আজ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা। এটাকে বাংলাদেশে বৈশাখী পূর্ণিমা বলা হয়। কারণ বুদ্ধ বিশাখা নক্ষত্রে এ পূর্ণিমা তিথিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বুদ্ধত্বলাভ ও মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যা সমগ্র বিশ্বে বুদ্ধের অনুসারী তথা বুদ্ধপ্রেমিকদের জন্য এক অনন্য আনন্দপ্রাপ্তির ঘটনা।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বুদ্ধের অনুসারীদের মতো বাংলাদেশেও বুদ্ধের জন্ম, গৃহত্যাগ ও পরিনির্বাণ প্রাপ্তিকে স্মরণ করতে পেরে আমরা গৌরবান্বিত। প্রিয় এ মাতৃভূমি বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রনির্বিশেষে ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে চিন্তাশীল মানুষের বসবাস কম নয়, যাদের অনেকেই বুদ্ধের প্রজ্ঞা ও জীবনাদর্শে উজ্জীবিত। আমরা কে না স্বীকার করব, তথাগত বুদ্ধ জন্ম-গোত্র-জাতপাত ও লিঙ্গ প্রভেদের ঊর্ধ্বে জগৎ ও জীবন অবলোকন করেছিলেন। জাত-প্রথা-অঞ্চলের অন্ধ মায়া বিনাশ করেই বুদ্ধের আলোকিত উত্থান হয়েছিল, কারণ তিনি দেখেছিলেন জাত-কূল-গোত্র-প্রথার আর অঞ্চলের অন্ধ ও মূর্খতার সীমায় বন্দি মানুষ হানাহানি, অপমান, জ্বালাও-পোড়াও, ধর্ষণ, লুণ্ঠনে প্রত্যহ নিপীড়িত, জর্জরিত হচ্ছে। তাই বাহ্যিক ফাঁকা আওয়াজ নয়, তিনি চেয়েছিলেন অন্তর-অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, পরিবর্ধন। তিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন সুবচন, সুচিন্তা, সুকর্মের ওপর। যার মাধ্যমে মানুষ উন্নতি সাধন করতে পারবে এবং সে জন্য বিশেষ কোনো দেবদেবী-ঈশ্বর বা যেকোনো ধরনের কাল্পনিক শক্তির আরাধনা করতে হবে না বলে সুস্পষ্ট মত দেন। এ জন্যই বুদ্ধের আরেক নাম কর্মবাদী ও তার ধর্মের নাম কর্মবাদ। তিনি বলেছিলেন, একমাত্র কর্মই বন্ধু এবং ছায়ার মতো অনুসরণকারী। ‘আমাদের ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর সবই কর্মের অধীন, তাই সঠিক মাঠ যাচাই-বাছাই করে উত্তম বীজ না আবাদ করতে পারলে ভালো ফল আশা করা, ভালো ফলের স্বপ্ন বোনা বোকামি’–এটাই বুদ্ধের শিক্ষা। মানবিক কল্যাণের জন্য যেকোনো ধরনের জ্ঞানতথ্য এবং তত্ত্বের উন্মেষ যেখান থেকে যেভাবে হোক না কেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য, অভিনন্দিত করার জন্য প্রস্তুত থাকাই হলো বুদ্ধের উপদেশ। তার সঙ্গে বিরোধ করা বুদ্ধের কাম্য নয় বলে প্রচলিত মত ও পথকে চ্যালেঞ্জ করে বিবেক-বুদ্ধির সহায়তায় সম্মুখে অতিক্রম করে যাওয়া পরম ধর্ম হিসেবে নিজ ধর্মমত স্থির করেন তথাগত।
তথাগত বুদ্ধের সময়ে জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে বুদ্ধসমমানের তেমন কেউ ছিল না, তবু তিনি সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে, কারও বাগ্মিতার ঔজ্জ্বল্য দেখে, জন ও সমাজ-প্রবৃদ্ধির জয়জয়কার শুনে বিনা বিচার-বিবেচনায় তার মত বা পথের অনুসারী হইও না। বোধের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে স্ব-বিবেক স্ব-বুদ্ধিতে গ্রহণীয়কে গ্রহণ করবে আর বর্জনীয়কে বর্জন করবে। এমনকি তিনি তার ধর্ম সম্পর্কে বলেন, এটা ভেলার মতো, যা দিয়ে পাড়ি দেওয়ার জন্য, পাড়ি দেওয়ার পরে যেদিকে যাচ্ছ সেদিকে মাথায় করে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নয়।
আজ আর বলতে দ্বিধা নেই, এই ভূভাগের সন্তান গৌতম বুদ্ধ, যার প্রভাবে আলোকিত জল-বায়ু-মাটি-মানুষ ও সংস্কৃতির এ বাংলাদেশ বেশ একটা ভালো নেই, এখানে আজ মত-পথের ভিন্নতায় ও বহুমাত্রিক কোন্দলে কুলীন হতে উৎগ্রীব নানা শ্রেণি ও গোষ্ঠীর হিংসাপরায়ণ মানুষ। এমন অবস্থায় ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্য ও শান্তির বার্তা বয়ে আনবে। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষার যে শিক্ষা গৌতম বুদ্ধ দিয়েছেন তার চর্চা আমাদের নতুন এক পুলকিত দিগন্ত উন্মোচিত করবে, এমন প্রত্যাশা।
ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রমাণিত সত্য, যেকোনো মহামানবকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচারিত ও রচিত হয় বিচিত্র, বৈচিত্র্য কিংবদন্তি; যা মানুষকে অনেক সময় ওই ব্যক্তি সম্পর্কে শতভাগ মৌলিক ধারণা পেতে কঠিন ও কষ্টসাধ্য করে দেয়। মহান বুদ্ধ সম্পর্কেও এমন অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে লোকমুখে, সাহিত্য ও ধর্মীয় গ্রন্থে। কিন্তু আশার কথা হলো এই, তথাগতের শিক্ষা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারলে সেসব কিংবদন্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেসব থেকে মুক্তি পাওয়ার বীজ বুদ্ধ নিজেই রোপণ করে গেছেন। যেমন- যথার্থ মত দিয়ে অযথার্থ মতের খণ্ডন করা যায়, সেরূপ বুদ্ধকে দিয়েই বোধির অর্জন ও নির্বোধির বর্জন করা একেবারেই সহজলভ্য।
উপরিউক্ত বিষয়ের আলোকে দেখি, যেকোনো প্রকার মুক্তির প্রশ্নে বুদ্ধ ‘কালাম সূত্র’-এ বলেন, ‘যদি উন্নত পথের যথার্থ পথিক হতে চাও, যদি রক্ষিত বিষয় পেতে চাও, জ্ঞানের উন্নতি সাধন করতে চাও, তবে ছাড় শ্রুতির পরম্পরা, ছাড় অন্ধতা, ছাড় বংশানুক্রমিক আগত রীতিনীতির ধারা, ছাড় মিথ্যা ধারণা, অমূলক দৃষ্টি, ছাড় শাস্ত্রোক্তির নির্ভরতা, ছাড় কূটতর্ক ও বাগ্মীতত্ত্ব, ছাড় মতামতের অনড় বালাই, ছাড় শ্রামণ-ব্রাহ্মণের ফতোয়া, ছাড় গুরুমতের দোহাই। আপন বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা, যুক্তি, বিচারের সঙ্গে যা মিলবে না, যা জীবনের জন্য হিতকর বলে বিবেচিত হবে না, তা মেনে নিও না। পরের মুখের ঝাল খেও না, বাহ্যিক রূপে বিস্মিত হইও না, সভ্যতা-ভব্যতায় মানুষের বিচার করো না। শুধু পরমত জেনে, পরের বই পড়ে, শাস্ত্র অধ্যায়ন করে, গুরুমহাশয়ের মুখে মুখে কিংবা দশজন হতে খবর নিয়ে যে জানা তা হলো মাত্র ‘জ্ঞাত পরিজ্ঞান’। জ্ঞানের সীমা অতিক্রমের চেষ্টা ও মীমাংসামূলক যে জানা, তা হলো ‘জ্ঞান পরিজ্ঞান’ অপর সজ্ঞানের প্রভাবে প্রচলিত ভ্রান্ত মত সম্পূর্ণরূপে বর্জনপূবর্ক যে জানা তা হলো প্রহান পরিজ্ঞান’।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগে তথাগত বুদ্ধ আহ্বান করেছিলেন চিত্তের আমূল পরিবর্তনের। তিনি অনুভব করেছিলেন ভেতর থেকে যদি ভালো রকমে পরিবর্তনের সূচনা না হয়, তবে আবেগ আর ক্ষোভের বাহ্যিক পরিবর্তনের স্থায়িত্ব তেমন একটা হয় না। তাই আমাদের ভেতরের সঙ্গে বাইরের, বাইরের সঙ্গে ভেতরের সমন্বয় সাধন করতে হবে জীবন ও জগৎকে আমূল পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য। মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে যতদিন পর্যন্ত আন্তরিক ও সৎ কর্ম-প্রচেষ্টার ভারসাম্য আসবে না, ততদিন পর্যন্ত লৌকিক ও অলৌকিকতার সব প্রার্থনা, স্তব, গাথা আমাদের নিরাশ করে ব্যর্থ হতে থাকবে এবং মানুষের অপার সম্ভাবনা দীর্ঘশ্বাসে প্রত্যহ তলিয়ে যেতে থাকবে ঠাঁইহীন কৃষ্ণগহ্বরে। এখানে স্মরণযোগ্য, বুদ্ধের উপদেশে ব্যক্তি-ভূমিকার সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও বিশ্বজনীন সম্পর্কের যে উপাদান পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি একান্ত ব্যক্তিগত, স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অভ্যন্তরে প্রভূত্বশীলতার উপদানও আকাশচুম্বী, যা থেকে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, ভাবুক মানুষ খুব বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। যেমন- ১. তথাগত বলেছেন, ‘ওহে, তুমিই তোমার নাথ, তাই বণিকের অশ্বের মতো নিজেকে নিজেই সংযত করো, ২. তলোয়ার দিয়ে অসংখ্য রাজ্য জয়ের চেয়ে আত্মজয়ই শ্রেষ্ঠ জয় এবং আত্মজয়ীরাই শ্রেষ্ঠ বীর, ৩. কণ্টকাকীর্ণ পৃথিবী চামড়া দিয়ে আচ্ছাদিত করা না গেলেও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি জানে কীভাবে নিজের পদযুগল আবৃত করে হেঁটে যেতে হয়।’ এ রকম অসংখ্য বাণীতে ভরপুর বুদ্ধের জীবনদর্শন, যা হাজার হাজার বছর ধরে আলো ছড়াচ্ছে বিশ্ব-ভূলোকে।
আজ সেই মহান মানবতাবাদী ও মানবধর্মের প্রবর্তক তথাগত বুদ্ধকে ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমায় বিনম্র শ্রদ্ধা ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনোলোকে পূজিত শ্রেষ্ঠ মানবের প্রতি প্রণাম জানাচ্ছি কবি গুরুরই ভাষায়: ‘আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি, আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি। এ কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের উপকরণগত অলংকার নয়, একান্তে নিভৃতে যা তাকে বারবার সমপর্ণ করেছি, সেই অর্ঘ্যই আজ এখানে উৎসর্গ করি। একদিন বুদ্ধগয়াতে গিয়েছিলাম মন্দির দর্শনে, সেদিন এই কথা আমার মনে জেগেছিল–যার চরণ স্পর্শে বসুন্ধরা একদিন পবিত্র হয়েছিল, তিনি যেদিন সশরীরে এই গয়াতে ভ্রমণ করেছিলেন, সেদিন কেনো আমি জন্মাইনি, সব শরীর-মন দিয়ে প্রত্যক্ষ তার পুণ্যপ্রভা অনুভব করিনি? তখন আবার এই কথা মনে হলো যে, বর্তমানকালের পরিধি অতিসংকীর্ণ, সদ্য উৎক্ষিপ্ত ঘটনার ধূলি-আবর্তে আবিল, এই অল্প পরিসর অস্বচ্ছ কালের মধ্যে মহামানবকে আমরা পরিপূর্ণ করে উপলব্ধি করতে পারিনি, ইতিহাসে বারবার তার প্রমাণ হয়েছে। বুদ্ধ দেবের জীবিতকালে ক্ষুদ্র মনের কত ঈর্ষা, কত বিরোধ তাকে আঘাত করেছে; তার মাহাত্ম্য খর্ব করবার জন্য কত মিথ্যা নিন্দার প্রচার হয়েছিল। কত শত লোক যারা ইন্দ্রিয়গতভাবে তাকে কাছে দেখেছে, তারা অন্তরগতভাবে নিজেদের থেকে তার বিপুল দূরত্ব অনুভব করতে পারেনি, সাধারণ লোকালয়ের মাঝখানে থেকে তার অলৌকিকত্ব তাদের মনে প্রতিভাত হওয়ার অবকাশ পায়নি। তাই মনে করি, সেদিনকার প্রত্যক্ষ ধাবমান ঘটনাবলির অস্পষ্টতার মধ্যে তাকে যে দেখিনি সে ভালোই হয়েছে।’...
এমন একটি নষ্ট সময়ে আমরা ভগবান বুদ্ধকে তার জন্মজয়ন্তীতে স্মরণ করতে যাচ্ছি, যে সময়ে মানুষ ধর্মের নামে উন্মাদনা, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধ্বংসযজ্ঞ, আত্মঘাতী হয়ে মানুষ হত্যা এ যেন পশুত্বকে বরণ করে মানবিকতার বিলোপসাধন। হত্যা, গুম, অপহরণ, যা মানুষের মানবিকতা বিলোপ করে, পুশুত্বকে বরণ করা। ধর্মের আসল উদ্দেশ্য মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশে কাজ করা। তা না করে বিপরীত কাজে ধর্মকে কলুষিত করছি। সভ্যতাকে পিছিয়ে দিচ্ছি। এ নষ্ট সময়ে আমরা নিজেকে সমর্পণ করতে পারি বুদ্ধের মৈত্রী করুণা মুদিতা উপেক্ষার কাছে। গ্রহণ করতে পারি তার সর্বজনীন প্রেমের বাণী- ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’।
লেখক: সম্পাদক, সৌগত ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, ঢাকা
[email protected]

