সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান নিজে পরিবহন শ্রমিক না হলেও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতা সেজে সারা দেশের পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে তুলেছিলেন তার নিজস্ব পরিবহন সিন্ডিকেট। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছরে পরিবহন সেক্টরের বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদাবাজি করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে কথায় কথায় পরিবহন ধর্মঘট ডেকে সরকার অচল করে দেওয়ার হুমকি দিতেন তিনি। সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শাজাহান খান একসময় আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা হলেও পরে তিনি জাসদে যোগ দেন। জাসদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জাসদের সশস্ত্র সংগঠন গণবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি। দ্রুতগতিতে ঘুরতে থাকে ভাগ্যের চাকা। তৈরি হয় ক্ষমতার বলয়। একে একে নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকেন মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। প্রভাব বাড়তে থাকে তার পরিবার ও স্বজনদের। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী শাজাহান খান ছিলেন দেনাদার। বর্তমানে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক। ওই নির্বাচনের হলফনামা মোতাবেক শাজাহান খানের মাসিক আয় ছিল ৫৭ হাজার ৮৬ টাকা। তার স্ত্রীর শিক্ষকতা পেশা থেকে মাসে আসত ৫ হাজার ২০০ টাকা। তখন তাদের স্বামী-স্ত্রীর হাতে নগদ কোনো টাকা ছিল না। বরং ঋণ ছিল ৪২ লাখ টাকার বেশি। ২০০৮ সালে শাজাহান খানের বার্ষিক আয় ছিল ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬ টাকা। এই হিসাবে প্রতি মাসে আসত ৫৭ হাজার ৮৬ টাকা। ২০০৮ সালে শাজাহান খানের নিজ নামে স্থাবর সম্পদ ছিল মাত্র তিনটি স্থানে। এ ছাড়া গ্রামের বাড়িতে যৌথ মালিকানায় স্থাবর সম্পদ ছিল। বর্তমানে তার নিজ নামে স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে কমপক্ষে ১৫ স্থানে এবং যৌথ মালিকানায় রয়েছে আরও ছয় স্থানে। ১০ বছর আগে তার স্ত্রীর নামে ছিল দুই স্থানে স্থাবর সম্পদ। বর্তমানে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৩ স্থানে। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার আগে তার মাসিক আয় ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। মন্ত্রী হওয়ার পর তার সম্পদ বেড়েছে প্রায় শতগুণ। নিজ জেলা মাদারীপুর আর ঢাকা শহরে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। আছে আবাসন, হোটেল ও শিপিং ব্যবসা।
তা ছাড়া মন্ত্রী থাকা অবস্থায় চট্টগ্রামের বন্দরও ছিল তার ছোট ভাই যাচ্চু খানের হাতে। আরেক ভাই আইনজীবী ওবায়েদুর রহমান কালু খান ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তার ইশারায় চলত মাদারীপুরের বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগে সিন্ডিকেট করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদক নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ শাজাহানের পরিবারের বিরুদ্ধে। বিএনপি-জামায়াতসহ সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেতেন না। বছরের পর বছর শ্রমিক ফেডারেশনের নির্বাহী সভাপতির পদে থেকে তিনি হয়ে ওঠেন পরিবহন জগতের কিং। কাজ করেন স্বৈরাচার সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দার হিসেবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান ও তার স্ত্রীর সম্পদ গত ১৬ বছরে বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বেড়েছে বার্ষিক আয়ও। মাদারীপুর শহরে তার দৃশ্যমান সম্পত্তির মধ্যে আছে ১০ তলা একটি বাসভবন, ছয়তলা একটি হোটেল, আছে একটি ফুড ভিলেজ। মাদারীপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের জমি দখল করে সেখানে গড়ে তোলেন চারতলা ভবন। একই শহরে রয়েছে তার তিনটি পেট্রল পাম্প, চারতলা ভবনে নিজের বাবার নামে আসমত আলী খান হাসপাতাল।
শাজাহান খান সার্বিক ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সার্বিক পরিবহন, সার্বিক ফিলিং স্টেশন, সার্বিক কনস্ট্রাকশন ফার্ম, সার্বিক রিয়েল এস্টেট, সার্বিক ইটভাটা, সার্বিক প্রেসসহ নানাবিধ ব্যবসা-বাণিজ্য। এসবই করেছেন দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে। মাদারীপুর শহরের একাধিক ব্যক্তির জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার ভাই ওবায়দুর রহমান খালু খানের বিরুদ্ধে। সড়ক বিভাগের জমি দখল করে ফিলিং স্টেশন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে তার ছোট ভাই যাচ্চু খানের বিরুদ্ধে। শুধু জমি দখল নয় এলজিইডি, সড়ক বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সব সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
শাজাহান খান তার ক্ষমতার দাপটে মাদারীপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, চেম্বার অব কমার্সও দখলে নিয়েছিলেন। মাদারীপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিজেই সভাপতির পদ দখল করেন। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে বসান তার বন্ধু সৈয়দ আবুল বাসারকে। চেম্বার অব কমার্সের দায়িত্ব দেন ছোট ভাই যাচ্চু খানকে। এসব দখল করেই ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি নৌমন্ত্রী থাকাকালে নৌ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর ব্যবহার করে মাদারীপুর প্রেসক্লাব দখল করেন। প্রেসক্লাবের দায়িত্ব দেন তার বন্ধু সাংবাদিক শাহজাহান খানকে। এভাবেই তিনি মাদারীপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করেন।
১৯৭০ সালে মাদারীপুর সদর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তার ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ সদর থানার একটি অস্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। এ ছাড়া একাধিক মামলা হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মামলাতেই তাকে জেলহাজতে যেতে হয়নি। সব সময়ই ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৩ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসার বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দিয়ে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সর্বহারা ও জাসদের একাধিক নেতা-কর্মীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে কোনো ঘটনাতেই তার বিরুদ্ধে কেউ মামলা করার সাহস পাননি।
মাদারীপুরের এক বাসচালক বলেন, ‘সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের অন্যতম বাধা ছিলেন শাজাহান খান। আমরা চাই অন্তর্বর্তী সরকার তার দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক বলেন, পরিবহন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজির নেতৃত্বে ছিলেন শাজাহান খান। এসব চাঁদা তোলা হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নামে। এই ফেডারেশনের সবকিছুই চলেছে শাজাহান খানের ইশারায়।
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আইনজীবী মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘বিগত সময়ে বিএনপির নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ অন্যান্য দাবিতে বৃহৎ পরিসরে আন্দোলনের ডাক দিলেই বন্ধ হয়ে যেত সড়কে যান চলাচল। এর নেপথ্যে ছিলেন এই শাজাহান খান। তিনি ও তার সহযোগীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আয় করে পরিবার, পরিজন, আত্মীয়স্বজনের নামে অর্থ ও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের আবেদন, অনতিবিলম্বে তদন্ত করে এসব অবৈধ সম্পত্তির বিষয় ব্যবস্থা নেবেন।’
শাজাহান খানসহ অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাই এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।