ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান, বাণিজ্য–বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দিনাজপুরে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ ফি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মানববন্ধন চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ শরীয়তপুরে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়: ইসি সচিব বোয়ালমারীতে শতবর্ষী কালী মন্দিরে ভাঙচুর চাঁদাবাজির অভিযোগে সোনারগাঁওয়ের এমপি পুত্র সজীব আটক প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান মাদারগঞ্জে বজ্রপাতে এক বৃদ্ধের মৃত্যু ‘কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নিচ্ছেন’ আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ যুদ্ধবিরতির পথে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংলাপ শুরু জেনেভায় সিলেটে টানা বৃষ্টি, বন্যার শঙ্কা পাউবোর বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা গাজীপুরে নিষিদ্ধ আ. লীগের বিক্ষোভ মিছিল প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি! ১০ দফা দাবিতে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের মানববন্ধন সোমবার মোহভঙ্গের বাংলাদেশ: যখন বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে অরণ্যের অন্ত্যজ কথা বরিশালে গ্রেপ্তার এড়াতে ছাদ থেকে পড়ে আ. লীগ নেতার মৃত্যু

শিশুরা কি আসলেই জাতির ভবিষ্যৎ?

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
শিশুরা কি আসলেই জাতির ভবিষ্যৎ?
রেজানুর রহমান

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ এটা কি শুধুই কথার কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিশুস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। উন্নত দেশে শিশুদের ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর আমাদের দেশে শিশুরাই সবচেয়ে অবহেলিত।...

মাত্র তিনটি ঘটনা উল্লেখ করি। এক. ফাতিমা আর খাদিজা। দুই বোন। হামে আক্রান্ত ফাতিমা মারা গেছে। খাদিজা ভর্তি আছে নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে। হামে আক্রান্ত যমজ মেয়েদের নিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাবা-মা ছুটছেন হাসপাতালে। ফাতেমা মারা যায় ২৩ এপ্রিল। খাদিজার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় বাসায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দুই. এরাও যমজ। রাইসা ও রুমাইসা। ফরিদপুরের বাসিন্দা। ফরিদপুরে পিআইসিইউ নেই। তাই দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন বাবা-মা। সকালে ফরিদপুর সদর হাসপাতাল থেকে তারা ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছান। বেলা ১১টার দিকে রাইসা মারা যায়। দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় দুই সন্তানকে কোলে নেওয়া অবস্থায় অসহায় বাবা-মায়ের ছবি ছাপা হয়েছে। খবরের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যমজ সন্তান কোলে মা-বাবা, একটি মৃত, অনটি অসুস্থ!’ 

তিন. রোগীর চাপ বেশি। কোনো হাসপাতালেই সিট খালি নেই। বাধ্য হয়ে একটি হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে শিশু আব্দুল্লাহর চিকিৎসা চলছে। একই পরিবারের আরেকটি শিশুর নাম আলিফ। তাকে ভর্তি করা হয়েছে অন্য একটি হাসপাতালে। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি অটোরিকশাচালক সাইফুল ইসলাম রাজধানীর কামরাঙ্গীচর এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। প্রচার মাধ্যমে সাইফুল বলেছেন, ছোট ছেলের অবস্থা ভালো নয়। সারা শরীরে ফুসকুড়ি বেরিয়েছে। ঠোঁট ও মুখের অবস্থা করুণ। মুখের ফুসকুড়ি ফেটে ঘা হয়েছে। শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। অক্সিজেন ছাড়া শ্বাস নিতে পারছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ, জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নিতে হবে। আইসিইউ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে মেঝেতে রেখে মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সাইফুল বললেন, আমি গরিব মানুষ। সন্তানদের চিকিৎসার জন্য টাকা জোগাড় করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহ জানেন আমাদের ভবিষ্যৎ কী? 

চার. সাত হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না ছোট্ট শিশু সাজিদকে। ১৪ এপ্রিল সাজিদ জ্বর, সর্দিকাঁশিতে আক্রান্ত হয়। প্রথমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে সাজিদকে নেওয়া হয়। পরে ফেনীর একটি হাসপাতালে নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় আনা হয়। একে একে সাতটি হাসপাতালে নেওয়ার পরও সাজিদকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।

এ পর্যন্ত সারা দেশে হামে আক্রান্ত প্রায় ৫০০ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। বাবা-মায়েরা অসহায় চোখে ছোট ছোট সন্তানদের করুণ মৃত্যু দেখেছেন, এখনো দেখছেন। চোখের সামনে ছেলেমেয়েদের মৃত্যু হচ্ছে। কারও কিছুই করার নেই। জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। তাই বলে এমন করুণ মৃত্যু কি মেনে নেওয়া যায়? কারও অযত্ন, অবহেলায় শিশুদের এমন অসহায় করুণ মৃত্যু হচ্ছে না তো? আসলে যার যায় সেই বোঝে ক্ষতিটা কেমন? সেজন্যই বোধকরি এত শিশুর মৃত্যুর পরও উচ্চপর্যায়ে তেমন হইচই, টেনশন, উদ্বেগ উত্তেজনা চোখে পড়ছে না।

শিশুদের অকাল মৃত্যু তাহলে কি গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল? তা না হলে এই যে প্রতিদিন হামে এত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, এর পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? প্রতিদিনই প্রচারমাধ্যমে শিশুদের করুণ মৃত্যুর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে। আহা! উহু করছেন অনেকে। কিন্তু হামের বিস্তার রোধে এখন পর্যন্ত সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। শিশু সন্তান যে কোনো পরিবারের ‘সাত রাজার ধন’। একটি পরিবারকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতে একজন শিশুর উপস্থিতিই যথেষ্ট। সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ, একজনের কোল থেকে অন্যজনের কোলে বিচরণ। ছোট হাত, ছোট মুখে কী যে মায়া। একজন শিশুই পরিবারের সবাইকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম। হঠাৎ যখন শিশুটি হারিয়ে যায় তখন তার পরিবারের ওপর পাহাড়সম মানসিক যন্ত্রণা ও করুণ হাহাকার ভর করে।

হামে আক্রান্ত প্রায় ৫০০ শিশুর করুণ মৃত্যু আমাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে। অথচ এ ব্যাপারে কার্যত: কাউকেই জবাবদিহি করা হয়নি। দেশে টিকা সংকট ও হামে শিশু মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রচারমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সরকার বলছে, হামের টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউনিসেফ এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নিশ্চুপ। শুধু এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সহ স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, বিভিন্ন মহল থেকে এই দাবি তোলা হলেও কার্যত এই দাবি অনেকটাই উপেক্ষিত।

হামে আক্রান্ত শিশুদের করুণ মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ এটা কি শুধুই কথার কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিশুস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একবার সিঙ্গাপুরের রাস্তায় দেখলাম রাস্তা পার হবে একটি শিশু। ট্রাফিক পুলিশ তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শিশুটি যতক্ষণ না রাস্তা পার হলো ততক্ষণ রাস্তায় গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকল। উন্নত দেশে শিশুদের ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর আমাদের দেশে শিশুরাই সবচেয়ে অবহেলিত। সরকার বদল হলে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকের ভাষা বদল হয়। দেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের স্কুলে খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদে শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রগুলো বেশ নড়বড়ে। হামে এ পর্যন্ত যত শিশুর মৃত্যু হয়েছে তারা অধিকাংশই মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দা। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে তাদের মৃত্যু নিয়ে ওপর মহলের বোধকরি তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। উদাহরণ টানতে গিয়ে একজন মনোবিদ বললেন, হামে গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকার কোনো শিশু যদি মারা যেত তাহলে প্রতিক্রিয়াটা অন্যরকম হতো। দুর্ভাগ্য, এই দেশে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ধনী ও গরিব পরিবারের বিভাজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হামে শিশুদের করুণ মৃত্যুর কথা যখন লিখছি তখন চোখের সামনে ভাসছে পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণকারী আরেক অসহায় শিশু রামিসার মুখ। শুধু দেশে নয়, গোটো বিশ্বে রামিসার মৃত্যু নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ আসলে কী? উত্তর কার কাছে খুঁজব?       

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

কে কাকে শক্তি জোগায় বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়
আনু মুহাম্মদ

দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে।...

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচির নামে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পরিচালিত সন্ত্রাস, দখল, যুদ্ধ, গণহত্যা ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ‘বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর’ শিরোনামে যৌথভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন। এগুলো হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল’।

এ রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষা থেকে দেখানো হয়েছে–এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এখনো আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি, প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে প্যালেস্টাইনে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যা অব্যাহত আছে।

২০০১-এর আগে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আল-কায়েদা বা তালেবান ধারার কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। একপর্যায়ে এ অঞ্চলে বিরাট জৌলুস নিয়ে আবির্ভূত হয় আইসিস। যারা তাদের ভাষায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে তারা যেন আচমকা হাজির হয়। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করে। তবে কখনোই ইসরায়েলে হামলা করেনি। তারা আরও বিভিন্ন দেশে একের পর এক মুসলমানসহ ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী মানুষদের আক্রমণ করতে থাকে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করে বীরত্ব দেখাতে থাকে। হঠাৎ  করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয়ের কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়ার ফলে এ দেশগুলোর মানুষকে নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিন পক্ষ–সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের আসল অপরাধ স্বৈরশাসন ছিল না, ছিল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিল। সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই তাদের ওপর গোস্বা ছিল। গাদ্দাফি জীবনের শেষপর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে কথিত পুঁজিপন্থি কিছু সংস্কারের পথে গেলেও তার বড় অপরাধ ছিল সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফি সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভাড়াটিয়া উগ্রপন্থিদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদের কাছে সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদি আরব-ইসরায়েল অক্ষের বিরোধিতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য সে কারণে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদি-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইসরায়েলকে শক্তি জোগানো এবং ইরানকে কাবু করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র জোগানের ওপর ভর করেই এসব উগ্রপন্থি গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিসের পেছনে তাদের ও মিত্র দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলারসহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেলেন। পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী তথ্য যুক্তি দিয়ে সঠিকভাবেই দেখান যে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় মৌলবাদ, সব মৌলবাদের জন্মদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথাগত বিচারে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র অনেক দিকই চিহ্নিত করা যায়। যেমন–অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, সড়ক পথের বিস্তার ঘটেছে অনেক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়, আমদানি-রপ্তানি দুটোই বেড়েছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গার্মেন্টস বড় সাফল্য তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল মজুত তৈরি করেছে, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও মডেল অনেক বিস্তৃত হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, মোবাইল ইন্টারনেট শহর-গ্রামে যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে পেশাগত ও অর্থনৈতিক নতুন নতুন সুযোগ বেড়েছে, জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অনেক; যদিও মানুষের যথেষ্ট এবং নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হয়নি। মানুষের সচলতা বেড়েছে।

এ সমৃদ্ধির গতি ও ধরনের কারণে প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হয়েছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এর সামাজিক ও পরিবেশগত খেসারতও বেশি। নদীনালা, খালবিল, বন শিকার হয়েছে দখল ও বিপর্যয়ের। বৈষম্য বেড়েছে। এ সময়কালেই দেশে একটি অতি-ধনিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত চোরাই টাকার মালিকদের বিত্ত এবং দাপট বেড়েছে বহু গুণ। ঢাকা শহরে এখন একই সঙ্গে বিত্তের জৌলুস এবং দারিদ্র্যের নারকীয়তা দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে। চোরাই কোটিপতির সংখ্যা যখন বেড়েছে তখন মাথাগণনায় দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা বা কোনোভাবে টিকে থাকার আয়সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা চার কোটির বেশি। যদি দারিদ্র্যসীমায় শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই অমানবিক জীবনে আটকে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যতসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। দেশে তাদের কর্মসংস্থান নেই। বিদেশেও তাদের জীবন ও জীবিকা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। অন্যদিকে এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ হলেও তা কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক ও নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।

কয়েক দশকে নারীর দৃশ্যমান সচলতা স্পষ্টতই অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই নারী। শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও উপার্জনমুখী কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। গ্রাম-শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের শিশু ও নারীর অবস্থা তুলনায় আরও বেশি নাজুক। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করা, নারী ও শিশু পাচারের সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে একদিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর জৌলুস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিভীষিকা, একদিকে সম্ভাবনার বিকাশ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি দখলদারদের দাপটে জননিরাপত্তার বিপর্যয় একটি নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশকে নিক্ষেপ করেছে। দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে। তাদের বর্ম হিসেবেই ধর্ম ও ধর্মপন্থি গোষ্ঠী ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতাও এ সময়ে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়?
এস এম নাজের হোসাইন

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।...

নিত্যপণ্যের বাজারে গেলে অনেক দোকানে দেখা যায় বড় বড় ড্রামে ভরা খোলা ভোজ্যতেল। ক্রেতা-ভোক্তারা ছোট বোতল বা পাত্র নিয়ে আসেন, দোকানি ড্রাম থেকে মেপে তেল ঢেলে দেন। অনেকের কাছে এটি স্বাভাবিক দৃশ্য। একজন নিম্নআয়ের মানুষ যখন খোলা তেল কিনছেন, তখন তার প্রধান চিন্তা থাকে, ‘কম দাম’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি যে দাম দিয়েই তেল কেনেন না কেন, সেটা আদৌ নিরাপদ কি না, তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বা ভিটামিন আছে কি না, কিংবা সেটি যে ড্রামে সংরক্ষণ করা হয়েছে তা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত, এসব জানার কোনো সুযোগই তার নেই।

বাংলাদেশে ভোজ্য তেল প্রতিদিনের পুষ্টি চাহিদার এক অপরিহার্য উৎস। অথচ যে তেল মানুষের শরীরে শক্তি ও পুষ্টি জোগানোর কথা, সেটাই এখন স্বাস্থ্য বিপন্নের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভোজ্য তেলের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে খোলা ড্রামের তেল। এসব তেল পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয় পুরোনো নন-ফুডগ্রেড প্লাস্টিক ড্রাম, অনেক আগেই যেগুলো রাসায়নিক, লুব্রিকেন্ট বা শিল্পকারখানার অন্যান্য পদার্থ বা কাঁচামাল বহনে ব্যবহৃত হয়েছে। পরে সামান্য ধুয়ে মুছে সেই একই ড্রামে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত তেল বাজারজাত করা হচ্ছে। এই প্লাস্টিক ড্রাম পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের ফলে ভোজ্য তেল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো এটি কি শুধু অব্যবস্থাপনা, নাকি সরাসরি ভোক্তার জীবনের সঙ্গে প্রতারণা?

এখানেই ভোক্তার অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ ভোক্তারা প্রতিদিন এমন একটি বাজারব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে পণ্যের মান, উৎস, সংরক্ষণ পদ্ধতি কিংবা পুষ্টিগুণ, কোনোটিই নিশ্চিত নয়। খোলা তেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এতে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে এবং সেই ভেজাল শনাক্ত করাও কঠিন। ভোজ্য তেলের এসব ড্রামে কোনো প্রকার লেবেল এবং উৎস শনাক্তকরণ তথ্য না থাকায় তেল সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ তেল কিনছেন ও ব্যবহার করছেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ খোলা তেলে মিলছে না প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা ভোজ্য তেলের ৫৯ শতাংশ নমুনায় ভিটামিন ‘এ’ অনুপস্থিত। এক-তৃতীয়াংশ নমুনায় প্রয়োজনের তুলনায় কম ভিটামিন পাওয়া গেছে। মাত্র ৭ শতাংশ নমুনা সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ ভোক্তা টাকা দিয়ে এমন একটি পণ্য কিনছেন, যা আইন অনুযায়ী মানসম্মত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। যে তেল মানুষের পুষ্টির ঘাটতি কমানোর কথা, সেটাই উল্টো অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের (গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নয়) মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় খোলা তেলের নামে পুষ্টিহীন পণ্য বাজারে চলতে দেওয়া মানে জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। ‘‘ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩” অনুযায়ী ফুডগ্রেডবিহীন প্যাকেজিংয়ে তেল বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকার বিভিন্ন সময়ে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের কড়া নির্দেশনা জারি করলেও মাঠপর্যায়ে এই সিদ্ধান্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ ভোক্তারাই ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈষম্যও স্পষ্ট। দরিদ্র মানুষ খোলা ভোজ্য তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অর্থাৎ অনিরাপদ তেলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সমাজের অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। একটি দরিদ্র পরিবার দাম দিয়ে তেল কিনলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যহানি, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আকাশচুম্বী চিকিৎসা ব্যয়ের মাধ্যমে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন।

এই চক্রাকার সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নীতিমালার বাস্তবায়ন। প্রথমত, অস্বাস্থ্যকর ও নন-ফুডগ্রেড ড্রামে ভোজ্য তেল পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারে প্রাপ্ত সব তেল ফুডগ্রেড বোতল, পাউচ বা নিরাপদ প্যাকেজিংয়ে বাজারজাত বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, বাজার তদারকি, ল্যাব টেস্ট এবং উৎস শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তাদের মধ্যে অনিরাপদ খোলা তেল ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরতে বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আর এ লক্ষ্যে সরকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিতভাবে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। ভোক্তার অধিকার নিয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে, কারণ ভোক্তার স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সে তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই এখনই সময় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্য তেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল নিশ্চিত করার। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা কখনো বড় হতে পারে না।

লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) 
[email protected]

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন
ড. খলিলুর রহমান

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।...

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা, প্রকাশ্যে অপমান এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো আবারও একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গণপিটুনি ও জনতার বিচার (মব জাস্টিস) ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়; বরং এগুলো এমন এক দায়মুক্তির সংস্কৃতির লক্ষণ, যা ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন রূপে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যে, কত ঘন ঘন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, আইনবহির্ভূত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয়, লিঙ্গ, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, কোনো নাগরিককে জনতা, স্বঘোষিত ন্যায়বিচারক বা আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ব্যক্তিদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনানুগ প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রসিকিউটর মামলা পরিচালনা করবেন এবং আদালত নির্ধারণ করবেন কে দোষী আর কে নির্দোষ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে না।

বিশেষ করে গত ১৮ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় নারীদের ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে কোন আইনের বলে একজন সাধারণ নাগরিক অন্য কাউকে প্রকাশ্যে আটকে রাখতে, আক্রমণ করতে বা অপমান করতে পারেন? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ: এমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

যখন এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে এবং বারবার ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অনিবার্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে–বাংলাদেশ কি এখনো আইন দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান এবং জনতার শক্তির মাধ্যমে?

এই বিপজ্জনক প্রবণতার প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ নারীর ক্ষমতায়ন, কন্যাশিশুর শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্জনগুলো এ ধরনের সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ও।

বাংলাদেশ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এবং শিশু অধিকার সনদের (CRC) সদস্য রাষ্ট্র। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের সহিংসতা, বৈষম্য, নির্যাতন, শোষণ এবং অবমাননাকর আচরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) সদস্য এবং জাতিসংঘ সনদের সেই মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ, যা মানবিক মর্যাদা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।

অতএব, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সাংবিধানিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করা, শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়া এবং রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো জনতানির্ভর আইন প্রয়োগের সংস্কৃতির দৃশ্যমান স্বাভাবিকীকরণ। বহু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা নাগরিকরা হয়রানি, হুমকি, হামলা এবং প্রকাশ্যে অপমানের শিকার হয়েছেন। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটবে। কিন্তু সে প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসনের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের মতো নয়, এ সরকার জনগণের ভোট থেকে সরাসরি বৈধতা অর্জন করেছে। ফলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

অতএব, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যেকোনো ঘটনায় সরকারকে দ্রুত, দৃঢ় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা মতাদর্শগত সহানুভূতি নির্বিশেষে অপরাধীদের আদালতের মুখোমুখি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো প্রায়ই ঢাকাস্থ বিভিন্ন পশ্চিমা দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। প্রকাশ্য বিবৃতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উদ্বেগ প্রকাশ ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর অনেক বাংলাদেশি লক্ষ্য করেছেন, পরিস্থিতির প্রতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। নারী নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং অন্যান্য কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা একই ধরনের দৃশ্যমান উদ্বেগ বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পায়নি। বিশেষ করে কূটনৈতিক মহলের কিছু অংশ, ঢাকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার প্রতিনিধির নীরবতা অনেকের দৃষ্টিতে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে–বিশেষ করে ইউনূস প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক হোক বা না হোক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে এটি বৈধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা এর সর্বজনীনতার ওপর নির্ভর করে। ক্ষমতায় যারাই থাকুক, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিন্দিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর হামলা সরকারপক্ষ, বিরোধী দল কিংবা নাগরিক সমাজ–যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মানবাধিকার তখনই নৈতিক শক্তি হারায়, যখন তা পক্ষ বাছাই করে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের নেতাদের সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা কখনোই দলীয় বা রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে না।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস, জনস্বাস্থ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এসব অর্জন ধরে রাখতে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা নির্বাচনি বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং সব নাগরিকের সমান সুরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার।

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যতের দাবিদার, যেখানে কোনো নারী প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ভয়ে থাকবে না, কোনো শিশু সহিংসতার শিকার হবে না, কোনো নাগরিক যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি পাবে না এবং কোনো সরকার–নির্বাচিত বা অনির্বাচিত–জবাবদিহি এড়াতে পারবে না।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হোক। দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান হোক। বাছাই করা মানবাধিকার চর্চার অবসান হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব, সাবেক জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি

মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়
সোনিয়া তাসনিম

শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য...

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ২০২৪-২০২৫ অনুযায়ী, সে সময়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে শিক্ষার ব্যয়ের অঙ্ক ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বাংলাদেশি টাকায় ব্যয়কৃত ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ ব্যয়ের অর্থের পরিমাণ, হাজার ৭৯ কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ১২২ টাকা হিসাবে) চমকে গেলেন? এত দ্রুত চোখ গোলাকার করলে হবে না কারণ, কেবল বিশাল ব্যয় নয়, সংখ্যার দিক থেকেও এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের মেধা বগলদাবা করে পাড়ি জমাচ্ছে দূরদেশের পথে

আপাতদৃষ্টিতে একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যায় কারণ, অ্যামাজন, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কর্মীর সংখ্যা যেখানে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সেটা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গর্ব তবে এই অহমের তাজকে ছুঁয়ে দিতে আমরা কি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বিশাল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? যদি হয়েও থাকি তবে কেন?

গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, ব্যক্তিগত উন্নতির আকাঙ্ক্ষার এই আনন্দযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের উন্নয়নের পথে বিশাল হুমকি পরিস্থিতি বিচারে একে আমরা বলতে পারি মেধা পাচার যা নীরবে বয়ে আনতে পারে জাতীয় জীবনের জন্য এক গভীর বিপর্যয়

যদি কোনো তরুণকে প্রশ্ন করা হয়, কেন সে বিদেশে পড়তে আগ্রহী? তাহলে চটজলদি অনেক বিষয় আমাদের সামনে চলে আসবে একজন মেধাবী ছাত্রের কাছে এখন বিদেশ পাড়ি দেওয়া কেবল উচ্চশিক্ষা লাভ নয়, পাশাপাশি যে বিষয়গুলো তাকে এই পদক্ষেপে আগ্রহী করে সেগুলো হলো, সম্মানজনক পরিবেশ তথা নিরাপত্তা, যোগ্যতার মূল্যায়ন, দক্ষতার সঠিক ব্যবহার মূলত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, একজন তরুণকে যখন ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও লম্বা সময় ধরে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেরাতে হয় এবং তার যোগ্যতার বিপরীতে লবিং সংস্কৃতি জোড়ালো হয়ে ওঠে, তখন দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মক্ষেত্র নির্বাচনে সে স্বভাবতই হতাশ হয়ে পড়ে

মূলত, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে উন্নয়ন হয়নি শিক্ষার মানসহ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গুণগত দক্ষতা বর্তমানে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে হারে বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার নীতিমালা এর গুণগত মান

পড়াশোনার পরিবর্তে শিক্ষালয়গুলো অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চামহলের আঁকড় হয়ে উঠছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব, গেস্টরুম কালচার, ভিন্নমত দমনএমন সব বিষয় রীতিমতো এখন অভিভাবক থেকে শিক্ষার্থীমহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মেধার বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের নৈতিক জায়গা থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে কেউ প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কিছু ভাবতে গেলে তাকে প্রতিহত করা হচ্ছে, যার কারণে একজন প্রকৃত মেধাবী ক্রমশ এটি অনুধাবন করে, যেখানে ট্রেন্ডিং কাঠামো উপস্থিত, সেখানে নিজেকে প্রমাণ করা সম্ভব নয় আর এই ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতাই তাকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভিন্ন ভাবনায় ধাবিত করতে বাধ্য করে

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোভাবে পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করেও দুশ্চিন্তার অবসান নেই কারণ, একজন শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ওপর তার চাকরির ব্যাপারটা নির্ভর করে না যেমন, পলিটিক্যাল সায়েন্স কিংবা ইংরেজি বিষয়ে একজন স্নাতক ডিগ্রিধারীকে দেখা যায় ব্যাংকিং সেক্টরের কাজ করতে অথচ এখানে তার শিক্ষাগত ্যাকগ্রাউন্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে যখন কাউকে নিজের প্রকৃত মেধার বিপরীতে নিয়োজিত হতে হয়, তখন সেখানে ডিমোটিভেশন কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক আমাদের দেশে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অভাব বিশ্ববাজারের বহুমাত্রিক প্রতিয়োগিতায় অবতীর্ণ হতে অক্ষম অপরপক্ষে আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামও আন্তর্জাতিক মাপকাঠি অনুযায়ী প্রণীত হয় না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয় রাজনৈতিক পালাবদল, নির্লজ্জ রাজনৈতিক আগ্রাসনের কারণে শিক্ষার্থীদের অহেতুক দুর্ভোগ পোহাতে হয়

এবার আসা যাক শিক্ষকদের বিষয়েশিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর এখন যদি কারিগরের কারিগরি প্রশিক্ষণেই গোলমাল থাকে, তবে? আমাদের শিক্ষা খাতের বিষয়টা এখানে এমনই গোড়াতেই গলদ যাকে বলে কী করে? দেশের ইউনিভার্সিটিগুলোর ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রফেসর এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ চাটুকারিতার প্রভাবে অনেক অযোগ্য লোকেরা অলংকৃত করে তুলছেন, যার খেসারত শিক্ষার্থীদের মেটাতে হয় পাশাপাশি আমাদের এখানে পুঁথিগত শিক্ষাটাকেই মূল ভিত্তি বলে বিবেচনা করা হয় কারিগরি শিক্ষা থাকে উপেক্ষিত অথচ হাতে-কলমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না হলে দক্ষ জনশক্তি তথা দক্ষ মেধার বিকাশ ঘটা অসম্ভব এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা কেন যেন সব সরকারের অগোচরেই থেকে যায় সঙ্গে দেশে গবেষণাভিত্তিক কাজগুলো করা যতটুকু কঠিন, সীমিত আবার ততটুকু জটিলও যে কারণে এখন কেবল ডাক্তার, প্রকৌশলী নয় বরং গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সৃজনশীল তরুণরা ভিনদেশে পাড়ি জমাতে উদগ্রীব

যেখানে সময়ের গতিতে দাঁড়িয়ে আজকের বিশ্ব ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন দেখে, সেখানে আমাদের মেধাবী তরুণরা একগাদা সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরির আশায় এখানে-ওখানে ধরনা দিয়ে বেড়ায় প্রচলিত সেকেলে ধারা থেকে কেন যেন আমাদের শিক্ষা কর্মব্যবস্থার যথাযথ মুক্তি মিলছে না কোনোভাবেই আমরা আজ ড্রোন প্রযুক্তি থেকে নানা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য দেশের বাইরে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে নিজেদের আধুনিক করে তুলতে চাই অথচ এই বিনিয়োগের অর্ধেকটাও যদি নিজ দেশের গবেষণা খাতে করতাম, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারাটা হয়তো অন্যরকম হতো যেখানে গবেষণা থেকে উদ্ভাবন স্বাধীনচর্চার রাস্তা এতটা বন্ধুর, সেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জায়গা থেকে দুর্বল হবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই

এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয় কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না একটি প্রগতিশীল জাতি গড়ে উঠতে দরকার দক্ষ মানবসম্পদ একজন মানসম্মত ডাক্তার কিংবা গবেষক গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের একটা লম্বা সময়ের শ্রম অর্থ ব্যয় করার পর তারা যখন অন্য দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে, তখন তা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের বুক ফুলিয়ে তুললেও পরোক্ষভাবে ক্ষতিটা আমাদেরই হয় আর আমাদের প্রচলিত অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি একজন শিক্ষার্থীর মগজে এই নীতিটাই ঠুঁসে দেয়যোগ্য হলেই দেশ ছাড়তে হবে কারণ, এখানে ভবিষ্যৎ নেই

মূলত, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেকেই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করলেও প্রকৃতপক্ষে মিলেছে শুভংকরের ফাঁকি যেখানে আশা করা হয়েছিলরিভার্স ব্রেইন ড্রেইনহবে, সেখানে বাস্তব ছিল পুরোটাই উল্টো রাজনৈতিক পট বদলালেও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা, মন্থর গতির সরকারি নিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় তরুণ শিক্ষার্থীদের হতাশা একই রকম রয়েছে ফলে ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে

সরকার বদলে মুখ পরিবর্তন হয়, কিন্তু ভাগ্য বদলায় না আমজনতার মসনদে থাকা শক্তি বারবার জনগণের স্পন্দন বুঝতে ভুল করে ফেলে, নচেৎ এড়িয়ে যায় আমাদের যুবসমাজ যেখানে তাদের দক্ষতা প্রমাণে উদগ্রীব, সেখানে সময়সীমা বেঁধে বেকার ভাতার মূলা ঝুলিয়ে নিলে তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক ভাতা বা রেশন হয়তো সাময়িক সমাধান দেবে, পূর্ণাঙ্গ সমাধন নয় অতএব, প্রতিশ্রুতি এবং কার্যক্রমের মধ্যে সুষম মেলবন্ধন ঘটানো প্রয়োজন এই দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারের

মেধাবী এই সমাজকে দেশের কাজে লাগাতে হলে তাদের জন্য একটি দক্ষ ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ড অনুযায়ী তাকে কাজে নিয়োগ দিতে হবে বদলাতে হবে দেশের প্রচলিত সেকেলে শিক্ষা কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে সমর্থন করে এমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে ছোটবেলা থেকেই স্কুলে কারিগরি কর্মশালা স্থাপন করতে হবে ছেলেমেয়েরা পুথিগত বিদ্যা আর বাস্তবভিত্তিক বিদ্যাকে এতে করে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে শিখবে

সর্বোপরি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য ভুললে চলবে না, ভবিষ্যতের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নে দক্ষ পারদর্শী তরুণ প্রজন্মের এখন নিজ দেশের মাটিতে শেকড় গেঁড়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি

লেখক: প্রাবন্ধিক কলাম লেখক