আসন্ন ঈদুল ফিতরকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলে চলছে জমজমাট কেনাকাটা।
সোমবার (২৪ মার্চ) দুপুর ২টায় রাজধানীর মিরপুরের বেনারসিপল্লিতে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। ঈদের বাকি আর মাত্র কটা দিন। অথচ বেনারসিপল্লির বেশির ভাগ অলিগলিতেই সুনসান নীরবতা। ক্রেতাসংকটে অলস সময় কাটাচ্ছেন অধিকাংশ দোকানের কর্মচারীরা। মূল্যহ্রাসের অফার দিয়েও ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পারছেন না দোকানিরা। অন্যদিকে ক্রেতাসংকটের বাজারেও শাড়ির বেশি দামের অভিযোগ ক্রেতাদের।
মিরপুর বেনারসিপল্লি দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরপুরের বেনারসিপল্লিতে ছোট-বড় মিলিয়ে দোকান রয়েছে ১২৭টি। ঈদ মৌসুমের কেনাকাটায় এবার বিগত ৪০ বছরের মধ্যে কম বিক্রির রেকর্ড হয়েছে। বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র ৫-১০ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় এমনকি করোনার সময়ের চেয়েও কম। এমন পরিস্থিতিতে এই পল্লির অন্তত ২০-২৫টি দোকান বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেক কর্মচারী।
তাওসিফ বেনারসি ফ্যাশনের ডেপুটি ম্যানেজার ফারুক রাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আপা কী বলব। ক্রেতাই পাচ্ছি না এবার। ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ভয়ে অনেকেই কেনাকাটা করছেন না। বিক্রি বলার মতো নয়। এমন পরিস্থিতি বিগত কোনো ঈদে হয়নি। গতকাল সারা দিনে ১ হাজার ২০০ টাকার মাত্র একটি শাড়ি বিক্রি হয়েছে। কর্মচারীদের ইফতার বাবদ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা। এ ছাড়া দোকানের শাটার খুললেই প্রতিদিন গড় খরচ আছে অন্তত ১০ হাজার টাকা। এই দোকানে একসময় (২ বছর আগে) ২৬ জন কর্মচারী ছিল, কমতে কমতে বর্তমানে কর্মচারী মাত্র ৫ জন।’ উল্লেখ্য, তাওসিফ বেনারসি ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী কলিমউদ্দিন মিরপুর বেনারসিপল্লি দোকান মালিক সমিতির সভাপতি।
ঢাকা বেনারসি কুটিরের এক বিক্রেতা জানান, গেল ৫ বছর ধরেই তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এবারের ঈদের এ পর্যন্ত ৫ শতাংশ পণ্যও তারা বিক্রি করতে পারছেন না। তাদের মালিক জানিয়েছেন ঈদের পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন।
স্টার অ্যান্ড স্টাইলস শাড়িঘরের বিক্রেতা মো. আদিল বলেন, ‘মেট্রো স্টেশনের কাজ চলাকালীন এমনকি করোনার সময়ও এমন খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা ছিলাম না। বিক্রি ভালোই হতো। বিগত ছয় মাসে বিগত ৪০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। বিক্রি নেমেছে ৯২ শতাংশ। দোকানে প্রতিদিনের খরচই ওঠানো যাচ্ছে না। মাসে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২-৩ লাখ টাকা।’
ঈদ উপলক্ষে বেনারসিপল্লির বেশ কিছু দোকানে ক্রেতাদের জন্য ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যহ্রাসের অফার চলছে। মনময়ূরী নামে এমন এক দোকানের বিক্রেতা আব্বাস আলী বলেন, ‘আপা ডিসকাউন্ট দেওয়ার পরও ক্রেতা পাচ্ছি না। মানুষ মার্কেটে এবার আসছেই না। যারা আসছেন তাদের অনেকেই দেখে চলে যাচ্ছেন। এখন শাড়ির চেয়ে থ্রি-পিস ও হিজাবের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে মানুষের। অনেক মা-খালাও এখন শাড়ি পড়তে চান না।’

কচুক্ষেত এলাকা থেকে শাড়ি কিনতে আসা মাহমুদা বেগম বললেন, ‘এখন শাড়ি খুব কম পরি। ঈদের পর আমার ছোট বোনের বিয়ে উপলক্ষে কিছু গিফটের শাড়ি কিনেছি।’
রূপ মোহিনী গ্যালারির স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুল হক সুমন বলেন, ‘আগে রোজার শুরু থেকেই ক্রেতার আনাগোনা থাকত। কিন্তু এবার ঈদ ঘনিয়ে এলেও ১০ শতাংশ বিক্রি করতে পারিনি। এবার ক্রেতাদের ভারত যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হওয়ায় ভেবেছিলাম ঈদে বিক্রি ভালো হবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি।’
এ বিষয়ে দিয়া শাড়িজের ম্যানেজার মো. সজীব চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দোকানে রমজানের প্রথম এক সপ্তাহে একটি শাড়িও বিক্রি হয়নি। আর এ পর্যন্ত বিক্রির হার ১০ শতাংশও হয়নি।’ কারণ জানতে চাইলে বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে তিনি দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে দায়ী করেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঈদের পর মিটিং করে পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে বলে জানান মিরপুর বেনারসিপল্লি দোকান মালিক সমিতির নেতারা।