‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারির পর থেকে প্রশাসনে তীব্র আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আইন ও বিধি উপেক্ষা করে অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের যাবতীয় ‘প্রস্তাব’ এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আব্দুর রহমান খানের কাছ থেকে।
এই অধ্যাদেশ জারির সময় অবশ্য পালনীয় (বাধ্যতামূলক) প্রশাসনিক ধাপ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে ও সচিব কমিটির সুপারিশ ছাড়াই অধ্যাদেশটি অনুমোদন করানো হয়। জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগকে বাইপাস করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে এই অধ্যাদেশ ঘিরে। বিষয়টি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
অধ্যাদেশ করতে গিয়ে যা যা হয়েছে তাতে এনবিআর চেয়ারম্যানের ভূমিকা এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। যে কারণে এই বিতর্ক, সেগুলো হলো–সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম, রুলস অব বিজনেস সংশোধনে বাধ্যতামূলক ধাপ এড়িয়ে যাওয়া, মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন এবং পদ সৃজনের ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদন না নেওয়া।
সরকারের রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আলাদা করার প্রস্তাব নতুন নয়। জনপ্রশাসনবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। সেখানে প্রস্তাব করা হয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যানের দ্বৈত দায়িত্ব পৃথক করতে হবে। একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি বিভাগ রাজস্বনীতি প্রণয়ন করবে এবং নীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি পৃথক অধিদপ্তর করতে হবে। সেগুলো হলো–আয়কর, শুল্ক ও আবগারি এবং ভ্যাট। কমিশনের সুপারিশের উদ্দেশ্য ছিল নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন তৈরি করা।
কিন্তু কমিশনের সেই সুপারিশ অগ্রাহ্য করে গত বছরের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের বিধান রাখা হয়। পরে সংশোধনী অধ্যাদেশও আনা হয়, যার ফলে পরে সাংবিধানিক ক্ষমতার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভাগ সৃষ্টি করা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরকারি কার্যাবলি বণ্টন ও পরিচালনার জন্য বিধি প্রণয়ন করেন এবং সেই ভিত্তিতে রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ জারি হয়েছে। ওই বিধির ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনবোধে এক বা একাধিক বিভাগ নিয়ে মন্ত্রণালয় গঠন করতে পারবেন। অর্থাৎ বিভাগ সৃজনের এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নয়।
অন্যদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১)(২) অনুযায়ী অধ্যাদেশ সংবিধানের কোনো বিধান লঙ্ঘন করতে পারে না। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অধ্যাদেশের মাধ্যমে নতুন কোনো বিভাগ প্রয়োজন হলে তা করবে নির্বাহী বিভাগ। এই অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগকে পাশ কটিয়ে আইন বিভাগের মাধ্যমে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্টতই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আলোচিত এই অধ্যাদেশ জারির আগেই খসড়া পরীক্ষা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভার কার্যবিবরণীতেও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৬) ও রুলস অব বিজনেসের ৩(১) ধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন শাখার আপত্তিকে উপেক্ষা করে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।
অথচ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০১৮ সালের ২ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় বা বিভাগ গঠন/পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ‘প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি’র সুপারিশ নেওয়া বাধ্যতামূলক, যা এই দুই বিভাগ গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি। দায় এড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বলেছে, নির্বাচন আসন্ন থাকায় সচিব কমিটির বৈঠক আহ্বান করা সম্ভব নয়। সে কারণে ২৯ জানুয়ারি (২০২৬) কেবল প্রস্তাবিত সারসংক্ষেপে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারির লক্ষ্যে ‘রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর প্রযোজ্য অংশ’ সংশোধন এবং ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস প্রণয়ন/সংশোধনের’ প্রস্তাব করা হয়। অথচ ১ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ‘সভা সম্ভব নয়’ এই যুক্তি তথ্যভিত্তিক নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, যা পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশ নেওয়া বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
আরও অভিযোগ, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ কাটাছেঁড়া করে সংশোধনী এনে তা পরিপত্রের মাধ্যমে অনুমোদন করেন প্রধান উপদেষ্টা। সংশোধনীকে ‘জায়েজ’ করার জন্য পৃথক গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অধ্যাদেশ জারির জন্য ‘লুকোচুরি’ করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। রুলস অব বিজনেসের বিধি ১২ ও ১৩ অনুযায়ী, কোনো বিভাগ পুনর্গঠন, পদ সৃজন বা সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনের আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন আবশ্যক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, শত শত পদ সৃজন ও পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, পরে ‘ভূতাপেক্ষভাবে’ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটিতে বিরাজমান আইন ও বিধিকে উপেক্ষা করে ‘নির্বাহী বিভাগ’কে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
অধ্যাদেশে পদ সৃজনের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘রাজস্ব নীতি বিভগে’ প্রায় ৪০০ জনবল এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে’ প্রায় ৭৯০ জনবলবিশিষ্ট কাঠামো গঠন করা হবে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পদ উন্নীতকরণের প্রস্তাবও রয়েছে সেখানে। প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী আগে সম্মতি নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তাব নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিভাগ দুটির নীতি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্র নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। রুলস অব বিজনেসের ৪(৯) ধারায় বিভাগগুলোর কাজ নীতি প্রণয়ন ও তত্ত্বাবধানে সীমাবদ্ধ। কিন্তু অধ্যাদেশের ৮ ধারায় ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’-এর কাজ হিসেবে রাজস্বনীতি ও আইন বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতি বাস্তবায়ন করা অধিদপ্তর বা মাঠপর্যায়ের সংস্থার কাজ। এটি বিভাগের দায়িত্ব নয়। ফলে এটি রুলস অব বিজনেসের কাঠামোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের দাবি, কর ও কাস্টমস ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দুজন সচিব পদ নিশ্চিত করতেই এ তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের প্রস্তাব অনুমোদন নাও পেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
এদিকে এরই মধ্যে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর বাস্তবায়ন স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছে সংক্ষুব্ধ পক্ষ। রিট আবেদনে অধ্যাদেশটি সংবিধানের ২৬৩১ এবং ২৯(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আইনি ক্ষমতার বাইরে উল্লেখ করে এর কার্যকারিতা স্থগিত করার আবেদন করা হয়েছে।