বাজারব্যবস্থার সমস্যা নয়, অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা দুর্বলতারও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি-অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত চাপ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই সময় থাকতে বাজারে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও ভোক্তাসুরক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অতন্ত জরুরি।...
বর্তমান বিশ্ব এমন এক অনিশ্চিত সময় পার করছে, যেখানে একটি অঞ্চলের সংঘাত খুব দ্রুত অন্য অঞ্চলের অর্থনীতি, বাজার ও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে কূটনেতিক আলোচনার ভেঙে পড়া বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, পণ্য পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ বৈশ্বিক অস্থিরতা কেবল পরিসংখ্যানগত কোনো বিষয় নয়; এটি মানুষের রান্নাঘর, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এক বাস্তব সংকট।
এ বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। অতি সম্প্রতি সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা ও চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে তা সরাসরি ভোক্তাদের ব্যয় বাড়াবে এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
আমাদের দেশে কয়েক মাস ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, সবজি, মাছ, মাংস প্রায় সব পণ্যের দানই সাধারণ মানুষের নাগালের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত মার্চে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য এটি টিকে থাকার সংকট, আর মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি নীরব আর্থিক বিপর্যয়। যেসব পরিবার আগে মাসের ব্যয় মোটামুটি সামলে নিতে পারত, তারাও এখন হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সংসারের খরচ সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যতালিকা কমিয়ে দিচ্ছেন, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, সন্তানদের অতিরিক্ত শিক্ষা ব্যয় কমাচ্ছেন, এমনকি সঞ্চয় ভেঙে বা ধার করে চলার মতো পরিস্থিতিতেও পড়ছেন।
দ্রব্যমূলোর এ ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত বৈশ্বিক কারণগুলো আগে সামনে আসে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে সব পণ্যের ওপর পড়ে, এটি সত্য। একইভাবে যুদ্ধ, সামুদ্রিক রুটে অনিশ্চয়তা, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া- এসব কারণও আমদানি ব্যয় বাড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব কি আমাদের বাজারে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, নাকি এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, দুর্বল তদারকি এবং কিছু অসাধু গোষ্ঠীর সুযোগসন্ধানী আচরণ। বাস্তবতা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি যত দ্রুত দেশীয় বাজারে আসে, মূল্যহ্রাস তত দ্রুত আসে না। এ বৈপরীত্য কেবল অর্থনীতির নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আমাদের বাজার ব্যবস্থায় বহুস্তরীয় মধ্যস্বত্বভোগীতা, অস্বচ্ছ সরবরাহ কাঠামো, মজুতদারি এবং কৃত্রিমসংকট সৃষ্টির প্রবণতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। যখনই আন্তর্জাতিক অস্থিরতার খবর আসে, তখনই বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। সে চাপকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দেন। পরে দেখা যায়, বাজারে পণ্যের প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও ভোক্তাকে বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বৈশ্বিকসংকট অনেক সময় স্থানীয় বাজারে অতিরঞ্জিত মুনাফার অজুহাতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রপ্ত হন সৎ ব্যবসায়ীও, কারণ অসাধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনিও টিকতে পারেন না।
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থার প্রশ্নকে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা মানেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্যের বিষয় নয়, এটি উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প- সবকিছুর ভিত্তি। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে তার অভিঘাত প্রতিটি খাতে গিয়ে পড়ে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষিপণ্যের বাজারজাত ব্যয় বাড়ে, নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি খাতের চাপ একত্রিত হয়ে ভোক্তার কাঁধে এসে পড়ে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক সময় বলা হয়, গ্যাস বা তেলের বড় কোনো সংকট নেই, সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা দেয়। কোথাও শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ঘাটতির অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে, আবার কোথাও ব্যবসায়ীরা আগাম মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে সংকট না থাকলেও বাস্তবে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থা অর্থনীতির জন্য যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি জনগণের আস্থার জন্যও ক্ষতিকর।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব কেবল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সমাজের ভেতরেও গভীর পরিবর্তন আনে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, সঞ্চয়ের সক্ষমতা হ্রাস পায়, পুষ্টির মান নেমে আসে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাপে পড়ে, তরুণদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়। বিশেষ করে স্থির আয়ের মানুষ, পেনশনভোগী, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী এবং শহরের ভাড়াটিয়া পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। তারা একদিকে আয় বাড়াতে পারছেন না, অন্যদিকে ব্যয় কমানোরও খুব বেশি সুযোগ নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত একটি বড় প্রশ্ন।
এ অবস্থায় কেবল বিচ্ছিন্ন বাজার অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। মাঝে মাঝে কিছু জরিমানা, কিছু তদারকি বা কিছু ঘোষণায় সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু সমস্যার মূলে যদি হাত দেওয়া না হয়, তবে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে। প্রয়োজন হলো বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোন পণ্য কোথা থেকে আসছে, কত দামে আমদানি হচ্ছে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কীভাবে দাম নির্ধারিত হচ্ছে এসব বিষয়ে স্পষ্টতা বাড়াতে হবে। বাজারে তদারকি সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয়, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। ভোক্তারা যেন বুঝতে পারেন, কোন দামের পেছনে কী যুক্তি আছে, আর কোথায় অযৌক্তিক মুনাফা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া এ সংকট থেকে পরিত্রাণের পথ নেই। আমাদের কৃষি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কমাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য ঝাঁকুনিতেই দেশীয় বাজান অস্থির হয়ে উঠবে। ভোজ্য তেল, ডাল, পেঁয়াজসহ যেসব পণ্যে আমদানিনির্ভরতা বেশি, সেসব ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন সম্প্রসারণ, নিকল্প উৎস খোঁজা এবং মজুত ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি। কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদন কমবে, আবার ভোক্তারা সাশ্রয়ী দামে পণ্য না পেলে বাজারে অসন্তোষ বাড়বে। তাই উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাও জরুরি।
জ্বালানি খাতেও স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা নয়, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় বিকল্প জ্বালানি, দুর্নীতি ও অপচয়রোধ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ন্যায্যমূল্যের বিক্রয়ব্যবস্থা, ভর্তুকি ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা জোরদার করা জরুরি। কারণ অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে কঠিন আঘাত পড়ে সেই সব মানুষের ওপর, যাদের সহ্যক্ষমতা সবচেয়ে কম।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে তথ্যের অসমতা। ভোক্তারা অনেক সময় জানতেই পারেন না কোন পণ্যের প্রকৃত মূল্য কত হওয়া উচিত, কোথায় অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে বা কোন পণ্যটি নিরাপদ ও মানসম্মত। এ তথ্যঘাটতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজেই অতিরিক্ত মুনাফা করে থাকে। যদি নিয়মিতভাবে পণ্যের ন্যায্যমূল্য, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে ভোক্তাদের একটি বড় অংশ সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন। এতে বাজারে একটি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশও তৈরি হবে।
একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের গুরুত্ব আরও বাড়ানো দরকার। অনেক সময় তাৎক্ষণিক চাপ মোকাবিলায় নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই অর্থনীতি, বাজার ও ভোক্তা আচরণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করলে তা আরও কার্যকর ও টেকসই হবে।
সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি নিছক একটি সাময়িক বাজারব্যবস্থার সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা দুর্বলতারও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এখনই যদি কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি-অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত চাপ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সে সংকটের সবচেয়ে ভারী বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে ভোক্তাদের কাঁখেই। তাই সময় থাকতে বাজারে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও ভোক্তাসুরক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অতন্ত জরুরি।
লেখক: সভাপতি, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)


