আচ্ছা, কখনো খেয়াল করেছেন? ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কোনো রেস্তোরাঁয় বসে থাকা প্রেমিক আর মতিঝিলের কোনো করপোরেট অফিসের ওয়েটিং রুমে বসে থাকা চাকরিপ্রার্থীর চেহারার মধ্যে অদ্ভুত এক মিল থাকে। দুজনেরই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, গলার ভেতরটা সাহারা মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ, আর বুকের বাঁ পাশটা এমনভাবে ধড়ফড় করছে যেন ভেতরে কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে।
দৃশ্যপট ভিন্ন, উদ্দেশ্য আলাদা, কিন্তু নার্ভাসনেসের গ্রাফটা হুবহু এক! চাকরির ইন্টারভিউয়ের আগে আমরা কী করি? সিভিটা আপডেট করি, স্কিলগুলো বোল্ড করি, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করি ‘টেল মি অ্যাবাউট ইউরসেলফ…’।
আর প্রেমের প্রপোজালের আগে? ঠিক একই কাজ! নিজের ‘সিভি’ অর্থাৎ মনের কথাগুলো গুছিয়ে নিই। ওখানে যেমন ফরমাল শার্ট ইস্ত্রি করা নিয়ে টেনশন থাকে, এখানে থাকে লাল পাঞ্জাবি বা প্রিয় শাড়িটা ঠিকঠাক মানাবে কি না, সেই টেনশন। ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজেকে ‘বেস্ট ক্যান্ডিডেট’ প্রমাণ করতে হয়, আর ডেটে প্রমাণ করতে হয় ‘আমার চেয়ে বেশি তোমায় কেউ ভালোবাসবে না।’ দুটোই আসলে নিজেকে মার্কেটে সেরা প্রমাণ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা।
ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্নকর্তা যখন চশমার ফাঁক দিয়ে তাকান, তখন মনে হয় যেন সিআইডির জেরা চলছে। আর প্রেমের ক্ষেত্রে? উল্টো দিকের মানুষটা যখন অপলক তাকিয়ে থাকে আর মুচকি হাসে, তখন মনে হয়—এই বুঝি সব গুলিয়ে ফেললাম!
ইন্টারভিউতে বস জিজ্ঞেস করেন, ‘হোয়াই শুড উই হায়ার ইউ?’ আর হবু প্রেমিকা মুখে না বললেও তার চোখের ভাষা বলে, ‘এত ছেলে থাকতে তোমাকেই কেন চুজ করব?’ দুটো জায়গাতেই একটা ভুল উত্তর, আর সঙ্গে সঙ্গে ‘গেম ওভার’।
সবচেয়ে ট্র্যাজিক পার্ট হলো রিজেকশন। ইন্টারভিউ শেষে যখন এইচআর মুচকি হেসে বলে, ‘থ্যাংক ইউ, উই উইল লেট ইউ নো’—তখনই বুঝে নিতে হয়, এই চাকরিটা আর হচ্ছে না। ঠিক তেমনি, প্রপোজালের পর যখন উত্তর আসে, ‘আসলে আমি তোমাকে জাস্ট ফ্রেন্ড ভাবি’ অথবা ‘আমার ফ্যামিলি এটা মানবে না’—তখন বুঝতে হবে, এটাও ওই এইচআরের মতো পলিটিক্যালি কারেক্ট রিজেকশন।
চাকরির ক্ষেত্রে অজুহাত থাকে ‘ওভার কোয়ালিফাইড’ বা ‘বাজেট নেই’। আর প্রেমের ক্ষেত্রে অজুহাত ‘এখন আমি রিলেশনের জন্য মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড না’ বা ‘তুমি আমার চেয়ে বেটার কাউকে ডিজার্ভ করো’। দিনশেষে দুটোই এক ‘সরি ভাই, আপনি ওয়েটিং লিস্টেই থাকুন’।
যদি কপাল ভালো থাকে আর চাকরিটা হয়ে যায়, মনে হয় যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছি! প্রথম মাসের স্যালারি আর প্রেমিকার প্রথম ‘হ্যাঁ’ দুটোর আনন্দেই আকাশে ওড়ার মতো অবস্থা হয়। আর যদি না হয়? চাকরি না পেলে যেমন আমরা হতাশ হয়ে টিএসসিতে চা খাই আর বলি, ‘মামা, দেশে জবের কোনো ভ্যালু নাই’, প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েও আমরা অরিজিৎ সিংয়ের গান ছেড়ে বলি, ‘ভালোবাসার কোনো দাম নাই’। মজার ব্যাপার হলো, মানুষ কিন্তু হাল ছাড়ে না। এক কোম্পানি রিজেক্ট করলে যেমন আমরা নতুন করে সিভি ড্রপ করি অন্য কোম্পানিতে, তেমনি এক ক্রাশ রিজেক্ট করলে কিছুদিন পর মনটাও নতুন করে ‘সিভি ড্রপ’ করে অন্য কারও ইনবক্সে। জীবন তো থেমে থাকে না!
আসলে জীবনটাই একটা বিশাল ভাইভা বোর্ড। সে অফিসের বস হোক বা স্বপ্নের মানুষ—সবাই আমাদের ধৈর্য আর কনফিডেন্সের পরীক্ষা নেয়। তাই নার্ভাস হওয়াটা স্বাভাবিক, ঘাম হওয়াটাও দোষের না। শুধু মনে রাখতে হবে, ইন্টারভিউ হোক বা প্রপোজাল—একবার ‘না’ মানেই সব শেষ নয়। পরের ইন্টারভিউটা হয়তো আরও ভালো কোনো পজিশন বা আরও ভালো কোনো মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।
তাই টাইটা ঠিক করুন অথবা গোলাপটা হাতে নিন—বুক চিতিয়ে সামনে যান। যা হওয়ার হবে, নার্ভাসনেসটাকে এনজয় করাই তো আসল স্মার্টনেস।