দুই নদীর একই নাম- পিয়াইন। এক পিয়াইন সিলেটের সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাট, অন্যটি কোম্পানিগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত। এদের সংযোগ-উৎস ভারতের মেঘালয় রাজ্য। এ জন্য প্রতি বর্ষায় পিয়াইনের ঢলের জলে প্রবাহিত হয় বালু-পলি-পাথর। এসব আহরণের জন্য আছে তিনটি বালুমহাল। বালু উত্তোলনে এখানে যে কর্মকাণ্ড চলে তা ভয়াবহ। এবার বর্ষা মৌসুমে পিয়াইনের বালুমহাল রীতিমতো রূপ নিয়েছে উন্মুক্ত কারখানায়। ‘বোমা মেশিন’ নামের নিষিদ্ধ যন্ত্রের তাণ্ডবে পিয়াইনের তীর থেকে তলদেশ পর্যন্ত লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। এক সময় এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ সক্রিয় থাকলেও, এখন তৎপর নয়। প্রশাসনের গাছাড়া ভাব। সব চলছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। পুরোনোদের জায়গায় কর্তৃত্ব এখন নতুন বন্দোবস্ত পাওয়া রাজনীতিকদের।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ বোমা মেশিন-লিস্টার-সেইভ-ড্রেজার নামের নানা যন্ত্র চলছে বালুমহালে। তলদেশ যত্রতত্র খোঁড়ায় পিয়াইনের পাড় ভাঙছে। কোথাও ধসে পড়ছে ফসলি জমি। জমির দখলযজ্ঞও চলছে। অথচ বালুমহাল ইজারার শর্তে আছে, আহরণের জন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। বেলচা-বালতি আর পরিবহনের জন্য ছিল বারকি নৌকা। কিন্তু যন্ত্রদানবের তাণ্ডবে এখন এসবের কোনো ব্যবহার নেই।
পিয়ানতীরের বাসিন্দা শিমুলতলা গ্রামের কৃষক ইশরাব আলীর কথা, ‘বোমা মেশিন যদি পাথরমহালে বন্ধ থাকে, তাহলে তা বালুমহাল চলে কী করে?’
এই বোমা মেশিন হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার পাম্পের যন্ত্র। পরিবেশবাদী সংগঠনের সূত্রে জানা গেছে, বোমা মেশিন দিয়ে মাটির প্রায় ৭০ গজ তলদেশ থেকে পাথর তুলে আনায় সিলেটের পাথরমহালে ভূ-প্রকৃতিগত বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। পরিবেশ ও প্রকৃতিতে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। এ অবস্থায় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের প্রবণতা বন্ধে পাথরমহালের ইজারা প্রদান স্থগিত রাখা হয়। এই সুযোগে পাথরমহালে বন্ধ থাকা বোমা মেশিন নির্বিঘ্নে চলছে বালুমহালে। এই যন্ত্রের ব্যবহারে বালুমহালও বেহাল। জলের তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাথরমহালের মতোই ক্ষতির মুখে পড়েছে বালুমহাল। এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এলাকাবাসী, পরিবেশবাদী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসনের সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
পাথরমহাল বন্ধের কারণ
সিলেট জেলায় সায়রাত মহালের ব্যবস্থাপনায় ছয়টি পাথরমহাল রয়েছে। এগুলো থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য শুরু হয়েছিল বোমা মেশিনের ব্যবহার। এতে ভূগর্ভের স্তর পরিবর্তনের শঙ্কা দেখা দিলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর এই মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভূমিধসে অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। শ্রমিকেরা তখন সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের দাবি জানায়। কিন্তু দেশের পাথর, সিলিকাবালু, নুড়িপাথর, সাদা মাটি মহালগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সভায় পরিবেশের সংকট বিবেচনায় ৫১টি পাথরমহালের মধ্যে ১৭টির ইজারা দেওয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এই স্থগিতাদেশের মধ্যে সিলেটের ছয়টি পাথরমহাল রয়েছে।
ইজারাধীন-ইজারাবিহীন একাকার
এদিকে সিলেট জেলায় ইজারাযোগ্য বালুমহাল রয়েছে ২৩টি। এর মধ্যে ১৩টি ইজারাবিহীন। এই সুযোগে দুই উপজেলার পিয়াইনতীরে চলছে তাণ্ডব। কোম্পানীগঞ্জের লামনিগাঁও, শিমুলতলা ও বুড়িডহর এলাকা যেন উন্মুক্ত এক কারখানা। নদীর যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করে বালু উত্তোলন করে তীরে মজুত রাখা হয়েছে। বোমা মেশিন থেকে শুরু করে লিস্টার মেশিন ও সেইভ মেশিনও চলছে। যন্ত্র চালাতে রাস্তাও খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে। ইজারাবিহীন বালুমহালে আনুমানিক প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি ঘনফুট বালুর স্তূপ দেখা গেল।
এদিকে, গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন প্রবাহিত হয়েছে জাফলং ও বিছনাকান্দি দিয়ে। জাফলংয়ে রীতিমত হরিলুট চলছে। বোমা মেশিন ও সেইভ মেশিন বসিয়ে জাফলংয়ের মন্দিরের জুম, কান্দুবস্তি, নয়াবস্তি, জুমপাড়, বেড়িবাঁধ, চা-বাগান, জাফলং সেতু এলাকা এখন ক্ষতবিক্ষত। দুই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, ক্ষতবিক্ষত এলাকা কিছুদিন পরই ঢাকা পড়বে পাহাড়ি ঢলে। তখন লুটপাটের চিহ্ন থাকবে না।
স্টেলিং বাহিনী ও পিয়াইন সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে বালুমহালে বালু উত্তোলন আর কেনাবেচায় দুটো সিন্ডিকেটকে সক্রিয় দেখা গেছে। উত্তোলনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের লোকজন। ৫ আগস্টের পর নতুন চক্রের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন জাফলংয়ের রফিকুল ইসলাম শাহ পরাণ ও শাহ আলম স্বপন। তারাই নেতৃত্বে দিচ্ছেন নতুন সিন্ডিকেটের। ৫ আগস্টের পরে পাথর লুটপাটের ঘটনায় এ দুজনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলাও করেছে।
শাহ পরাণ বিএনপির পদ হারিয়েছেন, তবু ক্ষান্ত হয়নি তার দল। গোয়াইনঘাটের জাফলং, খাসিয়াপুঞ্জি ও প্রতাপপুরের পাথর-বালু লুটপাটে যুক্ত রয়েছে স্টেলিং বাহিনী। এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রক জাহিদ খান, আরিফ ইকবাল নেহাল, সাত্তার, জুবের, কামাল মেম্বার। অভিযোগ রয়েছে, বোমা মেশিন চালাতে দেওয়ার বিনিময়ে এই স্টেলিং বাহিনী প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা চাঁদা তুলছে। এ ব্যাপারে বিএনপিপন্থি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আরিফ ইকবাল নেহালের কাছে চাঁদা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি একে ‘ভুয়া’ বলে এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে বালু ও পাথর কেনাবেচায় সক্রিয় রয়েছে সদ্য গঠিত ‘পিয়াইন সিন্ডিকেট’। বালুমহাল থেকে বালু পরিবহনের জন্য সিলেটে একাধিক নৌপথ ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে পিয়াইন-ইছাকলস-চেঙ্গেরখাল নৌপথের বেশি ব্যবহার হয়। সেখান থেকে গন্তব্য সুনামগঞ্জের ছাতক। পিয়াইন থেকে ছাতক পর্যন্ত পৌঁছে গেলে প্রতি ঘনফুট বালুর দর তিনগুণ বেড়ে যায়। ২৩ টাকা ঘনফুট দরের বালু হয়ে যায় ৭৭ টাকা। বালুমহাল থেকে পরিবহন এবং বোমা মেশিনসহ যাবতীয় যন্ত্র পরিচালনারও নিয়ন্ত্রক এই পিয়াইন সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটটি আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন এই সিন্ডিকেটে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র থেকে পিয়াইন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক ১৪ জনের নাম পাওয়া গেছে। এরা হলেন, সুফি আলম সোহেল, টুটুল (গণেশপুর), ইয়াকুব আলী, উসমান খান, দেলোয়ার হোসেন জীবন, ইকবাল হোসেন আরিফ, জামাল উদ্দিন (বুড়িডহর), আলী আব্বাস, আলী বক্স, সোহেল রানা, আক্কাস আলী, আলমগীর আলম, আজমান আলী ও শওকত আলী।
এদের মধ্যে সুফি আলম সোহেল জামায়াতপন্থি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। তার দাবি, পিয়াইন সিন্ডিকেট নেতিবাচক কিছু নয়। ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। নৌপথকে চাঁদাবাজি-মুক্ত রাখতেই তারা কয়েকজন এখানে সক্রিয় রয়েছেন।
নাগালেও নেই নজরদারি
বেশির ভাগ বালুমহালের অবস্থান যোগাযোগ বিড়ম্বিত এলাকায়। প্রশাসনিক নজরদারিতে এ বিষয়টি প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বালুমহালেও নজরদারি নেই। সিলেট নগরীর আম্বরখানা-বিমানবন্দর সড়কের পাশের ছড়াটির নাম মালনীছড়া। একদিকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আরেক দিকে লাক্কাতুরা চা-বাগান। ছড়ার যে অংশটি বালুমহাল হিসেবে চিহ্নিত, ঠিক সেখানে স্থাপন করা হয়েছে একটা যন্ত্র। ‘হর্স পাওয়ার’ নামের যন্ত্রটির আকৃতি ছোট ও ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় এর লোকপ্রচলিত নাম ‘বিলাই বোমা’। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে তিনজন শ্রমিক পালাক্রমে কাজ করছেন। একজন একটু পর পর মেশিনের গতি ওঠানামা করাচ্ছেন আর বাকি দুজন পাইপের মাথাটিকে ছড়ার পানিতে চেপে ধরছেন। এভাবেই সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বোমা মেশিনটি।
লাক্কাতুরা চা-বাগানের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ছড়া থেকে বালু উত্তোলন বেলচা দিয়ে করার কথা। যন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন করলে তো চা-বাগান ও আশপাশের এলাকার ক্ষতি হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই।
বালুমহাল মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০-এর ‘ভূগর্ভস্থ বা নদীর তলদেশ থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন সংক্রান্ত বিশেষ বিধান’ ৫-এর ১ উপধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না।’ এই আইন লঙ্ঘন করা হলে ইজারা বাতিল করাসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ রয়েছে। এ ছাড়া, ইজারা দরপত্রের ৯ ও ১০ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ।
এ ব্যাপারে সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে স্থানীয় মেম্বারকে অবগত করেছি। আমাদের অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও সেখানে গিয়ে বলে আসবেন। এরপর যদি ইজারাদার নির্দেশনা না মানেন, আমরা সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব।’
সংকটাপন্ন এলাকা আরও সংকটে
গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর জাফলংকে পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার গেজেট প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এই আবেদন করেছিল ২০১২ সালে। এরপর থেকে কয়েকটি ধাপে জাফলং থেকে বালু ও পাথর কোয়ারির ইজারা কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি জাফলংকে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ঘোষণা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে জাফলংয়ের ২২ দশমিক ৫৯ একর জায়গাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়।
উন্মুক্ত শিলাস্তর, চুনাপাথর সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য জাতীয় স্বার্থে ২৫ দশমিক ৫৯ একর ভূমিকে ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ঘোষণার গেজেটে বলা হয়েছিল, ওই ভূমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণ করা হবে। জাফলং ইসিএ–ভুক্ত এলাকা ছাড়াও ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় একটি ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর স্থাপন করা হবে। তবে ১৯৭২ সালে সেখানকার ভূমি অধিগ্রহণ করে মেসার্স জালালাবাদ লাইম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডিং অ্যাসোসিয়েশন। খনি পাথরের ইজারা নিয়ে জাফলংয়ের সোনাটিলাসহ আশপাশের এলাকায় পাথর উত্তোলন করা হলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় ওই প্রতিষ্ঠানকে খনি পাথর আহরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। জালালাবাদ লাইম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডিং অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফসার উদ্দিন জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে সংরক্ষিত এলাকা থেকে বালু তোলার নামে হরিলুট চললেও অধিগ্রহণ করা ভূমির ব্যবস্থাপনার দিকটি অনুপস্থিত।
কর্তৃপক্ষ গাছাড়া
সরকারের রাজস্ব আয়ের জন্য রয়েছে জেলা প্রশাসনের সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা। প্রশাসনের রাজস্ব শাখা প্রতি বাংলা সনে ইজারা দিয়ে মহাল ব্যবস্থাপনাকে হালনাগাদ করে। সিলেটে বালু, পাথর ছাড়াও রয়েছে নাওমহাল ও জলমহাল। এসবের দেখভালে রয়েছে দুটি কর্তৃপক্ষ। একটি জেলা প্রশাসনের সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অন্যটি পরিবেশ অধিদপ্তর। সিলেট জেলা প্রশাসনের সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা দপ্তরে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে গাছাড়া ভাব দেখা গেছে। বালুমহাল থেকে রাজস্ব আদায় শাখার প্রধান হিসেবে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসাইন মো. আল-জুনায়েদের জানা নেই জেলায় কতটি বালুমহাল ইজারাধীন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি উপজেলা প্রশাসন থেকে জেনে নেওয়ার কথা বলেন। বোমা মেশিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বোমা মেশিন বা ড্রেজিং মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ব্যাপারে কিছু জানা নেই। তবে আপনি যখন বলেছেন, আমরা দেখব ব্যাপারটা।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার জানান, বালুমহালে নিয়মিত অভিযান চলছে, মামলাও করা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘যারা বালুমহাল ইজারা নেন তাদেরকে অবশ্যই শর্ত মেনে বালু উত্তোলন করতে হবে। এটা না করলে অবশ্যই এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কারণ জেলা প্রশাসন থেকে বালুর মহাল ইজারা দেওয়া হয়।’
দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ
পরিবেশবাদী সংগঠনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বালু অথবা পাথরমহাল মূলত কায়িকশ্রম নির্ভর ছিল কাজ। বহনের বাহন বারকি নৌকা, বালতি আর বেলচা ছিল শ্রমিকদের হাতিয়ার। কিন্তু সেই কায়িক শ্রমের জায়গা দখল করে নিয়েছে দানবীয় যন্ত্র। তাতে ইজারাদার লাভবান হলেও পরিবেশগত ব্যাপক ক্ষতির কারণে সাধারণ শ্রমিকরা কর্মহারা হয়ে পড়ছেন। দায়িত্ব পালনে প্রশাসনিক ব্যর্থতাও রয়েছে।
‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, ‘পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষার দাবি একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। জনস্বার্থেই এই দাবি। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশাসন উদাসীন। বাস্তবে লড়তে হয় দুই যন্ত্রের বিরুদ্ধে। একটি প্রশাসন যন্ত্র, অন্যটি দানবসদৃশ বোমা মেশিন তথা বালু-পাথর উত্তোলন যন্ত্র। অবস্থা এখন এমন যে, কায়িক শ্রমের অধিকারহারা শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি হবে। নতুবা ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না!’
শ্রমিকের অধিকার বিষয়টি মাথায় রেখে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাথরমহাল শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে না পারাটা এক ধরনের ব্যর্থতা। কেবল পাথরমহাল নয়, সব মহালেই পরিবেশবিনাশী তৎপরতা চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’