ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গাজীপুরে পোশাক কারখানায় পানি খেয়ে অসুস্থ ২ শতাধিক শ্রমিক ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ১২০ মোড়ে বসছে এআই ক্যামেরা বিধিনিষেধ আরোপ সময়ের দাবি রাঙামাটির বরকল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে রসুন ও সার জব্দ নড়াইলে শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গণপিটুনি মেসিকে ছাড়িয়ে গেলেন হ্যারি কেইন রিজার্ভ চুরিতে জড়িত ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের ১০ জন কানাডায় সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যু সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য এনডিএর আর ৬ ভোট লাগবে টুকটুক ও চিকু পাঠ থেকে ৩টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও  উত্তর , ৩য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক শিশু নিহত চট্টগ্রামের নিখোঁজের ২ দিন পর শিশুর মরদেহ উদ্ধার টিভিতে আজকের খেলা দ্বিতীয় ম্যাচের আগে ‘মুখ বন্ধ রাখতে’ বললেন দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ যেভাবে নির্ধারিত হবে সেরা ৮ ‘তৃতীয় দল’ কুড়িগ্রামে ট্রাক উল্টে রেলপথে, ভোগান্তিতে ট্রেনের যাত্রীরা বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে দর্শকদের দুয়োধ্বনি হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৫৮ হাজার ৬৩৯ জন বাংলাদেশি জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমিই বস’ লৌহজংয়ে ভাঙারি ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা আদিতমারীতে শিশু নন্দিনী হত্যার দায় স্বীকার পাওনা টাকার বিরোধেই খুন হন আরিফ আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম ইরানের সঙ্গে চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র আলফাডাঙ্গায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নতুন দায়িত্বে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ চট্টগ্রামের অপহরণকারীদের হুমকিমূলক চিরকুট,নিখোঁজ শিশু উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে কলম্বিয়ার শুভ সূচনা ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনি ধর্ষণ-হত্যার বর্ণনা দিলেন ৪ ধর্ষক গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক
Nagad desktop

পরিকল্পিত নগরায়ণ এখন সময়ের দাবি

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
পরিকল্পিত নগরায়ণ এখন সময়ের দাবি
ডা. মুশতাক হোসেন

মশার জন্য গবেষণার প্রতিষ্ঠানে আমাদের কমতি নেই, কিন্তু কমতি হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজটা করা। মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূলের মতো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখছি না।...

৬০ বছর আগে আমরা সফলভাবে মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়াকে নির্মূল করতে পেরেছিলাম। এখন আধুনিক জ্ঞান রয়েছে, অথচ আমরা এখনও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। যেভাবে ম্যালেরিয়াকে সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণে কাজ হয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সে রকম দেখছি না। গতানুগতিকভাবে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলে যেভাবে চিকিৎসা করা হয় আমরা সেভাবে দেখছি। মশা নিয়ে গবেষণার ইনস্টিটিউট আছে। নতুন করে তা করার বিষয় না। ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউট যেটা এখন আইইডিসিআর, সেটার প্রথম যে ডিপার্টমেন্ট ছিল সেটা কীটতত্ত্ব বিভাগ। সেটা কীটপতঙ্গ নিয়ে কাজ করে। নিপসমে কীটতত্ত্ব বিভাগ আছে। এ দুই প্রতিষ্ঠানে কীটতত্ত্ব বিভাগে গবেষণা হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কীটতত্ত্ব বিভাগ রয়েছে। তারা কাজ করছে, গবেষণা করছে। মশার জন্য গবেষণার প্রতিষ্ঠানে আমাদের কমতি নেই, কিন্তু কমতি হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজটা করা। মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূলের মতো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখছি না। 

জনস্বাস্থ্যের মূলনীতি অনুযায়ী কীটতত্ত্ববিদ, জনস্বাস্থ্যবিদ, পরিবেশবিদ- সবাই মিলে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একে অপরকে দোষারোপ করা হচ্ছে। একটা কেন্দ্র থেকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো যে কাজটা করা হয়েছিল সেটা কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে করা হচ্ছে না। এর ব্যর্থতা অবশ্যই যারা সিদ্ধান্ত নেন সেসব কর্তৃপক্ষের। যারা এ বিষয়ে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং যারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন তাদের এখানে ব্যর্থতা আছে। জনসংখ্যার বিস্তার, আবহাওয়ার বিষয়, অপরিচ্ছন্নতা- আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায়ও একই অবস্থা। আমাদের আরেক পাশের দেশ মিয়ানমারের একই অবস্থা। থাইল্যান্ডে একই অবস্থা। সেখানে যদি মশা নিয়ন্ত্রণ হতে পারে আমরা কেন পারব না? আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ থেকে পরিকল্পিত নগরায়ণে যেতে হবে। আমরা পরিকল্পনা নিলে করতে পারি হয়তো তবে সময় লাগবে। নগরায়ণের পরিকল্পনা এই মুহূর্ত থেকে করতে হবে। যতটুকু অপরিকল্পিত নগর আছে সেখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরিকল্পনা করে চেষ্টা করতে হবে। নতুন যেসব নগর হচ্ছে সেখানে শুরু থেকে পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলার আহ্বান করব। শুধু নগর তো না, আমাদের গ্রামেও এক ধরনের নগর হয়ে গেছে। যার ফলে গ্রামেও অপরিচ্ছন্নতা ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও পলিথিনের ব্যবহার, প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। সেখানেও এডিস মশার প্রকোপ। গ্রামেও কিন্তু এডিস মশার দংশনে মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে, চিকুনগুনিয়ায় ভুগছে।

’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পরে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত নেতৃত্বরা বরখাস্ত হয়েছে। কিন্তু দেশের কাজ করতে হাজার হাজার ছাত্র-তরুণ-তরুণী, তারা কিন্তু প্রস্তুত ছিল। কিছুদিন তারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করেছে। জনসাধারণ তাদের যত্ন করেছে। কাজেই মশা নিয়ন্ত্রণকাজে যদি ছাত্র-তরুণদের কাজে লাগানো যেত তাহলে ডেঙ্গু ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। গণ-অভ্যুত্থানের ফলে দেশপ্রেমের একটা মনোভাব জেগে উঠেছিল, এটাকে কাজে লাগাতে হবে। যারা পরিবেশবিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী তারাই ছাত্র-তরুণদের ট্রেনিং দেবেন। তিন দিন থেকে পাঁচ দিন যথেষ্ট। তারপর তারা কার্যক্রমে মাঠে নামত। তা হলে কয়েক বছরের ভেতরে শহর, গ্রাম- সব জায়গায় আমরা একটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারতাম।

ঢাকা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঢাকার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ আছে। এর মাঝখানে বিশাল পাহাড় বা সমুদ্র নেই। কাজেই মানুষ ও এডিস মশার চলাচল সমান্তরাল রয়েছে। মানুষের চলাচলের সঙ্গে মশাও চলাচল করছে। ডেঙ্গু রোগীর চলাচল হচ্ছে। মশা এবং ডেঙ্গু রোগী দুটি যদি এক হয়ে যায় তাহলে মানুষ থেকে মানুষে ডেঙ্গু রোগটা ছড়ায়। ঢাকাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে ঢাকার বাইরে আর ছড়াত না। ঢাকা যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করেনি ফলে এটা ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এখন যে গবেষণা হচ্ছে না, তা না। গবেষণার সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বা মিলটা হচ্ছে না। গবেষকরা বলেই যাচ্ছেন। যারা দায়িত্বে আছেন তারা গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী কাজ করছেন না। কাজের পরিকল্পনার সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্ট গবেষণাটা লাগবেই। সেটা হচ্ছে না। যদি একটা কেন্দ্রে সম্মিলিতভাবে কাজটা করত, তাহলে সফল হতো। অবশ্যই গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আমাদের যারা কীটতত্ত্ববিজ্ঞানী আছেন, জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী আছেন, পরিবেশবিজ্ঞানী আছেন তারা গুরুত্বসহকারে গবেষণার কাজগুলো করতেন।

কলকাতা থেকে আমাদের প্রধান পার্থক্য আমাদের প্রশিক্ষিত ইন্টার্নি আছে, জনস্বাস্থ্যবিদ আছে, পরিবেশবিজ্ঞানী আছে, কিন্তু আমাদের যেটা নেই সেটা হলো কলকাতার মেয়রের মতো অঙ্গীকারবদ্ধ মেয়র। সেখানকার সরকার, রাজ্য সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেখানে অনেক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। তারা ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাজার হাজার ভলান্টিয়ার নিয়ে একেবারে বাড়িভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক কাজ করেছে। আমরা সেই কাজটি করছি না। বিশেষ করে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ এভাবে তাদের সম্পৃক্ত করে দিনের পর দিন কাজ করে গেছে। ফলে কলকাতায় তারা ডেঙ্গু নির্মূল করতে পেরেছে। আমাদের জনগণকে সম্পৃক্ত করে কাজ করানো, এটা কিন্তু আমরা করছি না।

এডিশ মশার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে, চিকুনগুনিয়া হতে পারে। দরকার হচ্ছে জনগণকে দিয়ে কাজটা করানো। সেটা কিন্তু জনগণ নিজে থেকে করতে পারে না। সরকারি সিদ্ধান্ত লাগে। প্রয়োজন প্রত্যেকটি ওয়ার্ডভিত্তিক ভলান্টিয়ার সংগ্রহ করে তাদের দিয়ে, জনগণকে নিয়ে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা। তরুণ-যুবক ছেলেমেয়েদের দিয়ে কাজটা করানো স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। এভাবে কাজটা হলে বাস্তবায়ন করা যেত। জনগণ কিন্তু যথেষ্ট সচেতন। সচেতনতার কোনো ঘাটতি নেই। আপনি একটা উচ্চবিত্ত এলাকায় যান বা মধ্যবিত্ত এলাকায় যান, নিম্নবিত্ত এলাকায় যান- সবাই বলবে যে এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু হয়। আমরা ডেঙ্গুর বিপদ সম্পর্কে জানি। জনগণকে উদ্যমী ভূমিকায় নিয়ে কাজটা কিন্তু আমরা করছি না। জনগণকে দিয়ে কাজটা করাতে হবে। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। সেসব ক্লিনিকে রক্ত সংগ্রহ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যে গ্রামে বা যে পাড়ায় ডেঙ্গু রোগী আছে, এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতর যারা জ্বর নিয়ে আছে বা শরীরটা খারাপ লাগছে, রক্তের নমুনা তারা পাঠাতে পারে জেলা হাসপাতালে। গ্রামাঞ্চলে কাঠামো আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকাঠামো হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকাঠামো হিসেবে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল। আর তৃতীয় পর্যায় তো আছেই, যেগুলো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা মহানগরীতে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলো হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে একসঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। কিন্তু এটা বিকেন্দ্রীকরণ না। বড় বড় হাসপাতালে তিন পর্যায়ের সুবিধা আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে এখানে টেস্ট করে। মাধ্যমিক সেবা হিসেবে পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতাল বেডও আছে। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ের সেবা হিসেবে ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্য চাহিদার তুলনায় বেড খুব কম। মাধ্যমিক সেবার অংশ হিসেবে ডেঙ্গু রোগী পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকা শহরে হাসপাতাল হতে পারে। মানুষের মধ্যে একটা ধারণা, যে হাসপাতালে ব্রেন অপারেশনের, হার্টের জন্য অপারেশন থিয়েটার নেই, যে হাসপাতালে এমআরআই মেশিন নেই, এটা কোনো হাসপাতাল না। রোগী পর্যবেক্ষণ করার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতাল দরকার। সেখানে অক্সিজেন আছে, ব্লাডপ্রেসার মেশিন আছে, স্যালাইন দিতে পারে। এগুলো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। পর্যাবেক্ষণ করতে পারে ডেঙ্গু রোগীদের। যেসব ডেঙ্গু রোগী ঝুঁকিপূর্ণ বয়সের বা গর্ভবতী নারী, তাদেরকে তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এভাবে শহর অঞ্চলে স্তরভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা করা দরকার খুবই দ্রুত। এতে রোগী অনুপাতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কমানো যাবে। নতুবা ডেঙ্গুতে বাংলাদেশে রোগী অনুপাতে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার- এ বদনাম থেকে, এ কলঙ্ক থেকে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারব না।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সামাজিকভাবে পাড়া-মহল্লার ময়লা-আর্বজনা পরিষ্কার করার জন্য যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে জোর দিতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে। তারা মশা নিয়ন্ত্রণের কাজের পাশাপাশি রোগী শনাক্তের কাজ করবে। আর ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখবে। শহর, নগর এবং গ্রামগঞ্জ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে যদি স্বাস্থ্যসেবাটা দেওয়া যায়, তাহলে মানুষের রোগটা খারাপ জায়গায় আর যাবে না বা বড় বড় হাসপাতালে চাপটা বেশি হবে না। তাই কমিউনিটি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স- এখানে যদি আমরা অধিকাংশ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারি এবং রোগ প্রতিরোধের উপদেশ দিতে পারি- তাহলে বাংলাদেশে মৃত্যুহার অনেক কমে যাবে। অসুস্থতার হারও কমে যাবে। কাজেই এখানে যদি কোনো ঘাটতি থেকে থাকে সে ঘাটতি জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা উচিত। ডেঙ্গু অধ্যুষিত এলাকায় যেন ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং চিকিৎসার কোনো রকম ঘাটতি না হয় সে বিষয়ে জরুরিভাবেই মনোযোগ দিতে হবে। 

লেখক: জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)

বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
মহিদুল ইসলাম হাওলাদার

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উচ্চাভিলাষী বাজেট রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট খুব কমই দেখা গেছে।

 

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতিকে গতিশীল করার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মূল প্রশ্ন হলো–এই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ কোটিরও বেশি। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় প্রায় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতা এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ অথবা অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতার কারণে এ অর্থ প্রত্যাশিত মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতাও সে আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে তার চাপ সরাসরি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়বে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্যসংকট এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব ও ঋণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

আমার বিবেচনায় বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো–উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহে সম্ভাব্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতও নিয়মিতভাবে বড় আকারের ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক গভীর ও শক্তিশালী। ফলে তারা সহজেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই একই ধরনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন।

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, সুস্থ ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়, এই বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সভাপতি, জাতীয় পার্টি, মাদারীপুর জেলা শাখা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর
গাজীউল হাসান খান

চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না।...

মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমেই এখন এক বহুমুখী ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। শুধু পশ্চিমা রাজনৈতিক আধিপত্য নয়, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এ পরিবর্তনের ধারা শুরু হতে দেখা গেছে নব্বইয়ের সূচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই। দ্বিকেন্দ্রিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলনির্বিশেষে বিভিন্ন শক্তির অভ্যুদয় ক্রমে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তাতে বিশ্বব্যাপী কারও একচ্ছত্র আধিপত্যের পরিবর্তে বরং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের বিকাশ কিছুটা সহজসাধ্য হচ্ছে এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামরিক দিক থেকে নিরাপত্তার বিষয়গুলো জোরদার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে কারণে ভারতের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা সীমান্ত পথ রক্ষা করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অতি উৎসাহী কিছু ব্যক্তি কখনো বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ এবং পাশাপাশি ভারতের স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোকে রক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকল্পে এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অখণ্ডতা কিংবা সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে তার লালমনিরহাটসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য বিমান ঘাঁটিসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজ অতি দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত সমস্যা ভারতের অরুণাচল রাজ্যের সঙ্গেও তার প্রতিবেশী চীনের রয়েছে। কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের কোনো স্থায়ী সমাধান বা অবসান আজও হয়নি। এ অবস্থায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশেষ করে গাজাসহ ফিলিস্তিন-ভিত্তিক ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও তার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সার্বিক উন্নয়ন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, অবিলম্বে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় তাকে বলেছেন যে, চীনের উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মসূচির কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শেষের দিকে চীন সফরে যাচ্ছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে বহু কারণে এ দেশের পরলোকগত নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বিশেষ করে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বিনির্মাণের ক্ষেত্রে চীন আমাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। সে কারণে বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিতে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিপ্লব-উত্তর বিগত প্রায় ৭৭ বছরে চীন তার পঞ্চশীলা নীতি অনুযায়ী ভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির বরখেলাপ। কিন্তু গত বছর চীনের প্রণীত ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সূচিত হয়েছে বিরাট পরিবর্তন। গণচীনের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, তাতে জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায়ে তুলে আনা হয়েছে। সে হিসেবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখন অনেক গুরুত্ব লাভ করেছে। সে কারণে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামরিক ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। তাতে অভ্যন্তরীণ এবং এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ চীনের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এবং উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে উন্নয়নকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নকে অগ্রসর কিংবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন তিনটি বিষয় নির্ধারণ করেছে। সেগুলো হচ্ছে: কৌশলগত গঠনশীল স্থিতিশীলতা (Constructive Strategic Stability), বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (Gobal Development Initiative) এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (Global Security Initiative)। এর মাধ্যমে তারা আগামী ১০ বছর অর্থাৎ ২০৩৫ সালের মধ্যে আধুনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার পক্ষপাতি। তাই তারা এখন থেকেই প্রচার করছে যে, নিরাপত্তা হচ্ছে উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। সে শর্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নিরাপত্তাবেষ্টনী বা বলয় গড়ে উঠতে পারে। সে প্রস্তাবিত নিরাপত্তাবলয় শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা জগতের নিরাপত্তাব্যবস্থা ন্যাটোর মতো হবে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথভাবে গড়ে তোলা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিভিন্ন অঞ্চলিক উদ্যোগ, ব্যবস্থা কিংবা চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।

ওপরে উল্লিখিত প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান-ধারণা থেকেই একদিন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠন করা হয়েছিল। এ সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল ২০০১ সালের ১৫ জুন। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, তাজিকস্তান, কিরঘিজস্তান ও উজবেকিস্তানকে নিয়ে এ সহযোগিতা সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। পরে ভারত পাকিস্তান ও বেলারুশ তাতে যোগ দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঠেকানোও এর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে চীনের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোদার করার পরিকল্পনা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য হতে পারে সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসন ঠেকানো। চীন ক্রমে ক্রমে তার প্রতিবেশীদের নিয়ে সে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাজার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা এবং ডলারের আধিপত্যরোধ করার জন্য চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংস্থা ব্রিকস গঠিত হয়েছিল। তাতে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয় ২০১১ সালে। যুক্তরাষ্ট্র এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এখনো এ প্রতিষ্ঠানে ততটা অবদান না রাখতে পারলেও বিশেষ করে চীন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার কারণে ব্রিকস এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারত ব্রিকস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে পারে। তখন তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ইরান। তা ছাড়া বাংলাদেশও বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তা বিশেষভাবে নির্ভর করবে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।

চীন বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক বিএপি সরকার চীনের সঙ্গে অতীতে একযোগে কাজ করেছে অত্যন্ত নির্ভরতার সঙ্গে। শহিদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এটি চীনের সরকার এবং জনগণের কাছে নিঃসন্দেহে একটি গভীর আস্থা ও সম্মানের বিষয় হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন, যা আইনসঙ্গতভাবে তিনি করতে পারেন না। সেসব চুক্তি পরে অকার্যকর হয়ে গেলেও তার কিছু কিছু বিষয় চীনকে অখুশি করেছে বলে জানা যায়। অনেকে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র কারও বন্ধু হতে পারে না। এ কথা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অনেক বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। সে কারণে তার সঙ্গে সাবধানে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করেতে হবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন, নতুন উন্নয়ন ও নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন এখন অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের তিস্তা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার পর্যায়ে কাজ করেছে। তা ছাড়া, লালমনিরহাটে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ব্যাপারেও অনেক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা রয়েছে চীনের। একমাত্র তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেই প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রয়োজন বাংলাদেশের। প্রতিরক্ষা ও অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল কর্মপরিধি, যাতে অর্থ ও কারিগরি জ্ঞান কিংবা দক্ষতা সবকিছুই প্রয়োজন হবে ধাপে ধাপে। বর্তমান অবস্থায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের সংগ্রাম সফল হোক। এক নতুন যুগের সূচনা করুক তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
[email protected]

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না।...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দামও এক দফায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়েছে। এখন মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা উসকে যাবে। এমনকি বাজারে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অনেকটা হিমশিম পর্যায়ে উঠতে হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সংস্কারমূলক পরামর্শের কারণে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, ডলারের বিনিময় হার– সবকিছুই জ্বালানি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–বিশ্ববাজারে ওঠানামা থাকলেও দেশে কেন বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে? কেন সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না? এবং এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি অনেকেই ২০ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলবে বিধায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অবশ্য প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির বিভিন্ন ইউনিট। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশের সংকটকালীন সময়ে বিএনপি কখনোই ভালোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। বিদ্যুতের দাম বাড়বে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।’ 

অনেকেই আছেন যারা একসময় বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে টেলিভিশনসহ রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় তুলত, তাদের কেউ কেউ এখন সরকারের কেবিনেটে আছেন। তারা সরকারে থাকার অজুহাতে হয়তো মুখ বন্ধ করে আছেন এই মুহূর্তে। আমরা মনে করি তারা যদি সরকারে না থাকত নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ঝড় তুলতেন টকশোয় কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে।

বাজেট ঘোষণার আগেই বিদ্যুৎ ও জ্বালিানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব ফেলছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অন্যান্য দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়? অনেক দেশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিছু দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর কমিয়ে দেয়, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কম পড়ে। কিছু দেশ পরিবহন খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়। অনেক উন্নত দেশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি প্রদান করে।

আবার অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা তাদের অর্থনীতিকে তুলনামূলক কম প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বিস্তার এখনো সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি কর্মচারী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের আয় একই থাকে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। যদি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী–সবকিছুর দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়বেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা হারাতে পারে, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হতে পারে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, যা চাকরির সুযোগও সীমিত করে। চতুর্থত, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মধ্যবিত্তের একটি অংশও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। যারা কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এখন আমাদের মাথায় একটি বিষয় খুব ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো বাজেটের পর পরিস্থিতি কী হতে পারে? সরকার কি যথাযথভাবে সবকিছু সামাল দিতে পারবে? সাধারণত বাজেটের সময় সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক সমন্বয় করে। যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা আমদানিনির্ভর খাতে নতুন কর আরোপ বা শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সরকার যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে কিছুটা চাপ লাঘব হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের বিশেষ ইফেক্ট সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, একটি খাতে মূল্য বৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে অন্য সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করা, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখা। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না। বাজেট-পরবর্তী বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থের মধ্যে সরকার কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।...

নতুন সরকার কেমন বাজেট প্রণয়ন করে এবং কোন কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। প্রস্তাবিত বাজেট এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট হতে যাচ্ছে, এটি অনুমান করা গিয়েছিল। বাজেটে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরান্তে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। একটি দেশের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়সংবলিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ৫০১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নতুন সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম।

দেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে বেকার সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে চায়। এসব প্রতিটি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। অনেক দিন ধরেই এ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় নেই। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতকে দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত রেখে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা যায় না। নতুন সরকার এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে।

চলমান দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে ৭ শতাংশ সরল সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ তহবিল থেকে কীভাবে ঋণ বিতরণ করা হবে, কারা সেই ঋণ পাবেন–এসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত ঋণখেলাপি এবং নানা আইনি সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের ক্লিন (ঋণখেলাপিমুক্ত) দেখাচ্ছেন, তারা যদি এ বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন, তাহলে বিশেষ ঋণদান তহবিল শুধু ব্যর্থ হবে তাই নয়, এটি ব্যাংক খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ দেশে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব রয়েছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি অথবা বিদেশি নাগরিক যদি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন, তাহলে তাদের ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।

বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা বিরাজ করছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এ বছর জুনের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আগামী অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিট অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই এর প্রভাব পড়বে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না বলে দেশ ক্রমাগত বিদেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেও ভালো নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়াতে হবে। আর উচ্চ হারে করারোপের পরিবর্তে করজাল বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সাধারণ করদাতারা যাতে কর প্রদানে আগ্রহী হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের কম। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। এ জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এ হার দ্রুততর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যেসব প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কয়েক বছর আগে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, সাধারণত কয়েকটি বিশেষ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। এগুলো হচ্ছে–প্রকল্প অনুমোদনকালে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালন নিয়োগে বিলম্ব এবং অনুমোদিত প্রকল্পের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণে অথবা ক্রয়ে বিলম্ব। এ ছাড়া প্রতিবারই দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। অর্থবছরের শেষের দুই মাস অর্থাৎ মে ও জুনে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়িত প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষুণ্ন হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বছরের শুরু থেকেই দ্রুততর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রণীত বাজেট সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করা।
 
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও বিগত অন্তর্বর্তী 
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?
দীপু মাহমুদ

বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।...

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। রাষ্ট্র কাদের জন্য ব্যয় করতে চায়, কাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাবে–তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিচার করতে হলে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো–বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিশু কি এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, শিশু কি এই বাজেটে দৃশ্যমান?

প্রথম দর্শনে উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হতে পারে। বাজেটের আকার বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে কেবল বরাদ্দের অঙ্ক দেখলে চলবে না। কারণ শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ নয়, বরং ‘শিশুদের প্রয়োজন কতটা দৃশ্যমান হলো’।

বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন, বিশেষ করে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় অধিক বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল–শিশুদের জন্য বরাদ্দকে দৃশ্যমান করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটের ভেতরে এমনভাবে শিশুদের উপস্থিতি থাকতে হবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় শিশুদের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ফল অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের কতটা শিশুদের জন্য? শিশু সুরক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন, পথশিশুদের সেবা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ কত? সামাজিক সুরক্ষার বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অংশ কতটা রয়েছে?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজেটে শিশুদের জন্য আলাদা লক্ষ্য ও দৃশ্যমান বরাদ্দ না থাকলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে শিশুরা প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষা তখন পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট চাহিদা আড়ালে থেকে যায়।

একই ধরনের প্রশ্ন মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? অর্থনীতিবিদ ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।

ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলতে হলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং সাপোর্ট এবং মানসিক বিকাশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই প্রারম্ভিক বিনিয়োগ কতটা দৃশ্যমান?

শিক্ষা খাতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বাজেটে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগকে আধুনিকায়ন বলা যায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা, যা শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক বোধকে বিকশিত করে।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে শিশুরা কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের আলোচনায় গ্রন্থাগার, শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এসব বিষয় কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।

শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অথচ গবেষণা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে বিনিয়োগ তার সারা জীবনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে শিশু পুষ্টিতে বিনিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তবে শিশুর প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশু সুরক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয় বাজেট আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের খেলা, অবসর, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিনোদনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় শিশুদের আনন্দের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বলি, পুষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।

শিশু কেবল পরীক্ষার্থী নয়। সে খেলবে, গল্প পড়বে, ছবি আঁকবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াবে। আনন্দও শিশুর অধিকার। শিশুবান্ধব সমাজ কেবল শিশুদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না, তাদের আনন্দময় শৈশবও নিশ্চিত করে।

একইভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বাজেটে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্নও রয়ে যায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন শিশু অধিকার প্রশ্নের অংশ। শিশুরা ক্রমশ অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি রয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

শিশুদের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক বিকাশ বলতে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নাগরিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো মূল্যবোধের বিকাশকে বোঝানো হচ্ছে। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি করে। কিন্তু শিশুর ভেতর নেতৃত্বে এই দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

শিশুদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করি–‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ।’ কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরও নাগরিক। তাদের অধিকার ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখা যায় না। তাদের নিরাপত্তা, আনন্দ, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আজকের, এই মুহূর্তের।

তাই শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন কেবল আগামী দিনের মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন নয়, এটা আজকের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শিশুবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্র শিশুদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা আছে। কিন্তু প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বলছে, মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, শিশুদের দৃশ্যমানতায়। সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার কিংবা স্বাস্থ্য খাত–সব ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান বরাদ্দ এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জিডিপি, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুখী, কতটা সৃজনশীল এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাজেটকে শুধু শিশুবান্ধব হলেই চলবে না, শিশুদের জন্য দৃশ্যমানও হতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক