বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সঙ্কটের সবচেয়ে করুণ স্বাক্ষী হতে যাচ্ছে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার তীব্র পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক টানপোড়নে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে দেশগুলো। এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে প্রায়ই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হচ্ছে তারা।
কয়েক দশক ধরেই কার্বন নিঃসরণের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়নে নিচু দ্বীপগুলো পানিতে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়া সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন। সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কিছু নিচু দ্বীপ ইতোমধ্যেই পানিতে ডুবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিশ্বের অন্যান্য নিচু দ্বীপগুলোও বন্যার কারণে ব্যাপক অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্যে রয়েছে।
২০৫০ সাল নাগাদ এসব সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলের প্লাবন তিনগুন বেড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে ১১ গুণ। তাই আসন্ন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশগুলো।

জমি পুনরুদ্ধার
অবশ্যম্ভাবী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে অভিনব পদ্ধতি হচ্ছে জমি পুনরুদ্ধার। মালদ্বীপে এই পদ্ধতির ব্যাবহার সবচেয়ে বেশি। প্রায় ১ হাজার ২০০টি ছোট দ্বীপ মিলে গঠিত এই দেশের ভূখণ্ড পুরো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিচু অবস্থানে রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দ্রুতই এই দেশ প্লাবিত হয়ে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
এই সমস্যার সমাধান করতে জমি পুনরুদ্ধার পদ্ধতি অবলম্বন করছে তারা। কয়েক দশক ধরে চলমান ব্যয়বহুল এই প্রকল্পের অধীনে ১৮৬টি দ্বীপের মাটি প্রায় তিন মিটার উঁচু করা হয়েছে।
তবে এই পন্থায় আবার অন্য সমস্যা রয়েছে। মাটি উঁচু করার কারণে ম্যানগ্রোভ ও প্রবাল প্রাচীর ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে দুর্যোগ প্রতিরক্ষার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
২০২৩ সালে করা এক গবেষণার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মালদ্বীপের জমি পুনরুদ্ধারের কারণে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা আরও বাড়ছে। এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘জলবায়ু বিপর্যয়ের দুষ্টচক্র’ বলে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।
মালদ্বীপের জলবায়ু বিষয়ক কর্মকর্তা বিষয়টির বিরূপ প্রভাব স্বীকার করলেও বর্তমান পরস্থিতিতে জমি পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘দেশের চারপাশেই সমুদ্র। এমন পরিস্থিতিতে ভূখণ্ডের সুরক্ষাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।’
তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেষ্টাও করছেন বলে জানান তিনি।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি
সমুদ্রবাঁধ নিমার্ণের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে অনেক দ্বীপরাষ্ট্র। সেশেলস ও সামোয়াতে এই ধরণের পদ্ধতি দেখা যায়। তবে সামুদ্রিক ভাঙ্গন ও প্লাবন সাময়িকভাবে সামলানো গেলেও বাঁধগুলো মজবুত না হওয়ায় তা সহজেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সমস্যার সমাধান করতে কিছু দেশ আবার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে। ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে প্লাবন ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে তারা।

নাগরিকত্ব বিক্রি
জলবায়ুর এই সঙ্কট মোকাবিলায় প্রচুর অর্থের যোগান দরকার। ছোট অর্থনীতির দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর এই সক্ষমতা নেই।
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ডোমিনিকা দ্বীপ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তবে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে তাদের নেওয়া অভিনব পদ্ধতি হলো- নাগরিকত্ব বিক্রি। এতে ২ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে যে কেউ দেশটির নাগরিক হতে পারবে। এই খাত থেকেই বার্ষিক জিডিপির ৩০ শংতাশ অর্জন করছে ডোমিনিকা।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্যোগ সতর্কতা পদ্ধতি ও ভূমিধ্বসপ্রবণ অঞ্চলের স্থিরতা টিকিয়ে রাখতে এই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
তবে এতে কিছুটা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছে উন্নত দেশগুলো। ডোমিনিকার নাগরিকরা আগে ভিসা ছাড়াই যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ করতে পারতেন। তবে সম্প্রতি এই সুবিধা বাতিল করেছে যুক্তরাজ্য প্রশাসন।

অনুদানের চাপ সৃষ্টি
দীর্ঘদিন ধরেই দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর কাছে অনুদান দাবি করে আসছে দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৯ এ বার্ষিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার দাবি করে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের জোট এওএসআইএস।
তবে সব উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলার অনুদান দিতে রাজি হয়েছে উন্নত দেশগুলো।
এ বিষয়ে এওএসআইএসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিকাই রবার্টস বলেন, ‘আমাদের অঞ্চল যে পরিমাণ ক্ষতি সামলাতে হচ্ছে অর্থ সহায়তা দিয়ে সেটার ক্ষতিপূরণ হয় না।’
আইনগত ব্যবস্থা
কিছু দেশ জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় আইনের সাহায্য নিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোকে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করছে তারা।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের পদক্ষেপের নিশ্চয়তা আদায় করেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতু।
এ ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হলেও ভবিষ্যতে জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলার পথ কিছুটা সুগম হয়েছে বলে ধারণা পরিবেশবাদীদের।
বাসস্থান স্থানান্তরের প্রচেষ্টা
নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার কারণে ফিজি সরকার বাসিন্দাদের উচু অঞ্চলগুলোতে পাঠাচ্ছে।
টুভালু দ্বীপ আরও বেশি সঙ্কটের মুখে পড়েছে। ভূখণ্ডের প্রায় পুরোটাই তলিয়ে যাওয়ায় দেশের একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করছে দেশটির সরকার। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টাই এই পদক্ষেপ। সূত্র: বিবিসি
নাইমুর/পপি/