প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সুস্থ সমাজ গঠনে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব কতটুকু। ২০২৬ সালের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘Together for health. Stand with science’ বা ‘স্বাস্থ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ, বিজ্ঞানের সঙ্গে অবস্থান’। এই আহ্বান আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
গত কয়েক দশকে টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং সাধারণ রোগ প্রতিরোধের মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আমরা ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছি। কিন্তু যখনই ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ বা ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজের (ইউএইচসি) কথা আসে, তখন আমাদের সফলতার পেছনের এক রূঢ় বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়। দেশের প্রতিটি মানুষ, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, যেন সমান ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পান- সেই লক্ষ্য থেকে আমরা এখনও অনেকটাই দূরে।
আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই ঘাটতির গভীরতা সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত একটি সংলাপে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ইউনিসেফ, পিপিআরসি এবং ইউএসসি ফোরামের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় যে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে, তা আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে চালাতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৪৪ দশমিক ৫ জন স্বীকৃত স্বাস্থ্যকর্মী- অর্থাৎ চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংখ্যাটি বর্তমানে মাত্র ৮ দশমিক ৩! এটি শুধু কাগজে লেখা কোনো পরিসংখ্যান নয়। এর মানে হলো- প্রতিদিন হাজারো মানুষ সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি যত্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পর্যাপ্ত কর্মীর অভাবে আমাদের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এই জনবল সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নতুন নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ৯৬ শতাংশই গ্রামে স্থায়ীভাবে কাজ করতে অনাগ্রহী। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে শুধু চিকিৎসকদের পেশাদারত্বের অভাব মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যাবে, এর পেছনে রয়েছে কাঠামোগত চরম অবহেলা।
গ্রামে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, মানসম্মত বাসস্থানের অভাব রয়েছে, সন্তানদের জন্য ভালো স্কুল নেই এবং যাতায়াত ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম। এ ছাড়াও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব তাদের কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। এই বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান না করে শুধু চিকিৎসকদের ওপর দায় চাপালে জনবল বণ্টন কখনোই সুষম হবে না।
কর্মীসংকটের এই সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রোগের চিকিৎসায়। পরিসংখ্যানগুলো আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের। দেশে বর্তমানে মাত্র ৪১ শতাংশ গর্ভবতী নারী মানসম্মত প্রসবপূর্ব সেবা পান। মাতৃস্বাস্থ্যের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় এটি বড় ধরনের দুর্বলতা।
অন্যদিকে, উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতক রোগে আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় আসছেন। ডায়াবেটিসের মতো আজীবন বয়ে বেড়ানো রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা পাওয়ার হার আরও ভয়াবহ-মাত্র ১৯ শতাংশ। এর মূল কারণ হলো, প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত ফলোআপ করার মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী আমাদের নেই।
৯৮ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার মতো চমৎকার সক্ষমতা আমাদের আছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সেবার ক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও অনেকটাই নড়বড়ে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু গতানুগতিক নিয়োগ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; আমাদের দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক ও কাঠামোগত সংস্কার।
এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের যে মূল সুর- বিজ্ঞানের পাশে থাকা, তার আলোকেই আমাদের নীতি নির্ধারণ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত উন্নয়নে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি:
প্রথমত, আমাদের একটি তথ্যভিত্তিক বা ডেটা-ড্রিভেন মানবসম্পদ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দেশের কোন অঞ্চলে, কোন ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর কতটুকু ঘাটতি রয়েছে, তা বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু নির্দেশ দিয়ে গ্রামে চিকিৎসক পাঠানো নয়, বরং সেখানে থাকার জন্য তাদের উৎসাহিত করতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য পারিবারিক ভাতা, নিরাপদ বাসস্থান, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকলে গ্রামের হাসপাতালগুলোতে কর্মীর অভাব থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে হবে। দেশে প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে প্রচুর গবেষণা ও জরিপ হয়, কিন্তু সেগুলোর ফলাফল খুব কমই জাতীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়। সরকারি গবেষণার ডেটাগুলো শুধু ফাইলের ভেতরে বন্দি না রেখে, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা সাজানো জরুরি। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাই বলে দেবে কোথায় আমাদের বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, একটি শক্তিশালী জবাবদিহি ও মনিটরিং কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবায় বেসরকারি হাসপাতাল এবং এনজিওগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তাদের সেবার মান, ওষুধের মান এবং খরচের যৌক্তিকতা নজরদারি করার জন্য সরকারের নিজস্ব একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকতে হবে। সঠিক মনিটরিং ছাড়া সেবার মান নিশ্চিত করা অসম্ভব।
চতুর্থত, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসার কারণে মানুষের অর্থনৈতিক নিঃস্ব হওয়া ঠেকাতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা বা হেলথ ইনস্যুরেন্সের প্রসার ঘটানো, দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা অতি অল্প খরচে সেবার পরিধি বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সর্বোপরি, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ই-হেলথ বা ডিজিটাল চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও বেগবান করতে হবে। টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং দূরনিয়ন্ত্রিত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়। শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানভিত্তিক এই সমাধানটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, আবেগ বা খণ্ডিত কোনো উদ্যোগ দিয়ে এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে, বিজ্ঞানের সহায়তায়। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৪৪ দশমিক ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মীর যে লক্ষ্যমাত্রা, তা শুধু সরকারি নথির একটি সংখ্যা হয়ে থাকলে চলবে না। সরকার, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের পথে হাঁটলেই আমরা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আস্থার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব।
লেখক: জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক