মিশরের কুমির দেবতা ‘সোবেক’-এর উদ্দেশে প্রাচীন মিশরীয়রা নিয়মিত কুমির মমি করতেন। সেইরকমই এক ৭.২ ফুট লম্বা, প্রায় ৩ হাজার বছর পুরোনো কুমিরের দেহ নিয়ে নতুন গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়কর সব তথ্য। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই মমিটি পরীক্ষা করেন—যাকে সংরক্ষণ করা আছে বার্মিংহাম মিউজিয়ামে, নাম ২০০৫.৩৩৫।
মানুষের মমি তৈরির সময় ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করে ফেলা হতো, কিন্তু সোবেক দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গকৃত কুমিরের মমি তৈরিতে অঙ্গগুলো অক্ষত রাখা হতো। এই কারণেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন ভেতরের অঙ্গ পরীক্ষা করতে পারছেন।
নমুনাটি নষ্ট না করেই ভেতরের অংশ দেখা যায়—এ কারণে গবেষকরা এক্স–রে এবং সিটি–স্ক্যানের মতো অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। স্ক্যান করে দেখা যায়, কুমিরের পাকস্থলীতে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায় এমন কিছু পাথর (গ্যাস্ট্রোলিথ) রয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে মিলল আরও চমক—একদম অক্ষত মাছ, যা একটি ব্রোঞ্জের হুক দিয়ে টোপ হিসেবে লাগানো ছিল।
গবেষকদের মতে, কুমিরের শেষ খাবার আর মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান খুব কম ছিল—কারণ গ্যাস্ট্রোলিথগুলো তখনো পাকস্থলীতে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ কুমিরটিকে সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই মাছ ও হুক দিয়ে ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল, সোবেকের উদ্দেশে উৎসর্গ করার জন্য।
গবেষক লিডিয়া ম্যাকনাইট বলেন, আগে এমন গবেষণায় মমির আবরণ খুলে অটপসি করতে হতো, ফলে মূল্যবান নমুনা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এখন ৩ডি রেডিওগ্রাফি প্রযুক্তিতে কোনো ক্ষতি ছাড়াই ভেতরের ছবি পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, তারা স্ক্যান করা ডেটা দিয়ে কুমিরের পাকস্থলীতে থাকা ব্রোঞ্জের হুকটির একটি ভার্চুয়াল প্রতিরূপও তৈরি করেছেন যাদুঘরের প্রদর্শনীর জন্য।
প্রাচীন মিশরীয়রা কীভাবে হুক বানাতেন—সেটিও জানা গেছে। তখন তারা মাটির ছাঁচ তৈরি করে জ্বালানো কয়লার আগুনে গলিত ধাতু ঢেলে দিতেন— যা আজকের কাস্টিং পদ্ধতির সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল রয়েছে।
যদিও এই বিশেষ কুমিরটির মৃত্যু ছিল ভয়াবহ, মিশরীয় সমাজে কুমিরকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো। শক্তি, সাহস আর সন্তানদের প্রতি কোমল আচরণের কারণে তারা ‘পবিত্র প্রাণী’ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, সোবেকের উপাসনাকারী ‘কুমির উপাসক গোষ্ঠী’ বিশেষভাবে কুমির পালনও করত। ফাইয়ুম নগরের মন্দির এলাকায় হাজার হাজার কুমিরের মমি পাওয়া গেছে—অনেকগুলোই শিশু কুমির।
কিন্তু হাজার বছরের সেই বলিদান প্রথাই আজ বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিচ্ছে প্রাচীন মিশরের অজানা অধ্যায়।
মেহেদী/