ঢাকা ১১ বৈশাখ ১৪৩১, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

দুর্বিষহ শব্দদূষণ, বেপরোয়া হর্ন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:১৫ পিএম
দুর্বিষহ শব্দদূষণ, বেপরোয়া হর্ন

রাজধানীর আসাদ অ্যাভিনিউতে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তা পার হন, তখন অনেককেই দেখা যায় দুই হাতে কান চেপে ধরতে। বয়স্ক মানুষ অস্থির হয়ে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এমন পরিস্থিতি। একই রকম দৃশ্য চোখে পড়ে ফার্মগেট, বাংলামোটর, মহাখালী, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যস্ত সড়কে।

বছিলায় ছোট বস্তির ঘরে বড় ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকে ১৫ বছর বয়সী পরিবহন শ্রমিক মো. রাহুল হোসেন। প্রতিদিন সকাল ৭টায় বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরতে বেজে যায় রাত ১১টা-১২টা। চার বছর ধরে তার কাজ মোহাম্মপুর টু ফার্মগেট রুটের টেম্পোতে। গত কয়েক মাস ধরেই তার মনে হচ্ছে কানে ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করতে থাকে। বিষয়টি জানার পর বড় ভাই মকবুল হোসেন তাকে নিয়ে যান মহাখালীর নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে তার শ্রবণযন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে তার মস্তিষ্কের কিছু কোষেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।

হাতিরপুল কাঁচাবাজারের কাছেই ছোট্ট চায়ের দোকানে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন অনেকটা সময় কাটায় ৪ বছরের শিশু সুমাইয়া। কিছুদিন ধরেই ঘুমের মধ্যে লাফিয়ে ওঠে কান চেপে ধরে শিশুটি কান্নাজুড়ে দিচ্ছে। সারা রাত আর তার ঘুম হয় না। এক দিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের শিশু বিভাগে। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই বিভাগ থেকে তাকে পাঠানো হয় শ্রবণ বিভাগে। প্রতিদিনের ইতিহাস শুনে ও পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান, অসহনীয় মাত্রার শব্দদূষণের প্রভাবে এই পরিণতি হয়েছে শিশুটির।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের নাক, কান, গলা বিভাগের অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু খবরের কাগজকে বলেন, দেশে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে শব্দদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মানুষের কেবল শ্রবণশক্তিই নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্য অনেক রোগের কারণও হয়ে উঠেছে। এমনকি হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম, স্নায়ুর সমস্যাও হচ্ছে মানুষের। তিনি জানান, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষ কিছু পেশার মানুষের মধ্যে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব খুবই বেশি দেখা যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শব্দদূষণের কারণগুলো আমরা সবাই জানি। এটা নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি প্রয়োজনে আরও কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়াও এখন জরুরি। জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।’ 

এদিকে শব্দদূষণ নিয়ে দেশে খুব কাছাকাছি তেমন কোনো গ্রহণযোগ্য গবেষণা, তথ্য-উপাত্তও হয়েছে কম। তবে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নাক, কান, গলা বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসক খবরের কাগজকে জানান, দিনে দিনে দেশে শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা একসময়ে বড় এক জনগোষ্ঠীর বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের রাজপথে শব্দদূষণ এবং শব্দদূষণের কারণে রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের শ্রবণ সমস্যা’ নিয়ে গবেষণার আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট, বাসচালক ও হেলপার, পিকআপচালক, সিএনজিচালক, লেগুনাচালক, দোকানদার, মোটরসাইকেল, রিকশাচালক এবং প্রাইভেটকারচালক-শ্রমিকদের শ্রবণশক্তি পরিমাপ করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, শ্রবণশক্তি কম থাকা মানুষের মধ্যে ৪২ শতাংশই রিকশাচালক। বাকিদের মধ্যে ৩১ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ, ২৪ শতাংশ সিএনজিচালক, ২৪ শতাংশ দোকানদার, ১৬ শতাংশ বাসচালক, ১৫ শতাংশ প্রাইভেটকারচালক এবং ১৩ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, শব্দদূষণের সঙ্গে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে। আকস্মিক তীব্র শব্দে অন্তকর্ণের ক্ষতির কারণে মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় বধির হয়ে যেতে পারে। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের দূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ডে ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা সৃষ্টি করে। 

বিভিন্ন তথ্য খুঁজে দেখা যায়, শব্দদূষণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) গ্রহণযোগ্য শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফলতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। 

২০১৭ সালে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ শহরে শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল। তখন ঢাকায় ১১ লাখ ৩৪ হাজার বার, চট্টগ্রামে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ বার, সিলেট শহরে ৩ লাখ ২৪ হাজার, খুলনায় ৩ লাখ ২৪ হাজার, বরিশাল শহরে এবং ২ লাখ ৪৩ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ৪৩ হাজার, রাজশাহীতে ১ লাখ ৬২ হাজার এবং ময়মনসিংহ শহরে ২ লাখ ৪৩ হাজার বার পর্যবেক্ষণ করা হয় বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে। এর আওতায় জনমত জরিপও ছিল।

জরিপের জন্য নির্ধারিত প্রতিটি স্থানে ৯০ জন করে ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়। নির্ধারিত স্থানগুলোতে শব্দের উৎস পর্যবেক্ষণ ও গাড়ির হর্ন গণনাও করা হয়েছে। 

জরিপের ফলাফল সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহের প্রতিটি শহরের নির্ধারিত স্থানগুলোতে বিধিমালা নির্দেশিত শব্দের মানমাত্রার চেয়ে শব্দের মাত্রা দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ছিল। আটটি শহরের রেকর্ড করা আকস্মিক শব্দের মাত্রার (ডেসিবল) ভিত্তিতে প্রথম (বেশি শব্দ) ও শেষে (কম শব্দ) অবস্থানকারী স্থানগুলো যথাক্রমে ঢাকার ‘পল্টন মোড়’ ও মিরপুর-১ নম্বর সেকশন: চট্টগ্রামে ‘বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের সামনে’ ও ‘পোর্ট কলোনি মোড়’। সিলেটে ‘করিমউল্লাহ মার্কেট’ ও ‘কোর্ট পয়েন্ট’। খুলনায় ‘ডাক বাংলো মোড়’ ও ‘সরকারি মহিলা কলেজ মোড়’; বরিশালে ‘কাশিপুর বাজার’ উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রতিটি শহরেই শব্দের উৎস হিসেবে যানবাহন এবং হর্ন শব্দদূষণের জন্য প্রধানত দায়ী বলে উঠে আসে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাইকিং, জেনারেটর এবং কলকারখানা ইত্যাদি শব্দদূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ওই জরিপের সুপারিশে জানানো হয়, শহরগুলোতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের বাস্তবায়ন, প্রতিপালন, পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহারে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

ওই জরিপের ফলাফল অনুসারে শব্দের মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে ঢাকা শহরের ৭০টি স্থানের বর্তমান পরিস্থিতি উঠে আসে। ঢাকার প্রতিটি স্থানেই শব্দের মাত্রা শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ নির্দেশিত মানমাত্রা অতিক্রম করেছিল তখনই। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানগুলোতে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ। ঢাকা শহরের মধ্যে নির্বাচিত স্থানগুলোর মধ্যে ফার্মগেটের কেন্দ্রস্থলে সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ ছিল। শব্দদূষণের দিক থেকে উত্তরা ১৪ নং সেক্টরের ১৮ নং সড়ক সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকলেও সেখানেও শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। 

অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি শব্দদূষণ হচ্ছে। কারণ নির্মাণ কার্যক্রম বেড়েছে আবার প্রতিদিন পরিবহন চলাচলের পরিমাণও বেড়েই চলছে।

এদিকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুসারে আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবল। এর বিপরীতে মধ্যে আগের জরিপ অনুসারেই রাজধানীর শাজাহানপুরে সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ১২৮ দশমিক ৪ ডেসিবল আর সর্বনিম্ন ছিল ৫০ দশমিক ৭ ডেসিবল; রাতব্যাপী শব্দের মাত্রা ছিল ১৩৩ দশমিক ৬ ডেসিবল। অন্যদিকে সবচেয়ে কম শব্দদূষণ থাকা উত্তরা ১৪ নং সেক্টরেও শব্দের মাত্রা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৬ ডেসিবল ছিল। 

বিধিমালা অনুসারে মিশ্র এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৬০ এবং রাতে ৫০ ডেসিবল। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ২০টি মিশ্র এলাকার মধ্যে ফার্মগেট শব্দদূষণের জন্য শীর্ষে ছিল। যেখানে শব্দের মাত্রা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১৩০ দশমিক ২ ডেসিবল ছিল।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ এ নীরব এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল। নির্বাচিত ১০টি নীরব এলাকার মধ্যে আইসিসিডিডিআরবি-মহাখালী শব্দদূষণের মাত্রা দেখা যায় ১১০ দশমিক ৯ ডেসিবল। 

বিধিমালায় শিল্প এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৭৫ এবং রাতে ৭০ ডেসিবল। ঢাকায় ২০টি আবাসিক এলাকার মধ্যে ধোলাইপাড়-যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিল ১২৬ দশমিক ৮ ডেসিবল থেকে ১৩১ দশমিক ৯ ডেসিবল।

এদিকে সর্বশেষ ওই সরকারি জরিপ অনুসারেই ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ঢাকা শহরে মোটরযানের হর্ন শব্দদূষণের প্রধান কারণ। এ ছাড়া যথাক্রমে ২৪ শতাংশের মতে কলকারখানা এবং নির্মাণকাজের কারণেও শব্দদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে আছে পটকা ও আতশবাজির শব্দদূষণ।

এদিকে ওই জরিপে উঠে আসা তথ্য অনুসারে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ সম্পর্কে প্রায় ৪৯ শতাংশই অবগত নন বলে জানা যায়। এ ছাড়া ৯৬ শতাংশ মানুষ জানান, বিধিমালা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ তারা দেখেননি। 

ওই জরিপের সময় হর্ন গণনা করা হয়েছিল। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় ১০ মিনিটে ৫৯৮টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ১৫৮টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৪০টি সাধারণ হর্ন।

পাঠক সৃষ্টির উদ্যোগে গলদ

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩৩ পিএম
পাঠক সৃষ্টির উদ্যোগে গলদ

তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহেও দেশের অনেক শিশু-কিশোর এখনো ছাপা বইয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছে। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও ভ্রমণবিষয়ক বইয়ের খোঁজে তারা নিয়মিত ঢুঁ দিচ্ছে সরকারি-বেসরকারি পাঠাগারগুলোতে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই বেসরকারি পাঠাগারগুলো কি শিশু-কিশোরদের বয়স উপযোগী বই সরবরাহ করতে পারছে কি না। সাধারণ মানুষকে বইমুখী করতে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নানা ভূমিকা রাখলেও তা পাঠতৃষ্ণা কতটা পূরণ করতে পারছে, এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ উদযাপন করা হচ্ছে বিশ্ব বই ও মেধাস্বত্ব দিবস।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বইয়ে আগ্রহ কম

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের হিসাবে সারা বাংলাদেশে এখন ৯২৪টি বেসরকারি পাঠাগার রয়েছে। জেলা-উপজেলার সরকারি গ্রন্থাগারগুলোর পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পাঠাগারগুলোই সৃজনশীল বই ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশে। এই পাঠাগারগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রতিবছর অনুদান দিচ্ছে সরকার। ‘ক’ ক্যাটাগরির পাঠাগারগুলো পাচ্ছে ৭০ হাজার টাকা, ‘খ’ ক্যাটাগরির পাঠাগার ৫৫ হাজার ও ‘গ’ ক্যাটাগরির পাঠাগার ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা। নিয়মানুযায়ী, এই পাঠাগারগুলোকে অনুদানের ৫০ শতাংশ টাকায় বই কিনতে হয়, বাকি ৫০ শতাংশ টাকা তারা পাঠাগারের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করে থাকেন। 

‘অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর বাস্তব অবস্থা, সক্ষমতা ও কার্যকারিতা যাচাই’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী কিশোর পাঠকরাই সবচেয়ে বেশি আসছে। বেসরকারি পাঠাগারের পাঠকদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ পাঠক পছন্দ করছেন গল্প-উপন্যাসের বই। ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক বইয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ পাঠকের। 

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নীতিমালা অনুযায়ী, অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি পাঠাগারগুলোকে ৩০ শতাংশ শিশুতোষ বই কিনতে হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি পাঠাগারগুলো এই শিশুতোষ বই কেনার ক্ষেত্রে মূলত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত বই নিতেই আগ্রহ দেখান। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই বাছাই কমিটির বিরুদ্ধেও। তারা গ্রন্থতালিকায় এমন কিছু বই অন্তর্ভুক্ত করছেন, যাতে শিশু-কিশোরদের আগ্রহও কম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুরের বেগম রোকেয়া পাঠাগারের কর্ণধার রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে যে ধরনের বই আমরা পাচ্ছি, সেই বইগুলোর প্রতি শিশু-কিশোরদের খুব একটা আগ্রহ নেই। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে তরুণদের আরও অনুসন্ধিৎসু করে তুলবে এমন বই চাই আমরা। সে ধরনের বইয়ের সংখ্যা কম।’

বেসরকারি পাঠাগারগুলোর সংগঠন সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সভাপতি আবদুস ছাত্তার খান বলেন, বেসরকারি পাঠাগারগুলোতে যে ধরনের বই আসছে, তাতে ক্ল্যাসিক রাইটারদের বইয়ের সংখ্যা কম। এর ফলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা ক্ল্যাসিক সাহিত্য পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই কেনা কমিটির অনত্যম সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন লাইব্রেরিগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে সৃজনশীল বই দেওয়া হয়। কিন্তু পাঠকের আগ্রহ না থাকায় তা বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।’

এ বিষয়ে পরে সংস্কৃতি সচিব খলিল আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগও রয়েছে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পাঠাগারগুলোকে কবিতার বই বেশি কিনতে বলে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে কবিতার বই পড়ার আগ্রহ তো কমই থাকবে।’

এ বিষয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের জন্য যে ধরনের বই তারা চাইছে, সেই বইগুলোর বিষয়বস্তু আদৌ তাদের বয়স উপযোগী কি না, তাও ভাবতে হবে। আমাদের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পে ভালো মানের শিশুতোষ বইয়ের সংকট রয়েছে। অনুবাদের কিছু বই দিয়ে আমরা সেই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।’ 

বেসরকারি পাঠাগার নিয়ে নানা প্রশ্ন, কয়েকটি ধুঁকছে অর্থসংকটে 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি পাঠাগারগুলোকে অনুদান দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সম্পন্ন করেছে গত বছরের ডিসেম্বরে। অনুদান কমিটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দেশের বেসরকারি পাঠাগারগুলোর নানামুখী সংকট। এমনই এক সংকটের কথা শোনালেন কক্সবাজারের রামুর জ্ঞানান্বেষণ পাঠাগারের কর্ণধার শিপ্ত বড়ুয়া। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অর্থাভাবে আমাদের পাঠাগার ভবনটি এখনো কাঁচা-পাকা রয়ে গেছে। এখানে বসে বই পড়তে চাইলেও শিশুরা তা পারছে না। শিশুদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি করতে আমরা খেলনা রাখছি পাঠাগারে। এসব করতে গিয়ে আমাদের যে অর্থ দরকার, তা আমরা পাচ্ছি না।’ পাবনার কাশিনাথপুরের প্রয়াস পাঠাগারের ফজলুর রহমান জানান, আর্থিক সংকটের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বইমেলার আয়োজন করতে পারছেন না। 

বেসরকারি পাঠাগারগুলোতে বেসরকারি নানা উদ্যোগও থমকে আছে। অর্থাভাবে বরিশাল, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লার সরকারি পাঠাগারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের পক্ষ থেকে বেসরকারি পাঠাগারগুলোতে প্রতিবছর অন্তত ১ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। 

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর যে অনুদান দিচ্ছি, সেটি নিতান্ত কম। বই কেনার পর যা থাকছে, তাতে পাঠাগারগুলোর নানা বিল দিতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখানে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আমরা উদ্যোগ নেব। মে মাসের মধ্যে ৪০-৪৫টি পাঠাগারের সংকট সমাধানের পথ বের করা হবে।’

বিভাগীয় বইমেলাকে কার্যকর করার উদ্যোগ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে যে বিভাগীয় বইমেলাগুলোর আয়োজন করা হতো, নানা কারণে সেই বইমেলাগুলোকে পাঠকপ্রিয় করা যায়নি। আয়োজকদের নিয়েও ছিল নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক বিক্রেতা সমিতির উপদেষ্টা ওসমান গনি বলেন, ‘বিভাগীয় বইমেলা হলো তাদের রুটিন ওয়ার্ক। তারা এই বইমেলাকে নামকাওয়াস্তে একটি বইমেলায় পরিণত করেছেন।’

সংস্কৃতি সচিব খলিল আহমদ এই বিভাগীয় বইমেলাকে জনপ্রিয় করতে যথাযথ প্রচারণায় গুরুত্বারোপ করেন। মিনার মনসুর বলছেন, তারা অমর একুশে গ্রন্থমেলার আদলে নতুন করে একটি কাঠামো প্রণয়ন করবেন। প্রতিবছর ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে এই বিভাগীয় বইমেলাগুলো আয়োজন করার তোড়জোড় শুরু করেছেন তারা। সৃজনশীল প্রকাশকদের অনেকেই এই বিভাগীয় বইমেলায় অংশগ্রহণ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে মিনার মনসুর বলেন, ‘আমরা আগরতলা বইমেলা আর আমাদের বিগত ছয়টি বিভাগীয় বইমেলার আয়োজন দেখেছি। আমাদের প্রকাশকরা কিন্তু বিভাগীয় বইমেলাতেই বেশি বই বিক্রি করেছেন। বিভাগীয় বইমেলা কার্যকর করা যায়নি, এটির কাঠামোগত সমস্যা ছিল। আমরা প্রকাশকদের নিয়ে এখন একটি কার্যকর কাঠামো প্রণয়ন করব।’ 

বিভাগীয় বইমেলার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুল-কলেজের বই পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সংস্কৃতি সচিব খলিল আহমদ জানান, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বই বিতরণ করা হবে। সেই বই পাঠের পর তারা সেই বইয়ের পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন। তা নিয়ে হবে প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া রেলস্টেশন, বাস স্টপেজসহ নানা স্থানে উন্মুক্ত লাইব্রেরি গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা থমকে আছে, তাতে গতি আনার বিষয়েও কাজ করবে মন্ত্রণালয়।

বাড়ি ভাড়া হয়নি এখনো, হজ ভিসা অনিশ্চিত অনেকের

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:২৩ পিএম
বাড়ি ভাড়া হয়নি এখনো, হজ ভিসা অনিশ্চিত অনেকের
ছবি : সংগৃহীত

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এ বছর হজ হতে পারে আগামী ১৬ জুন। এর আগে ৮ মে দেশের হজ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা বছর অলস পার করলেও এখন ব্যস্ত সময় পার করছে হজ অফিস। অন্যদিকে সৌদি আরবে হাজিদের জন্য এখনো বাড়ি ভাড়া করা হয়নি। বাড়ি ভাড়া করার ব্যাপারে হজ মিশন, দূতাবাস ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম।

সরকারিভাবে নিবন্ধনকৃত হাজিদের হজ-ব্যবস্থাপনায় জটিলতা না থাকলেও বেসরকারিভাবে নিবন্ধনকৃত হজযাত্রীদের হজ-ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কারণে এখনো সৌদি আরবে বাড়ি ভাড়া করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘হজযাত্রীদের জন্য বাড়ি ভাড়া করার এজেন্সির প্রতিনিধিদের সৌদিতে যাওয়া লাগে। তাদের সৌদির মাল্টিপল ভিজিট ভিসার প্রয়োজন হয়। হজ অফিসের পরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী এজেন্সিগুলো পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভিজিট ভিসার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখনো সে ভিসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। প্রতিনিধিরা সৌদি আরবে না গেলে বাড়ি ভাড়া সম্পন্ন হবে না। প্রতিনিধি ছাড়া বাড়ি ভাড়া করা যাবে না এবং বাড়ি ভাড়া করা না গেলে হজ ভিসা করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সব হাজির টাকা সৌদি আরবে স্থানান্তর করা হয়নি। ব্যাংকে টাকা না আসায় যারা বাড়ি ভাড়া করতে সৌদি গেছেন, তারাও বাড়ি ভাড়া করতে পারছেন না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, টাকা যেতে সময় লাগে। কিন্তু এটি তো নতুন বিষয় নয়। তাহলে তারা কেন আরও আগে থেকে উদ্যোগ নেননি? এ অভিযোগও করেন হাব সভাপতি। তিনি বলেন, আমরা চাই, যারা নিবন্ধন করেছেন, টাকা জমা দিয়েছেন, তারা ভালোভাবে হজ করতে পারুক কিন্তু ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গড়িমসির কারণে হাজিদের হজ ভিসা পাওয়াই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

রাজধানীর আশকোনা হজ অফিসের পরিচালক মুহম্মদ কামরুজ্জামান খবরের কাগজকে জানান, আগামী ৮ মে হজ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এর আগেই ৬ মে থেকে হজ ক্যাম্পে আসতে শুরু করবেন হজযাত্রীরা। 

হজযাত্রীদের রাখতে এবার কি ব্যবস্থা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাজগকে বলেন, ‘আমাদের নতুন পুরোনো দুটো ক্যাম্প ভবনেই এবার হজযাত্রীদের রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দুটো ক্যাম্প মিলিয়ে মোট ২৪টি ডরমিটরিতে তাদের থাকার যে ব্যবস্থা হবে, তার অনেকটা কাজই আমরা এগিয়ে নিয়েছি। 

এ মৌসুমের হজের নিবন্ধন শুরু হয় গত বছর ১৫ নভেম্বর এবং ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। হজে গমনেচ্ছুদের প্রত্যাশিত সাড়া না মেলায় সময় বাড়ানো হয় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাতেও কোটার অর্ধেকও পূরণ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রত্যাশিত কোটা পূরণ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় ১ ফেব্রুয়ারি এবং সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ হজযাত্রীর কোটা রয়েছে। তবে এবার সরকারি ও বেসরকারিভাবে নিবন্ধন করেছেন ৮৫ হাজার ২৫৭ জন হজযাত্রী। এখনো খালি রয়েছে ৪১ হাজার ৯৪১টি। 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানা গেছে, এবারের মোট হজযাত্রীর অর্ধেক অর্থাৎ ৪২ হাজার ৬২৯ জন এবং এর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা ও মোয়াল্লেমসহ মোট ৪৩ হাজার ৮৯৯ জনকে পরিবহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। পাশাপাশি সৌদিয়া পরিবহন করবে ৩৫ শতাংশ যাত্রী এবং ফ্লাইনাস পরিবহন করবে ১৫ শতাংশ হজ যাত্রী। আরও জানানো হয়, ৯ মে শুরু হচ্ছে বিমানের হজ ফ্লাইট। চলবে ১০ জুন পর্যন্ত। ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে ২০ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত। 

সরেজমিনে পাবলিক-ঢাবি লাইব্রেরি চাকরির গাইডে চোখ

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:২৩ পিএম
চাকরির গাইডে চোখ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। ছবি: খবরের কাগজ

দুই বছর আগে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে রাজধানীর শাহবাগ থেকে রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) ভবনে স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ে অবস্থানগত কারণে একদিকে যেমন বইপ্রেমী পাঠক কমেছে অন্যদিকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যাও কমে গিয়েছে। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ বিজ্ঞান গ্রন্থাগারেও বেড়েছে চাকরির বইয়ের দাপট, একাডেমিক ও অন্যান্য বই ছেড়ে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ছেন চাকরির গাইড বইতে, দিন দিন বেড়েই চলেছে এই সংখ্যা।

ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন-সংকটের মাঝেও প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি উপস্থিত হন। এদের বেশির ভাগই চাকরিপ্রত্যাশী। অন্যদিকে গত তিন মাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি মাসে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পাঠক সংখ্যা ১ হাজার থেকে হাজার ২০০ এর মধ্যে ছিল। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যারা এসেছেন সকলেই চাকরি প্রত্যাশী। তাদের সামনে রাখা সারি সারি চাকরির গাইড বই। একাডেমিক বই পড়তে আসা পাঠক একেবারে নেই বললেই চলে। গ্রন্থাগারের একটি সূত্রের দাবি, আগামী ২৬ এপ্রিল ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যার ফলে এই উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক বেশি। অন্যদিকে ঢাবির বিজ্ঞান গ্রন্থাগারেও একই চিত্র।

ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসের মধ্যে জানুয়ারিতে পাঠক ছিল সবচেয়ে বেশি। এ মাসে পাঠক এসেছে ১ হাজার ২০৫ জন, বই ইস্যু হয়েছে ২ হাজার ১২টি এবং ফেরত এসেছে ২ হাজার ২৫ টি। ফেব্রুয়ারিতে পাঠকসংখ্যা কিছুটা কম ছিল ১ হাজার ১৯৪ জন, বই ইস্যু হয়েছে ১ হাজার ৯১২টি এবং ফেরত এসেছে ১ হাজার ৯৮৩টি। মার্চ মাসে পাঠক এসেছে ১ হাজার ১৭১ জন, বই ইস্যু হয়েছে ১ হাজার ৮০৭টি এবং ফেরত এসেছে ১ হাজার ৮৫০টি। 

ঢাবির গ্রন্থাগারে ৩৬ বছর ধরে কাজ করে আসছেন সাইফুল ইসলাম মোল্লা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দায়িত্বে থাকা এই উপ-গ্রন্থাগারিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাঠক আগের তুলনায় অবশ্যই বেড়েছে, তবে সেটি চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যা। আগে যেমন টেক্সট বই পড়তে এখানে আসত, এখন সেটি আর আগের মতো নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন মুন্সী খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখন শুরুতে বিসিএস নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যখন একজন শিক্ষার্থী সবে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠে তখন থেকেই সেই লাইব্রেরিতে আসে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে। অথচ কথা ছিল উল্টো; বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সেমিস্টার সিস্টেম সেখানে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক বইমুখী হয়ে লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন তারা চাকরির পড়াশোনা করছে। ক্লাসে যা পড়ানো হয় তার শিট দেয়া হয়, আর এই শিট পড়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা অনায়াসে পাস করেছেন। যার ফলে এটিও শিক্ষার্থীদের এই লাইব্রেরি বিমুখতার কারণ।’

এদিকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্প’ এর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নির্মাণকাজ চলমান থাকাতে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে শাহবাগ থেকে রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) ভবনে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থানগত কারণে পাঠক উপস্থিতিতে ভাটা পড়েছে। যদিও একটা সময় জাতীয় গণগ্রন্থাগারে বেশ ভালো উপস্থিতি ছিল, তবে উপস্থিতি থাকলেও সেই সময়জুড়েও চাকরিপ্রত্যাশীদের উপস্থিতিই ছিল তুঙ্গে, বলে দাবি করে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কর্মরত ও বর্তমান পাঠকদের।

জাতীয় গণগ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই গ্রন্থাগারের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২২০ জন। সাময়িক স্থানান্তরিত আইইবি ভবনে এখন গড়ে মাসে ৬০ থেকে ৭০ জন পাঠক আসেন। মাস জুড়ে ইস্যু হয় গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি বই। যদিও শাহবাগে একটা সময় এই সংখ্যা ছিল কয়েক গুণ, দৈনিক গড়ে ১ হাজার থেকে হাজার ২০০ এর মতো পাঠক দর্শনার্থী আসত ইস্যুও হতো শ’খানেক বই। 

২ লাখ ৭০ হাজারের বই সংগ্রহশালার এই জাতীয় গ্রন্থাগারেও স্থানান্তরিত হওয়ার আগে চাকরিপ্রত্যাশীরা এখানে বেশি ভিড়ত। এখন অবস্থানগত কারণে সেটিও সীমিত হয়ে এসেছে, এখন সংখ্যায় গবেষক-লেখকদের আনাগোনা তূলনামূলক বেড়েছে।

জাতীয় গণগ্রন্থাগারের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক শহিদুল ইসলাম আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন আমরা সীমিত পরিসরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। অনেক বই এখনো বাক্সবন্দি রয়েছে, জায়গা সংকুলান না হোয়ায় সেগুলো আমরা প্রদর্শন করতে পারছি না। যার ফলে পাঠল উপস্থিতি কমেছে, যখন আমরা বড় পরিসরে চলে যাব, তখন এই সংকটটি কেটে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি আগে এখানে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যাই বেশি ছিল। এখন তুলনামূলকভাবে অবস্থানগত কারণে কমেছে। তবে এর পাশাপাশি লেখক-গবেষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এখনো আসছেন। বর্তমানে ২ লাখ ৭০ হাজারের বইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত ১৩টি পত্রিকার পাশাপাশি বিদেশি কিছু সাময়িকী রাখা হয়।’

মনন তৈরিতে বই পড়া উচিত, পরামর্শ বইপ্রেমী ষাটোর্ধ্ব বইপ্রেমী সংবাদ উপস্থাপকের: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন সময়ে আজ থেকে ৫০ বছর আগে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের সদস্য হন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপক সাইদুর রহমান সাঈদ। জাতীয় গ্রন্থাগারে অস্থায়ী ভবনে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয় বই পড়তে আসা সাইদুর রহমান সাঈদের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘বই মানুষের মনন তৈরি করে। বই না পড়লে এই মনন তৈরি হয় না। এই মনন যদি মানুষের সৃষ্টি না হয়, মানুষ হিসেবে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না। অধুনা অনেক মাধ্যমে বইয়ের বিকল্প এলেও ইলেকট্রনিকভাবে আমাদের দেশে বইগুলো সংখ্যাও কম এবং পড়ার জন্যও অনুপযুক্ত। পাশ্চাত্য দেশগুলোতে বইগুলোর ওয়েবসাইট সমৃদ্ধ হলেও আমাদের দেশে সেটি নেই। তারপরেও কেন জানি বইয়ের তৃষ্ণা নিবারণ করে না। হয়তো একটা সময় গিয়ে ইলেকট্রনিক-নির্ভর বইয়ের দিকে আমাকেও ছুটতে হতে পারে।’

বেড়েছে চাকরির গাইড বই পড়ুয়াদের সংখ্যা এমন প্রসঙ্গে টানলে সাইদুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘এখন আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রত্যাশাও বেড়েছে। যার ফলে এখন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিতে চাকরির প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে চাকরি বই পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আমরা যে সময় পার করে এসেছি সেই সময়ে মননশীলতা তৈরির জন্য মানুষ অনেক বই পড়তেন। সেই সময়ে মানুষের সাদামাটা জীবনযাপন করে সামান্য কিছুতেই সন্তুষ্ট ছিল। আর এখন প্রত্যাশার পারদ দিন দিন বাড়ছে এবং সকলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য যা যা করা প্রয়োজন, যতটুক পড়া উচিত ততটুকুই পড়েছে। যার ফলে এখন অর্থের অভাব নেই, এখন মননের অভাব রয়েছে।’ 

সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ছে

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:১৮ পিএম
সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ছে

আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অন্যান্য খাতের ভাতাও। সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুটি কর্মসূচি হচ্ছে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা। অর্থ ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন (২০২৪-২৫) বাজেটে এই দুটি কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ছে। কিন্তু ভাতার অঙ্ক অপরিবর্তিত থাকছে। 

দেশে এখন ৫৮ লাখ ১ হাজার সুবিধাভোগী আছেন, যারা ৬০০ টাকা করে নগদ মাসিক বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে ‘বাড়তি’ দুই লাখকে এর আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৬০ লাখ ১ হাজার। 

অন্যদিকে বর্তমানে বিধবা ভাতা পাচ্ছেন ২৫ লাখ ৭৫ হাজার জন। এর সঙ্গে আরও দুই লাখ নতুন করে যুক্ত হবেন। ফলে মোট বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ২৭ লাখ ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আগামী বাজেটে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার তালিকায় নতুন করে যোগ হচ্ছেন চার লাখ। মাসিক ভাতার অঙ্ক ৬০০ টাকা অপরিবর্তিত থাকছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে সরকার। সে জন্য নগদ ভাতা বাড়ানো হয়নি। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, বেশিসংখ্যক যোগ্য মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা। সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। 

বর্তমানে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়স্ক দুস্থ ভাতা পাচ্ছেন। পক্ষান্তরে নারীদের ক্ষেত্রে ৬২ বা তদূর্ধ্ব হলে ভাতা পান। এখন ২৬২ উপজেলায় বয়স্ক ও বিধবা ভাতা চালু রয়েছে। চলতি অর্থবছরে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে বর্তমান ভাতার চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, সব উপজেলার ভাগাযোগ্য সবাইকে এসব কর্মসূচির আওতায় আনতে হলে আরও আট লাখকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সূত্র বলেছে, বাকিদের পর্যায়ক্রমে আওতায় নিয়ে আসা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রতিবন্ধীদের আরও সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ২০ লাখ প্রতিবন্ধী ৮৫০ টাকা করে নিয়মিত মাসিক ভাতা পান। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন ৩ লাখ ৩৪ হাজার। ফলে মোট ২৩ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আসছেন। তবে ভাতা অপরিবর্তিত থাকছে। 

‘দরিদ্র মা ও শিশুদের সহায়তা’ কর্মসূচির আওতা বাড়ছে। এ কর্মসূচির আওতায় এখন আছেন ১৩ লাখ জন। নতুন করে আরও যুক্ত হচ্ছেন ৬০ হাজার। 

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বর্তমানে আট ধরনের কর্মসূচি রয়েছে, যার মাধ্যমে নিয়মিত মাসিক নগদ ভাতা দেওয়া হয়। এ ছাড়া খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয় ১১টি কর্মসূচিতে। অন্যান্যের মধ্যে প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা জেলে, বেদে, হিজড়া সম্প্রদায়, চা-শ্রমিকদেরও নগদ ভাতা দেওয়া হয়। এ ছাড়া দুস্থ নারীদের জন্য চালু আছে মাতৃত্বকালীন ভাতা। 

মুক্তিযোদ্ধাদেরও মাসিক ভাতা দেয় সরকার। এ ছাড়া ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত গরিবদের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে ৩০ হাজার গরিব রোগী এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা পান। আসন্ন বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও ২০ হাজার বাড়ানো হচ্ছে।

বয়স্ক, বিধবাসহ বর্তমানে সারা দেশে মোট ১ কোটি ৩৯ লাখের বেশি উপকারভোগী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। আসন্ন বাজেটে আরও আট লাখকে নতুন করে যুক্ত করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে আট লাখ সরকারি চাকরিজীবী পেনশন সুবিধা পান। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, মাসিক ভাতার বাইরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ-দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ৩০টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন।

পেনশন সুবিধাকেও একধরনের সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এটি নিয়ে প্রশ্নও আছে। বর্তমানে আট লাখ সরকারি চাকরিজীবী পেনশন সুবিধা পান। আবার রেশনব্যবস্থা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, জেনারেল রিলিফ, শিক্ষাবৃত্তি, কম দামে গরিবকে চাল বিতরণ, ভিজিডি, ভিজিএফ ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে টার্গেট গ্রুপকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) বাজেটে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী (২০২৪-২৫) অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষায় মোট ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয় তা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং জিডিপির আড়াই শতাংশ।

আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করে। তখন ভাতা ছিল ১০০ টাকা। পরে ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হয়। 

সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, অসমতা ও দারিদ্র্য দূর করতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়াতেই হবে। এই খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। এখনো জিডিপির ২ শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটি অন্তত ৩-৪ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। 

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে খরচের দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ার নিচের দিককার পাঁচটি দেশের একটি। বাংলাদেশের পেছনে আছে শুধু মায়ানমার, কম্বোডিয়া, ভুটান ও লাওস। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম।

এশিয়ার ২৫টি দেশের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ‘দ্য সোশ্যাল প্রোটেকশন ইন্ডিকেটর ফর এশিয়া: অ্যাসেসিং প্রোগ্রেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত বছর এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশে নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি সুরক্ষা পান। আবার সামাজিক সুরক্ষার জন্য গরিব মানুষের পেছনে যতটা খরচ হয়, এর চার গুণ বেশি খরচ হয় ধনীদের পেছনে।

মুক্তিযোদ্ধা ও অশীতিপরদের ভাতা বাড়তে পারে

আগামী বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা বাড়তে পারে। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবার মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এটি বেড়ে ২৫ কিংবা ৩০ হাজার টাকা করা হতে পারে। বর্তমানে ২ লাখ মুত্তিযোদ্ধা মাসিক সম্মানী ভাতা পাচ্ছেন। চলতি অর্থবছরে এর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব কার্যকর করা হলে ‘বাড়তি’ বরাদ্দ দিতে হবে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, আওতা না বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ২০ হাজার টাকা করা হয়। এর আগে ছিল ১২ হাজার টাকা। অশীতিপরদের ভাতা বাড়তে পারে। বর্তমানে তারা পান ৬০০ টাকা। এটি বেড়ে ৯০০ টাকা করা হতে পারে।

শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমাদের চাপ বাড়ছেই

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:১৩ পিএম
শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমাদের চাপ বাড়ছেই
পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত

শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের ওপর পশ্চিমাদের চাপ বাড়ছেই। তাদের সঙ্গে ‘বনিবনা’ না হওয়ায় শ্রম আইন সংশোধনের বিষয়টিও আটকে আছে। গত নভেম্বরে জাতীয় সংসদে বিল পাস হলেও তা ফেরত দেন রাষ্ট্রপতি। বিলটি তামাদি হয়ে যাওয়ায় সেটিকে এখন নতুন করে সংসদে তুলতে হবে। এ অবস্থায় আগামী নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) অধিবেশনে আবার বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা হবে। 

শ্রমিকবান্ধব শ্রম আইন করতে আইএলও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিদ্যমান আইন সংশোধনের অঙ্গীকার করেছে ঢাকা। রাষ্ট্রপতি বিলটি ফেরত দেওয়ার পর বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিলটি পাস হবে আইএলওকে এমনটা জানায় বাংলাদেশ। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও পূরণ করতে পারেনি ঢাকা।

চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাস না হওয়ার পর আইএলওর চারজন প্রতিনিধির সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘আইএলও আরও সময় নিতে বলেছে। আইএলওতে আমাদের বিরুদ্ধে গত তিন বছর ধরে একটা অভিযোগ ঝুলে আছে। প্রত্যেক মার্চ মাসেই বলা হয়, এটার বিষয়ে মার্চ মাসে সিদ্ধান্ত হবে না, নভেম্বরে হবে। আবার নভেম্বরে বলা হয় এবার হবে না, মার্চে হবে। আমি তাদের স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি যে, আগামী মার্চ মাসের গভর্নিং বডির মিটিংয়ে যদি বলেন, এটা আবার নভেম্বরে যাবে, সেটা আমরা মেনে নিতে রাজি না।’

বাংলাদেশ আইএলও-কে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শ্রম অধিকার, নিরাপত্তাসহ শ্রম খাতের সংস্কার নিয়ে ২০২১-২০২৬ সালের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। এতে অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মজুরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমকল্যাণ। যদিও আইএলও এর সর্বশেষ গভর্নিং বডির বৈঠকে বাংলাদেশের এই অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, আইএলও চাইছে, শিল্পকারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকদের স্বাক্ষরের হার ১০ শতাংশ করা হোক। কিন্তু সরকার বলছে, এ ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে আইএলও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। 

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়গুলো চিন্তা করতে হবে। একেক দেশের প্রেক্ষাপট একেক ধরনের। যারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন তাদের সবাইকে বিষয়টি বুঝতে হবে।’

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলছেন, ‘শ্রম আইনে শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল আইএলও কনভেনশনের ৮৭ ও ৯৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী শ্রমিকদের যেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বিঘ্নে ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয়। শ্রমিকরা যেন সম্মিলিতভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষায় দর-কষাকষি করার সুযোগ পায়। এখন একটা কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলে ওই কারখানার ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অত্যন্ত কঠিন।’

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইইউয়ের চাপ

আইএলও ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতিও বাংলাদেশকে চাপে ফেলেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলছেন, বিশ্বব্যাপী শ্রম অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, ভিসা বিধিনিষেধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দূতাবাস বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন নতুন শ্রমনীতির টার্গেট হতে পারে বাংলাদেশ। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞায় পড়লে বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেবে না, এমন কথা জানিয়েছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএয়ের সভাপতি ফারুক হাসান। বাংলাদেশে পোশাক খাতে ‘শ্রমিক নির্যাতন বন্ধের আহ্বান’ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (এএএফএ) বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসানকে চিঠি দিয়েছে। চিঠি দুটি এএফএর ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়। 

এ ছাড়া সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আইএলও-এর ৩৫০তম অধিবেশনে বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতির অগ্রগতি পর্যালোচনাকালে শ্রম অধিকার চর্চা, শ্রমিকদের ওপর হামলা-নির্যাতন বন্ধসহ শ্রম আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশগুলো বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলে। তারা বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতার নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আনা ভিত্তিহীন অভিযোগগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।