রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশের জনগণের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান।
তিনি বলেন, পিআর পদ্ধতির গভীরে গেলে দেখা যাবে, সত্যিকার অর্থে জনগণ একটি দলকে ভোট দিচ্ছে, একজন ব্যক্তিকে নয়। বাংলাদেশের মানুষ জবাবদিহি করতে চায়, মানুষের ধৈর্য অত্যন্ত সীমিত ও আবেগময়। সেখানে পিআর সিস্টেম একটি নৈর্ব্যক্তিক ভোটিং প্রক্রিয়া। এই পদ্ধতি বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র, গতি-প্রকৃতির সঙ্গে কখনো খাপ খাবে না। মানুষ জানতে চায়, তাদের প্রত্যাশা পূরণ না করলে নির্বাচন এলাকায় কাকে দায়ী করবে?
বুধবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন (পিআর) বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। আয়োজন করে ডেমোক্রেসি ডায়াস।
পিআর পদ্ধতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পিআর পদ্ধতি প্রযোজ্য কি না তার জন্য আজ থেকে ১০ বছর আগে বিএনপি গবেষণা করেছিল। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য আড়াইশ বছরের গণতন্ত্র সেখানে কিন্তু পিআর পদ্ধতি প্রচলিত হয়নি। ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কোথাও সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি নেই। সব জায়গা বাংলাদেশের প্রচলিত ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে ভোট হয়। এই পদ্ধতি মানুষের মতামত সহজে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থা এক নয়, তাই পিআর পদ্ধতি এখানে কার্যকর করা যাবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে।’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনে করেন আব্দুল মঈন খান।
তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট যদি সত্যিই নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়, তবে সেটা যে মাসেই নির্বাচনের সময় দিক-না কেন, তা নিয়ে এত ভাবনার কারণ নাই। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সমাজ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে। নৈরাজ্য ক্রমেই কমে যাবে। আসুন আমরা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় নতুন করে যাত্রা শুরু করি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যত বিলম্ব করা হবে তত সমস্যা দেখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচন দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন হয়েছিল বলে উল্লেখ করে মঈন খান বলেন, সেই সময়ে তিন মাসের তত্ত্ববধায়ক সরকার একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলেন। তারা রিপোর্ট দিয়েছিলেন কিন্তু তা নিয়ে দেন-দরবার হয়নি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কোনো আলোচনা হয়নি। তাই অন্তবর্তী সরকারের অত্যাবশ্যক সরকার যা করার দরকার তারা তা করবে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এক্সিট পলিসি চিন্তা করার সময় এসেছে। বর্তমান সরকার যে যাবেন, তারা যে কাজকর্মগুলো করেছেন, আগামী সরকার সেইগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বৈধতা দেবে কি না এই বিষয় কিন্তু এখনো সামনে রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমি একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে বাংলাদেশ থেকে কী কী শিক্ষা আমরা নিতে পারি। প্রথমত একটি অন্তর্বর্তী সরকার বা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তো বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনি যদি দেখেন এই সরকারের প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিলো? যখন কোনো রাজনীতিবিদ সাংবিধানিকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে আটকে দিতে চায়, তখনই রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং যখনই রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে তখনই একটি জরুরি অবস্থার প্রয়োজন পড়ে। প্রথম রাষ্ট্রব্যবস্থার এই রকম ভঙ্গুর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এরশাদের শেষের দিকে, ৯০ এর গণ-অভ্যুত্থানে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডেমোক্রেসি ডায়াসের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান, সাংবাদিক মাসুদ কামাল, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন প্রমুখ।
শফিকুল ইসলাম/