স্কুলশিক্ষক থেকে সংসদ সদস্য। সাদামাটা চালচলন। স্থানীয় রাজনীতিতেও খুব একটা প্রভাব বিস্তার করেননি। এমন ভালোমানুষী চেহারার আড়ালে দখলবাজি ও নিয়োগ-বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ করেছেন খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালে নির্বাচনে পরপর চারবার সংসদ সদস্য ও দুই দফায় মন্ত্রী হওয়ায় এলাকার সব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে নিয়োগে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাণিজ্য করেছেন তিনি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারে প্রথমবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবং শেষবার ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় স্বজনদের নিয়ে তিনি অনিয়মের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তার ছেলে বিশ্বজিৎ চন্দ্র চন্দ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক সদস্য এবং তার এপিএস সমীরণ দে গোরা নানা অপকর্ম ও লুটপাট করে বিতর্কিত হয়েছেন। মন্ত্রীর মেজো ছেলে সত্যজিৎ চন্দ্র বিসিআইসির সার ও সেনা কল্যাণ সংস্থার সিমেন্টের ডিলার। সত্যজিতের মালিকানাধীন ঊষা এন্টারপ্রাইজ ১৫ বছর ধরে এককভাবে সারের ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছে।
২০২৪ সালে দেওয়া হলফনামায় নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সম্পদের মধ্যে ব্যাংকে জমা ৫৫ লাখ টাকা, ৪ দশমিক ১৭ একর কৃষিজমি, কিছু অকৃষি জমি, একটি দালান ও একটি সেমিপাকা ভবন রয়েছে। তবে স্থানীয়রা জানান, এর বাইরে নারায়ণ চন্দ্রের একাধিক ইটভাটা, কৃষিজমি, ঢাকা ও কলকাতায় ফ্ল্যাট রয়েছে।
৭ অক্টোবর ছদ্মবেশে ভারতে পালানোর সময় ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর সীমান্ত থেকে তাকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। স্থানীয় অনেকে বলছেন, নারায়ণ চন্দ্র ও তার ছেলে বিশ্বজিৎ চন্দ্র হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন প্রতিবেশী দেশে। সে কারণে বাংলাদেশে তাদের সম্পদ কম।
নিয়োগ-পদোন্নতিতে অর্থবাণিজ্য
২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ডুমুরিয়া উপজেলার একটি কলেজ সরকারীকরণের উদ্যোগ নেয়। তবে শর্ত অনুযায়ী ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে হতে হবে। কিন্তু কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে নারায়ণ চন্দ্র প্রভাব খাটিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপক্ষো করে ১৪ কিলোমিটার দূরে শাহাপুর-মধুগ্রাম কলেজকে সরকারিকরণ করেন।
এ ছাড়া তিনি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ ও বদলিতে বাণিজ্য করে বিপুল অর্থ আয় করেছেন। জানা যায়, ডুমুরিয়া কলেজে প্রভাষক পদে তার এক পুত্রবধূ সুলগ্না বসু, লাইব্রেরিয়ান পদে আরেক পুত্রবধূ কেয়া রানী চন্দ্র, প্রভাষক পদে তার সাবেক এপিএস সমীরণ দের শ্যালক শোভন দে, সাবেক এপিএস সত্যম রায়, ভাতিজা জয়ন্ত কুমার দে, নাতি দ্বীপ চন্দ্র চন্দ চাকরি করেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়োগে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন।
নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে দুই মামলা
ডুমুরিয়ার ইটভাটার নামে প্রায় ১০০ বিঘা জমি দখলের অভিযোগে নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ভদ্রাদিয়া গ্রামের শংকর মল্লিক জানান, ২০২১-এর ২১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রামের ১০ জন জমির মালিককে লিজের টাকা না দিয়ে নারায়ণ চন্দ্র ও তার দুই ছেলে সেখানে ইটভাটা গড়ে তোলেন। এতে লিজ বাবদ তাদের কাছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে শিমুল দাস ৯ লাখ, লাইলী কারিগর ৯ লাখ, সুমন মল্লিক ৯০ হাজার, নজরুল গাজী ১ লাখ ৫৩ হাজার, আহমদ গাজী ১ লাখ ৫৩ হাজারসহ ১০ জনের পাওনা ১ কোটি ২০ লাখ ৬৬ হাজার ৩০০ টাকা।
তিনি বলেন, প্রতি শতাংশ বাবদ বছরে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল এবং প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা চুক্তি থাকার কথা। কিন্তু অনেকে রাজি না হলেও জোর করে কোনো চুক্তি ছাড়াই ইটভাটা নির্মাণ করা হয়। অনেককে শুরু থেকেই লিজের টাকা দেওয়া হয়নি। ইটভাটা শুরু হওয়ার পর আশপাশে জমিতে কোনো ফসল উৎপন্ন হয় না। গাছপালা, মৎস্য খামারসহ পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে আরও প্রায় ২ কোটি টাকার। ওই ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর থেকে ধর্ষণের শিকার নারীকে অপহরণের ঘটনায় ২৯ সেপ্টেম্বর সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী। খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি করা হয়। ওই নারী নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে অপহরণে সহযোগিতা ও তার সহযোগী উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন।
চরমপন্থিদের সঙ্গে সম্পর্ক
স্থানীয় চরমপন্থিদের সঙ্গে নারায়ণ চন্দ্র চন্দের যোগাযোগ ছিল। নিজের বলয় তৈরি করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের বাইরে গিয়ে পছন্দের মাই ম্যানকে বিজয়ী করতে প্রভাব বিস্তার করেন।
ভান্ডারপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. হিমাংশু বিশ্বাস বলেন, ১৬ বছরে নারায়ণ চন্দ্র তিনটি ইটভাটা করেছেন। তিনি এক ছেলের নামে সারের ডিলারশিপ নিয়েছেন। পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যদের চাকরি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ ও ৬ আগস্ট বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ডুমুরিয়ায় তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দোতলা বাড়ির আসবাবসহ গ্যারেজে থাকা দুটি গাড়ি পুড়ে যায়।