ের তত্ত্ব আওড়াবে না। আমি মাটি কামড়ে লড়ে যাব। এটাই ভোটে বড় ফারাক গড়ে দেবে। শুভেন্দুর এই আগ্রহে সম্মতি দেওয়ার ক্ষমতা বা অধিকার সেখানে উপস্থিত কারও ছিল না বলেই খবর।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলেন অমিত শাহ। মোদির সম্মতি আদায় করে নেন। তার পর শুভেন্দুকে তা জানিয়েও দেন অমিত শাহ। গত শুক্রবারই শুভেন্দু জেনে গিয়েছিলেন দল তাকে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও প্রার্থী করবে। ভবানীপুরে শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আরও একটি কারণে আগ্রহ ছিল বলে অনেকে মনে করেন। বাংলার ভোটে কোনো একজন নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী প্রোজেক্ট করে ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি।
গত সপ্তাহের একেবারে শেষদিনে রবিবার বিকেল ৪টায় পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তার আগে একই দিনে তিন ধরনের ভাতা নিয়ে বেনজির তৎপরতা দেখা যাচ্ছিল রাজ্যের সচিবালয় তথা নবান্নে। এদিনের মধ্যে বেকার ভাতার টাকা ৫৪ লাখ যুবক-যুবতীর অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রেখেছিল নবান্ন। একদা মতোই তোড়জোড় চলছিলই। বিকেল ৩টা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎই সবাইকে চমকে দিয়ে পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা ৫০০ টাকা করে বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা করেন। তার পরপরই তিনি বকেয়া মহার্ঘ ভাতা মার্চের মাসের মধ্যেই মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু আদৌ কি কর্মচারীরা বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) সামনের মাসের বেতনের সঙ্গে হাতে পাবেন? কর্মচারীরা বলছেন, এটা মমতার বিরাট ধাপ্পাবাজি। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, সরকারি নির্দেশিকা যদি ভোট ঘোষণার পরে বের হয়, তাহলে কমিশন ঘোষণা কার্যকর করতে আটকাতে পারে। অর্থাৎ সাপও মরল লাঠিও ভাঙল না। তখন মুখ্যমন্ত্রী বলতে পারেন, আমি তো দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কমিশন দিতে দিল না।
ভোট ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক স্তরে বদল এনেছে নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্য সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নন্দিনী চক্রবর্তীকে। দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকেও। এছাড়া রাতারাতি অপসারণ করা হয়েছে কলকাতা পুলিশের কমিশনারসহ একাধিক শীর্ষ পুলিশ কর্তাকেও। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো কাজ করতে পারবেন না তারা। নন্দিনীকে সরিয়ে রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব পদে দুষ্মন্ত নারিওয়ালাকে নিয়ে এসেছে কমিশন। নতুন স্বরাষ্ট্র সচিব করা হয়েছে সংঘমিত্রা ঘোষকে।
রবিবার বিকেলেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে কমিশন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের দুই শীর্ষ আমলাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ভোট ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হয়ে গেছে। এই সময়ে কমিশনের হাতে বিশেষ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। রাজ্য সরকারের আমলা, আধিকারিক, পুলিশকর্তাদের বদলির নির্দেশ দিতে পারে কমিশন। অতীতেও বিভিন্ন পুলিশকর্তা এবং সরকারি আধিকারিক বদল করেছে কমিশন। নির্বাচনের আগে পুলিশ সুপার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার বদলেরও নজির রয়েছে। এমনকি স্বরাষ্ট্র সচিব বদলের উদাহরণও আছে। তবে একেবারে মুখ্য সচিব পর্যায়ে পরিবর্তন সাম্প্রতিক সময়ে কবে হয়েছে, মনে করতে পারছেন না কেউই।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


