ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানে আগের মতো আর শিক্ষার পরিবেশ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন নষ্ট রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নগ্ন দলীয়করণ রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ’৬০-এর দশকের ছাত্ররা যে জ্ঞান আহরণ করেছে, এখন ছাত্ররা কি তা পারছে? ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা শিক্ষক যারা তারা কি সব কোর্স পড়িয়ে ছাত্রদের মাঝে জ্ঞান বিতরণ করতে পারছি। এর জন্য ছাত্রদের দায়ী করে লাভ নেই। শিক্ষকরাই দায়ী। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও নীতি দায়ী।…
শিক্ষাঙ্গনে স্বজনপ্রীতি একবারেই থাকা উচিত নয়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বত্র স্বজনপ্রীতি দেখা যায়। স্বজনপ্রীতি একটা সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। নীতি হলো যোগ্যতাই হবে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি। সেই নীতিই আমরা অতীতে ফলো করে এসেছি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি ছিল। যোগ্যতার ভিত্তিতেই পদোন্নতি হবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই নীতি বহাল থাকেনি। বিশেষ করে গত ১৬ বছরে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে কোনো ন্যায়নীতি অনুসরণ করা হয়নি। প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যখন নিরপেক্ষ ছিল তখন শিক্ষাব্যবস্থা ভালো চলেছে। যখনই স্বজনপ্রীতি এসেছে তখন বিশ্ববিদ্যালয় ভালো চলেনি।
আমি উপাচার্য থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরপেক্ষভাবে চালানোর চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় নিরপেক্ষভাবে চললে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। আমি প্রশাসনে থাকা অবস্থায় বারবার সরকারকে বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয় নিরপেক্ষ রাখলে আপনাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই দলীয়করণ করা যাবে না। গত ১৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে নগ্ন দলীয়করণ করা হয়েছে। প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয়। দেশের শিক্ষাবিদদের; যাদের প্রকাশিত বই ও পাঠক পরিচিতি আছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছে তারাই উপাচার্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। আমি নিজেও যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলাম। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিশেষ করে ২০১০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এত নগ্ন দলীয়করণ হয়েছে যা ইতিহাসে বিরল। যিনি শেখ হাসিনাকে বেশি তোষামোদী করতে পেরেছেন, তাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশে অনেক যোগ্য লোক থাকা সত্ত্বেও যিনি সরকারের বেশি দালালি করতে পারবেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয় লোকদের বেশি বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে মেধার ভিত্তিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও নজির আছে, যেখানে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট বাদ দিয়ে সেকেন্ড ক্লাসের কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয় বিবেচনায় বহু নিয়োগ হয়েছে। এভাবে উচ্চশিক্ষায় বড় আকারে ধস নেমে এসেছে। শিক্ষকদের মধ্যে শুধু দলবাজি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত নিয়োগে দলীয়করণ হয়েছে। তাঁবেদার বা তোষামোদকারী শিক্ষক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি উপাচার্য হবেন তাকে একজন শিক্ষাবিদ হতে হবে। ভিসিকে অনেক দূরদর্শী হতে হবে। আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয় কোন পর্যায়ে যাবে তা নিয়ে ভিসিকে ভাবতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করতে হবে। যিনি লেখাপড়া করেন না, বরং দলবাজি করেন, তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখবেন। উচ্চশিক্ষায় আর শিক্ষা নেই, একদম ধস নেমে এসেছে। এমনকি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরেও দলীয়করণ হয়েছে।
১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় অনেক স্বপ্ন নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যারা ন্যায়নীতি বিশ্বাস করে না, পদলেহনকারী ও দলবাজি করে, সেসব লোক যেন কখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না পান। বিশ্ববিদ্যালয় হলো অধ্যায়নক্ষেত্র এবং জ্ঞানচর্চার জায়গা। কেউ যদি দলবাজি করেন, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষাদান করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের সময়ে তাদের দলের বাইরে কোনো কথা বলা যায়নি। চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাধীনতা না থাকলে কীভাবে তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময় বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকতে হবে। কীভাবে একটা জাতি উন্নতি করবে, যদি সেখানে চিন্তার স্বাধীনতা না থাকে। চিন্তার স্বধীনতা না থাকলে সেখানে গণতন্ত্র থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি একদম মিশে গেছে। লেজুরবৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি দূর করতে হবে। ছাত্ররাজনীতি থাকবে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষপাতি আমি নই। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি স্বাধীনভাবে থাকবে। ছাত্ররাজনীতি স্বচ্ছ থাকবে, সেখানে কোনো চাঁদাবাজি থাকবে না। তারা দেশে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। এ জেনারেশনের ছাত্ররা আগস্ট মাসে বিপ্লব করে দেখিয়ে দিয়েছে। তারা ফ্যাসিবাদী সরকার দমন করেছে। আমাদের দেশের চেতনা ও গণতন্ত্রের পক্ষে ছাত্ররা আন্দোলন করবে। গত ১৬ বছরে ছাত্ররা যে রাজনীতি করেছে, এটা কীসের রাজনীতি? এটা ছিল সন্ত্রাসী রাজনীতি। ছাত্রদের লেজুরবৃত্তিক ও দালালি রাজনীতি ছিল। এভাবে ছাত্ররাজনীতি হতে পারে না। ছাত্ররাজনীতি হবে আদর্শিক। মানুষের মঙ্গল কামনায় ও সুনাগরিক সৃষ্টির পক্ষে ছাত্ররাজনীতি হবে। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। এখন কি কেউ সদা সত্য কথা বলে। কারণ, এখন সত্য কথা বলে তেমন লাভ হয় না, মিথ্যা কথা বলে লাভ হয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে কেউ থাকে না। অথচ ন্যায় ও সত্য ছাড়া কোনো সমাজ উন্নতি লাভ করতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতিও এখন দূষণীয়। ১৯৭৩-এর আইনের সংশোধন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সারা বছরই শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এগুলো বন্ধ করতে হবে। সারা বছর শিক্ষক নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন শিক্ষকরা। এটার কী দরকার। নির্বাচন করতে গিয়েই দলীয় রাজনীতি করতে হয়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন শিক্ষকরা। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি শিক্ষক রাজনীতি আছে? নির্বাচন আছে? শিক্ষক নির্বাচন বন্ধ করতে পারলে শিক্ষক রাজনীতি কমে আসবে। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতির যে মেলবন্ধন তা বন্ধ করতে হবে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমি এ দেশের একজন প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে বলব, ১৯৭৩-এর আইন সংশোধন করে শিক্ষকদের লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানে আগের মতো আর শিক্ষার পরিবেশ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন নষ্ট রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নগ্ন দলীয়করণ রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ’৬০-এর দশকের ছাত্ররা যে জ্ঞান আহরণ করেছে, এখন ছাত্ররা কি তা পারছে? ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা শিক্ষক যারা তারা কি সব কোর্স পড়িয়ে ছাত্রদের মাঝে জ্ঞান বিতরণ করতে পারছি। এর জন্য ছাত্রদের দায়ী করে লাভ নেই। শিক্ষকরাই দায়ী। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও নীতি দায়ী।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সংস্কারে এতগুলো কাজ করেছে, শিক্ষার সংস্কার কী করতে পারছে। একটা শিক্ষা কমিশন এখন পর্যন্ত গঠন করতে পারেনি। সরকার শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও এটা করেনি। শিক্ষা কমিশন সবার আগে করা দরকার ছিল, অথচ সেটাই করতে পারেনি। সবাই বলে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কীসের মেরুদণ্ড? জাতির মেরুদণ্ড কি আছে? নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘কোনো জাতিকে যদি ধ্বংস করতে হয় তাহলে কোনো গোলাবারুদের দরকার নেই। সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দাও। তাহলেই জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে’। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একদম ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশে যতটুকু শিক্ষাব্যবস্থা আছে, তাও আগামীতে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি একজন ছাত্রকে কীভাবে দোষ দেব যে, তুমি কেন অর্ধ শিক্ষিত হয়েছ? দেশে শিক্ষার যে ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে, তাতে অর্ধশিক্ষিত তো হবেই। দেশে সুনাগরিক তৈরি করতে হলে সবার আগে শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষাসংস্কার করতে হবে। শিক্ষায় এগিয়ে গেলে জাতি উন্নত হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়