রিয়াজউদ্দিন সাহেব জামাই-শ্বশুর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার পদ পেয়েছেন গত বছর। চেয়ারে বসার পর থেকেই তার হুমকি-ধমকি আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে। তার অধীনস্ত কর্মচারীরা ত্যক্ত-বিরক্ত। অফিসে কোনো কাজ না করেও কীভাবে সুড়সুড় করে এত উপরে উঠে গেলেন সেটা নিয়ে অফিসে কানাঘুষা আছে। কেউ কেউ বলেন, রিয়াজ সাহেব টাকা দিয়ে ডিগ্রি কিনেছেন। আজ পর্যন্ত কেউ তাকে নিজ হাতে কোনো রিপোর্ট বানাতে দেখেননি, প্রেজেন্টেশন দিতে দেখেননি। কেউ কেউ বলেন, রিয়াজ সাহেব মালিকপক্ষের লতাপাতায় গিট্টু দেওয়া আত্মীয়। কিন্তু আসল কাহিনি কী সেটা কেউ জানে না।
আসলাম ছেলেটা মাস ছয়েক জয়েন করেছে রিয়াজ সাহেবের টিমে। মারাত্মক ব্রিলিয়ান্ট ও ক্রিয়েটিভ হওয়ার কারণে সে রিয়াজ সাহেবের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল। কয়েকটা মিটিংয়ে মালিকপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছেলেটার কাজের প্রশংসা করায় রিয়াজ সাহেব ভীতসন্ত্রস্ত হতে লাগলেন। তিনি ম্যানেজমেন্টকে বোঝালেন যে, সব আইডিয়া ও কাজের কনসেপ্ট তিনিই ছেলেটাকে দিয়েছেন। সে শুধু টুলস ব্যবহার করে কাজ করেছে। ম্যানেজমেন্ট রিয়াজ সাহেবের ওপর যথাবিহিত সন্তুষ্ট হয়ে গেল। কোম্পানির নেক নজর নিজের দিকে রাখতে সে ভাবল, যে করেই হোক এই ছেলেটাকে কব্জায় রাখতে হবে। করপোরেট পলিটিক্সের মারপ্যাঁচে একে আটকাতে না পারলে পরবর্তী সময়ে নিজের পদ ও পরিস্থিতি দুটোই খারাপ হতে পারে।
একদিন দুপুরবেলা রিয়াজ সাহেব জরুরি তলব করলেন আসলামকে। আসলাম তৎক্ষণাৎ তার বসের রুমে গিয়ে উপস্থিত হলো। রিয়াজউদ্দিন সাহেব গম্ভীর মুখ করে কাগজপত্র এদিক সেদিক করতে লাগলেন কিছুক্ষণ। আসলাম তার কর্তব্য বুঝে উঠতে না পেরে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। সে নিচু স্বরে বলল, স্যার আমি কি একটু পরে আসব?
আপনাকে কি আমি যেতে বলেছি? -বাঘের মতো গর্জে উঠল রিয়াজ সাহেব।
: স্যরি স্যার। আমার ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করবেন।
: কীসের স্যরি? পারেনই তো ওই একটা কাজ, শুধু স্যরি বলতে।
আসলাম কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল। রিয়াজ সাহেব একটা প্রিন্টেড ডিজাইন আসলামের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, এটা কোনো ডিজাইন হয়েছে? কোন থিমে ডিজাইন করেছেন? আমাদের ব্র্যান্ডের সঙ্গে অ্যালাইন হয় এটা?
আসলাম মৃদু স্বরে বলল, স্যার আপনিই তো আমাকে সাজেস্ট করেছিলেন এই থিমে ডিজাইন করতে।
খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন রিয়াজ সাহেব। গলায় খাঁকারি দিয়ে বললেন, কখন বললাম আমি এই থিমে কাজ করতে? বলি একটা আর বোঝেন আরেকটা। আমি কী বলেছি সেটা তো বোঝেনই নাই। বুঝলে এরকম ডিজাইন আপনার মাথা থেকে বের হতো না। উপরের বসরা একটু প্রশংসা করলেই ভাববেন না যে আপনি আহামরি কিছু হয়ে গেছেন। এই চেয়ারে বসে আমাকে সব ভাবতে হয়। সব করতে হয়। যান আমাদের ব্র্যান্ড কালার অ্যান্ড কনসেপ্ট মিল রেখে ডিজাইন করে নিয়ে আসুন।
আসলাম নিজের রুমে এসে ভাবতে লাগল হঠাৎ কী হলো তার বসের। এমন তিরিক্ষি মেজাজের আগে সে দেখেনি কখনো। যাই হোক সে ডিজাইনটা নিয়ে আবার বসল। ঘণ্টা চারেক সময় দিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আরেকটা ডিজাইন দাঁড় করাল। আগে সব কলিগকে দেখাল। সবাই খুব পছন্দ করল। এবার এটা নিয়ে সে বসের রুমে গেল।
রিয়াজউদ্দীন সাহেব খুঁটে খুঁটে সবকিছু দেখলেন। তারপর বললেন, আপনার তো আবার ডিজাইনের ওপর কোর্স করতে হবে দেখছি। কী সব অদ্ভুত এলিমেন্ট দিয়েছেন? এগুলো যায় আমাদের সঙ্গে?
আসলাম বলল, স্যার এর আগেও তো আমরা এ ধরনের এলিমেন্ট ব্যবহার করেছি। আপনি পছন্দ করেছেন।
: আগে করেছি মানে এখনো করব এমন তো কোনো কথা নেই। আপডেট ইউরসেলফ।
: শিওর স্যার। আই উইল ডু।
রিয়াজ সাহেব জ্ঞানী মানুষের মতো ভং ধরে বললেন, এই
ডিজাইনটাকেও শেপে আনা যায় বুঝলেন আসলাম সাহেব। আপনি লাল কালারটাকে নীল করেন। হলুদটাকে পার্পেল করে দিন। আর ডানের শেপটাকে উপরের দিকে বসান। চারপাশে একটা বর্ডার দিন গ্র্যাডিয়েন্ট ব্যবহার করে। দারুণ একটা ডিজাইন হয়ে যাবে। বুঝতে পেরেছেন।
আসলাম উপর থেকে নিচে দুবার মাথা ঝাঁকাল। যার অর্থ হলো সে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সে এটা বুঝতে পারছে না লালকে নীল আর হলুদকে পার্পেল করলে কীভাবে এই ডিজাইন ব্র্যান্ডের সঙ্গে অ্যালাইন হবে। যাই হোক কর্তার ইচ্ছাই কর্ম ভেবে আসলাম সেভাবেই ডিজাইন করে বসকে সাবমিট করে দিল। বস এবার বেজায় খুশি। বিকেলে বোর্ড মিটিংয়ে নেক্সট ইভেন্টের ডিজাইনগুলো ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রুভ করবে।
পরদিন অফিসে গিয়ে আসলাম বুঝতে পারল বসের মেজাজ ভয়াবহ খারাপ। বস ডাকার আগেই সে বসের রুমে উপস্থিত হলো। মধুর সুরে সে বসকে জিজ্ঞেস করল, স্যার ডিজাইনগুলো অ্যাপ্রুভ হয়েছে?
রিয়াজ সাহেব আগুন চোখে বললেন, আপনার মুণ্ডু হয়েছে। যতসব ছাইপাশ ডিজাইন করেছেন। প্রথমে যে কাজটি করেছিলেন সেটা নিয়ে আসুন।
আসলাম আলোর গতিতে সেই ডিজাইনটি নিয়ে উপস্থিত হলো। রিয়াজ সাহেব বললেন, এই ডিজাইনটা ঠিক আছে তবে হালকা কারেকশান লাগবে।
রিয়াজউদ্দীন আবার ডানেরটা বামে, বামেরটা ডানে, উপরেরটা নিচে আর নিচেরটা উপরে করে করে বহাল তবিয়তে আবার আগের ডিজাইনে ফেরত গেলেন। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে বললেন, হ্যাঁ এবার ঠিক আছে। এটা করতে এবার অনেক পেরেশানি গেল।
আসলাম মনে মনে তৃপ্তির হাসি হেসে এলাকার সহমত ভাইদের মতো একাগ্রচিত্তে বলল, অবশ্যই স্যার। আপনি না থাকলে এই ডিজাইন আমি কোনোভাবেই দাঁড় করাতে পারতাম না স্যার। ইউ আর সো কাইন্ড। ইউ আর অ্যা রিয়েল মেন্টর।
রিয়াজ সাহেব বিগলিত হয়ে বললেন, আরে না, এটা তো আমার দায়িত্ব।
সহি সালামতে করপোরেট ইভেন্ট শেষ হলো। এই ইভেন্টে আশানুরূপ প্রফিট করায় ম্যানেজমেন্ট এ বছরের প্রোমোশনের ডেট ঘোষণা করল। প্রোগ্রামটি হবে গাজীপুরের একটা রিসোর্টে। খোলামেলা জায়গায় একটা পিকনিক টাইপ ব্যাপার হবে। অফিসের সবাই উচ্ছ্বসিত। যারা বছরজুড়ে ডেডিকেটেডভাবে কাজ করেছে তাদের জন্য নিশ্চয়ই অনেক আনন্দের দিন এটা।
রাজেন্দ্রপুরের খোলামেলা জায়গায় প্রোগ্রাম হচ্ছে। একদম গ্রামীণ পরিবেশ। যারা প্রমোশন পেয়েছেন তাদের নাম ঘোষণা করছেন অফিসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। প্রমোশনপ্রাপ্তরা সামনে আসছেন। তাদের অনুভূতি জানাচ্ছেন। মালিকপক্ষকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। হঠাৎ মাইকে নাম ঘোষণা শোনা গেল রিয়াজউদ্দীন সাহেবের। তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার থেকে পূর্ণ জেনারেল ম্যানেজার পদে প্রমোশন পেয়েছেন। গত ছয় মাসে কোম্পানির ব্র্যান্ডিং অ্যান্ড
ডিজাইনটাকে একদম ঢেলে সাজিয়েছেন। রিয়াজ সাহেব মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন, নিজের ব্যক্তিগত জীবন তুচ্ছ করে দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনি তিনি এসব করতে ব্যয় করেছেন। অফিসের কর্মীরা একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এমন সময় পেছনের একটি ধানখেত থেকে ছুটে এল স্বাস্থ্যবান এক দুধেল গাই। আশপাশের লোকজন ছুটে পালাতে পারলেও রিয়াজ সাহেব বক্তব্য দেওয়ার কারণে ঘটনা বুঝে উঠতে পারলেন না। গাইটি তার শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রিয়াজ সাহেবকে গুঁতো মেরে একটি ঠ্যাং ভেঙে ফেলল। ঠিক তখনই দৌড়রত এক দুষ্টু কর্মী বলে উঠল,
দেখলে নদী লাফায় বেশি অশিক্ষিত ব্যাঙ,
এক গাইয়ে ভাইঙ্গা দিল অন্য গাইয়ের ঠ্যাং।