ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় আহত ২ বাংলাদেশি শহরেই বেশি হামের প্রকোপ মিরসরাইয়ে ১৫ দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গে যমজ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি করে ভাঙারিতে বিক্রি, গ্রেপ্তার ২ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদক কারবারের অভিযোগে হাত-চোখ বেঁধে যুবককে নির্যাতন ঝিনাইদহে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বিশ্ব পরিবেশ দিবস: গ্রিন কনসার্ন’স ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ দিল্লিতে দগ্ধ ৮ বাংলাদেশির ৩ জনের অবস্থা গুরুতর রংপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে মারধরের অভিযোগে ওসি ক্লোজড চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা দুপক্ষের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র নান্দাইল, ১৪৪ ধারা জারি খলিলুর রহমান কীভাবে সামলাবেন দুই দায়িত্ব গাছ থেকে পড়ে প্রাণ গেল গৃহবধূর ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ৬ নবজাতকের মৃত্যু: আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শোকজ ঘুরতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই বন্ধুর চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে: নজরুল ইসলাম প্রতিবন্ধী শিশুদের সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে ৫ জনের মৃত্যু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে: জি এম কাদের যে বিশ্বাস মানুষের জীবনে এনে দেয় অভাবনীয় ৬টি পরিবর্তন? জনমুখী শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় জাতীয় সংসদ: স্পিকার চামড়া নৈরাজ্য অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত ৫ জুন পপ গুরু আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকী গাজীপুরে বাসচাপায় অটোচালকসহ নিহত ২ আছিয়া থেকে রামিসা: বিচার কোথায়? প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ঈশ্বরগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় তরুণের মৃত্যু, চেয়ারম্যানসহ ৩১ জনের নামে মামলা
Nagad desktop

ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে গাজীপুর: গবেষণা

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৫ পিএম
ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে গাজীপুর: গবেষণা
গাজীপুরের বনাঞ্চল। ছবি: সংগৃহীত

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে গাজীপুর পরিবেশগত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গাজীপুরের ৬০ শতাংশ বন উজাড় এবং ৫০ শতাংশ জলাধার দখল করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সহযোগিতায় রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগে ‘গাজীপুর জেলার পরিবেশগত অবস্থা: পরিণতি ও ভ্রমণ’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালিত হয়।

এই গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

২০০০ সালের গাজীপুরের বনাঞ্চলের আয়তন ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। ২০২৩ সালে তা কমে ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টর হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরে বনাঞ্চল কমেছে ৫৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

২০০০ সালে জলাশয় ছিল ১১ হাজার ৪৬২ হেক্টর। ২০২৩ সালে কমে তা ৫ হাজার ৫৬৮ হেক্টর হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে জলাশয়ের আয়তন কমেছে ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো এলাকায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল এবং ৭ থেকে ১৪ শতাংশ জলাশয় রাখা উচিত। কিন্তু গাজীপুরে এখন মাত্র ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বনভূমি এবং ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ জলাশয় রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুরে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে এসে বসবাস করছে। এ কারণে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৫১ শতাংশ, যেখানে গ্রামীণ জনসংখ্যা ২ দশমিক ০৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

মূলত শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের কারণে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে। এখন কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যার ৬১ দশমিক ৫২ শতাংশ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কর্মরত।

২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। শিল্প কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি এই এলাকার বন ও জলাশয় দখলের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

২০০০ সালে জেলার জমির ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বনাঞ্চল, ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ জলাশয়, ৫০ দশমিক ২১ শতাংশ বসতি, ৫ দশমিক ২১ শতাংশ শিল্প এলাকা, ১০ দশমিক ২১ শতাংশ কৃষি এলাকা এবং ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ খোলা জায়গা ছিল।

২০২৩ সালের মধ্যে এসব পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন দেখা গেছে। এ সময় বসতি এলাকা ৬৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং শিল্প অঞ্চল ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে বনাঞ্চলের পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জলাশয় ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ, কৃষি এলাকা ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং উন্মুক্ত স্থান শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ হয়েছে।

গত দুই দশকে গাজীপুরে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের কারণে প্রায় ২৩ হাজার ৭৬৯ একর বা ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে।
গাজীপুরের বাস্তুতন্ত্র ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য খাল, নদী, জলাভূমি দূষণ ও দখলের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে।

গবেষণায় তুরাগ, লাবান্দা, টঙ্গী, মোগর ও চিলাই নদীসহ প্রধান জলাশয়গুলোতে ২৪৭টি প্রধান স্থান দখল এবং ১৬১টি সক্রিয় দূষণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।

মার্কাস বিল থেকে আসা শিল্পবর্জ্যের কারণে তুরাগ নদী মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। আর লাবন্দা নদী প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ১৫টি পৌরসভার বর্জ্য লাইন এবং ৩৯টি দৃশ্যমান শিল্প বর্জ্য লাইনের কারণে দূষিত হয়েছে।

জবরদখলের কারণে মোগর খালেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং মাটি ভরাটসহ ৩৪টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তুরাগ নদীর তীরে অবৈধ ইটভাটার কারণে দূষণ ও দখল বেড়েছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে হচ্ছে। এদিকে কৃষিকাজ ও মাছ ধরার মতো ঐতিহ্যবাহী জীবিকা ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন।

গবেষণায় গাজীপুরের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় পৌর ও জাতীয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আরও অবক্ষয় রোধ করতে এবং জেলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের জন্য শক্তিশালী পরিবেশ নীতি এবং তার কার্যকরী প্রয়োগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: ইউএনবি

সুমন বিশ্বাস/

বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা
ছবি : খবেরর কাগজ

কয়েক একরের বিশাল দিঘিজুড়ে সবুজের মেলা, তার মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে হাজারও বিরল শ্বেতপদ্ম। অথচ ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বরিশালের এই বিখ্যাত পদ্মপুকুরের সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় প্রবেশ। প্রায় এক মাস ধরে কার্যকর থাকা এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বরিশাল শহরের রাজাবাহাদুর সড়কে বিআইডব্লিউটিএর বিশ্রামাগার ‘হিমনীড়’-সংলগ্ন পুকুরটিতে প্রতিবছর এই সময়ে শ্বেতপদ্মে ছেয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক দর্শনার্থীকে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য দেখছেন। কয়েকজন কিশোরও ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ পায়নি। অনেকে আক্ষেপ করছেন, বছরের এই একটি সময়ে ফোটা বিরল শ্বেতপদ্মগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে আসা মাহবুব মাসুম নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘শনিবার অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দেখাতে এনেছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা আনসার সদস্যরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের ফুল দেখালাম।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘এত সুন্দর ও দর্শনীয় একটি জায়গা সাধারণ মানুষের জন্য এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বরিশালের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।’

পুকুরটির পাহারায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জানান, কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশেই তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, কিছু দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে পদ্মফুল টেনে ছেঁড়েন এবং আশপাশের বাগানের ক্ষতি করেন। এ ছাড়া কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ-তরুণী দীর্ঘসময় ধরে ভেতরে বসে আপত্তিকর আচরণ করেন। মূলত এই সামাজিক পরিবেশ রক্ষা ও ফুল বাঁচানোর তাগিদেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসাইনের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শিশির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই পদ্মপুকুর বরিশালের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানকার শ্বেতপদ্ম অত্যন্ত বিরল প্রজাতির। ফলে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা ও দেখার নাগরিক অধিকার সবার আছে।’

তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘পুকুরটির ঠিক পাশেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল কার্যালয় এবং তাদের ঐতিহাসিক বাংলো ‘হিমনীড়’ অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীরা ডিউটি করেন। এত নজরদারির মধ্যে কিশোর-কিশোরী বা যুবকদের পক্ষে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তবে তা শক্ত হাতে দমন করার দায়িত্ব তো নিরাপত্তাকর্মীদেরই।’

শহীদুল ইসলাম শিশির পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী চাওয়া যেতে পারে কিংবা আরও আনসার সদস্য নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও প্রকৃতির সুন্দর একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ইমন অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মপুকুরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষণের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। দর্শনার্থীরা সীমানাপ্রাচীরের বাইরে থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নগরের বান্দ রোড এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ব্যবস্থাপক জার্মান নাগরিক মি. ইলিনগর বিশেষভাবে শ্বেতপদ্মের চারা সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। এর পর থেকেই পুকুরটি ‘পদ্মপুকুর’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত পুকুরজুড়ে শ্বেতপদ্মের সমারোহ দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

মঈনুল ইসলাম সবুজ/ খাদিজা রুমি/

দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের
চট্টগ্রাম শহরের এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অনন্যা আবাসন প্রকল্প এলাকার ঝোপে কাঠ বগ। ছবি: লেখক

২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জার মুনির ভাই ও তার স্ত্রী পক্ষী আলোকচিত্রী তানিয়া খানকে নিয়ে ছুটে চলেছি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্যের দিকে। রাস্তার জায়গায় জায়গায় কাদা।

কাজেই অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বালিহাঁসের বাক্সগুলোর দিকে যাচ্ছি। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি ঢোল কলমি ও কচুরিপানায় পূর্ণ। হঠাৎই তানিয়া আপার চিৎকার ‘পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে!’ ‘কই? কই? দেখছি নাতো।’ আমি বললাম।

উত্তর এল ‘ওই তো উড়ে যাচ্ছে।’ ‘হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি।’ ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। কাঠের মতো হলদেটে রঙের লম্বা ঠোঁটের পাখিটি খানিকটা উড়ে গিয়ে ঢোল কলমিগাছের নিচে বসল। পটাপট কয়েকটা ছবি তুললাম। মনটা ভরে গেল দুর্লভ পাখিটিকে দেখে।

এরপর ওকে বহুবার দেখেছি ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও পূর্বাচল, গাজীপুরের পুবাইল, রাজশাহীর মোহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিল, চুয়াডাঙ্গার বেলগাছিসহ দেশের বহু স্থানে।

গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় দিনের জন্য গেলাম বন্যপ্রাণী চিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য। পরীক্ষা দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। কাজেই সকালে কোনো কাজ নেই। কাজেই ২১ এপ্রিল ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অবস্থিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্প এলাকায় চলে গেলাম।

একসময় এখানে গ্রাম, বিল ও জলাশয় ছিল। এখনো খানিকটা রয়েছে। পুরো প্রকল্পটি প্লটে ভাগ করা থাকলেও কোনো প্লটেই ঘরবাড়ি ওঠেনি। তাই পুরো এলাকাটি ঘাসবন, হোগলাবন ও গাছপালায় ছেয়ে গেছে। আর আবাস গেড়েছে লালটুপি ছাতারে, হলদে-পেট টুনি, লালবুক ঘুরঘুরিসহ বেশ কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখি।

সকাল ৭টা নাগাদ সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় ৫০ মিনিটে পুরো প্রকল্প এলাকা হেঁটে ১২ প্রজাতির পাখির দেখা পেলাম। এরপর এক ঝাঁক কালোমাথা মুনিয়া দেখে হোগলাবনের সামনে এলাম। কিন্তু মুনিয়ার ছবি তোলার আগেই পাখিগুলোর ঠিক সামনে একটি ঝোঁপে হঠাৎই ১৪ বছর আগে শ্রীমঙ্গলে

দেখা লম্বা ঠোঁটের ছোট্ট হলদে পাখিটির মতো একটি পাখি এসে নামল। আর যায় কোথায়? ক্যামেরার শাটারে ক্লিক ক্লিক ধ্বনি শুরু হলো। তবে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে ১৯টি ছবি দিয়ে পাখিটি দ্রুত সামনের দিকে উড়ে গেল।

চট্টগ্রামের অনন্যার হোগলা বনে ও বাইক্কা বিলে দেখা পাখি আর কেউ নয় এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি কাঠ বগ। হলদে বগ বা হলুদ বগলা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Yellwo Bittern। আরডেইডি (Ardeidae) গোত্রের বকটির বৈজ্ঞানিক নাম Ixobrychus sinensis (ইক্সোব্রাইকাস সাইনেনসিস)। বাংলাদেশ ছাড়াও সাইবেরিয়াসহ পুরো এশিয়াজুড়ে পাখিটিকে দেখা যায়।

কাঠ বগ ছোট আকারের বগলা। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৬-৩৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ৮১-১০৪ গ্রাম। গলা ছোট ও ঠোঁট লম্বা। পুরুষের দেহের ওপরটা হলদে-বাদামি ও নিচটা হালকা হলদে। ডানা হালকা হলুদ। ডানার মাঝের ও প্রান্তের পালকগুলো কালো ওড়ার সময় যা স্পষ্ট দেখা যায়।

কোমর ও লেজের পালক কালচে। মাথা ও গলা খয়েরি; মাথার টুপি কালো। চোখ কমলা-হলুদ। চঞ্চু হলদে। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলদে-সবুজ। স্ত্রীর মাথার টুপি, গলা ও বুক বাদামি রেখাযুক্ত। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে মায়ের মতো হলেও দেহের নিচের দিকে বাদামি রেখার পরিমাণ বেশি। তা ছাড়া পিঠের ওপরটা হলদে ফোঁটাযুক্ত।

এ দেশের সব বিল ও বাদায় বাস করতে সক্ষম হলেও এদের সিলেট বিভাগের জলাধারগুলোতেই বেশি দেখা যায়। এরা নলবন, ঢোল কলমি, কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদপূর্ণ জলাধার, বিল, বাদা, খাল, পুকুর ও ধানখেতে বিচরণ করতে পছন্দ করে। একাকী চরে বেড়ায়।

অত্যন্ত সাবধানি ও লাজুক পাখিগুলো সচরাচর কোনো পাতা বা উদ্ভিদের নিচে লুকিয়ে থেকে ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি শিকার করে খায়। এদের গায়ের রং পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলে সহজে নজরে আসে না। কেবল ওড়ার সময়ই চোখে পড়ে। সকাল ও পড়ন্ত বিকেলে বেশি তৎপর থাকে। সচরাচর উচ্চস্বরে ‘কেকের-কেকের---’ বা ‘কাকাক-কাকাক---’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য ‘ক্রিউ-ক্রিউ---’ একটিমাত্র শব্দে ডাকে ও প্রজনন নৃত্য করে। জলার পাশের ঘন ঝোপ, কচুরিপানা, পানিতে ঝুলে পড়া উদ্ভিদ, প্লাবিত ধানগাছ ইত্যাদিতে অতি গোপনে বাসা বানায়।

ডিম পাড়ে ৪-৬টি, রং ফ্যাকাশে নীলচে-সবুজ। মা-বাবা দুজনেই তা দিয়ে ১৬-২১ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। ছানাদের বয়স ১৪-১৬ দিন হলেই ওরা বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা বেলি ফুল। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: লেখক

স্নিগ্ধ সাদা রং, মন-মাতানো সুবাস আর অতুলনীয় কোমলতার এক অপরূপ প্রতীক হলো বেলি ফুল। এর মোহনীয় সুবাস আর ধবধবে সাদা পাপড়ি বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac,  এটি  Oleaceae  পরিবারের একটি  জনপ্রিয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই ফুলের আদি নিবাস  দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই ফুল জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। 

বেলি মূলত একটি মাঝারি আকৃতির গুল্মজাতীয় বা লতানো গাছ। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। বেলি ফুল সাধারণত গুচ্ছাকারে ফোটে।  পাপড়ির বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বেলি ফুল কয়েক জাতের হয়। এক পাপড়ির বেলি আকারে কিছুটা ছোট  এবং এর সুবাস অত্যন্ত তীব্র হয়। মাঝারি বেলিতে  পাপড়ির স্তর কিছুটা বেশি থাকে। থোকা বেলি গোলাপের মতো ঘন পাপড়িযুক্ত এবং আকারে বেশ বড় হয়।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই বেলি ফুল ফোটার ধুম পড়ে। মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল বেলি ফুল ফোটার প্রধান সময়। বিকেলের ম্লান আলোয় এই ফুল ফুটতে শুরু করে এবং সন্ধ্যার পর এর সুবাস চারপাশ মুখরিত করে তোলে। বেলি ফুল চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী। রোদেলা জায়গায় এই গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত দোআঁশ মাটিতে বেলি ভালো হয়। বছরের চৈত্র মাস থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত বেলিফুল ফোটার প্রধান সময়। কাটিং বা কলমের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ফুলের বংশবিস্তার করা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

শীতকালে বেলি গাছ একপ্রকার সুপ্তাবস্থায় থাকে। তাই শীতের শেষে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) গাছের ডালপালা হালকা ছাঁটাই করে দিলে বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর নতুন কুঁড়ি আসে।

বেলি শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেলি ফুলের চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বাঙালির যেকোনো উৎসব, বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নারীদের খোঁপার শোভা বর্ধনে কিংবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার। এর তীব্র ও মনমাতানো ঘ্রাণের জন্য পারফিউম, কসমেটিকস এবং ধূপকাঠিতে বেলিফুলের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনায় বেলিফুল পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেলি ফুলের সুগন্ধি তেল (Jasmine Essential Oil) অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নামি-দামি পারফিউম, সাবান, সুগন্ধি তেল এবং বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বেলির পাতা ও ফুলের ব্যবহার রয়েছে। এর সুবাস মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। অনেক দেশে বেলির শুকনা পাপড়ি দিয়ে সুগন্ধি ‘জেসমিন টি’ বা চা তৈরি করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, হজমে সাহায্য করে। এ ছাড়া এর পাতা ও শিকড় নানা চর্মরোগ সারাতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

আমাদের সাহিত্যে ও গানে বেলিফুলের উপস্থিতি বিশাল। বেলিফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মিকী প্রতিভা গীতিনাট্যে  লিখেছেন, 

‘বেলি ফুল, বেলিফুল,
কার খোঁপায় হবি ব্যাকুল
কার গলায় মালিকা হয়ে
সুবাস দিবি আকুল করে।’ 
বেলিফুল কিন্তু ফিলিপিন্সের জাতীয় ফুল। সেখানে একে বলা হয় ‘সাম্পাগুইতা’ (Sampaguita)। এটি সেখানে বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

শহুরে ব্যালকনি বা ছাদবাগান থেকে শুরু করে গ্রামীণ উঠোন—সবখানেই বেলি ফুল তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল। এর সরল সৌন্দর্য এবং তীব্র ও স্নিগ্ধ সুবাস আমাদের মনকে সতেজ করে তোলে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে ঘরের কোণে এক গোছা বেলি ফুল এনে দিতে পারে এক টুকরো অনাবিল শান্তি ও সতেজতা।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। খবরের কাগজ

নিজ আবাস হারিয়ে বনের প্রাণীরা এখন শহরের দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছে, নিঃশব্দ আর্তনাদ নিয়ে। ক্রমাগত বনভূমি ধ্বংস, খাদ্য ও নিরাপত্তার সংকট তাদের ঠেলে দিচ্ছে মানুষের বসতির দিকে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এ যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক জীববৈচিত্র্যের মর্মান্তিক গল্প।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, চলতি বছরের ৩ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এই এক মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি বন্যপ্রাণী। এদের মধ্যে রয়েছে অজগর, পদ্ম গোখরা, তক্ষক, বন বিড়াল, চিতা বিড়াল, জঙ্গল প্যাঁচা, সবুজ ফনিমনসা এবং বিপন্ন লজ্জাবতী বানরের মতো সংবেদনশীল প্রজাতি যারা একসময় গভীর বনে নির্ভয়ে বিচরণ করতো।

তিনি আরও জানান, তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি কিংবা দোকানপাট থেকে এসব প্রাণীকে উদ্ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীগুলো থাকে আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। তাদের সযত্নে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহায়তায় আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাদের নিজস্ব আবাসে, বনের নীরব সবুজে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন আজ সংকুচিত। মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি আর অবাধ প্রবেশে কমে গেছে খাদ্যের উৎস। ফলে বনের প্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে, কখনও খাদ্যের খোঁজে, কখনো নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। আর সেই পথেই অনেক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে দ্রুতগামী যানবাহনের চাকায়।

পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে শুধু প্রাণীকুলই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই একদিন হুমকির মুখে পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রায়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশের এলাকা থেকে ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়- বনের প্রাণীরা আর বনে নিরাপদ নেই।

স্বপন দেব সজল বলেন, নির্বিচারে গাছপালা কাটা, ঝোপঝাড় উজাড়, বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, ফসল চাষ ও অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণীদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। খাদ্যের সংকটে তারা বাধ্য হয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে।

তিনি সবাইকে অনুরোধ করে বলেন, বন্যপ্রাণী লোকালয়ে এলে আতঙ্কিত হয়ে তাদের আঘাত করবেন না। আমাদের খবর দিন, আমরা নিরাপদে উদ্ধার করে তাদের আবার বনে ফিরিয়ে দেব।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল খবরের কাগজকে বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি বন ও পরিবেশ রক্ষা না করি, একদিন এই প্রাণীরাও হারিয়ে যাবে আমাদের পৃথিবী থেকে। এই উদ্ধার কার্যক্রম শুধু প্রাণ বাঁচানো নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণে এমন উদ্যোগ প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

থিও/

পটিয়ার লোকালয়ে মেছোবাঘ

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
পটিয়ার লোকালয়ে মেছোবাঘ
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নে লোকালয়ে ঢুকে পড়া একটি মেছোবাঘ (ফিশিং ক্যাট) গ্রামবাসীর হাতে আটক হয়েছে। এ সময় প্রাণীটিকে আটক করার চেষ্টা করলে মানিক (২১) ও বাবু (১৯) নামে দুই যুবক আহত হয়েছেন। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবিত অবস্থায় মেছোবাঘটিকে উদ্ধার করেন।

সোমবার (১ জুন) বেলা ২টার দিকে উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খলিল ভান্ডারবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে এলাকায় একটি মেছোবাঘের বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। স্থানীয়দের দাবি, প্রাণীটি এরই মধ্যে কয়েকটি ছাগল ধরে খেয়ে ফেলেছে। এতে এলাকাজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর শিশু ও গৃহপালিত প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরে রায়হান বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এলাকায় মেছোবাঘটি দেখা যাচ্ছিল। আমাদের কয়েকটি ছাগলও মেরে ফেলেছে। তাই সবাই আতঙ্কে ছিল। সোমবার দুপুরে আবার বাঘটিকে দেখতে পেয়ে এলাকার মানুষ একত্রিত হয়ে সেটিকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে প্রাণীটি দৌড়ে পালাতে গিয়ে পাশের একটি ম্যানহোলে পড়ে যায়। পরে অনেক চেষ্টা করে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেছোবাঘটিকে আটক করার সময় সেটি আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এতে দুই যুবক আহত হন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়।’

আহত দুই যুবক হলেন মানিক (২১) ও বাবু (১৯)। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পটিয়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, ‘স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং জীবিত অবস্থায় একটি মেছোবাঘ উদ্ধার করি। উদ্ধারকৃত প্রাণীটি কিছুটা আহত হয়েছে। বর্তমানে সেটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর উপযুক্ত ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে।’

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মেছোবাঘ বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। সাধারণত জলাভূমি, খাল-বিল ও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় এদের বসবাস। খাদ্যের সন্ধানে কিংবা আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়লে অনেক সময় এসব প্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত বন বিভাগকে অবহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে বিরল এ প্রাণীটিকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের অনেকে মেছোবাঘটিকে দেখতে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।

রাফিউল আকরাম/রিফাত/