ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুদ্ধবিরতির পথে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংলাপ শুরু জেনেভায় সিলেটে টানা বৃষ্টি, বন্যার শঙ্কা পাউবোর বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা গাজীপুরে নিষিদ্ধ আ. লীগের বিক্ষোভ মিছিল প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি! ১০ দফা দাবিতে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের মানববন্ধন সোমবার মোহভঙ্গের বাংলাদেশ: যখন বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে অরণ্যের অন্ত্যজ কথা বরিশালে গ্রেপ্তার এড়াতে ছাদ থেকে পড়ে আ. লীগ নেতার মৃত্যু ইরান ম্যাচে বেলজিয়ামের মূল ফোকাস নিজেদের খেলায়: গার্সিয়া কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ৩য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিনজনের মৃত্যু গোপনে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বিপ্লব দেব প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যায়ের ৩টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৫ম পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র জাহাজডুবির দুঃসহ অধ্যায় শেষে দেশে ফেরা সুনামগঞ্জে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দুই উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশি নিহত হাইড্রোলিক হর্নের অত্যাচার ও বিপন্ন জনস্বাস্থ্য ‘কমল দাদার পাঠশালায়’ আদিবাসী শিশুদের পাশে ফারুক হোসেন একটি ব্রিজের অভাবে থমকে আছে জনজীবন সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়? জার্মানির জয়ের নায়ক কে এই ডেনিজ উন্দাভ? অস্ট্রেলিয়ার দাপুটে জয়ে হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড় গ্যালাক্সি ওয়াচে যেভাবে ব্যবহার করবেন গুগল ওয়ালেট শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মাসুদ চৌধুরী রিমান্ডে বাজার ছিল যার ঠিকানা, পরিচয় রয়ে গেল অজানা স্বাগতিকদের সিরিজ পরাজয়ে গ্যালারিতে দর্শক ফাঁকা কেন মন্টেরি স্টেডিয়াম পরিষ্কার করলেন জাপানি সমর্থকরা?

ট্রাম্পের ২০-পয়েন্ট পিস প্ল্যান বনাম হামাস: বিশ্লেষণ-পরিস্থিতি, দ্বিধা ও সম্ভাব্য পরিণতি

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৪৬ পিএম
আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৪৮ পিএম
ট্রাম্পের ২০-পয়েন্ট পিস প্ল্যান বনাম হামাস: বিশ্লেষণ-পরিস্থিতি, দ্বিধা ও সম্ভাব্য পরিণতি
ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েক দিন ধরে প্রকাশিত ইউনাইটেড স্টেটসের ২০-পয়েন্ট ‘গাজা চুক্তি’ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামাসকে শনিবার/রবিবার (ডেডলাইন) সম্মতি দেওয়ার ultimatum সংবাদমাধ্যমে শীর্ষ খবর। 

ট্রাম্প এই প্রস্তাব না মানলে “অল হেল” ধামাকা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন; হামাসের তরফ থেকে পয়েন্ট-বাই-পয়েন্ট প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া এসেছে—কোনগুলো গ্রহণ, কোনগুলো শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ, আর কোনগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই ফিচারে আমরা আগে আপনি যে ২০টি পয়েন্টের সারসংক্ষেপ দিয়েছেন তা নিয়ে বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ করছি: কিভাবে এগুলো মাঠে চলবে, কোথায় রাজনৈতিক ও ন্যায়িক সমস্যা, এবং প্রত্যেক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে।

১) বাস্তবিক অবস্থা: প্ল্যান কী বলছে এবং হামাস কী বলেছে (সংক্ষিপ্ত)

আপনি যে ২০টি পয়েন্ট সাজিয়েছেন তাদের মূল লাইন—গাজাকে নির্মাণযোগ্য, সশস্ত্রতা-শূন্য, হোস্টেজ প্রত্যাবর্তন, অস্থায়ী আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান, এবং বৃহত পুনর্গঠন—প্রক্সি করলে এটিই সার। হামাসের প্রতিক্রিয়া যে “পুরোপুরি মেনে নিলো না — অনেক শর্ত মানলো, কিছু শর্ত শর্তসাপেক্ষে মানলো, কিছু প্রত্যাখ্যান করলো”—এই সারমর্ম সংবাদমাধ্যমও রিপোর্ট করেছে: হামাস অংশ নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে, কিন্তু নিরস্ত্রীকরণ, বিদেশী স্টেবিলাইজেশন ফোর্স বা টোটাল ডিসআর্মামেন্টসহ কয়েকটি মূল শর্ত তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। 

২) নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ: বাস্তবসম্মত না কি অস্থিরতা বাড়াবে?

টিপিক্যাল দ্বিপক্ষীয় চুক্তি—বিশেষত যেগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে “সংগঠনকে নিরস্ত্রীকরণ” দাবি করে—প্রশ্ন তোলে: কে, কীভাবে, কখন ও কী পরিমাপে অস্ত্র সমর্পণ পর্যবেক্ষণ করবে? হামাস যদি “ইসরায়েলি ফেরার/দখল না হওয়া” নিশ্চিত না পায়, তারা অস্ত্র ছাড়বে না—এটাই তাদের প্রধান অবস্থান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্টেবিলাইজেশান ফোর্স (ISF/ISF-সমমান) মোতায়েন করা হলে সেটা স্থানীয় স্বীকৃতি ও নীতিগত স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করবে; বিদেশী সৈন্যদল স্থানীয় গণতান্ত্রিক স্বীকৃতির বাইরে গেলে তা স্থানীয় প্রতিরোধ ও নতুন সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। অর্থাৎ, নিরস্ত্রীকরণ চাওয়া হলো সহজ—but বাস্তবায়ন জটিল। 

৩) বন্দী ও হোস্টেজ বিনিময়: সময়সীমা ও বাস্তবতা

ট্রাম্প পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব হোস্টেজের প্রত্যাবর্তন উল্লেখ আছে—কিন্তু হামাস ৭২ ঘণ্টার অক্ষরিক টাইমলাইন মেনে চলতে অস্বীকার করেছে; তারা একটি প্রিজনার-এক্সচেঞ্জ ফর্মুলা চান। আন্তর্জাতিক অনুশীলনে দ্রুত হোস্টেজ-রিলিজ সম্ভব হলে তা শক্তিশালী সিগন্যাল হবে; কিন্তু যদি প্রত্যাবর্তন—বিশেষত মৃত-জীবিত তালিকা—চূড়ান্ত না হয়, তাহলে আস্থা তাত্ক্ষণিকভাবে ধ্বংস হতে পারে এবং যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত ব্যর্থ হতে পারে। সংবাদশিরোনামগুলোই দেখায়—বহু পক্ষ মীমাংসার চাপ দিচ্ছে কিন্তু কারিগরি ছক এখনই আলোচ্য। 

৪) গভর্নেন্স: প্রযুক্তকেন্দ্রিক অস্থায়ী বোর্ড বনাম জাতীয় সহমত

ট্রাম্পের প্ল্যান একটি “টেকনোক্র্যাটিক” অস্থায়ী শাসন ও ‘বোর্ড অফ পিস’-ের তত্ত্বাবধানের কথা বলে—এতে তনি ব্লেয়ার বা বিদেশি ব্যক্তিত্বের নামও ওঠেছে বলে বিতর্ক হয়েছে। হামাস ইচ্ছুক “প্যালেস্টাইনিয়ান টেকনোক্র্যাট লিড বডি” মেনে নিতে—কিন্তু বিদেশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সরাসরি বিদেশী হস্তক্ষেপ গ্রহণ করে না। দুটি সত্যই সংকটজনক: একটি—লোকাল লিগিটিমেসি ছাড়া কোনো অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা টেকবে না; এবং দুই—বিদেশি নেতৃত্ব দিলে তা স্থানীয় প্রতিপক্ষের মাঝে উৎসাহী হবে না। সুতরাং প্রশাসনিক সমাধান হিসাবে “টেকনোক্র্যাটি” কার্যকর হতে পারে যদি স্থানীয় অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও সাংগঠনিক গ্যারান্টি থাকে। 

৫) পুনর্গঠন ও অর্থনীতি: বড় সুযোগ, বড় শর্ত

পান্থীয়ভাবে গাজা পুনর্গঠন—অর্থনীতি চালু করা, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকার ব্যবস্থা—চতুর্থ দিক থেকে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব আনবে। হামাস পুনর্গঠনের তৎপরতা মেনে নিয়েছে; তবু পুনর্গঠনকে যদি রাজনৈতিক শর্তে বাঁধা দেওয়া হয় (যেমন–নিরস্ত্রীকরণ বা রাজনৈতিক ভঙ্গিমা), তাহলে সাহায্য বিতরণ এবং পুনর্নির্মাণে দেড়ার সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি, পুনর্গঠন যেন দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান দেয়—এটাই টেকসই সমাধান। 

৬) আঞ্চলিক কূটনীতি: মিশর, কাতার, তুরস্ক ও আরব লিগের ভূমিকা

ত্রিপক্ষীয় প্রেসার—ইউএস, ইজরায়েল এবং আরব/মুসলিম-মাজরিটি দেশগুলো (মিশর, কাতার, তুরস্ক ইত্যাদি)—এখানে ক্ল্যাসিক মূর্ছনা। কিছু সরকার প্ল্যানকে স্পন্সর করেছে, অন্যরা বলছে “এটা তাদের পরিকল্পনার অনুকরণ নয়” — যেমন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন এটি তাদের খসড়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আঞ্চলিক গ্যারান্টি না থাকলে প্ল্যান কার্যকর হবে না; আরব দেশগুলোর শর্ত-প্রেক্ষিত ও জাতীয় জনমতও কৌশল নির্ধারণ করবে। 

৭) মানবিক সংকট: তাত্ক্ষণিক ঝুঁকি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা

প্রতিটি দিনই গাজার মানুষদের জন্য ক্ষতি বাড়ায়—হাসপিটাল ভেঙে, ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত। যে কোনো চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন মানবিক রিলিফের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু চুক্তি যে “শর্তসাপেক্ষ”—এতে সময় লাগলে বা লজিস্টিক ব্যর্থ হলে মানবিক পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। বিশ্বের বড় দাতা ও সংস্থাসমূহ—UN, Red Crescent ইত্যাদি—কীভাবে কাজ করবে তা প্রথম সারির প্রশ্ন হবে।

৮) দ্বিতীয়-অর্থনৈতিক রিপোর্ট: কৌশলগত প্রবাহ ও বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকি

চুক্তিতে বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠিত না হলে (যেমন: হোস্টেজ-রিলিজে গর্ভবতী অস্বচ্ছতা, প্রিজনার রিলিজে টানাপোড়েন), সোয়াপ ব্যর্থ হলে হামলা পুনরায় শুরু হতে পারে—অথবা ইলেকটিভ বিদেশী অনুদান, নিরাপত্তা দিয়ে দেশীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে। অপর দিকে, যদি আস্থা গড়ে ওঠে, একটা ধাপে ধাপে পুনর্গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তর তরতর করে বাস্তবে রূপ নিতে পারে। সুতরাং বিশ্বাস-ভিত্তিক কন্ট্রোল মেকানিজম (সেপারেট তৃতীয় পক্ষ, নিরপেক্ষ তদারকি) জরুরি। 

৯) যদি হামাস প্রত্যাখ্যান করে — দ্রুতকালের সম্ভাব্য ফলাফল

ট্রাম্পের টোন যেভাবে “ডেডলাইন” দিয়ে প্রান্তিক হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের দুইটি সরল ফল দিতে পারে: (ক) কূটনৈতিক চাপে আকস্মিক ও বড় সামরিক অভিযান, বা (খ) দীর্ঘস্থায়ী অবরুদ্ধ অবস্থা ও অর্থনৈতিক একরকম ‘বাধ্যতামূলক’ অবস্থা, যা মানবিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করবে। আন্তর্জাতিক প্রবল চাপ থাকায় বড় শক্তি প্রয়োগে রোডম্যাপ অস্পষ্ট—এবং এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। সংবাদ প্রতিবেদনে ট্রাম্প হাস্যরূপে ‘সংকট অবসান’ বললেও মাঠে বাস্তবতা জটিল। 

১০) সম্ভাব্য রোডম্যাপ — বাস্তবতাবোধক সুপারিশ

প্রাথমিক হস্তক্ষেপ: কনক্রিট মেকানিজম দিয়ে হোস্টেজ-রিলিজ ও প্রিজনার এক্সচেঞ্জের ফর্মুলা চূড়ান্ত করা; টাইমলাইন শর্তসাপেক্ষে নমনীয় হওয়া দরকার। নিরপেক্ষ তদারকি: তৃতীয় পক্ষ—যেমন জাতিসংঘ বা বহুপক্ষীয় আরব-সমঝোতা—নিরপেক্ষ তদারকির গ্যারান্টি দেবে; বিদেশি স্টেবিলাইজেশন ফোর্স যদি প্রয়োজন হয় তা অবশ্যই আঞ্চলিক সম্মতি ও স্থানীয় অংশগ্রহণের সঙ্গে।

মানবিক তাত্ক্ষণিকতা: ত্রাণ ও মেডিকেল করিডর অবাধ করা—এতে বিশ্বাস বাড়ে এবং অস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। ধাপে ধাপে ডিলিভারি: পূর্ণ “ডেমিলিটারাইজেশন” চাওয়ার বদলে পর্যায়ক্রমিক ফিরিস্ত—প্রথম ধাপে হোস্টেজ মুক্তি, তারপর থানাত্মক অস্ত্র শক্তির সীমাবদ্ধকরণ ইত্যাদি।

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব

ট্রাম্পের ২০-পয়েন্ট প্ল্যান রাজনৈতিক দিক থেকে ‘বড় ছবি’ দেয়: যুদ্ধ শেষ, পুনর্গঠন, এবং নিরাপত্তা। কিন্তু গোলকধাঁধায়—বিশ্বাস ও বাস্তবায়নের কৌশলগত সমস্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হামাসের শর্তসাপেক্ষ সম্মতি নির্দেশ করে যে তারা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্তি বা বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক গ্যারান্টি এবং বাস্তবতাবোধক ধাপে-ধাপে বাস্তবায়ন ছাড়া এই প্রস্তাব সফল হবে না—অথবা অতিমাত্রায় মানবিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাবে। সংবাদমাধ্যম রির্পোট অনুযায়ী (ডেডলাইন ও হ্যাকার-টোন), এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই সংবেদনশীল—পরবর্তী ২৪–৭২ ঘণ্টা আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে মিলিয়ে দৃশ্যপট নির্ধারণ করবে। 

লেখক : সমাজ সেবক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।

বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ প্রেক্ষাপটে বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহ। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে কর কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই শুধু ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা নয়, উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

বেসরকারি খাত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়া বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

একটি বাজেটের সাফল্য কেবল বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটকে হতে হবে বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাষ্ট্র যখন আধুনিকতার মহাসড়কে পা বাড়ায়, তখন তার নাগরিকরা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তিতে ভোগেন। আমরা ধরে নিই, প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের জীবনকে আরও শৃঙ্খলিত, স্বচ্ছ এবং নিরাপদ করবে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’ সংযোজনের খবরটি যখন চাউর হলো, সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, মানবীয় দুর্নীতির অবসান এবং ঘুষ-বাণিজ্যের অবসান ঘটানোর জন্য এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু এই স্বস্তির আয়ুষ্কাল যে এতটা সংক্ষিপ্ত হবে, তা হয়তো রাষ্ট্র বা নাগরিক–কেউই ভাবেনি। বিজ্ঞানের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী, প্রযুক্তির যেমন আলো আছে, তেমনি রয়েছে এক অন্ধকার চোরাগলির অপচ্ছায়া। এআই ক্যামেরা চালু হওয়ার সংবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের এক বিশাল অংশের নাগরিকের মুঠোফোনে হানা দিতে শুরু করেছে এক অভিনব আপদ। ‘এআই ক্যামেরায় আপনার গাড়ির ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, এত টাকা জরিমানা নিম্নোক্ত লিংকে ক্লিক করে পরিশোধ করুন’ এমন বার্তা বা এসএমএস দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অত্যন্ত চতুর, সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন সাইবার অপরাধী চক্র। এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল রূপান্তর, ডেটা নিরাপত্তা এবং নাগরিক মনস্তত্ত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত। স্মিশিং: যখন আতঙ্কই অপরাধীদের প্রধান অস্ত্র সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এই অপরাধটিকে বলা হয় ‘স্মিশিং’ (Smishing), যা মূলত এসএমএস এবং ফিশিংয়ের একটি মারাত্মক মেলবন্ধন। অপরাধীরা এখানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করছে না, তারা মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করছে।

আমাদের সমাজে ‘মামলা’ বা ‘আইনি জটিলতা’ শব্দ দুটি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের তীব্র ভীতি ও অস্বস্তি তৈরি করে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী যখন হঠাৎ মেসেজ পান যে তার অজান্তে তার গাড়ির নামে মামলা হয়েছে এবং দ্রুত টাকা না দিলে লাইসেন্স বাতিল বা বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা সাময়িকভাবে লোপ পায়। অপরাধীরা ঠিক এই ‘আতঙ্কের মুহূর্তটি’ ব্যবহার করে। তারা মেসেজের নিচে যে শর্ট লিংক বা ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়ের লিংক যুক্ত করে দেয়, আতঙ্কিত নাগরিক নিজের অজান্তেই সেখানে ক্লিক করেন। সেখানে গিয়ে বিকাশ, রকেট, নগদ বা কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে যখনই তিনি টাকা স্থানান্তর করেন, তখনই তিনি পাতানো ফাঁদে পা দেন। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জরিমানার টাকা কেটেই ক্ষান্ত হয় না এই চক্রটি; ওটিপি বা পিন হাতিয়ে নিয়ে পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়ার নজিরও মিলছে। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিখুঁত ‘ডিজিটাল ডাকাতি’।

ডেটাবেজের শুভঙ্করের ফাঁক: তথ্য পাচার হচ্ছে কোথায়? এই পুরো অপরাধ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার এবং রহস্যময় দিকটি হলো–তথ্যপ্রাপ্তি। একটি অপরাধী চক্র কীভাবে জানল যে নির্দিষ্ট একটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে অমুক ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিবন্ধিত রয়েছে? এখানে দুটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণ সামনে আসে, যা রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের নিরাপত্তাহীনতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নাগরিকদের যে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্যের (মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির চেসিস নম্বর) ডেটাবেজ রয়েছে, তা কি আসলেই নিরাপদ? অতীতেও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের ডেটা ফাঁসের খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। এই ক্ষেত্রেও কি কোনো অসাধু চক্র বা হ্যাকার গোষ্ঠী সেই তথ্য অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। নির্বিচার আক্রমণ (Brute Force/Random Attack): যদি ডেটা ফাঁস না-ও হয়ে থাকে, তবে অপরাধীরা হয়তো লটারির মতো নির্বিচারে হাজার হাজার নম্বরে এই বার্তা পাঠাচ্ছে। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ মোটরসাইকেল ও গাড়ি রয়েছে। ফলে প্রতি হাজার মেসেজের মধ্যে যদি ৫০ জন গাড়ির মালিকও এই ফাঁদে পা দেন, তবেই অপরাধীদের উদ্দেশ্য সফল। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের এই উন্মুক্ততা প্রমাণ করে যে, আমরা ‘স্মার্ট’ হওয়ার স্লোগান দিলেও আমাদের ডিজিটাল দেয়ালগুলো কতটা নড়বড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা এবং সামাজিক সচেতনতার খরা ডিজিটাল অপরাধের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতাও কম দায়ী নয়। যখন একটি নতুন প্রযুক্তি (যেমন এআই ক্যামেরা) সড়ক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন তার অনুষঙ্গ হিসেবে নাগরিকদের সচেতন করার যে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন ছিল, তা উধাও। বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ থেকে কেন শুরুতেই জোর গলায় বলা হলো না যে–‘সরকারি কোনো মামলার মেসেজ কোনো সাধারণ ১১ ডিজিটের মোবাইল নম্বর থেকে যাবে না এবং কোনো মেসেজে সরাসরি পেমেন্ট লিংক দেওয়া থাকবে না?’ এই স্পষ্ট বার্তার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতারক আর সরকারের পার্থক্য করতে পারছে না। এর পাশাপাশি আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রযুক্তিগত শিক্ষার হার অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখেছি, ইন্টারনেট ডেটা কিনতে শিখেছি, কিন্তু ‘সাইবার হাইজিন’ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতা শিখিনি।

একটি অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে যে ডোমেইন নেম চেক করতে হয় (যেমন .com -এর জায়গায় .xyy বা .top থাকা মানেই সেটি ভুয়া), এই সাধারণ জ্ঞানটুকু দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই। অপরাধীরা নাগরিকদের এই সরলতা বা অজ্ঞতারই চূড়ান্ত ফায়দা তুলছে। রাষ্ট্রের স্মার্টনেস বনাম অপরাধীদের চাতুর্য আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন এই ধরনের সাইবার ক্রাইম পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর জনগণের আস্থা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকরা প্রযুক্তির যেকোনো নতুন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবেন। আজ যদি এআই ক্যামেরার নাম করে টাকা ডাকাতি হয়, তবে কাল হয়তো ই-পাসপোর্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা স্মার্ট এনআইডি কার্ডের নাম করেও একই কাজ হবে। অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের চাতুর্য এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটাচ্ছে, অথচ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাইবার ইউনিটগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এই চক্রগুলোকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করে ধরা সম্ভব নয়, কারণ তারা ভুয়া বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এদের ধরতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আন্তর্জাতিক মানের সাইবার ফরেনসিক ল্যাব। উত্তরণের পথ: তিন স্তরের প্রতিরোধ এই সর্বগ্রাসী ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক–এই তিন পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। প্রথমত, কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে অনতিবিলম্বে এই চক্রের আইপি অ্যাড্রেস এবং ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়েগুলো চিহ্নিত করে ডোমেইনগুলো ব্লক করতে হবে।

এই চক্রের মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই সাহস না পায়। দ্বিতীয়ত, ডেটা অডিট ও তথ্য অধিকারের সুরক্ষা: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের ডেটাবেজ অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন আইটি টিম দ্বারা ‘সিকিউরিটি অডিট’ করা উচিত। নাগরিকদের তথ্য চুরির সঙ্গে যদি ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকেন, তবে তাকে কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, গণসচেতনতার মহাবিপ্লব: টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের প্রতিটি পেট্রল পাম্প ও ট্রাফিক সিগন্যালে বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, ট্রাফিক মামলার বৈধ মেসেজ কেবল নির্দিষ্ট ‘Masking’ (যেমন–ডিএমপি বা বিআরটিএ) নামেই আসবে এবং মামলার সত্যতা যাচাইয়ের একমাত্র স্থান হলো সরকারের নিজস্ব অফিশিয়াল পোর্টাল। শেষ কথা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরার ব্যবহার যুগের দাবি এবং একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর সুফল দেশের মানুষ পাক–সেটিই কাম্য। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে যদি একদল সাইবার অপরাধী সাধারণ মানুষের পকেট কাটার মহোৎসবে মেতে ওঠে এবং রাষ্ট্র যদি তা নির্বিকার চিত্তে চেয়ে চেয়ে দেখে, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য, শোষণের জন্য নয়। ডিজিটাল অপরাধীদের চেয়ে রাষ্ট্রকে সব সময় দুই কদম এগিয়ে থাকতে হবে। সরকার যদি দ্রুত এই ‘এআই ক্যামেরা’র ভুয়া মামলার প্রতারক চক্রকে দমনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ সাধারণ মানুষের কাছে এক মূর্তিমান অভিশাপ ও আতঙ্কের কারণ হয়েই থাকবে। আমরা একটি নিরাপদ সড়ক যেমন চাই, তেমনি একটি নিরাপদ এবং সাইবার-শত্রুমুক্ত ডিজিটাল পরিবেশও আমাদের নাগরিক অধিকার।

লেখক: শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
[email protected]

বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি!

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

আজ বাবা দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি, শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণ আর আবেগঘন বার্তায় ভরে উঠবে দিনটি। কেউ বাবার সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি পোস্ট করবেন, কেউ লিখবেন বাবার ত্যাগের গল্প, কেউ হয়তো বাবাকে হারানোর বেদনা জানাবেন। কিন্তু এই আবেগঘন দিনের মাঝখানে আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়–আমরা কি সত্যিই আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, নাকি আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে প্রজন্মগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বসবাস করছে!

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পরিবর্তনের অসম গতি। প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাপনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক অভিযোজনের কাঠামো সেই একই গতিতে বদলাতে পারছে না। ফলে একই পরিবারের ভেতরেও তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য দূরত্ব।

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে জানতে পারে, অনলাইনে কাজ করতে পারে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই একই তরুণের বাবা হয়তো এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন একটি চিঠি পৌঁছাতে সপ্তাহ লেগে যেত, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হতো, আর জীবনের স্থিতিশীলতাই ছিল সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ।
এখানেই টানাপোড়েনের সূত্রপাত।

অনেক সময় আমরা এই পার্থক্যকে প্রজন্মগত সমস্যা বলে দেখি। মনে করি বাবা বুঝতে পারেন না, সন্তানও বুঝতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। একই সমাজে এখন একাধিক সময় পাশাপাশি অবস্থান করছে। একজন বাবা যে অভিজ্ঞতার পৃথিবীতে বড় হয়েছেন, তার সন্তান বড় হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। ফলে একই ঘটনাকে তারা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
বাবা যখন নিরাপদ চাকরির কথা বলেন, সন্তান তখন নতুন সুযোগের কথা ভাবে। বাবা যখন স্থায়িত্ব চান, সন্তান তখন পরিবর্তনকে স্বাভাবিক মনে করে। বাবা যখন পারিবারিক বন্ধনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, সন্তান তখন ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

এই পার্থক্যকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটাকে সময়ের পার্থক্য হিসেবে বুঝতে হবে।
কিন্তু এই বোঝাপড়ার দায় শুধু বাবা-মায়ের নয়, সন্তানেরও।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পরিবারনির্ভর ছিল। বার্ধক্যের নিরাপত্তা, মানসিক আশ্রয়, অসুস্থতার সময়ে সহায়তা কিংবা জীবনের শেষ বয়সের সঙ্গ–সবকিছুর কেন্দ্র ছিল পরিবার। আমাদের বাবা-মা সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন যে, একদিন সন্তানরাই তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হবে।
কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং অভিবাসনের কারণে পরিবার এখন আর আগের মতো ভৌগোলিকভাবে একসঙ্গে নেই। সন্তান চাকরির জন্য ঢাকায়, বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে। কেউ বিদেশে, কেউ অন্য শহরে। প্রযুক্তি যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সহাবস্থানের অভাবও তৈরি করেছে।
ফলে বাবা-মায়ের জীবনে একটি নতুন ধরনের নিঃসঙ্গতা জন্ম নিচ্ছে।

অনেক সময় তারা অর্থের অভাবে নয়, মানুষের অভাবে কষ্ট পান। প্রয়োজনের অভাবে নয়, গুরুত্ব হারানোর অনুভূতিতে ভোগেন। তাদের সন্তান হয়তো নিয়মিত টাকা পাঠায়, কিন্তু মাসের পর মাস মন খুলে কথা বলে না। ওষুধের খরচ দেয়, কিন্তু এক কাপ চা নিয়ে পাশে বসে না। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু সব সময় সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত দায়িত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা।

বর্তমান প্রজন্মের কর্তব্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, মানসিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার দামি কোনো বস্তু নয়, বরং সময়, মনোযোগ এবং সম্মান।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আবার সম্পর্কনির্ভর হয়ে ওঠে। যে বাবা একসময় সন্তানের হাত ধরে রাস্তা পার করিয়েছেন, একসময় সেই বাবাই সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। যে মানুষটি একসময় পরিবারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনিই একসময় পরিবারের আলোচনার বাইরে পড়ে যান।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটা একটি সামাজিক সংকট।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাই কয়েকটি দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, নিয়মিত যোগাযোগকে অভ্যাসে পরিণত করা। ব্যস্ততার যুগে সময়ের অভাব বাস্তব, কিন্তু পাঁচ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথনও অনেক সময় গভীর মানসিক শক্তি দেয়। প্রতিদিন না পারলেও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া সম্পর্কের নিরাপত্তা তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক মনে না করা। সময় বদলেছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার মূল্য কমে যায়নি। প্রযুক্তিগত জ্ঞান হয়তো নতুন প্রজন্মের বেশি, কিন্তু জীবনের জ্ঞান এখনো প্রবীণদের কাছেই বেশি।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবধান কমানো। অনেক বাবা-মা প্রযুক্তির জগতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তাদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা, অনলাইন সেবা ব্যবহারে সহায়তা করা কিংবা ধৈর্য নিয়ে শেখানোও এক ধরনের পারিবারিক দায়িত্ব।
চতুর্থত, বার্ধক্যকে পারিবারিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন পরিকল্পনা করা হয়, তেমনি বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর পরিবারকে এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে বাবা-মা কোনো অতীতের প্রতিনিধি নন, তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পেশা বদলাবে, জীবনযাপনের ধরন বদলাবে, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন–ভালোবাসা, সম্মান এবং আপনজনের উপস্থিতি কখনো বদলায় না।
বাবা দিবস তাই শুধু একজন বাবাকে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। এটা আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন? আমরা কি এমন পরিবার গড়ে তুলছি, যেখানে প্রজন্মের পার্থক্য দূরত্বে নয়, সংলাপে রূপ নেবে?

পরিবর্তন অনিবার্য। জীবনও তাই। কিন্তু পরিবর্তনের এই দ্রুত সময়ে যদি আমরা বাবা-মায়ের হাত ছেড়ে দিই, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনও শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে যাবে।
কারণ, একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তার প্রযুক্তির গতি দিয়ে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা দিতে পারে–সেই মানদণ্ডেই পরিমাপ করা হয়।
আজ বাবা দিবসে তাই সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটি ফোনকল, একটি দীর্ঘ আলাপ, একটি আন্তরিক কুশল জিজ্ঞাসা কিংবা একটি প্রতিশ্রুতি–সময়ের পরিবর্তন যত দ্রুতই হোক, বাবা-মা যেন কখনো নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

অরণ্যের অন্ত্যজ কথা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
অরণ্যের অন্ত্যজ কথা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

...ঝড়, জল আর কালবৈশাখীর ঝঞ্ঝা বুকে নিয়ে যখন নতুন বছরের সূর্য ওঠে, তখন এক বুক শঙ্কা আর প্রার্থনা নিয়ে ‘গ্রাম রক্ষা’র মন্ত্রণায় মগ্ন হন লক্ষ্মণ মুন্ডা। শহর ছাড়িয়ে আট ক্রোশ দূরের মুন্সীবাজার, সেখান থেকে মহাসড়ক পেরিয়ে আরও দেড় ক্রোশ ধূলিমলিন পথ ভাঙলে তবেই দেখা মেলে করিমপুর চা বাগানের। মনু ভ্যালির এই গহীন কোণে কেবল মুন্ডারাই নন; কড়া, ভূমিজ, রিকিয়াসনসহ হরেক রকম আদিম জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান। ধর্মবিশ্বাসে বৈচিত্র্য থাকলেও বঙ্গাব্দের শুরুতে এসে তারা সবাই এক মোহনায় মেশেন। সেই মোহনার নাম ‘গ্রাম পূজা’। বছরের এই একটা সময়ে সব বিভেদ ভুলে প্রকৃতির আদিম উপাসনায় মেতে ওঠেন প্রান্তিকের এই মানুষ।

নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার মানুষ মূলত প্রকৃতিরই সন্তান। তাদের উপাস্য আলাদা, পূজার নাম ভিন্ন, এমনকি একই দেবতাকে তারা ডাকেন নানাবিধ নামে। এই বৈচিত্র্যই যেন তাদের আধ্যাত্মিক পরিচয়কে আরও বিমূর্ত এবং রহস্যময় করে তোলে। সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তনে তাদের বহু প্রাচীন আচার আজ বিলুপ্তির পথে। তবু বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি আর বুনো সংস্কৃতির শেকড়টুকু আঁকড়ে ধরে আজও তারা টিকে আছেন পরম মমতায়।

 

কাদা-মাটির বেদি ও পঞ্চভূতের দর্শন

শহুরে জাঁকজমকপূর্ণ পূজার সঙ্গে তাদের কোনো মিল নেই। এদের পূজার সব উপকরণই অকৃত্রিমভাবে মেলে প্রকৃতির আঁচল থেকে। কাদা-মাটির বেদিতে কোনো জৌলুসপূর্ণ প্রতিমা থাকে না; কচি বাঁশের কাঠামোয় লাল সুতা বেঁধে, বুনো জবা আর দুধসাদা কাঠমালতি গুঁজে তারা অবয়ব দেন মনের ভেতরের দেবতাকে। তারা বিশ্বাস করেন প্রকৃতিই পরম মাতা। মা যেমন তার সন্তানকে স্তন্যপানে পরিপুষ্ট করেন, প্রকৃতিও তেমনি ফল, ফুল আর জলে তৃপ্ত করে মানবজাতিকে। তাদের আদিম বিশ্বাস মাটি, জল, বাতাস, আকাশ ও আগুন–এই পঞ্চভূতের আশীর্বাদেই মানবদেহের নির্মাণ এবং এর ভেতরেই অবসান। অঞ্চলভেদে কেউ আরাধনা করেন রাম, কৃষ্ণ বা কালীর; কেউ মাতেন ‘জাহের বঙ্গা’র বন্দনায়। মহামারি থেকে বাঁচতে অলমিক সমাজ যে ‘মাত্তালাম’ পূজা করে, তা মূলত শীতলা দেবীরই রূপ। আবার কালী বা বনদুর্গার পূজাকে তারা বলে ‘আমতেলি’। এই পূজার সুরের মিল পাওয়া যায় উত্তর জনপদের অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর ‘আমলোবান’ পূজায়। মুন্ডাদের প্রধান দেবতা ‘জাহের বঙ্গা’ মূলত তাদের গ্রাম দেবতা। তার সন্তুষ্টির ওপরই নির্ভর করে গ্রামের আগামী বছরের নিরাপত্তা ও ফসলের প্রাচুর্য।

 

বিদঘুটে বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব দ্রোহ

সনাতন হিন্দু সমাজের সঙ্গে এই নৃগোষ্ঠীর মৌলিক তফাৎটা গড়ে ওঠে পূজার পৌরোহিত্যে। সমতলের মানুষ যেখানে চক্রবর্তী বা কুলীন ব্রাহ্মণের ওপর পূজার ভার সঁপেন, সেখানে এই প্রান্তিক মানুষ বেছে নেন পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মানুষকে। শ্রদ্ধাবনত এই পদের নাম ‘অসাই’। এই ‘অসাই’ নির্বাচন কেবল একটি ধর্মীয় নিয়ম নয়, এটি আসলে আমাদের তথাকথিত মূলধারার সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব ও কড়া প্রতিবাদ। প্রবল জাত্যভিমান আর ছুঁতমার্গের দেয়াল তুলে আমরা যুগে যুগে এই মানুষের ব্রাত্য করে রেখেছি। আমাদের সামাজিক মণ্ডপগুলোয় তাদের ঠাঁই হয়নি। আমাদের অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে এই অন্ত্যজ শ্রেণিটি সমাজ থেকে ক্রমশ দূরে সরতে সরতে আজ ঠাঁই নিয়েছে গহীন অরণ্যের প্রান্তে। আর তাই, শহুরে বর্ণপ্রথার সেই বিদঘুটে অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা নিজেদের ‘অসাই’ নিজেই বেছে নেয়।

 

 

স্বকীয় কৃষি ও জল-প্রকৃতির মিতালী

প্রকৃতির এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব ও অভিনব কৃষি অর্থনীতি। চা কলোনির পাশে এক চিলতে ধানি জমি, ছোট পুকুরের মাছ কিংবা বাড়ির কোণের আম-কলা-লেবু বাগানই এখন তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। দেবতাকে তারা অন্য কোথাও থেকে কিনে আনা নৈবেদ্য দেয় না, উৎসর্গ করে নিজেদের ফলানো টাটকা ফসল। আমরা যখন সমতলে বসে উন্নত বীজ, সেচ আর রাসায়নিক কীটনাশক নিয়ে প্রতিনিয়ত হাহাকার করি, তখন এই প্রান্তিক মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব জৈব পদ্ধতিতে, নিজস্ব বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণ করে ফলিয়ে চলছেন বিষমুক্ত ফসল। তাদের এই অভিনব কৃষি পাঠশালা আধুনিক বিজ্ঞানকেও চমকে দেওয়ার মতো। একই চিত্র তাদের জল ব্যবস্থাপনায়। সুপেয় জলের তীব্র সংকটে যখন ঝিরি বা নালার অস্বচ্ছ জলই তাদের ভরসা, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে তাদের প্রাচীন কুটির শিল্প। পূজার দিনগুলোয় মাটির কলসি ও ভাঁড়ের কদর বাড়ে। প্লাস্টিকের এই যুগে জল সংরক্ষণের জন্য মাটির কলসির এই পুনরুত্থান যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি ঐতিহ্যবাহী।

 

ক্যান্টনমেন্টের চেয়েও ছিমছাম এক স্বর্গভূমি

এই নৃগোষ্ঠীর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরলে তাদের গৃহ ব্যবস্থাপনার নান্দনিকতায় মুগ্ধ হতে হয়। মেঠো পথে কোনো ঝরা পাতার আবর্জনা নেই, ঝোপঝাড়ের বিশৃঙ্খলা নেই। কাদা-মাটির লেপা উঠানগুলো এতটাই তকতকে যে, এক পলকে ভুল করে সামরিক সেনানিবাস বা কোনো পরিকল্পিত আধুনিক আবাসন বলে ভ্রম হতে পারে! বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের চুক্তিটা যেন অলিখিত। ঘরের পাশের সুবিন্যস্ত পুকুরগুলো বাস্তুতন্ত্রের একেকটি জীবন্ত উদাহরণ। সাপের উপদ্রব থাকা বড় জলাশয়গুলোয় মানুষের নামা নিষেধ। সেখানে ফোটা লালপদ্ম, শাপলা বা ভাঁটফুল ছেঁড়া পাপ–কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে না। প্রকৃতির প্রতি এই পরম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তৈরি হয় তাদের নিজস্ব লোকজ স্তব ও স্তুতি। বৈদিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো তাদের নেই, কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত পৌরাণিক কেচ্ছা আর সুরের মায়ায় তারা অনন্য। কোনো এক কালবৈশাখীর ঝরঝর বৃষ্টির রাতে যখন দেশোয়ালি বা নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ভাষায় এই জনপদের মায়েরা সুর তোলেন, বোনেরা গীত গান–তখন ভাষা না বুঝেও চোখ ভিজে আসে। স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার কী আকুল ও ঐকান্তিক প্রয়াস!

 

উৎসবের রং ও অন্তিম বাস্তবতা

এদের উৎসবে রং এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বসনে ও ভূষণে বিচিত্র রঙের ছোঁয়া। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের প্রহর ভেদে বদলে যায় উৎসবের এই রং। তবে তাদের উৎসবের পোশাকের সুতায় হাত দিলে টের পাওয়া যায় অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর কশাঘাত। সস্তা সিনথেটিক বা পলিয়েস্টারের কাপড়ে ঢাকা পড়ে যায় তাদের উৎসবের জৌলুস। একটু সচ্ছলতার মুখ দেখলে তবেই গজ কাপড় কিনে শার্ট বা মায়েরা বছরে বড়জোর একটা তাঁতের শাড়ির বিলাসিতা করতে পারেন। তবু এই অভাব, অবহেলা আর প্রান্তিকতার ভেতরেও তাদের উৎসবের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। সমতলের তথাকথিত সুশীল সমাজের মতো জাত্যভিমান বা ছুঁতমার্গ নেই ওদের ডেরায়। সেখানে সবার একটাই পরিচয়–মানুষ। শহুরে বাবুদেরও তারা বুকে টেনে নেয়, মেতে ওঠে উদ্বাহু নৃত্যগীতে। কারণ তারা জানে, মানুষ আর প্রকৃতির চেয়ে বড় সত্য এই চরাচরে আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রান্তিকের এই বুনো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শেকড়কে ভুলে আমরা যতই যান্ত্রিক হই না কেন, দিনশেষে আমাদের ফিরতে হবে প্রকৃতির এই আদিম পাঠশালাতেই।

 

লেখক: সাংবাদিক, আলোকচিত্রী

 

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

হরেন্দ্রনাথ সিং, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, রাজশাহী

পরিমল সিংহ বাড়াইক, সভাপতি, চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্ট

লক্ষ্মণ মুন্ডা, সাধারণ সম্পাদক, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ

নৃপেন মুন্ডা, চা শ্রমিক নেতা, দরগাবিল, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ

ছোটন সর্দার, অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, নাটোর

বাবা দিবস আমার ‘দুই’ বাবা: রক্তের সম্পর্কে একজন, ভালোবাসায় আরেকজন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
আমার ‘দুই’ বাবা: রক্তের সম্পর্কে একজন, ভালোবাসায় আরেকজন
বাবা আবুল হোসেন ও বড় মামা হাবিবুর রহমান হাবিব

কেউ বাবাকে আব্বা বলে, কেউ বাবা বলে, আবার কেউ আব্বু বলে ডাকেন। আমারও দুজন বাবা রয়েছেন, অবাক লাগছে! কিন্তু হ্যাঁ- একজন আমার জন্মদাতা আব্বা, আরেকজন আমার ‘ছোট বাবা’, যিনি আসলে আমার বড় মামা। একজন আমাকে পৃথিবীতে এনেছেন, আর অন্যজন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দায়িত্ব আর ছায়া হয়ে পাশে থেকেছেন। তাই নিজেকে আমি সবসময় সৌভাগ্যবতী মনে করি। কারণ সবার ভাগ্যে দুজন বাবার এমন অকৃত্রিম স্নেহ জোটে না।

২০১৭ সালের পর থেকে আমার দায়িত্ব চলে যায় আমার ছোট বাবার তত্ত্বাবধানে, যখন আমি ঢাকায় হলিক্রস কলেজে ভর্তি হয়েছি।

কলেজের কাছাকাছি একটা হোস্টেলে মামা আমাকে রেখে যান। প্রয়োজনীয় যা কিছু লাগবে সবকিছু আমার ছোট বাবা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। জিনিসগুলো মধ্যে কিছু জিনিস আমার কাছে এখনও রয়ে গেছে। যেমন, টুকটুকে লাল রংয়ের একটা বেডশিট যার মধ্যে বড় বড় লাল রংয়ের সূর্যমুখী ফুলের ছাপ। আমি এখনও মাঝেমধ্যে এই বেডশিটটি ব্যবহার করি।

আমার বড় মামা সব কিছু কিনে দিয়ে গেলেও, তিনি আমাকে লবণ কিনে দিয়ে যাননি। হোস্টেলে পান থেকে চুন খসলেই আমি আমার বড় মামাকে ফোন দিতাম।

প্রথম দিনের এই ঘটনার পর আমি মামাকে ফোন দিয়ে বলি, ‘মামা আমার তো নুন নাই, কি দিয়ে খামু’। মামা বললেন, ‘ঠিক আছে আম্মু, আমি অফিস শেষে তোমাকে দিয়ে আসবো’।

ওইদিন বিকেলে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মামা বৃষ্টিতে ভিজে আমার জন্য লবণ কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তখন ভাবছিলাম, এই লোকটা আমাকে এতো ভালোবাসে কেন! বোনের সন্তানকে কেউ এইভাবে ভালোবাসতে পারে! 

আমার সঙ্গের যারা হোস্টেলে থাকতো, তারা অবাক হয়ে যেতো মামা তার ভাগ্নিকে এমন ভালোবাসতে পারে!

মজার ব্যাপার হলো, আজও আমার বান্ধবীরা আমার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার আগে আমার মামার কথা জানতে চায়। আমার মামা কেমন আছেন? মামা ভালো আছেন তো?

আমি অসুস্থ হয়ে গেলে অস্থির হয়ে যেতেন মামা। তিনি পুরান ঢাকা থেকে ফার্মগেটে এসে আমাকে সপ্তাহের দুএক দিন ছাড়া, বলতে গেলে অন্য সব দিনই দেখে যেতেন। এমনও হয়েছে, আমি অসুস্থ থাকলে তিনি দিনে তিন বারও এসে দেখে গেছেন। তার একটা ছোট্ট মেয়ে রয়েছে। হুমাইরা। মামা আমাকে বলেন, আমি নাকি তার বড় মেয়ে। তিনি আমাকে আম্মু বলে ডাকেন। কলেজে মামা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন।

কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরুর পর মামার সঙ্গে একটু দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু তার ভালোবাসা আমার প্রতি কখনোই কম ছিলো না। এটা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রাজধানীর বাইরে হওয়ায়।

রাস্তার দূরত্ব বেশি হলেও, মনের দূরত্ব ছিল না। আমার মন খারাপ থাকলে মামা যেন কীভাবে বুঝে যেতেন। একবার কী নিয়ে জানি রাগ করেছি, কথা বলি না, ফোনও ধরি না। সব বন্ধ করে রেখেছি। চিন্তায় মামা আমার ক্যাম্পাসে চলে আসেন। মামা এসে আমার হলের গেটে দাঁড়িয়ে ফোন দিচ্ছিলেন। একে একে ৩৩ বার ফোন দিয়েছেন। কিন্তু আমি ফোন না ধরে ফোনটির দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ রুমে এসে এক জুনিয়র বলছে, আপনার মামা নিচে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ ধরে। বোরকা পরে নিচে গিয়ে দেখি, সত্যি সত্যি মামায় দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর মামাকে ক্যাম্পাসের ছোট অস্থায়ী রেস্টুরেন্টে খাবার খাইয়েছিলাম রাগ কমানোর জন্য। তিনি আমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে  ক্যাম্পাস থেকে চলে যান, আর বলেন- ‘এমন কইরো না আম্মু আর’। 

বাড়িতে থাকাকালীন কেউ কিছু বললে খাওয়া বন্ধ করে দিতাম। আমার আবার অভ্যাস খারাপ, খালি গাল ফুলাই অল্পতেই। আমার আব্বা একবার  কী যেন বলছিলেন, এর পর রাগ করে এক সপ্তাহে খাবার খাইনি। এটা সর্বোচ্চ না খাওয়ার রেকর্ড আমার জীবেন। এর পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।

আব্বা পরে বলেছিলেন, ‘তোকে আর কিছু বলবো না আমি’।

দুইজনের সঙ্গেই আমার মান-অভিমান চলে এখনও।

দুঃখের ব্যাপার, আমি আমার মামাকে সরাসরি ‘ছোট বাবা’ ডাকিনি একবারও। কখনও বলিনি, ‘ছোট বাবা আমিও আপনাকে অনেক ভালোবসি’।

আমি আমার দুই বাবাকে খুব ভালোবাসি। সবসময় তাদের অনুভব করি। সব সময় ভালো থাকুক আমার এই দুই বাবা।