অটোমেটিক রাইস মিল ও হাস্কিং মিল মালিকদের মাধ্যমে সারা দেশে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে খাদ্য অধিদপ্তর। তবে বিশেষ কিছু শর্ত বাস্তবায়ন ও কাঁকরবিহীন ও পলিশ চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর ক্রমেই নির্ভশীল হয়ে পড়ছে অটোমেটিক রাইস মিলগুলোর ওপর। এ কারণে গত ৭ বছরে ১১ হাজার ৩৬৫টি হাস্কিং মিলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়নি খাদ্য অধিদপ্তর। এর ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন এসব মিলের অন্তত ৪ লাখ শ্রমিক। বর্তমানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, সারা দেশে বর্তমানে ২১ হাজার ৮৭টি হাস্কিং মিল রয়েছে। তার মধ্যে ৯ হাজার ৭২২টি মিলের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। বাকি ১১ হাজার ৩৬৫টি হাস্কিং মিল চুক্তির বাইরে রয়েছে। এসব মিলের অনেকই ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ২০০০ সালে সারা দেশে অটোমেটিক রাইস মিল স্থাপন শুরু হয়। বর্তমানে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০৯টি। তার মধ্যে গত ৭ বছরে স্থাপন করা হয়েছে ৯৬৫টি অটোমেটিক রাইস মিল।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকা হাস্কিং মিলগুলো আধুনিকায়ন করা সম্ভব না হলে অটোমেটিক রাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। হাস্কিং মিলগুলো যদি এ অবস্থায় থাকে, তবে আগামী ৭ বছরের মধ্যে আরও ৭ হাজার হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কে এম লায়েক আলী জানান, খাদ্য অধিদপ্তর সংগ্রহ কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিচ্ছে কালার সটার ও পলিশ চাল। কিন্তু হাস্কিং মিলগুলোতে এ প্রযুক্তি না থাকায় অধিকাংশ বরাদ্দ পাচ্ছে অটোমেটিক রাইস মিলগুলো।
আরও হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে কে এম লায়েক আলী বলেন, ‘হাস্কিং মিলগুলোতো কালার সটার, ড্রায়ার ও পলিশারসহ আধুনিক অন্যান্য প্রযুক্তি যদি নিশ্চিত করা না যায়, তবে অটোমেটিক রাইস মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না হাস্কিং মিলগুলো।’
এ ক্ষেত্রে কি কোনো হাস্কিং মিলই বরাদ্দ পাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে কে এম লায়েক আলী বলেন, যেসব হাস্কিং মিল খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করছে, সেগুলোর একটি বড় অংশ অটোমেটিক রাইস মিল থেকে চাল কিনে গুদামে দেয়। অর্থাৎ লাইসেন্স টিকে রাখতে তাদের বিকল্প ব্যবস্থায় সরকারি গুদামে চাল দিতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, অটোমেটিক রাইস মিল চালু হওয়ার আগে হাস্কিং মিলগুলোতে শ্রমিক হিসেবে প্রায় ১২ লাখ নারী-পুরুষ কাজ করতেন। কিন্তু অনেক মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন অন্তত ৪ লাখ শ্রমিক।
বগুড়ার অন্যতম খাদ্য উৎপাদিত এলাকা দুপচাঁচিয়া। ৮ বছর আগেও এ উপজেলায় হাস্কিং মিল ছিল ৫৫০টি। কয়েক বছরের ব্যবধানে ৩৫৫টি হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ১৯৫টি মিল চালু থাকলেও গত বোরো মৌসুমে খাদ্য অধিদপ্তর ১২টি মিলের সঙ্গে চুক্তি করেনি। এ উপজেলায় বর্তমানে ১৩টি অটোমেটিক রাইস মিল স্থাপন করা হয়েছে।
দুপচাঁচিয়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘লোকসানের কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে হাস্কিং মিল। এ অবস্থা চলতে থাকলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে অটোরাইস মিলগুলো।’
দুপচাঁচিয়ার একটি ইউনিয়ন তালোড়া। এখন পৌরসভা হয়েছে। একসময় এ ইউনিয়নে হাস্কিং মিল ছিল ১৭৬টি। লোকসান গুনে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৪০টি হাস্কিং মিল।
তালোড়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুভাষ প্রসাদ কানু জানান, তালোড়া পৌর এলাকায় এখন অটোমেটিক রাইসমিল আছে ৭টি। সবচেয়ে ছোট অটোমেটিক রাইস মিলে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০ টন ধান লাগে। বড় অটোর জন্য প্রয়োজন ১৩০ থেকে ১৩৫ টন পর্যন্ত। আর কর্পোরেট কোম্পানির প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় ক্যাপাসিটি অনুযায়ী আরও বেশি।
তালোড়া অটোমেটিক রাইসমিল মালিক সুভাষ প্রসাদ কানু বলেন, ‘সরকারি সহযোগিতা পেলে আকার অনুযায়ী ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করলেই হাস্কিং মিলে উৎপাদিত চালের মানও উন্নত হবে। একই সঙ্গে ধানের তুষ থেকে রাইস ব্রান ওয়েল ও ফিড তৈরির করা যাবে। দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া হাস্কিং মিলগুলো চালু করলে ফিড আর ভোজ্য তেলের আমদানি কমে যাবে। আর সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রার।
বগুড়ার আরেকটি খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকা নন্দীগ্রাম উপজেলা। এখান থেকে ধান যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
নন্দীগ্রাম উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. বদরুদ্দোজা তৌফিক জানান, গত বোরো মৌসুমে সরকারি গুদামে চাল দিতে গিয়ে প্রতি কেজিতে লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় দেড় টাকা। গুদামে চাল দেওয়ার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪২ টন। নীতিমালা অনুযায়ী গুদামে মোটা চাল দিতে গিয়ে ধান সংগ্রহ করতে হয়েছে রংপুর অঞ্চল থেকে। কারণ নন্দীগ্রামে মোটা ধান হয় না। এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয় হয়েছে। কিন্তু লাইসেন্স বাঁচাতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নাই।’