বন ও নদীর ধারে জন্মানো সুন্দর হলুদ ফুলের শিয়ালকাঁটা অনেকেরই পরিচিত। এই উদ্ভিদ একই সঙ্গে বিষাক্ত এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন। এ উদ্ভিদের কাণ্ড ভাঙলে একধরনের হলুদ ল্যাটেক্স বের হয়। এই ল্যাটেক্স বিষাক্ত। এর কাণ্ড, পাতা ও ফুলে কাঁটা থাকে। ফুল দেখতে পপি ফুলের মতো। কারণ শিয়ালকাঁটা আর পপি একই গণ আর গোত্রের উদ্ভিদ। গত ২৩ মার্চ ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র তীরের কাচারিঘাটে সকালে হাঁটতে গিয়ে একটি শিয়ালকাঁটাগাছের দেখা পাই। ঝটপট ছবি তুলে নিই।
শিয়ালকাঁটা জন্মায় কোনো যত্ন ছাড়াই। এটি অল্প শাখাবিশিষ্ট গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ফল অনেকটা ডিম্বাকার ও লম্বায় ১ থেকে ১২ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এর মধ্যে সরিষার মতো কালো রঙের বীজ থাকে। শিয়ালকাঁটা গ্রীষ্মকালে মারা যায়, শরৎকালে মাটিতে পড়ে থাকা কালো রঙের বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মায়। এর সংস্কৃত নাম শৃগাল কণ্টক। গাছটির আরও নাম স্বর্ণক্ষীরা, স্বর্ণমুদ্রা, রুক্সিণী, সুবর্ণা, হেমদুগ্ধী, কাঞ্চনী ইত্যাদি। ইংরেজিতে শিয়ালকাঁটা মেক্সিকান পপি, মেক্সিকান প্রিকলি পপি, কারডো ইত্যাদি নামে পরিচিত।
এই গাছের কাণ্ড দেখতে কিছুটা শিয়ালের লেজের মতো এবং এর গা-ভর্তি কাঁটা। এ জন্যই এর নাম শিয়ালকাঁটা। বেলেমাটিতে ভালো জন্মায়। এর ডাঁটা রান্না করে খাওয়া যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Argemone Mexicana, এটি Papaveraceae গোত্রের উদ্ভিদ। এর ফুলে পাপড়ি থাকে ছয়টি। এর বীজ ও মূলের নির্যাস থেকে তেল আহরণ করা যায়। এই তেল দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো যায়। এর নির্যাসকে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এই গাছ মেক্সিকো থেকে সারা বিশ্বে আগাছা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ‘আর্জিমা’ মানে চোখের ছানি। এই গাছের রস চক্ষুরোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হতো বলে এর গণের নাম Argemone এবং মেক্সিকোয় পাওয়া যায় বলে প্রজাতিক পদ Mexicana। এর কাণ্ড গাঢ় সবুজ ও পাতায় সাদাটে ছিট থাকে। এর পাতা ঢেউ-খেলানো ও খণ্ডিত। প্রতিটি খণ্ডের মাথায় কাঁটা থাকে। এই গাছ দেখতে অনেকটা পপিগাছের মতো। তাই একে মেক্সিকান পপিও বলা হয়।
মেক্সিকো থেকে হন্ডুরাস পর্যন্ত বিস্তৃত জায়গার স্থানীয় এই বুনোফুল প্রায় ৫০০ বছর আগে আমাদের দেশের প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতকের দিকে স্প্যানিশ বাণিজ্যিক জাহাজে আলুর বস্তা ও মাটির সঙ্গে এই গাছের সরিষার মতো ছোট ছোট বীজ চলে এসেছিল এ দেশে। এভাবেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে গাছটি।
১৯৯৮ সালে ভারতের দিল্লির আশপাশে এর বিষক্রিয়ার প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৬৫ জন মানুষ মারা যায়। এই বিষক্রিয়ার লক্ষণ শরীরে পানি জমে যাওয়া। এ গাছের রসে আছে কয়েক ধরনের অ্যালকালয়েডস।
শিয়ালকাঁটা ভেষজ গুণে পরিপূর্ণ। এই গাছ কৃমি, পিত্ত ও কফনাশক। জ্বর ও মূত্রকৃচ্ছ্র রোগে কার্যকর। মূলের রস কুষ্ঠরোগ নিরাময়ে কাজে লাগে। গাছের পীত বর্ণের নির্যাস গনোরিয়া ও উপদংশ রোগে বেশ উপকারী। রক্তের ক্ষমতা তৈরিতে, নতুন রক্ত তৈরিতে, দেহের ক্ষয় পূরণে, পেটের যাবতীয় রোগ নিরাময়ে শিয়ালকাঁটা ব্যবহৃত হয়।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ