অ্যারোস্পেস পাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা কেবলমাত্র একটি বিশেষ বাহিনী দ্বারা সম্ভব নয়। এ পাওয়ারের মধ্যে বিজ্ঞানের এক অপরিসীম শক্তি নিহিত। সে শক্তিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি শিক্ষার সাফল্যে রূপান্তরিত করতে হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।...

‘Aerospace Power’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো মহাকাশ ও বিমান শক্তি। সহজ অর্থে, এটি আকাশ এবং মহাকাশ ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতাকে বোঝায়। আবার জাতীয় সামরিক প্রতিরোধের সহজ ও বোধগম্য ইংরেজি রূপান্তর হলো National Military Deterrence.
অধুনা একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রোহিঙ্গাসংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান শক্তির ব্যবধানকে (Gap) কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার কথার সারমর্ম হলো, বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হলে কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা যেত। কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর স্থাপনায় যে আক্রমণ হয়েছিল তার জন্য প্রয়োজন ছিল সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখার- স্থল, নৌ এবং বিমানের মধ্যে সমন্বিত একতা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী যাতে শক্তিশালী হয়, তার জন্য প্রয়োজন জনসাধারণের একনিষ্ঠ সমর্থন। এ সমর্থনকে কখনো বিঘ্নিত করা যাবে না।
সেনাপ্রধানের এ বক্তব্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অত্যন্ত চাক্ষুষ প্রমাণ আমরা লক্ষ্য করেছি পাকিস্তান-ভারতের ২০২৫ সালের যুদ্ধে এবং চলমান ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে।
পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের অবতারণা হয় ভারতের আকাশ পথে পাকিস্তানের তথাকথিত জঙ্গি ঘাঁটিগুলোতে মিসাইল আক্রমণের মধ্যদিয়ে। ৭ মে যুদ্ধের প্রথম দিনে পাকিস্তান তার বিরোধী বিমান আক্রমণে ভারতের বেশ কয়েকটি ফ্রান্স থেকে সম্প্রতি ক্রয়কৃত পঞ্চম প্রজন্মের রাফায়েল বিমান ধ্বংস করে। অন্যদিকে ভারতের আকাশ এবং মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হওয়ায় যুদ্ধের শেষ দুই দিন পাকিস্তানকে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এ যুদ্ধে কোনো পক্ষের জয় হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে না। কিন্তু একটি ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, যুদ্ধ পরিচালনায় সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখার মধ্যে ছিল দৃষ্টান্তমূলক একতা। এই একতার কথা বলতে গিয়ে সেনাপ্রধান স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অকার্যকারতার মধ্যেও সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনী তাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং পেশাদারত্ব বজায় রেখে জাতীর মেরুদণ্ড হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। আমার মনে হয়, সেনাবাহিনীর এ ভূমিকাকে অত্যন্ত বড় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির জন্য বিমান বাহিনীর ক্ষমতার ব্যাপকতা এবং সার্থকতার দিকেই ইঙ্গিত করে। ফিল্ড মার্শাল মন্টোগোমারি একজন সেনা নায়ক হওয়া সত্ত্বেও বিমান বাহিনীর এই ক্ষমতাকে তার স্থলবাহিনীর শক্তি হিসেবেই গণনা করতেন। Air Power যে, যুদ্ধের এক নতু এবং অভিনব দিক, তা তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামরিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতেন।
শক্তিশালী বিমান বাহিনীর গুরুত্ব ইতিহাসে ইদানীং সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাবে ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিমান বাহিনীর অদম্য ব্যবহারের মধ্যদিয়ে। ১৯৪৮ সালের কথা; কেবলমাত্র ইসরায়েল স্বাধীন হয়েছে। ইসরায়েলের প্যালেস্টাইন ভূমিতে এই নতুন রাষ্ট্র পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তে প্রতিষ্ঠার কারণে মুসলিম বিশ্ব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত। এর প্রতিবাদে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব থেকে মাত্র ১৭ মাইল দূরে, তখন ইসরায়েলের বিমান বাহিনী তার দুঃসাহসী বিমান আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে সমগ্র মিসরীয় একটি সেনা ডিভিশনকে সম্পূর্ণরূপে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয়েছিল। ইসরায়েল চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে প্রাপ্ত চারটি মাত্র এভিয়া এস-১৯৯ ফাইটার দিয়ে মিসরের সাতটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, আর্টিলারি এবং শতাধিক সামরিক যানকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করে। অথচ ইসরায়েলের ফাইটার বৈমানিক প্রত্যেকই তখন পর্যন্ত ছিলেন যথেষ্ট অনভিজ্ঞ এবং সাময়িক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু তাদের সেই বিজয় আজ পর্যন্ত ইসরায়েলের ইতিহাসে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনস্বীকার্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ইসরায়েলের বিমান বাহিনী যদি সেদিন পরাভূত হতো, ইহুদিদের ইতিহাস আজ বোধ হয় অন্যরকম হতো।
পরবর্তীতে মিসরের ওপর ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল প্রতিশোধ নিল। এবারও মিসরের তথা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠল ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। ১৯৬৭ সালের এ যুদ্ধ Six Day Arab-Israeli War হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত। এ যুদ্ধের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর অসামান্য সাফল্য। প্রথম দুই দিনের মধ্যেই আরব রাষ্ট্রগুলোর বিমান বাহিনীগুলোকে অকার্যকর করে ফেলা হয়। পরে বিমান বাহিনীর সহযোগিতায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জর্ডানের পশ্চিম তীর, মিসরের গাজা ও সানাই উপত্যকা এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। ১৯৭৩ সালেও প্রথম দিকে আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জনে সক্ষম হলেও, চূড়ান্ত পর্যায়ে ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের কারণে যুদ্ধাবসানে সম্মত হতে বাধ্য হয়। একইভাবে বর্তমানের যে যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে লিপ্ত, তাতে ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর অপারেশনাল শক্তি ইরানের সঙ্গে অতুলনীয়। রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর তিন বছরেরও অধিককাল যুদ্ধে আকাশে আধিপত্য Air Superiority অর্জন করতে পারেনি, অথচ ইসরায়েল সে সক্ষমতা অর্জন করেছে মাত্র চার দিনের মধ্যে। এ অর্জন আরও বেশি বিস্ময়কর দেখাচ্ছে। কারণ, ইরানের রাজধানী তেহরান ইসরায়েল থেকে প্রায় ১০০০ মাইল দূরে অবস্থিত। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে, ইসরায়েলের আকাশ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছিল প্রণিধানযোগ্য। এ যুদ্ধে ইরানের ৪৯টি সামরিক বিমানের বিপরীতে ইসরাইলের মাত্র ১৮টি ভূপাতিত হয়েছে। যুদ্ধে ইরানের ছিল ২১টি ফাইটার বিমান, অথচ ইসরায়েলের একটি ফাইটার বিমানও ইরান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইরানের কাছে যদি ইসরায়েলের মতা অত্যাধুনিক ফাইটার বিমান থাকত, তাহলে ইসরায়েল ইরান আকাশ সীমায় একচেটিয়া আধিপত্য অর্জনে সক্ষম হতো না এবং ইরানের ভৌতিক অবকাঠামো এবং জনসংখ্যার মৃত্যু বিমান হামলার কারণে এত বেশি হতো না। ইরানের পক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০০ জন এবং ইসরায়েলের পক্ষে মাত্র ২৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনী রাষ্ট্রের মানুষের জীবন রক্ষার জন্য একটি অদ্বিতীয় হাতিয়ার।
সেনাপ্রধান বাংলাদেশের জলসীমানার নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন। সুনীল অর্থনীতির কথা ইদানীং প্রায়শই শোনা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ রণকৌশল যেকোনো দুর্বল নৌবাহিনীর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আলোকে অকার্যকর এবং ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশের নৌবাহিনী যে এই বিশাল সমুদ্রসীমার নজরদারির জন্য অপরিহার্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অধিকন্তু আকাশ থেকে নৌ-সীমানার উপ-পৃষ্ঠ অঞ্চলের তথ্যাদি অনুসন্ধান করে বের করার জন্য প্রয়োজন বিমান বাহিনীর সার্ভেল্যান্স বিমানের সহায়তা। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীকে একটি ইকো-ব্যবস্থাপনার কাঠামো হিসেবে দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় তিন বাহিনীর মধ্যে ঐক্য থাকার কারণেই বিপ্লব-পরবর্তী গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ সম্ভবপর হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী বলতে গেলে সাধারণত আমরা মনে করি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যাদের যুদ্ধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা প্রদান করা ব্যতীত অন্য কোনো দায়িত্ব নেই। অথচ এ ধারণা ভুল। সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিচার করলে দেখা যাবে যে, এ প্রতিষ্ঠানটির তিনটি দর্শনগত ভূমিকা রয়েছে। প্রথম দিকটি তার পেশাগত কার্যকারিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র এবং জনসাধারণের মধ্যে সম্পর্ক। সামরিক সংস্কৃতিকে আমরা সর্বদা সিভিলিয়ান সংস্কৃতি থেকে পৃথক করে দেখি। Military Is A Way Of Life বলতে প্রবাদ বাক্যটি এখন সর্বস্বীকৃত স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু সামরিক সদস্যরা বৃহত্তর সিভিলিয়ান সমাজেরই একটি অংশ। এই বিরাট সিভিলিয়ান সমাজের সার্বভৌমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সশস্ত্র বাহিনীর অলঙ্গনীয় দায়িত্ব। তৃতীয় দর্শনগত দিক হলো বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ক স্থাপন করা। যে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সঙ্গে যত নিবিড় হবে, সে রাষ্ট্রের জ্ঞান আহরণের অভীপ্সা তত প্রখর হবে। জাতীয় সামরিক প্রতিরোধের প্রকৌশল প্রণয়নে বিজ্ঞানের প্রতিভূ কোনো বিকল্প নেই। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চাকে সর্বত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালনা না করতে পারলে সামরিক শিক্ষার যে সিভিলিয়ান মূল্য রয়েছে তা থেকে আমাদের যুবসমাজকে উপকৃত করতে ব্যর্থ হবে। আমরা দেখেছি যে, ইসরায়েল, ইরান এবং পাকিস্তান কীভাবে তাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিজস্ব প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানচর্চার মননশীলতা বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় সামরিক প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি করেছে।
আমরা এ লেখা আরম্ভ করেছিলাম অ্যারোস্পেস পাওয়ারের কথা দিয়ে। এ পাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা কেবলমাত্র একটি বিশেষ বাহিনী দ্বারা সম্ভব নয়। এ পাওয়ারের মধ্যে বিজ্ঞানের এক অপরিসীম শক্তি নিহিত। সে শক্তিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি শিক্ষার সাফল্যে রূপান্তরিত করতে হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: ডিস্টিংগুইসড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত


