ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
Khaborer Kagoj

শান্তিচুক্তির বছর ২৬ : জীবনমানের ব্যাপক উন্নয়ন

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:২৮ পিএম
শান্তিচুক্তির বছর ২৬ : জীবনমানের ব্যাপক উন্নয়ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৬তম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে আজ ২ ডিসেম্বর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির কথা বাদ দিলে চুক্তির হাত ধরে পিছিয়ে পড়া পার্বত্য অঞ্চলে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ।

বিশেষ করে শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা আর পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধি এসেছে পাহাড়ের মানুষের জীবনে। 

তবে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে নানা টানাপোড়েন চলে আসছে গত দুই যুগ ধরে। বেড়েছে অবিশ্বাস আর দূরত্বও। বাস্তবায়ন নিয়ে চুক্তি সম্পাদনকারী দুটি পক্ষেরই রয়েছে ভিন্নমত। ২৬ বছর পরেও চুক্তির ‘পূর্ণ বাস্তবায়ন’ না হওয়ায় ক্ষোভ আর হতাশার কথা বলছে চুক্তির স্বাক্ষরকারী দল জেএসএস। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার ওপর ভরসা রাখতে চায় দলটি। সরকারের তরফে দাবি করা হচ্ছে, ৭২টির মধ্যে ৬৯টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘স্থায়ী শান্তি’ ফিরিয়ে আনাই ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি পাওয়া এই চুক্তির ২৬ বছরেও শান্তি ফেরেনি পাহাড়ে। কেবল পাহাড়ি-বাঙালি জাতিগত সংঘাত কমেছে। বেড়েছে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। শান্তির পরিবর্তে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে মাঝে মাঝেই অস্থির হয়ে ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ের এ পরিস্থিতির জন্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়াকে ‘কারণ’ বলে দাবি করছেন চুক্তি সম্পাদনকারী দল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন ‘জনসংহতি সমিতি’। 

জনসংহতি সমিতি বিভিন্ন সময় দাবি করে আসছে, মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন এবং প্রত্যাগত জেএসএস সদস্যসহ ‘অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু’ ও ‘প্রত্যাগত উদ্বাস্তু’ পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেই। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে সার্বিক পরিস্থিতি জটিলতর অবস্থা ধারণ করছে।

চুক্তির মূল্যায়ন নিয়ে তরুণ প্রজন্মেও আছে নানান ভাবনা। রাঙামাটি শহরের বাসিন্দা দিশারী চাকমা বলেন, ‘চুক্তির ফলে পাহাড়ে হাজার কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিদ্যুতায়ন, রাস্তাঘাট বেড়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাহাড়ের মানুষ এর সুফল ভোগ করছেন।’

শহরের দেওয়ান পাড়ার বাসিন্দা তনয় দেওয়ান বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে আশাতীত উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এ অঞ্চলের বনায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়েনি। পাহাড়ে ভূমির ব্যবহার, বিশেষায়িত জুমচাষ, কৃষি, কাপ্তাই হ্রদের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর তেমন গুরুত্বারোপ করা হয়নি’। 

আলোচনায় আঞ্চলিক পরিষদ, তিন জেলা পরিষদ ও ভূমি বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে না। সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের দিয়ে সচল রাখা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। ভূমি বিরোধই সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে বেশি। 

২২ হাজারের বেশি ভূমি বিরোধের আবেদন কমিশনে জমা পড়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হয়। আইনটি ২০১৬ সালে সংশোধন করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে থেমে আছে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ (ল্যান্ড কমিশন)-এর কার্যক্রম। রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, আঞ্চলিক পরিষদ, ও তিন জেলা পরিষদের নির্বাচন দরকার। নির্বাচন না হওয়ায় জবাবদিহি নাই। এ জন্য জনআকাঙ্ক্ষাও পূরণ হচ্ছে না।

সংঘাত থামছে না
‘পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়’ আর চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ‘দৃশ্যমান দাবি’র আড়ালে পাহাড়ে এখন সক্রিয় ৬টি আঞ্চলিক সংগঠন সশস্ত্র তৎপরতার লিপ্ত। সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসীত খীসার ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ ন্যাশনালিস্ট পার্টি এবং সদ্য জন্মানো কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) আলাদা ‘জোট’ করে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। তবে নেতৃত্ব আর মতের বিরোধিতা থাকলেও এই চার আঞ্চলিক দলই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। 

অভিযোগ আছে, নানান উৎস থেকে বছরে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা চাাঁদাবাজি করে আসছে আঞ্চলিক দলগুলো। এসবের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আর আধিপত্য বিস্তারে নির্বিচারে একের পর এক খুন ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অস্থির হয়ে উঠেছে পাহাড়ের পরিস্থিতি। আঞ্চলিক দলগুলোর সংঘাতে প্রাণহানির পরিসংখ্যান নেই কারও কাছেই। তবে গণমাধ্যমে আসা তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে এখন পর্যন্ত গত ১০ বছরে পাহাড়ি তিন জেলায় খুন হয়েছেন চার শতাধিক মানুষ। অপহরণের শিকার সাড়ে ৫০০-এর বেশি। এ ছাড়া প্রসীতপন্থি ইউপিডিএফের ৩৫০ জন, সংস্কারপন্থি জেএসএস (এমএন লারমা) দলের ৮৩ জন খুন হয়েছেন প্রতিপক্ষের হাতে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাবিব আজম বলেন, আঞ্চলিক দলগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে বছরে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে আসছে। এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আর আধিপত্য বিস্তারে নির্বিচারে একের পর এক খুন ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অশান্ত হয়ে আছে পাহাড়ের পরিস্থিতি।

চুক্তি বাস্তবায়ন কত দূর 
দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চুক্তিতে সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক ও বৈষম্যমূলক’ ধারাগুলো সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছে পাহাড়ের স্থানীয় সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ। গতকাল শুক্রবার রাঙামাটি শহরে এই দাবিতে মানববন্ধন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)। মানববন্ধনে নেতারা বলেন, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য ২৬টি জাতীয় আইন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট ১২টি আইনসহ মোট ৩৮টি আইন সংশোধন করা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, ‘আমরা বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেছি। এটা আমরা আশা রাখব, সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষ এবং সরকার, আমাদের মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা উনি আমাদের বিষয়ে সংবেদনশীল। আমরা আশা রাখব, আমাদের যেন আর বলতে না হয়। এবারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করে এলাকায় যেন স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই প্রত্যাশা করব।’

রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘শান্তিচুক্তির মূল বিষয় ভূমি কমিশন, পুলিশ, বন বিভাগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। ৭২টির মধ্যে ৬৯টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। কাঁঠালের আমসত্ত্ব হয় না। আওয়ামী লীগ চুক্তি করেছে, বাস্তবায়নও করবে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব রেখে ও নেতা-কর্মীদের হত্যা করে এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’

দীপংকর আরও বলেন, যারা শান্তিচুক্তিকে কালোচুক্তি, সংবিধানবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী বলেছিল তাদের সঙ্গে জনসংহতি সমিতি আঁতাত করে ২০০১ সালের নির্বাচন করেছে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো চুক্তি বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। যেকোনো মূল্যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, বিবেচনায় আনতে না পারি, তাহলে ২৬ বছর পরেও আরও অনেক বছর পার হবে। তারপরও আমরা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মুখ আমরা দেখব না।’

দল ও সরকার আলাদা থাকছে না

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ১২:১২ পিএম
দল ও সরকার আলাদা থাকছে না

দল ও সরকারকে আলাদা করার নীতি থেকে সরে এসেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে গঠিত মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা স্থান পেয়েছেন। শুক্রবার (১ মার্চ) আওয়ামী লীগের তিন কেন্দ্রীয় নেতা মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ৯ জন শপথ নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে এবারের মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় নেতার সংখ্যা দাঁড়াল ১২ জনে। বিগত মন্ত্রিসভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন ৫ জন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানান, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরে গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রাধান্য ছিল। ২০১৪ সালে সরকার গঠনের পর থেকে সরকার ও দল আলাদা করার আলোচনা ওঠে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে। ২০১৮ সালের মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। ওই মন্ত্রিসভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ ৫ জন স্থান পেয়েছিলেন। সে সময়ে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দল ও সরকারকে আলাদা করার নীতির কথা জানানো হয়। 

পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুটি সম্মেলনেও দল ও সরকার আলাদা রাখার নীতি দেখা যায়। সে সম্মেলনগুলোতে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের যথাসম্ভব কম রাখার নীতি বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়। ২০১৯ সালে সরকার গঠনের পরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে কয়েকজন মন্ত্রীকে বাদ দেওয়া হয়। সেবার মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া দলের তিন সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম ও মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাননি। দলের কার্যনির্বাহী সদস্য পদ থেকে বাদ পড়েন একাধিক প্রতিমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দল ও সরকার আলাদা করার বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়। কোনো দেশেই এমন নীতি অনুসরণ করা হয় না। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাই মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন। আওয়ামী লীগও এখন মনে করছে সরকার ও দল আলাদা করার নীতি দলের জন্য ভালো ফল আনবে না। 

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসলে সরকার ও দল আলাদা করার ঘোষিত কোনো নীতি আওয়ামী লীগ নেয়নি। বাস্তবতা ও প্রয়োজনের আলোকেই মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচন করা হয়ে থাকে। কোনো দেশেই দল ও সরকার আলাদা করা হয় না। আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও এ নীতি নেই।’

২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে গঠিত সরকারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন ৫ জন। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক কৃষিমন্ত্রী, দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও দীপু মনি যথাক্রমে তথ্য ও সম্প্রচার এবং শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে দলের সভাপতিমণ্ডলীর ১৭ সদস্যের মধ্যে মাত্র একজন বিগত মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এবারের মন্ত্রিসভায় দলের সভাপতিমণ্ডলীর ৪ জন সদস্যকে রাখা হয়েছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী, জাহাঙ্গীর কবির নানক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী, আব্দুর রহমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবং সিমিন হোসেন রিমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে হাছান মাহমুদ ও দীপু মনি বিগত মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তারা এবারের মন্ত্রিসভায়ও আছেন। বিগত মন্ত্রিসভায় দলের বিষয়ভিত্তিক ১৮ সম্পাদকের কেউই স্থান পাননি। এবারে তিনজন সম্পাদককে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে। তারা হলেন আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক বেগম শামসুন নাহার চাঁপা, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান। 

আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটিতে কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী সদস্য আছেন ২৭ জন। তাদের কেউই বিগত মন্ত্রিসভায় ছিলেন না। এবারের মন্ত্রিসভায় তাদের একজনকে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। 

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিক সাবেক সচিব আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের এবারের মন্ত্রিসভায় সদস্য করার বিষয়ে জোরালো চেষ্টা ছিল। এ ছাড়া একাধিক সাবেক আমলাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হবে এমন আলোচনাও ছিল। কিন্তু এতে বাদ সাধেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা। ওই নেতারা দলের নেতাদের মূল্যায়ন করতে শেখ হাসিনার কাছে জোরালো অনুরোধ জানান। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা জানান, বর্তমান বাস্তবতায় দলের নেতারা অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। সরকার পরিচালনায় আমলারা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। এমন অবস্থায় যদি মন্ত্রিসভায়ও আমলাদের রাখা হতো, তাহলে তা দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতো।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসলে নতুন নতুন বাস্তবতা মাথায় রেখেই আওয়ামী লীগ সভাপতি সিদ্ধান্ত নেন। দ্বাদশ নির্বাচনের পরে আমরা এখন যে বাস্তবতার মধ্যে আছি, সেখান থেকে হয়তো প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীয় নেতাদের মন্ত্রিসভায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন সরকারকে বাজার সিন্ডিকেট, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভেবেছেন, দলের পোড় খাওয়া, অভিজ্ঞ কেন্দ্রীয় নেতাদের মন্ত্রিসভায় নিলে তারা এসবের বিরুদ্ধে লড়তে পারবেন।’

মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে আগুন

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ১১:১৯ এএম
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে আগুন

বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ৯টা ৫০ মিনিট, ঠিক তখন রাজধানীর বেইলি রোডের বহুতল ভবনটিতে আগুন লাগে। ২০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ১৩টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ২ ঘণ্টার আগুনে গতকাল শুক্রবার (১ মার্চ) পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
 
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, ভবনটিতে মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল। দুটি লিফ্ট ছিল। আগুন লাগার পর কেউ নামতে পারেননি। কেউ বলছিলেন ওপরে আগুন লেগেছে, কেউ বলেছেন নিচে আগুন লেগেছে। ফলে মানুষ কোন দিকে যাবেন তা বোঝা যায়নি। এ কারণে এত মানুষ মারা গেছেন।

‘ভবনটিতে একাধিক রেস্তোরাঁ ও দোকান ছিল, যার মধ্যে কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ, স্যামসাংয়ের শোরুম, গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, ইলিন, খানা ও পিৎজা ইন নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল। পুরো ভবনের প্রতিটি তলায় রেস্তোরাঁ থাকায় ভবনে গ্যাস সিলিন্ডার মজুত রাখা ছিল, যার ফলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।’

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত

ভবনটির বিপরীত পাশে থাকা মি. বেকারের ম্যানেজার (ক্যাশ) কামরুল খবরের কাগজকে বলেন, ‘চোখের সামনে মানুষ মারা গেল, আর আমরা সবাই অসহায়ের মতো দেখলাম। ২০ মিনিটের মধ্যেই সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রাস্তায় যানজট থাকার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে আসতে দেরি হয়। যার কারণে হয়তো এত মানুষ মারা গেছেন। ফায়ার সার্ভিসের অভিযান শুরু করতে দেরি হওয়ার কারণও রয়েছে, এর মধ্যে বড় কারণ হলো সাধারণ মানুষ ও ফেসবুক পার্টি আগুনের ভিডিও লাইভ করতে থাকে। যে কারণে গলিতে ফায়ার সাভিসের গাড়ি ঢুকতে দেরি হয়। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানির অভাব ছিল ফায়ার সার্ভিসের কাছে।’

ভবনটির ডান পাশে কেএফসিতে কর্মরত ওয়েটার আহাদ জানান, ভবনটিতে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার সাধারণ মানুষ অন্যান্য মার্কেটের কাছে আসেন ফায়ার সেফটি নেওয়ার জন্য, কিন্তু কেউ সেফটি দেয়নি। বরং সেসব মার্কেট, দোকান, অফিস ও রেস্টুরেন্ট দ্রুত বন্ধ করে দেয়।

আগুন লাগা ভবনের কাচ্ছি ভাই রেস্টুরেন্টের ওপরের সাততলায় বসবাসরত সাখাওয়াত জানান, নিচতলায় কিচেন থেকে আগুন লাগে, ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর গ্যাস বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরা ভবনের আশপাশে। মানুষ বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত আসতে পারলে অনেক প্রাণ বেঁচে যেত।

প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ কনস্টেবল আজাদ জানান, আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও আহত হয়ে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে এখন চিকিৎসাধীন।

মি. বেকারের আরেক কর্মচারী খবরের কাগজকে জানান, প্রথমে কাচ্চি ভাইয়ের নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে কাচ্চি ভাইয়ের দোতলাতেও আগুন লাগে। এরপর সেখান থেকে আর কেউ বের হতে পারেননি। 

জানা যায়, ভবনটিতে পিৎজা ইন, স্ট্রিট ওভেন, খানাসহ আরও রেস্টুরেন্ট ছিল। এ ছাড়া ইলিয়েন, ক্লোজেস্ট ক্লাউডসহ জনপ্রিয় বিপণিবিতানও ছিল। 

আগুন লাগা ওই ভবনের কর্তৃপক্ষকে তিনবার নোটিশ দেওয়া হলেও সতর্ক হয়নি কেন?

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুর্ঘটনাটির খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বৃহস্পতিবার রাস্তায় একটু যানজট ছিল, সে কারণে হয়তো যথাসময়ে আসা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের কোনো ধরনের গাফিলতি নেই।’

তিনি বলেন, ‘ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তাকে আমাদের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হলেও তিনি গাফিলতি করেছেন। এর দায়ভার তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। তা ছাড়া ওই ভবনে কোনো অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছিল না। মানুষের আসা-যাওয়ার জন্য কেবল একটি ছোট সিঁড়ি ছিল। ভবন কর্তৃপক্ষকে অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষ মারা গেছেন। এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভবনটায় মাত্র একটি সিঁড়ি থাকায় ধোঁয়ার কারণে মানুষ সেখানে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। আমরা একটি তদন্ত কমিটি করেছি, আমরা আসলে দেখতে চাই কারও কোনো গাফিলতি আছে কি না। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

ভবনটিতে অফিস করার অনুমতি ছিল। কিন্তু অফিস না করে এখানে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টসহ দোকান করা হয়েছে- এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সচিব বলেন, ‘আমরা শুধু ফায়ার সেফটি প্ল্যানটা দেখি। এ বিষয়ে রাজউক বলতে পারবে। তবে এ বিষয়টি আমরাও তদন্ত করে দেখব। এই ভবনটিকে এর আগেও অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। আমরা মনে করি, যারা ব্যবসা করেন, তাদের সবাইকে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।’

আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল নিচতলা থেকে। আমাদের প্রাথমিকভাবে ধারণা, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’

সূত্র জানায়, ভবনটিতে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ ছিল এবং সিঁড়ির পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল গ্যাস সিলিন্ডার। যার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এম খুরশীদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, বেইলি রোডের ভবনটিতে গ্রিন কজি কটেজে প্রথমে ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্ট থেকে আগুন ছড়ানোর খবর পাওয়া গেলেও কাচ্চি ভাই নয়, আগুনের সূত্রপাত নিচতলার একটি দোকান থেকে হয়েছে বলে আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি।

র‌্যাবের ডিজি বলেন, ‘নিচের একটি ছোট দোকানে প্রথমে আগুন লেগেছিল। সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। তবে পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ মানুষই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধে মারা গেছেন।’ 

খুরশীদ আলম বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এখনো তদন্ত শুরু করিনি। কারা সিঁড়িতে সিলিন্ডার রেখেছে তা বের করা হবে। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারাও রিপোর্ট দেবে। একটি ভবন তৈরির ক্ষেত্রে রাজউকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সরকার দায়িত্ব দিলে আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করব। দায়িত্ব না পেলেও প্রকৃত ঘটনার খোঁজ নিয়ে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সহায়তায় একটি রিপোর্ট তৈরি করা হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলছেন, এই আগুনের ঘটনাটি কি শুধুই দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, সেটি খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছেন। 

পুরো ভবন ছিল আবদ্ধ, দেয়ালে দেয়ালে মানুষের হাতের ছাপ

বেইলি রোডের ভবনটি ছিল আবদ্ধ। আলো-বাতাসের জায়গা ছিল না। আটকা পড়া ব্যক্তিদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন তৃতীয় তলার একটি কক্ষে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও তারা বের হতে পারেননি। কক্ষ থেকে উদ্ধার হয় ৯ জনের লাশ। সেখানে থাকা সবাই ধোঁয়ায় মারা গেছেন। ধোঁয়া থেকে বাঁচতে জানালা খুঁজেছিলেন তারা। দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে তাদের হাতের ছাপ। গতকাল শুক্রবার সকালে ওই ভবন থেকে বেরিয়ে এমন বর্ণনা দেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিনের সঙ্গে তিনি ওই ভবন পরিদর্শন করেন।

আমরা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি চাই না

এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি চাই না। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি আমাদের ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডে মানুষ তাদের মূল্যবান জীবন হারাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে অধিকাংশ ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধক ব্যবস্থা নেই। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো জানার পরও ভবনগুলোতে দিনের পর দিন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এই অগ্নিকাণ্ডে অবশ্যই অসচেতনতা ছিল, অবহেলা ছিল। এত বড় একটি বাণিজ্যিক ভবনে ফায়ার এক্সিট থাকবে না? আর এটি না থাকার কারণে মানুষ অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারেনি।’ 

গতকাল শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

কমিশনের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি মর্মপীড়াদায়ক এবং ভীষণ উদ্বেগের। এ ধরনের বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটার পর কিছুদিন উত্তপ্ত পরিস্থিতি থাকে। কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার তা থেমে যায়। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এ বিষয়গুলোতে সচেতন হচ্ছি না, কার্যকর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে না । দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষও কখনো যথাযথ নজরদারি করছে না বলে ঘুরেফিরে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আমরা মনে করি, যাদের গাফিলতিতে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে।’

গাফিলতিতে মৃত্যুকূপ বারবার

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ০৬:৫০ এএম
গাফিলতিতে মৃত্যুকূপ বারবার
বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া ভবন। ছবি : খবরের কাগজ

বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মানা হচ্ছে না আইনগত বাধ্যবাধকতা। এতে অগ্নি-দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে পড়ছে শিশু, নারী ও পুরুষসহ বহু প্রাণ। একের পর এক এমন দুর্ঘটনা ঘটে চললেও নতুন ভবন নির্মাণ বা পুরোনো ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষও উদাসীন। নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। আইনগত বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন করতে ফায়ার সার্ভিসের ক্ষমতাও শুধু নোটিশ ইস্যু করা পর্যন্ত। ফায়ার সার্ভিস পারে না ভবন সিলগালা করতে। মালিকপক্ষের গাফিলতি ও কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা- এই দুই কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বছরে শুধু চুলা থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের মতো। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমবেশি ১০০ কোটি টাকা।

খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটা বেইলি রোডের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন গ্রিন কোজি কটেজে অনুমোদনহীনভাবে রেস্টুরেন্ট করা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে ওই ভবনে মানা হয়নি ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া বিধিনিষেধও। ফলে গত বৃহস্পতিবার রাতে খাবার খেতে গিয়ে ওই ভবনের একাধিক ফ্লোরে থাকা রেস্টুরেন্টের গ্রাহকদের মধ্য থেকে আগুনে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন নারী, পুরুষ, শিশুসহ মোট ৪৬ জন। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন আরও ১৩ জন।

সরেজমিনে জানা গেছে, ভবনটিতে কোনো গ্যাসসংযোগ ছিল না। প্রতিটি রেস্টুরেন্টে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হতো। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক এম খুরশীদ আলম গণমাধ্যমকে বলেছেন, নিচতলায় একটি গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনটি কাঁচবদ্ধ হওয়ায় দ্রুত ওই আগুন উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সব ফ্লোরে গ্যাস সিলিন্ডার থাকায় সেগুলো আগুনের সংস্পর্শ পেয়ে বিস্ফোরিত হয়। ফলে ভবনটি থেকে বের হতে পারেননি অনেকেই। এ কারণে মৃত্যু হয়েছে বেশি।

বহুতল ভবন নির্মাণে অগ্নিদুর্ঘটনাজনিত নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান ও ডিন অধ্যাপক ড. মো. দেলোয়ার হোসেন খবরের কাগজকে গতকাল রাতে বলেন, ‘আমাদের দেশে আইন আছে। রাজউকের আইন আছে, ফায়ার সার্ভিসের আছে। কিন্তু আইন-কানুনের প্রয়োগে ঘাটতি আছে। ফলে ভবনমালিকদের আইন মানার ক্ষেত্রে নির্লিপ্তভাব দেখা যায়। রাজউক থেকে প্ল্যান পাস করিয়ে নেওয়া হয় ঠিকই। কিন্তু তা ঠিকমতো পালন করা হয় না। উল্টাপাল্টা করে ফেলে।’

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুলশানের একটি ১৩ তলা বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে আগুন লাগে। সে সময় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ দ্রুত উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ অভিযান করলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান ভবনটির বাসিন্দারা। এর আগে ২০১৯ সালে রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে দিনের বেলায় অফিস চলাকালে আগুন লাগে। ওই ঘটনায় আগুনে পুড়ে মারা যান ২৫ জন। এর আগেও রাজধানীর নিমতলী, চুরিহাট্টা ও সিদ্দিকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অনেকে প্রাণ হারান।

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছি আমাদের নাগরিক জীবনে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ততই বাড়ছে। তাই জানমাল বাঁচাতে আইনগত বাধ্যবাধকতা পরিপালন করা জরুরি। অপরদিকে ভবনমালিক ও ভবন ব্যবহারকারীদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। নগরের সরু রাস্তাগুলোও অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। এসব নিয়েও ভাবতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে রাখা তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বাসাবাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৬ হাজার ৫৫৮টি। এর মধ্যে চুলা বা রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৮টি। আর বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ১১৬টি। 

এসব ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়নি ১ হাজার ৬৮৪টিতে। বাকিগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা। ফায়ার সার্ভিস ২০২৩ সালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার হিসাব দেয়নি।

যোগাযোগ করা হলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সিনিয়র স্টাফ অফিসার মো. শাহজাহান সিকদার খবরের কাগজকে বলেন, মূলত তিনটি আইনের আওতায় সুউচ্চ ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যবাধকতা আছে। এর একটিতে ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্লিয়ারেন্স নেন না ভবনমালিকরা। এ ক্ষেত্রে, ফায়ার সার্ভিস শুধু সতর্কতামূলক চিঠি ইস্যু করে কৈফিয়ত চাইতে পারে। ভবন সিলগালা করার ক্ষমতা নেই। আর এ কারণেই ভবনমালিকদের একটি বড় অংশ আইন মানেন না।

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভবনটির এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে তা শুধু অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য। রেস্তোরাঁ, শোরুম (বিক্রয়কেন্দ্র) বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

জানা যায়, বেইলি রোডের ওই ভবনের নিচতলায় স্যামসাং ও গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার নামের দুটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম বিক্রির দোকান, শেখলিক নামের একটি জুস বার ও চুমুক নামের একটি চা-কফি বিক্রির দোকান ছিল। দ্বিতীয় তলায় কাচ্চি ভাই নামের একটি রেস্তোরাঁ, তৃতীয় তলায় ইল্লিয়িন নামের একটি পোশাকের দোকান, চতুর্থ তলায় খানাস ও ফুকো নামের দুটি রেস্তোরাঁ, পঞ্চম তলায় পিৎজা ইন নামের একটি রেস্তোরাঁ, ষষ্ঠ তলায় জেসটি ও স্ট্রিট ওভেন নামের দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে অ্যামব্রোসিয়া নামের একটি রেস্তোরাঁ এবং সপ্তম তলায় অপর অংশে হাক্কাঢাকা নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল।

 

দাম বাড়লেও কমছে না লোডশেডিং

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০৬:০৮ পিএম
দাম বাড়লেও কমছে না লোডশেডিং
ছবি : সংগৃহীত

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণার মধ্যেই লোডশেডিং নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার কারণে মূলত এমন শঙ্কা প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। নানা কারণে এবার পরিস্থিতি গত গ্রীষ্মের চেয়েও ভয়াবহ হবে এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

জানা যায়, এবার গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। দেশে বর্তমানে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ (১৯ এপ্রিল ২০২৩)। সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে জ্বালানিসংকটের কারণে এই উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। 

বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, কয়লা ও ডিজেল আমদানির বিল বিপুল বকেয়া রয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। ভারতীয় কোম্পানি আদানি বাংলাদেশের কাছে পাবে ৫০ কোটি ডলার। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বকেয়া ৯ হাজার কোটি টাকা। কয়লার বিলে জরিমানাও গুনতে হয়েছে। 

এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ঘাটতি মেটাতে চাইছে সরকার। কিন্তু দাম বাড়ালেও লোডশেডিং থেকে মুক্তি নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ গত বছরও তিন দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও ভয়াবহ লোডশেডিং ছিল। 

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা প্রসঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবী আলী ইব্রাহিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে কিন্তু বিদ্যুৎ তো দিতে পারবে না। এবারও প্রস্তুতি হিসেবে চার্জার ফ্যান আগেরটা ঠিক করেছি এবং নতুন আরেকটা কিনে রেখেছি। এবার তো মনে হচ্ছে গতবারের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে।’

গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট বেশি উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে সরকারের। তারপরও লোডশেডিংয়ের শঙ্কার কারণ জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারা। তবে ৮ হাজার মেগাওয়াট বেশি উৎপাদন সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখা হলেও তাদের নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভাড়া পরিশোধ করেছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। 

টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের তো এত বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার নেই। এগুলোর তো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ জন্য ইউনিটপ্রতি দেড় থেকে দুই টাকা দাম বেড়ে যাচ্ছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইনও মনে করছেন, জ্বালানির কারণে পরিকল্পনামতো উৎপাদন করা না গেলে লোডশেডিং হতে পারে। তবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাটা স্বস্তিকর হবে। 

গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং সামাল দিতে না পেরে সরকার গত দুই বছর এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়ার পদ্ধতি চালু করে। সেই সময় দেখা যায় এলাকাভেদে ১ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সরকার ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং করেছে। বাস্তবে আরও বেশ লোডশেডিং হয়েছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। 

জানা যায়, গত বছর কোনো কোনো দিনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে সরকারকে। এতে ঢাকায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা এবং কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায়নি মানুষ।

টাঙ্গাইলের বেসরকারি চাকরিজীবী মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়তি দিয়েও তো স্বস্তি পাব না। আগেও দেখেছি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে কিন্তু লোডশেডিংয়ে নাকাল হতে হয়েছে।’ 

বকেয়া নিয়ে হিমশিম অবস্থা

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সরকারের কাছে পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বকেয়ার চাপ ও ডলারের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেল আমদানি ব্যাহত হতে পারে। শুধু পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেরই বিল বকেয়া প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ভারতীয় কোম্পানি আদানি পাবে ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো একটা ভালো ভরসা হতে পারত। তবে ডলারসংকটের কারণে কয়লা আমদানি করতে পারা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দেশের প্রায় সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেরই বিল বকেয়া রয়েছে। কয়লাসংকটের কারণে দুই দফায় পায়রা ও রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছিল। 

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ড ইস্যুর পরও তাদের ৪ থেকে ৫ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। বকেয়া আর বাড়ানো যাবে না, প্রতি মাসে নিয়মিত বিল দিতে হবে। একই সঙ্গে ডলারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বিল দেওয়া এবং ডলারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি গত বছরের চেয়েও খারাপ হবে।

আবারও অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারীরা

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০৩:২৯ পিএম
আবারও অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারীরা
প্রতীকী ছবি

গত বছরের ডিসেম্বরে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে এক নারীকে অ্যাসিড ছুড়ে মারা হয়। এ ঘটনায় ঢাকার অ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা করেন ওই নারী। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ ছিল, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন আসামিরা। এ ঘটনার দেড় মাস পার না হতেই গত রবিবার রাতে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় দুর্বৃত্তের ছোড়া অ্যাসিডে ঝলসে গেছে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মিলি আকতারের মুখ (২০) ও তার মা রাশেদা বেগমের (৫৫) শরীর।

প্রায় দুই দশক আগে ২০০২ সালে অ্যাসিড সন্ত্রাসের উল্লম্ফন নাড়া দিয়েছিল সারা দেশকে। এরপর আন্দোলন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং আইনের কড়াকড়িতে নেমে আসতে থাকে অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনা। তবে ইদানীং এই নিষ্ঠুরতা ঘটে চলেছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২-এর অধীন ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ২৩৮টি মামলা হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) তথ্য অনুসারে, ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে দেশে ৩ হাজার ৮৭০ জন অ্যাসিডে দগ্ধ হয়েছেন। ২০২৩ সালে আট নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশু অ্যাসিডদগ্ধ হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছয় নারী, এক পুরুষ ও এক শিশু অ্যাসিডদগ্ধ হয়েছেন। গত ২৪ বছরে অ্যাসিডদগ্ধ ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশ নারী। এ ছাড়া বর্তমানে প্রায় ৬০০ মামলা অ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে ১৪ জনের। তবে এখনো কারও ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

চাঁদপুরে অ্যাসিডদগ্ধ মিলি আক্তারের চাচাতো ভাই শাকিল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘মিলির অবস্থা ভালো না। চোখ মেলতে পারছে না, কথাও কম বলছে। ওর পেটের সন্তান নিয়ে মিলি খুব চিন্তায় আছে। তার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এ ক্ষত কোনো কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ 

২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল পারিবারিক কলহের জেরে মধ্যরাতে ঘুমন্ত পুত্রবধূ সমাপ্তির গায়ে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন গীতা মণ্ডল। সমাপ্তির সঙ্গে তরল আগুনে পুড়ে যায় তার শিশুপুত্র স্নিগ্ধজিতের কোমল শরীর, মাথা ও মুখের চামড়া। 

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সাতপাড় গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছিল। পারিবারিক ও সামাজিক কারণে এই জঘন্য অপরাধ করেও পার পেয়ে যান শাশুড়ি গীতা মণ্ডল; কোনো শাস্তিই হয়নি তার।

শরীরে জ্বালাপোড়ার যন্ত্রণা নিয়েই সমাপ্তি সংসার করে চলেছেন। আর ছোট স্নিগ্ধজিৎ পোড়া মাথা, মুখ ও শরীর নিয়ে বেড়ে উঠছে।

অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার ভুক্তভোগী একাধিক নারী খবরের কাগজকে জানান, অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার অনেক নারী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। তবে সাধারণ জীবনে ফিরতে পারছেন না। বিশেষ করে যাদের মুখমণ্ডল পুড়েছে তারা সমাজে আর ১০ জন মানুষের মতো চলাফেরা ও পড়ালেখা করতে পারছেন না। আর যারা স্বামীর সংসার করছেন তারা অনেক অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছেন। এ ছাড়া অ্যাসিডের ঘা শুকালেও মনের ক্ষত কখনোই সারে না। ভেতরে পীড়া দেয়, যদি আগের মতো হতে পারতাম।

ভুক্তভোগী এসব নারীর দাবি, সরকার যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়। আর এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আইন আরও কঠোর করার দাবি জানান তারা। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে একসময় অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রেমের বা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে বা পুরুষের মতামতে সাড়া না দিলে অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হতো। নারীর প্রতি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব পালনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে নারীর জন্য একটি নিরাপদ অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।’ 

তিনি বলেন, অবিলম্বে অতীতের মতো আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়বে। শাস্তির ভয়ে অ্যাসিড নিক্ষেপ দীর্ঘ সময় প্রায় বন্ধ ছিল। চলতি সময়ে নারীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ভয়াবহ অপরাধের যে চিত্র দৃশ্যমান তা সমাজের ভঙ্গুর অবস্থাকে ইঙ্গিত করে। তবে সামাজিকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন ও কঠোর শাস্তির প্রয়োগ অ্যাসিড নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সমাজের সঠিক ধারায় চলতে বাধ্য করবে। সময়ের সমাধান হিসেবে এটাই প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত এক বছরে ঢাকা মেট্রোপলিটনে আমরা এ ধরনের অভিযোগ একটিও পাইনি। তবে ঢাকার বাইরে নারীরা অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’