রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ কখনো কখনো স্বৈরাচার নয়; বরং স্বৈরাচারকে পরাজিত করার নামে এমন এক শক্তির উত্থান, যারা মুক্তির ভাষা ধার করে মানুষের সামনে হাজির হয়, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত আরও গভীরভাবে ধ্বংস করে। ইতিহাস বারবার আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে। জনগণ অনেক সময় যে শক্তিকে মুক্তিদাতা মনে করে বরণ করে নেয়, পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেই শক্তিই নতুন শৃঙ্খলের কারিগর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সেই তিক্ত সত্যকেই আবার সামনে এনেছে। একসময় অনেকেই মনে করেছিলেন, দেশের সব সংকটের মূল কারণ একজন ব্যক্তি, একটি দল অথবা একটি সরকার। তারা বিশ্বাস করেছিল, তাদের বিদায়ের মধ্য দিয়েই যেন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরে আসবে। রাষ্ট্রের জটিল সংকটকে তারা সরল সমীকরণে নামিয়ে এনেছিল। মনে করেছিল, শাসক বদলালেই মুক্তি আসবে।
আজ সময়ের দূরত্ব থেকে ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে–তারা কি ভুল করেছিল? যে শাসনব্যবস্থাকে আমরা প্রতিদিন গালি দিয়েছি, তাকে হয়তো স্বৈরাচার বলার যথেষ্ট কারণ ছিল। মতপ্রকাশের সংকোচন ছিল, বিরোধী রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি আদর্শিক ভিত্তিও ছিল। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা–এসব অন্তত রাষ্ট্রীয় বয়ানের অংশ ছিল।
আজ সেই বাস্তবতাকে রোমান্টিক করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটিও সত্য অনেকেই বুঝতে পারেনি, ইতিহাসে সব কর্তৃত্ববাদ এক রকম নয়। উন্নয়নবাদী কর্তৃত্ববাদ, সামরিক কর্তৃত্ববাদ, ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ কিংবা ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদ–এসবের চরিত্র এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন জনগণ একটি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আরও ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদের পথ প্রশস্ত করে।
গণতন্ত্রের নামে যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে, তারা যদি গণতন্ত্রকে কেবল একটি সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেই পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ প্রকাশ্য স্বৈরাচারকে মানুষ সহজে চিহ্নিত করতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের পোশাক পরা ফ্যাসিবাদ অনেক বেশি ধূর্ত, অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং অনেক বেশি বিধ্বংসী। আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই বিপদের লক্ষণ স্পষ্ট। একটি সমাজকে দখল করতে হলে প্রথমে তার ইতিহাসকে দখল করতে হয়। তাই আমরা দেখছি ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার প্রতিযোগিতা চলছে। মুক্তিযুদ্ধকে খণ্ডিত করা হচ্ছে, স্বাধীনতার ইতিহাসকে দলীয় ইতিহাসে রূপান্তর করা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদেরও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।
ইতিহাসের এই বিকৃতি কেবল অতীতের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি ভবিষ্যতের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র।
কারণ যে জাতি তার ইতিহাস হারায়, সে জাতি তার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও হারায়। একসময় যে সমাজে মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রামের প্রতীক, সেখানে আজ মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি রাজনৈতিক পক্ষের সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্তরসূরিদের নতুন ভাষা, নতুন পোশাক ও নতুন কৌশলে পুনর্বাসনের পথও তৈরি করা হচ্ছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পৃথিবীর বহু দেশে ফ্যাসিবাদ এভাবেই কাজ করেছে। তারা প্রথমে ইতিহাসের ভাষা বদলায়, তারপর সংস্কৃতির ভাষা বদলায়, শেষে রাষ্ট্রের ভাষা বদলায়। বাংলাদেশেও আমরা সেই রূপান্তরের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। রাজনীতির জায়গা দখল করছে করপোরেট স্বার্থ, আন্তর্জাতিক শক্তির চাপ এবং অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠীগত প্রভাব। জনগণের ভোট, অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রশ্নগুলোকে দুর্বল করে দিয়ে এক ধরনের অভিভাবকতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
এই ধারণার মূল কথা হলো–জনগণ নাকি নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়; তাই কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’, কিছু ‘সুশীল’, কিছু ‘মহৎ ব্যক্তি’ জনগণের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টিকে না। জনগণকে অক্ষম প্রমাণ করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের অধিকারও কেড়ে নেয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন। একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার ভাষা, গান, সাহিত্য, ইতিহাস ও স্মৃতির ওপর। যখন এসবের জায়গায় বিভাজন, বিদ্বেষ ও পরিচয়-সংকটকে উসকে দেওয়া হয়, তখন সমাজের ভেতরে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন রাজনৈতিক মতভেদকে ক্রমশ অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপান্তর করা হচ্ছে। ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তির জায়গা দখল করছে গালাগালি, গবেষণার জায়গা দখল করছে গুজব, আর রাজনীতির জায়গা দখল করছে উন্মত্ততা।
এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
একজন বামপন্থি হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সংকট কেবল ব্যক্তি বা দলের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের সংকট। শাসক বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে–এই ধারণা বহুবার ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের প্রয়োজন রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা, অর্থনীতিকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে আনা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে মুক্তচিন্তার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক করা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই পথের বদলে ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিবিদ্বেষের চক্রে আটকে গেছি।
ফলে এক শাসকের পতনে আমরা উল্লাস করি, আরেক শাসকের উত্থানে আবার হতাশ হই। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। বাংলাদেশের মুক্তি কোনো ব্যক্তি, কোনো ত্রাতা, কোনো বিদেশি শক্তি কিংবা কোনো অলৌকিক নেতৃত্বের হাতে নেই। বাংলাদেশের মুক্তি নিহিত আছে তার শ্রমিকের মধ্যে, কৃষকের মধ্যে, ছাত্রের মধ্যে, নারীর মধ্যে, সাংস্কৃতিক কর্মীর মধ্যে এবং সংগ্রামী জনগণের মধ্যে। কারণ ইতিহাসে জনগণই শেষ কথা।
আজ তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কোথায় ভুল করেছি, কেন ভুল করেছি, কাদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস করেছি, কেন রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করেছি–এসব নিয়ে সৎ আলোচনা প্রয়োজন। মোহভঙ্গ কষ্টের বিষয়। কিন্তু মোহভঙ্গ ছাড়া সত্যকে দেখা যায় না। সম্ভবত আমরা এখন সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।
আমরা দেখছি, শাসক বদলেছে; কিন্তু শোষণ রয়ে গেছে। স্লোগান বদলেছে; কিন্তু বৈষম্য রয়ে গেছে। মুখ বদলেছে; কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র খুব বেশি বদলায়নি। এ কারণেই আজ প্রশ্ন উঠছে–আমরা কি সত্যিই মুক্তির পথে এগিয়েছি, নাকি নতুন এক অন্ধকারের দিকে হাঁটছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।
কারণ একটি জাতির সর্বনাশ কখনো একদিনে ঘটে না। সর্বনাশ ধীরে ধীরে আসে। ইতিহাস বিকৃত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আসে। সংস্কৃতি বিকৃত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আসে। গণতন্ত্রকে দুর্বল করার মধ্যে দিয়ে আসে। জনগণকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আসে। আর যখন মানুষ বুঝতে পারে সর্বনাশ হয়ে গেছে, তখন অনেক ক্ষতিই ইতোমধ্যে ঘটে যায়। তবু আশা আছে। কারণ ইতিহাসের শেষ কথা কখনো ফ্যাসিবাদ নয়, কখনো কর্তৃত্ববাদ নয়, কখনো শোষণ নয়। ইতিহাসের শেষ কথা মানুষ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে জনগণের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে।
সেই লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
লেখক: সহকারী ব্যবস্থাপক, নতুন দিগন্ত