উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিশাল রাজস্ব ঘাটতিসহ নানামুখী চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এই চাপ সামলাতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও গতি পায়নি অর্থনীতি।
সরকারের আয় কমেছে। বেড়েছে ব্যয়। বাজেটে অর্থায়নে বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তুলনায় কর আহরণ খুবই কম। কর আদায় আরও বাড়াতে হবে। চলমান ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি আইএমএফের কাছে নতুন করে আরও ৭৫ কোটি ডলার চেয়েছে সরকার। বাড়তি ঋণ পেতে নতুন শর্ত আরোপ করেছে সংস্থাটি। সেটি হলো, কর আহরণ আরও বাড়তে হবে। মূলত আইএমএফের শর্ত পালন করতে গিয়েই অর্থবছরের মাঝপথে এসে শতাধিক পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই সাধারণ মানুষের জীবন নাভিশ্বাস। উপরন্তু পণ্য ও সেবায় সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে তাদের জীবন আরও দুবির্ষহ হয়ে পড়েছে। এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এটি সর্বোচ্চ। ডলারের দাম ১২৩ টাকার বেশি। কিছুটা ইতিবাচক আছে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বাকি প্রায় সব সূচকই তলানিতে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা কাটছে না।
অর্থনীতি যে সংকটে আছে তাতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা কৃষিতে। এ খাতে চলতি প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতের অবস্থাও শোচনীয়। অবশ্য অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনা উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ বড় বড় পদে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার। কিন্তু নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি।
ধুঁকে ধুঁকে চলছে রাজস্ব খাত। এনবিআরের সাময়িক হালনাগাদ হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসেই আদায়ের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আছে এনবিআর।
বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ আসছে, তার চেয়ে বেশি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ কমেছে। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ অনেক ঠিকাদার পালিয়ে থাকার কারণে এডিপির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আগের বছরের তুলনায় জুলাই-নভেম্বর সময়ে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে।
খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি করে নামে-বেনামে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা এখন খেলাপি হতে শুরু করেছে। তা ছাড়া বর্তমান সরকার খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করছে। ফলে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ।
আর এই ঋণের বোঝা বাড়ছে দেশের জনগণের ঘাড়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ঘাড়ে দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ অঙ্ক বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় বাজেটের সমান। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অপর দিকে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে সরকারকে প্রতিবছর ১ লাখ কোটি টাকার বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। এতে করে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। রিজার্ভে সমস্যা। আমদানির সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আরও সমস্যা আছে, যেমন ব্যাংক খাত। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুফল মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, কিছু খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে ব্যাংক খাত, রিজার্ভের সমস্যা কাটেনি এখনো। অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। তবে এর সুফল আসবে কি না, তা বলা মুশকিল।