বিএনপি-জাতীয় পার্টি-আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্রমিক জয়ের ভোটের মাঠ সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসন। জেলা শহরের এ আসনটিতে এবার ভোটের হিসাব নতুন চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৯২ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. সামছ উদ্দিন পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৭৫ ভোট।
এ আসনটি বিএনপির ‘বিদ্রোহ’ শঙ্কা ছিল। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩০৭ ভোট। আর জাতীয় পার্টিও নাজমুল হুদা পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৭৮৯ ভোট। ‘বিদ্রোহ’ ডিঙিয়ে নুরুলের বিজয়ের মধ্যে ‘গুপ্ত ভোট’ মোকাবিলার বিষয়টি তুলে ধরেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ বিএনপি নেতারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলে বিএনপি রাজনীতিতে দুটি মেটাফর ক্রমে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। একটি ছিল ‘মেড ইন ছাত্রদল’, অন্যটি উত্তরসূরি প্রভাব। মনোনয়ন প্রত্যাশায় সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে উত্তরসূরি ও মেড ইন ছাত্রদল–দুটিই উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। এর মধ্যে ছাত্রদল নেতা থেকে বিএনপি নেতা তথা মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকা সুনামগঞ্জ-৪ আসনে দীর্ঘ ছিল।
সুনামগঞ্জ-৪ আসনে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থেকে যুবদলের সভাপতি ও বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবুল মনসুর মো. শওকত মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে ছিলেন। তাদের পাশাপাশি উত্তরসূরি প্রভাবে সক্রিয় ছিলেন এ আসনে একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুল হক আসপিয়ার ছেলে ব্যরিস্টার মোহাম্মদ আবিদুল হক আবিদ।
পাশাপাশি আসনটিতে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা, ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রধান এজেন্টের দায়িত্ব পালন করা হাসন রাজার প্রপৌত্র দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। প্রথম দফায় দল ঘোষিত মনোনয়ন ঘোষণা স্থগিত ছিল সুনামগঞ্জ-৪ আসনটির। তখন মনোয়ন প্রত্যাশার লড়াই আরও তীব্র হয়। শেষে ‘মেড ইন ছাত্রদল’ মেটাফরে দলীয় মনোনয়ন পান ছাত্রদল থেকে বিএনপি রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল।
দলের দুর্দিনে নেতৃত্ব দেওয়া নুরুল ইসলাম নুরুলকে ঘিরে একটি চক্র সক্রিয় হয়। আওয়ামী লীগ জমানার ১৫ বছর বাদ দিয়ে এ চক্রটি গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী কিছু ঘটনা সামনে এনে ভোটের মাঠে নুরুলকে ঠেকাতে নেমে পড়ে।
দলের নির্বাচনি প্রচারে থাকা নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নবঞ্চিত ও বিদ্রোহী প্রার্থিতায় নির্বাচন চলাকালে ভোটের মাঠ ছিল বিএনপির জন্য অস্বস্তির। এ অবস্থায় দলীয় প্রার্থী বিদ্রোহীর দুয়ারে গিয়ে প্রথম দফা প্রচার চালান। এরপর দলীয়ভাবে প্রচার চালাতে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীদের চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে কিছু বহিষ্কারের বার্তাও ছিল। এতে করে নুরুল বিদ্রোহ ডিঙাতে সক্ষম হলেও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের অঙ্ক কষে দেখা গেছে, নীরব ভোটে নতুন একটি বলয় তৈরি হওয়ায় নুরুল জিতেছেন।
প্রাপ্ত ভোট বিশ্লেষণে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, ধানের শীষের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন নীরব ভোটাররা। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সামছ উদ্দিনের শেষ শো-ডাউন দেখে ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয়তা বাড়ান কর্মীরা। নীরব ভোটারদের কাছে ওই সময় বার্তা ছিল, জামায়াতের প্রার্থীর অবস্থা ভালো, ভোটে জিতবে জামায়াত। কোনো কোনো নীরব ভোটার যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনকে ভোট দিতে চেয়েছিলেন, তারাও মত পরিবর্তন করে পরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় নুরুল জিততে পেরেছেন।
এ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দ্বিমত করেননি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনায় থাকা জেলা বিএনপির একাধিক নেতা। তারা বলেছেন, ‘একটি বিশেষ শ্রেণির ভোট বরাবর একটি রাজনৈতিক দলের দিকে যায়। এতে করে তৈরি হয় নয়া বলয়। ওই রাজনৈতিক দলের প্রতীক না থাকায় এবার নয়া বলয়ের পুরো ভোট আমাদের প্রার্থী পেয়েছেন। না হলে কিন্তু বিদ্রোহীর সুযোগে জামায়াত তথা ১১ দলের জোটের প্রার্থীর বিজয় দেখতে হতো।’
শুরু থেকেই নুরুলের পক্ষে ভোটের মাঠে সক্রিয় ছিলেন ছাত্রদল থেকে বিএনপির নেতৃত্বে থাকা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুনাজ্জির হোসেন সুজন। তার দাবি, এবার ‘গুপ্ত ভোট’ মোকাবিলা করায় বিজয় এসেছে।
ভোটের দুই দিন পর গতকাল শনিবার মুনাজ্জির সুজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বিজয়ী হয়েছি, তবে এত কম ব্যবধানে বিজয় হওয়ার কথা নয়। এ বিজয়ের পেছনে কেউ যদি নয়া বলয় বলে চিহ্নিত করেন, তাতে অবশ্য বলার কিছু নেই। সব বলয় মিলিয়েই বিজয় হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষের ভোট বেড়েছে নুরুল ঠেকাও থেকে। এখানে গুপ্ত ভোটও ছিল। গুপ্ত রাজনীতি থেকে গুপ্ত ভোট কি না, তা ভবিষ্যতে শনাক্ত করতে সাংগঠনিক তৎপরতা থাকা উচিত।’