২২শে জানুয়ারি থেকে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, এটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক মিলনমেলা। দুই বাংলার পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে যে সেতুবন্ধন বইমেলার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল, তা কয়েক দশক ধরে ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ ছিল কলকাতা বইমেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যাশিত দিক। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এবারের ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই উপস্থিত থাকতে পারছে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সরকারি অনুমতি না পাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড।
এই অনুপস্থিতি শুধু একটি দেশের অংশগ্রহণ বন্ধ হওয়া নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতির একটি বড় ক্ষতি।
গত প্রায় তিন দশকে কলকাতার পাঠকদের মধ্যে বাংলাদেশের বইয়ের যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও গভীর। প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা, ইতিহাস, উপন্যাস, কবিতা—বাংলাদেশের প্রকাশনাগুলো কলকাতার পাঠকদের কাছে ভিন্ন এক স্বাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছিল। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলো দুই বাংলার অভিন্ন ইতিহাস ও আবেগকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিত। অনেক তরুণ পাঠক বাংলাদেশের লেখকদের লেখা পড়ে ইতিহাসকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ পেয়েছে। এই সাংস্কৃতিক আদান–প্রদান কোনো সরকারি চুক্তির ফসল ছিল না, বরং পাঠকের আগ্রহ ও ভাষার টানেই তা গড়ে উঠেছিল।
এবার সেই স্বাভাবিক ধারায় ছেদ পড়েছে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে নানা জটিলতায় আবদ্ধ, যার প্রভাব পড়ছে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিনিময়ের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও। নিরাপত্তার কথা বলে বাংলাদেশের প্রকাশকদের অংশগ্রহণ বন্ধ হওয়া এক ধরনের প্রতীকী বার্তাই দেয়-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতিকেও বন্দি করে ফেলেছে। অথচ সংস্কৃতি ও সাহিত্য এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মানবিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার কথা ছিল।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকাশক ও বই ব্যবসায়ীরা। কলকাতা বইমেলা বাংলাদেশের প্রকাশনাগুলোর জন্য একটি বড় বাজার তৈরি করেছিল। অনেক প্রকাশক সারা বছরের পরিকল্পনাই করতেন এই মেলাকে কেন্দ্র করে। নতুন বই প্রকাশ, লেখক–পাঠকের সরাসরি সংযোগ, বিদেশি পাঠকের প্রতিক্রিয়া-সবকিছুই ছিল এই মেলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ বছর সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি একটি দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
ক্ষতি শুধু বাংলাদেশের নয়, কলকাতার পাঠকরাও বঞ্চিত হলেন। যারা প্রতিবছর বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে গিয়ে নতুন বই খুঁজতেন, লেখকদের সঙ্গে কথা বলতেন, ভিন্ন অভিজ্ঞতার সাহিত্য সংগ্রহ করতেন-তাদের জন্যও এটি এক ধরনের শূন্যতা। বইমেলার বহুমাত্রিক চরিত্র অনেকটাই নির্ভর করে ছিল দুই বাংলার সম্মিলিত উপস্থিতির ওপর। সেই বৈচিত্র্য কমে যাওয়া মানে মেলার প্রাণশক্তির একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া।
খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে রাজনীতির বাইরে রাখার কথা প্রায়ই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে তা খুব কমই রক্ষা করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশ-কেউই সেই সংযম দেখাতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনে সবচেয়ে সহজে বলি হয় সংস্কৃতি, কারণ একে অনেক সময় ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘নরম শক্তি’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সংস্কৃতিক সম্পর্কই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও সহমর্মিতা গড়ে তোলে। বইমেলার মতো আয়োজন সেই বিশ্বাস তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম ছিল।
কলকাতা বইমেলা থেকে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে। এটি শুধু একটি বছরের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যদি এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দুই বাংলার সাহিত্যিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে, নতুন প্রজন্ম একে অন্যের লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম পাবে। ভাষা এক হলেও অভিজ্ঞতার বিনিময় না হলে সেই ভাষাও ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে যায়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা জরুরি। নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সমাধান খুঁজে সংস্কৃতির দরজা বন্ধ না করে খোলা রাখার দায়িত্ব দুই পক্ষেরই। প্রকাশক, লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং পাঠকদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরই পারে এই অনুপস্থিতিকে সাময়িক রাখার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে। কারণ বইমেলা কোনো একক দেশের নয়, এটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সম্মিলিত উৎসব।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছাড়া কলকাতা বইমেলা যে অসম্পূর্ণ-এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। আশা করা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে আবারও দুই বাংলার বই একসঙ্গে পাঠকের হাতে পৌঁছাবে। কারণ রাজনীতি পরিবর্তনশীল, কিন্তু সাহিত্য ও সংস্কৃতির বন্ধন দীর্ঘস্থায়ী। এই বন্ধন রক্ষা করাই আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম