সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক এক পদক্ষেপে নেদারল্যান্ডস ভারতের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে একাদশ শতাব্দীর চোল আমলের বিরল তাম্রলিপির সংগ্রহ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইউরোপ সফরে শনিবার (১৬ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রত্নবস্তু ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই প্রত্যর্পণকে ভারত-নেদারল্যান্ডস সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপে ‘লাইডেন প্লেটস’ নামে পরিচিত এই তাম্রলিপিগুলো চোল সাম্রাজ্যের ইতিহাস, প্রশাসন, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। ভারত ২০১২ সাল থেকেই প্রত্নবস্তুগুলো ফেরত চেয়ে আসছিল।
প্রত্যেক ভারতীয়ের জন্য গর্বের মুহূর্ত
নেদারল্যান্ডসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি এই প্রত্যাবর্তনকে প্রত্যেক ভারতীয়ের জন্য গর্ব ও আনন্দের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই তাম্রলিপি শুধু প্রত্নসম্পদ নয়, বরং ভারতের হাজার বছরের সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষ্য।
বর্তমানে সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালিসহ পাঁচ দেশের সফরে রয়েছেন মোদি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাত্রাবিরতির পর শুক্রবার তিনি নেদারল্যান্ডসে পৌঁছান।
কী রয়েছে এই তাম্রলিপিতে?
এই তাম্রলিপিগুলো সম্রাট রাজারাজা চোল ১-এর আমলের। রাজরাজ চোল-১ এর জন্ম নাম অরুলমোঝি বর্মন। তিনি ছিলেন চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী সম্রাট। তিনি ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তার দক্ষ নেতৃত্ব, সামরিক বিজয় এবং প্রশাসনিক সংস্কার দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
প্রায় ৩০ কেজি ওজনের এই সংগ্রহে রয়েছে ২১টি তাম্রফলক, যা একটি ব্রোঞ্জের বলয়ের মাধ্যমে একত্রে বাঁধা। বলয়টিতে চোল সাম্রাজ্যের রাজকীয় সীলমোহর খোদাই করা আছে। শিলালিপির কিছু অংশ সংস্কৃত ভাষায় এবং বাকিগুলো প্রাচীন তামিলে লেখা।
নথিগুলোতে নাগাপত্তনমের একটি বৌদ্ধ বিহারের জন্য জমি ও অনুদান প্রদানের বিবরণ রয়েছে।
গবেষকদের মতে, এগুলো সেই সময়কার ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি এবং দক্ষিণ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার সমুদ্রপথের যোগাযোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে চোলদের সম্পর্কের প্রমাণ
ইতিহাসবিদদের মতে, তাম্রলিপিগুলো শুধু প্রশাসনিক দলিল নয়, বরং চোল সাম্রাজ্যের আন্তর্জাতিক প্রভাবেরও প্রমাণ। শিলালিপিতে শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বর্তমান ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল।
চোলদের নৌশক্তি সেই সময় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করত। এই তাম্রলিপিগুলো সেই সামুদ্রিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
কীভাবে ইউরোপে পৌঁছায় এই প্রত্নবস্তু?
অষ্টাদশ শতকে ফ্লোরেন্টিয়াস ক্যাম্পার নামে এক ডাচ পণ্ডিত ও মিশনারি এই তাম্রলিপিগুলো নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যান। সে সময় নাগাপত্তনম ডাচদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে প্রত্নবস্তুগুলো নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে সংরক্ষিত হয় এবং ‘লাইডেন প্লেটস’ নামে পরিচিতি পায়।
দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো মূলত গবেষক ও শিলালিপি বিশেষজ্ঞদের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত ছিল। তবে বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক উপন্যাস পন্নিইন সেলভান এবং পরবর্তীতে নির্মিত চলচ্চিত্রের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই তাম্রলিপির পরিচিতি ব্যাপকভাবে বাড়ে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার অভিযান
গত কয়েক বছরে ভারত বিদেশে পাচার হওয়া বহু প্রত্নসম্পদ ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও শতাধিক প্রত্নবস্তু ইতোমধ্যে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চোল তাম্রলিপির প্রত্যাবর্তন সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কারণ এটি শুধু একটি প্রত্নবস্তু নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, ভাষা, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সামুদ্রিক সভ্যতার অমূল্য দলিল। সূত্র: এনডিটিভি
অমিয়/