ঢাকা ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বুধবার, ২৯ মে ২০২৪

জন্ম যাদের মৃত্যু দিয়ে, ভাগ্যে জোটে না কবর

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৫৬ পিএম
জন্ম যাদের মৃত্যু দিয়ে, ভাগ্যে জোটে না কবর
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন এলাকা থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। রাস্তা থেকে কেউ একজন লাশটি সেখানে ছুড়ে ফেলে চলে যায়। ওই দিন দুপুরে হঠাৎ দেয়ালের অপর পাশের রাস্তা থেকে টুপ করে কিছু পড়ার শব্দ পান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তারা এগিয়ে দেখেন একটি ব্যাগ পড়ে আছে। প্রথমে তারা ভয় পান এ ভেবে যে, বোমা বা অন্য কিছু। পরে লাঠিজাতীয় কিছু দিয়ে একটু খুললে নবজাতকের মাথা বেরিয়ে আসে। প্রথমে তারা বিষয়টি উপাচার্যকে জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেন। এ ছাড়া একই দিনে টিএসসির ফুটপাত থেকে আরেকটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই নবজাতকের বয়স ছিল আনুমানিক এক দিন।

ডাস্টবিন ও রাস্তার পাশে ময়লা জায়গায় ফেলে দেওয়া এসব নবজাতকের বেশির ভাগই মায়ের পেটে বা জন্ম হওয়ার সময় মারা যায়। পরিচয় গোপন করতেই তাদের ফেলে দেওয়া হয়। যেসব নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয় তাদের কবর জুটলেও বাকিরা যায় শেয়াল-কুকুর ডাস্টবিনের পেটে।

ভিসির বাংলো এলাকা থেকে নবজাতকের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় ওই নবজাতকের বাবা সুলতান মিয়াকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। সুলতান দায় স্বীকার করে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার স্ত্রী খাদিজা একটি মৃত কন্যাশিশুর জন্ম দেন। সুলতান শিশুর লাশ হাসপাতাল থেকে বুঝে নিয়ে গোপনে একটি বাজারের ব্যাগে ভরে উপাচার্যের বাসভবনের সীমানা দেয়ালের পাশে বাগানের উত্তর-পূর্ব কোণে ফেলে যান। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এবং সুলতানের শ্যালক মুত্তাকীর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পুলিশ অভিযুক্ত সুলতানকে শনাক্ত করে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। 

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১৬টি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল টিম।

২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর কার্জন হলের বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৯ সালের ২৭ জুন শহীদুল্লা হল এলাকা থেকে একটি, পরের বছর ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পিছন থেকে একটি, একই বছর ৯ ডিসেম্বর শহীদুল্লা হলের পেছনে পানির পাম্পসংলগ্ন কেচিগেটের পাশ থেকে একটি এবং ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর জগন্নাথ হলের পাশ থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর গণিত ভবনের পাশ থেকে একটি, ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি রাসেল টাওয়ারের ফুটপাত থেকে একটি, একই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির গেট এলাকা থেকে দুটি, ওই বছর ১৭ মার্চ অমর একুশে হলের পাশের ফুটপাত থেকে একটি এবং একই বছর ২০ সেপ্টেম্বর শহিদ মিনার এলাকা থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২৩ সালের ১২ আগস্ট অমর একুশে হলের ফুটপাত থেকে দুটি এবং সর্বশেষ গত ২৯ ফেব্রুয়ারি উপাচার্যের বাংলো এলাকা ও টিএসসির ফুটপাত থেকে একটি করে মোট দুটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাবির নির্দিষ্ট সীমানাপ্রাচীর না থাকা, বহিরাগতদের অতিরিক্ত যানবাহনের চলাফেরা করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসব অপরাধ বেড়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে কাজ করছে প্রশাসন। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর এম মাকসুদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ঢাকা মেডিকেল ও বেশ কয়েকটি ক্লিনিক রয়েছে। এটা তারই একটি প্রতিফল। নবজাতকের লাশ হাসপাতাল থেকে বুঝে পাওয়ার পর অনেকে আশেপাশের (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা) খালি জায়গায় ফেলে যায়। তবে অধিকাংশ লাশ ডাস্টবিনে পাওয়া যায়। ঘটনাগুলো ভোরের দিকে বেশি হয়। কারণ এ সময়ে ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকে। এটা তো ক্যাম্পাসের সমস্যা না। কিন্তু এখানে এনে ফেলার কারণে আমরা সমস্যায় পড়ে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এটা ভয়াবহ অপরাধ। মৃত বাচ্চা হলেও দাফন করতে হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের ঘটনায় আমরা মামলা করেছি। সুলতান নামে একজন গ্রেপ্তারও রয়েছে। সে এখন কারাগারে আছে। তবে ঢাকা মেডিকেল এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’ 

প্রক্টর আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সতর্ক রয়েছে। ক্যাম্পাসে ওই ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাবি ক্যাম্পাসে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে। পাহারা ও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

খুলনায় শিল্পায়নে বড় বাধা গ্যাস

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ০৩:২০ পিএম
খুলনায় শিল্পায়নে বড় বাধা গ্যাস
লোকসানের কারণে খুলনায় বন্ধ হওয়া পাটকল

‘শিল্পনগরী’খ্যাত খুলনা মহানগরী অনেকটাই এখন শিল্পহীন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি। লোকসানের কারণে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রয়ত্ত নয়টি পাটকল। বেকার হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনায় শিল্পায়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তা কাজে লাগানো যায়নি। জ্বালানি সংকটে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে দ্বিগুণ তিনগুণ। ফলে লোকসানের আশঙ্কায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে রাজি হন না আগ্রহীরা। 

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলে নতুন শিল্পায়নের পথে এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস। শিল্পের জন্য অবশ্যই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ দরকার। গ্যাস ছাড়া উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বাড়ে। শিল্পনগরী হিসেবে ঐতিহ্য ফেরাতে খুলনায় গ্যাসের ব্যবস্থা করা জরুরি।’

এদিকে খুলনায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছে নাগরিক সংগঠন বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি।

সংগঠনের সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামান বলেন, ‘প্রাকৃতিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে খুলনাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। খুলনায় শিল্পায়নের সব ধরনের সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছে শুধু গ্যাসের অভাবে। মূলত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের অভাবেই শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে সময় নিচ্ছে।’

জানা যায়, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা হয়ে খুলনায় গ্যাস সঞ্চালন প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে। ২০০৯ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে স্থির হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে খুলনার আড়ংঘাটা থেকে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে সঞ্চালন লাইন, আড়ংঘাটায় ল্যান্ডিং স্টেশনসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজও শেষ হয়। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের অভাবে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া যায়নি। 

যেভাবে হারিয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান: ১৯৫৭ সালে খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে যাত্রা শুরু হয়েছিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের। লোকসানের কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশেই ১৯৬৫ সালে স্থাপিত খুলনা হার্ডবোর্ড মিলটি বন্ধ হয় ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর। ১৯৫৫ সালে রূপসা এলাকায় স্থাপিত দাদা ম্যাচ কারখানাও বন্ধ প্রায় এক যুগ ধরে। বন্ধ তিন কারখানার জমিতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। কাগজকল, সার কারখানা ও এসিড কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। 

এর বাইরে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ২০২০ সালের ২ জুলাই একই সঙ্গে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকল বন্ধ করা হয়। এতে চাকরি হারান ৩৩ হাজার স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক। গত চার বছরে চারটি পাটকল ইজারা দেওয়া হলেও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া যায়নি।

খুলনার নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না এসব প্রতিষ্ঠান। শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করতে সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সুপারিশ: খুলনা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, খুলনা-মোংলা মহাসড়কের দুই পাশে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এসব স্থানে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ রয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ কমাতে জ্বালানি নিরাপত্তার দিকেই ঝুঁকছে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। দক্ষিণাঞ্চলে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। পদ্মা সেতুর সুফল পেতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় আছেন পাইপলাইনে গ্যস সরবরাহের জন্য। ফলে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। 

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ খুলনার পরিচালক প্রণব কুমার রায় বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণকালীন থেকেই খুলনা অঞ্চলে বিনিয়োগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেখেছি। বিগত কয়েক বছরে বিনিয়োগের হার বেড়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি বদলে যাবে।’   

রাজশাহীতে এবার আমের ফলন হবে অর্ধেক

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ০১:১৪ পিএম
রাজশাহীতে এবার  আমের ফলন হবে অর্ধেক
ছবি : খবরের কাগজ

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে শীত বেশি থাকার পাশাপাশি গত এপ্রিলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁর অনেক এলাকাতেই আমের মুকুল ও গুটি ঝরে গেছে। সে কারণে এবার ফলন হয়েছে অনেক কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এবার আমের আকারও হয়েছে ছোট। শুধু তা-ই নয়, স্বাদেও এসেছে পরির্বতন।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কৃষিবিজ্ঞানীরা এসব তথ্য দিয়ে জানান, ওই তিন জেলার অনেক স্থানেই এ বছর জাতভেদে আমের ফলন কমেছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোখলেসুর জানান, এবার গুটি আসার পর অনেক এলাকাতেই অস্বাভাবিক তাপের কারণে জাত ও গাছের আকারভেদে গুটি ঝরে পড়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের তুলনায় নাচোলের মতো উপজেলাগুলোতে ছোট ছোট গাছে আম টিকে আছে তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ এবারের তীব্র গরমে ছোট গাছগুলোর পরিচর্যা করা সহজ ছিল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পলাশ সরকার জানান, এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন জাতের আমের ফলন পাওয়া যায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন। ফেব্রুয়ারিতে মুকুল বের হওয়ার সময় শীতের তীব্রতা ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। এতে মুকুল সঠিকভাবে বেরোতে পারেনি। এ ছাড়া বৃষ্টিতেও কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুকুল ও আমের গুটির ক্ষতি হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তা বাধা হবে না।

কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার আমচাষি মো. শাহজাহান আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, তার ছোট-বড় ৬টি বাগানে বিভিন্ন জাতের আমের গাছ আছে ১৮৪টি। সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি ৬টি বাগানের আম বিক্রি করে গত বছর লাভ করেছিলেন ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এ বছর আমের ফলন কেমন হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে মো. শাহজাহান আলী বলেন, ৬টি বাগানে ১৮৪টি আমগাছ থাকলেও মাত্র একটি গাছে আম আছে। তাতে ৬ মণের বেশি আম পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর কোনো অবস্থাতেই ১২ হাজারের চেয়ে বেশি টাকায় বিক্রি হবে না। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নয়ানগর এলাকার আমচাষি গোলাম মোস্তাফার সঙ্গে কথা হয় আমের ফলন নিয়ে। তিনি জানান, তার বাগানে ছোট ছোট আমগাছ আছে ৬ হাজারের কিছু বেশি। গত বছর তিনি ওই বাগান থেকে আম পেয়েছিলেন ৩০০ মণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমের ফলন কমেছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বড় বড় গাছে আম ধরেনি বললেই চলে। তবে আমার বাগানে ছোট ছোট গাছে আম ধরেছে গত বছরের তুলনায় বেশি এবং আম পাব অন্তত ৬০০ মণ। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বড় বড় আমগাছই বেশি।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এ বছর আম চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে। ফলন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে ২ লাখ ৬০ হাজার ৩১৫ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগ বলছে, শীত ও তীব্র খরার কারণে আমের ফলন কিছুটা বিঘ্নিত হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার আমচাষি মো. এন্তাজ আলী গত বছরের মতো এ বছরও ৫টি বাগানে আম চাষ করেছেন। কিন্তু কতটা আম পাবেন, তা নিয়ে সংশয় আছে। তিনি বলেন, ‘৫টি বাগানে যে ৪০০ আম গাছ আছে, তাতে গত বছর আম পেয়েছিলাম প্রায় ৫০০ মণ। এ বছর ৫০ মণ পাব কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে।’ তার ধারণা, তীব্র দাবদাহ আর শীত-বৃষ্টির কারণেই আমের মুকুল ও গুটি ঝরে পড়েছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গত বছর নওগাঁয় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু ফলন হয়েছিল আরও বেশি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৪ মেট্রিক টন ফলন আশা করছি এবার।’ 

কথা হয় নওগাঁর পোরশা উপজেলার আমচাষি ও স্থানীয় নিয়ামতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, তার মতোই এলাকার আমচাষিদের ফলন হয়েছে গত বছরের তুলনায় কম। যদি দাম ভালো না পাওয়া যায়, তবে লোকসান গুনতে হবে। ৩টি বাগানে গাছ আছে প্রায় ৫ হাজার। গত বছর ফলন কিছুটা কম হলেও আম পেয়েছিলেন প্রায় ২০০ মণ। এবার ১০০ মণ পাওয়া নিয়েই সংশয় আছে। 

নওগাঁর অধিকাংশ এলাকাতেই আমের গাছ ছোট হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ফলন হয়নি বলে দাবি করছেন চাষিরা। কৃষিবিজ্ঞানী ও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) সাবেক পরিচালক ড. মো. জাকারিয়া জানান, আমের ফলনের জন্য ভালো তাপমাত্রা দিনের বেলায় ২১ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর রাতে ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এবার আমের গুটি তৈরির সময় এপ্রিলে অনেক এলাকাতেই দিনেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। কোনো কোনো এলাকায় ছিল আরও বেশি। রাতেও তাপমাত্রা অনেক এলাকাতে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর ছিল টানা কয়েক দিন। ড. জাকারিয়া আরও বলেন, মার্চ পর্যন্ত শীত বেশি থাকায় অনেক এলাকায় আমের মুকুল ঝরে গেছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। আর গুটি বাঁধার সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি পার হওয়ায় আমের আকার ছোট হয়েছে। স্বাদেও এসেছে পার্থক্য। সান বার্নের ফলেও আমের ক্ষতি হয়েছে যথেষ্ট।

জনশক্তি রপ্তানিতে কালো ছায়া

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১১:১২ এএম
জনশক্তি রপ্তানিতে কালো ছায়া
প্রতীকী ছবি

মালদ্বীপে বন্ধ রয়েছে জনশক্তি রপ্তানি। ৩১ মের পরে মালয়েশিয়াতেও কর্মী যাবেন না। ওমানের ভিসা বন্ধ হওয়ার পর ছয় মাস পার হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টিকে জনশক্তি রপ্তানিতে ‘কালো ছায়া’ হিসেবে অভিহিত করে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের তরফ থেকে নতুন বাজার সৃষ্টির কথা বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই শ্রম অভিবাসন স্মার্ট বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি সেভাবেই দেখেন। তারপরও বাস্তবে সেটার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 

এ প্রসঙ্গে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই জনশক্তি রপ্তানির নেতিবাচক দিককেই ইঙ্গিত করে। তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আমরা ঘুরেফিরে কয়েকটি দেশেই কর্মী পাঠাচ্ছি। ফলে একসময় দেখা যাবে যে নতুন করে আর কাউকে পাঠাতে পারছি না।’

অবিলম্বে বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে সামনে আরও সংকট দেখা দেবে উল্লেখ করে আসিফ মুনীর বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা বেশির ভাগ এসএসসি পাসই না। তারা ভালো করে বাংলা বলতে পারেন না। ইংরেজি তো দূরের কথা। তাই ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হতে পারে। তাহলে দেখা যাবে আমরা এগোচ্ছি।’

মালদ্বীপে কোটার এক লাখ কর্মীই অবৈধ

চার বছর বন্ধ থাকার পর শেষ পর্যন্ত গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও দরজা খুলেছিল মালদ্বীপ। কিন্তু সেটি খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। সম্প্রতি বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া আবারও বন্ধ করেছে দেশটি। 

নির্ধারিত কোটা পূরণ হওয়ায় দেশটির সরকার নতুন কর্মী ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে বলে বাংলাদেশ হাইকমিশন জানালেও গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলী ইহুসান বলেন, ‘বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ২২০টি ওয়ার্ক পারমিট আগে থেকেই রয়েছে। তাদের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট ফি নিয়মিতভাবে দিয়ে বৈধ আছেন মাত্র ৩৯ হাজার ৪ জন।’

এ প্রসঙ্গে মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের কোটা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মীদের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে বৈধভাবে মালদ্বীপে যেতে হবে, ভ্রমণ ভিসা বা ফ্রি ভিসায় নয়।’

শুক্রবার থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া বন্ধ হচ্ছে

গুটিয়েক রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট করে হাজার হাজার কোটি হাতিয়ে নেওয়ার পর তিন বছর মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ রাখে। তারপর অনেক দেন-দরবারের পর ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে পুনরায় দেশটিতে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। গত দেড় বছরে দেশটিতে গেছেন অন্তত চার লাখ কর্মী। তবে কোটা পূরণের অজুহাতে দেশটি হঠাৎ ভিসা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। সেই সঙ্গে বলা হয়েছে, ৩১ মের পর আর কোনো কর্মী মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারবেন না। এই অবস্থায় সব প্রক্রিয়া শেষ করেও মালয়েশিয়ায় যেতে না পারার আশঙ্কায় আছেন বাংলাদেশের অন্তত ১০ হাজার কর্মী। 

দ্বিতীয় দফায়ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। মোট ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি ঠিক করে দেওয়া হয়। এর বাইরে কেউ দেশটিতে কর্মী পাঠাতে পারবে না। এটি নিয়েও ব্যাপক আন্দোলন করে অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সি। তারা বলেন, ঘুরেফিরে আগের সিন্ডিকেটই এখনো বহাল। এ অবস্থায় আগামী শুক্রবার থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠানো যাবে না। 

এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, সময় বাড়ানোর জন্য মালয়েশিয়াকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আলোচনা চলমান আছে।

সুরাহা হয়নি ওমানের সঙ্গেও 

গত বছরের শেষদিকে রয়্যাল ওমান পুলিশ (আরওপি) এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা দেওয়া স্থগিত করা হয়েছে। পর্যটক ও ভ্রমণ ভিসায় যেসব বিদেশি ইতিমধ্যে ওমানে এসেছেন, তাদের জন্যও ভিসা পরিবর্তন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। 

যদিও ওমান রয়েল পুলিশের পক্ষ থেকে কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তারপরও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা তখন বলেন, দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। তাদের অনেকে বেকার রয়েছেন। এ কারণে তারা নতুন করে কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছে।

কিন্তু এতদিনেও দেশটির সঙ্গে সুরাহা করতে পারেনি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। বিএমইটির ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের পর তৃতীয় বৃহত্তম এই শ্রমবাজারে মাত্র ৩০২ জন কর্মী গেছেন। এই কর্মীদেরও আগে ভিসা ইস্যু করা ছিল। 

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই বাজার দ্রুত চালু করতে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। না হলে প্রবাসী আয়ে প্রভাব পড়বে।’

যদিও সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী গত ২৪ মে সাত দিনের সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান সফরে গেছেন। এর ফলে ওমানে জনশক্তি রপ্তানির বাধা দূর হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। 

এমপি আজীম হত্যারহস্যের জট খুলছে

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১০:২৯ এএম
এমপি আজীম হত্যারহস্যের জট খুলছে
এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার

বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দারা ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যায় এখনো কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না। ১৫ দিনের মাথায় কিছু মাংসের অস্তিত্ব মিললেও পুরোটা শনাক্ত করতে আরও সময় লাগবে। তবে মরদেহ পাওয়া যাক বা না যাক যেসব আলামত রয়েছে তাতেই প্রযুক্তির সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ডের জট খুলবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মরদেহের খোঁজ পেতে কিছুটা দেরি হওয়ায় অনেকেই নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি, আইনজীবী, অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ও সিআইডি বলছে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা তেমন কঠিন কিছু না। ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে হওয়ায় একটু সময় লাগবে হয়তো। 

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অবশ্যই উন্মোচন করা যাবে। যেসব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এগুলো দিয়েই এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ পেতেই হবে বিষয়টি এমন নয়। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আনারের রক্ত ও গায়ের শার্ট, গাড়িতে উঠাসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। এগুলো ফরেনসিক ল্যাবে টেস্ট করা হচ্ছে। রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে এমপি আনার খুন হয়েছেন কি না। আরেও কয়েকটি উপায় হচ্ছে তার পরিবারের ডিএনএ টেস্ট করা, আনারের ঘটনাস্থলের আলামতগুলো সংগ্রহ রাখা ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করা।

সিআইডি বলছে, পুলিশ বছরের পর বছর বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রহস্য বের করে, লাশ গুম করে দেওয়ার ঘটনায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনছে। আনারের ক্ষেত্রেও অনেক কিছু সম্ভব। তবে তার ক্ষেত্রে লাশের পরিচয় বের করা আগে জরুরি। সেই বিষয়টি দুই দেশের পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত বিভিন্ন হত্যা মামলার উঘাটন করা হয় নানা পদ্ধতিতে।

পুলিশ, হাসপাতাল ও ডিএমপির সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের একাধিক ব্যক্তির ডিএনএ টেস্ট ও ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির মরদেহ শনাক্ত করা যায়। তা ছাড়া যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও সহজ হবে। ‌এই যুগে এসে ‘ক্লু-লেস’ হত্যাকাণ্ড বলতে কিছু নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার করে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ অজ্ঞাত লাশের পরিচয় বের করা সম্ভব।

‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া হলে অধিকাংশ লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবিদ পুলিশ কর্মকর্তারা।’

সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিহত ব্যক্তির এবং আসামিদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলালেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

ডিআইজি (ফরেনসিক) এ কে এম নাহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা যাবে। তবে সময়ের ব্যাপার। দু-দেশের সমন্বয়ে বিভিন্ন কাজ চলছে। ফরেনিক রিপোর্ট এলে এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিচয় ও গুরুত্বপর্ণ বেশ কিছু তথ্য বের হয়ে আসবে।’ 

সিআইডির সূত্র জানায় ‘একটি হত্যার ঘটনার পর লাশ শনাক্ত করার জন্য সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ টেস্টসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে। লাশের হাতের ছাপ অথবা যদি ঘটনাস্থলে তার রক্ত পড়ে থাকে, সেগুলো সংগ্রহ করা সেই জায়গার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করলেই অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তবে এমপি আজীমের মরদেহ শনাক্তের জন্য ভারতীয় পুলিশ এবং আমাদের দেশের পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এ হত্যার রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে। যেহেতু মরদেহ পাওয়া যায়নি, অপরাধীরা বিভিন্ন জায়গায় গুম করেছে সেই ক্ষেত্রে এ হত্যার আলামত সংগ্রহ করতে একটু সময় লাগবে।’

এই বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসে ‘ক্লু-লেস’ হত্যাকাণ্ড বলতে কিছু নেই। হয়তো আনার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সময় লাগবে। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হবে, সেটা আজ হোক অথবা পরে হোক। তবে এই ঘটনার পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে।’

‘ঘটনাস্থল থেকে আনারের যেসব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠালে অনেক তথ্যপ্রমাণ মিলবে। এবং তার পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ টেস্ট করলে বোঝা যাবে ওই রক্ত আনারের বা ঘটনাস্থলে আনার ছিলেন কি না। তা ছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তারা আসামি পক্ষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট যদি সংগ্রহ করতে পারে, সেটিও সংগ্রহ করলে ভালো তথ্য আসবে। অনেক সময় এই ধরনের খুনের ঘটনায় আসামিরা আলামত নষ্ট করে দেন, কিন্তু সেগুলো ব্যবস্থা করা তেমন কঠিন কিছু না।’

পুলিশের আরেক সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশ ইচ্ছা করলে অনেক কিছু পারে। এক্ষেত্রে আনার হত্যাকাণ্ড রহস্য উন্মোচন করা তেমন কঠিন কিছু না। আমি মনে করি এটা খুব সহজ।‌ এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোনোভাবেই হত্যার সব আলামত ধ্বংস করা সম্ভব না। যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে সেগুলোর সূত্র ধরে দরকার হলে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতে হবে। অথবা যেসব দেশে উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি আছে, সেই দেশের সহযোগিতা নেওয়া। ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা, ডিএনএ টেস্ট থেকে শুরু করে সব আলামত বিশ্লেষণ করলে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন অনেকটা সম্ভব।’ 

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সাধারণত সেইভাবে হয় যাতে লাশ পাওয়া না যায়। এমপি আনারের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে। অনেক সময় লাশ পাওয়া যায় না। যদিও লাশ পাওয়া যায় হয়তো সেগুলো টুকরো টুকরো করা। আনার হত্যার ঘটনায় অনেক আলামত পুলিশ সংগ্রহ করলেও জঙ্গলে ফেলে দেওয়া কোনো অংশ উদ্ধার করতে পারেনি। হত্যাকারীরা নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করে হত্যা করেছে। 

সাধারণত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো পূর্বে আমরা দেখেছি এমনটা হয়। যেটাকে ‘ক্লু-লেস’ হত্যাকাণ্ড বলে। তবে আমাদের দেশে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটালে এতদিন রহস্য উন্মোচন হয়ে যেত। যেহেতু পাশের রাষ্ট্রে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির যুগে এসে অনেক কিছু সম্ভব আশা করি একটু সময় লাগলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এই হত্যার আসল রহস্য উন্মোচন করা এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে ফেঁসে না যান সেদিকে খেয়াল রেখে তাদের কাজ করতে হবে। 

আইনজীবী ফেরদৌস সুলতানা বলেন, আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘ক্লু-লেস’ না। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা তার রক্তমাখা শার্ট এবং গাড়িতে উঠানোর ফিঙ্গার এগুলোর সব আলামত সিআইডি ফরেনসিক রিপোর্টে উল্লেখ থাকবে। ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা নিয়ে, তার পরিবারের ডিএনএ টেস্ট করলে বোঝা যাবে সেটা আনারের কি না। সর্বপ্রথম তিনি মারা গেছেন কি না সেটা নিশ্চিত করা। তারপর সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে আসামিদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করে আদালতকে জানানো।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক আব্দুল নুর দুলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘এমপি আনারের লাশ পাওয়া না গেলেও ডিএনএ টেষ্ট করা যেতে পারে। তা ছাড়া অন্যান্য আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতেও হত্যাকাণ্ড বা মৃত্যুর বিষয়টি প্রমাণ হতে পারে।’  

এমপি আনার হত্যাকাণ্ড: কলকাতায় মাংসখণ্ড উদ্ধার

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১০:১৭ এএম
এমপি আনার হত্যাকাণ্ড: কলকাতায় মাংসখণ্ড উদ্ধার
আনোয়ারুল আজীম আনার

কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিবা গার্ডেনের আলোচিত সেই আবাসনের সেপটিক ট্যাংক থেকে গতকাল বিকেলে কিছু খণ্ডিত মাংস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশের ধারণা, এগুলো এমপি আনারের হতে পারে। ঢাকার ডিবি পুলিশপ্রধান হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাপ্ত মাংসখণ্ডগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। এরপর নিশ্চিত করে বলা যাবে এগুলো এমপি আনারের শরীরের অংশ কি না। 

ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার সঞ্জিবা গার্ডেনের ওই আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হয়েছেন।

তদন্তের কাজে কলকাতা অবস্থানকালে বাংলাদেশের ডিবি পুলিশপ্রধান হারুন অর রশিদের অনুরোধে সেই ফ্ল্যাটের টয়লেটের সঙ্গে যুক্ত সেপটিক ট্যাংক ভেঙে তল্লাশিকালে এসব খণ্ডিত মাংস পাওয়া যায়। এসব মাংসের ওজন ৪ কেজির মতো হবে বলে জানা গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আরও তল্লাশি চলছিল। সেপটিক ট্যাংক তল্লাশি করার সময় কলকাতার সিআইডির একটি টিমের সদস্যরা ওই মাংস ও কিছু চুল পেয়েছেন। সেপটিক ট্যাংক তল্লাশির সময় ঢাকার ডিবি কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন না। বাংলাদেশ মিশন সূত্রও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি সূত্র জানায়, কসাই জিহাদ মাংস কেটে তার সঙ্গে থাকা ছোট ওজনযন্ত্রে কয়েকটি মাংসের টুকরা ওজন করে দেখেও নিয়েছিলেন। একেকটি মাংসের টুকরোর ওজন ছিল ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম। আনারের মাথা আধখানা করে তাও টুকরো টুকরো করে দেওয়া হয়। জিহাদের দাবি, মাথার টুকরো অন্য দুই অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর ও ফয়সাল অন্য টুকরোর সঙ্গে  ট্রলিতে পুরেছিলেন। তারা ওই টুকরোগুলো বনগাঁ সীমান্তের কাছে যশোর রোডের ওপর ফেলে দেন।

এর আগে এমপি হত্যাকাণ্ডে নতুন করে দুটি জায়গায় তল্লাশি করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের সিআইডিকে অনুরোধ করেন ঢাকার ডিবির গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একটি জায়গা হচ্ছে সঞ্জিবা গার্ডেন আবাসনসংলগ্ন জলাশয়। আর দ্বিতীয়টি হলো টয়লেট চেম্বার। ডিবির প্রধান হারুন অর রশিদ সিআইডিকে ওই ফ্ল্যাটের সুয়ারেজ পাইপ ভাঙার পাশাপাশি হাতিশালা ব্রিজের নিচের খালটি সার্চ করতে অনুরোধ করেন। 

সে অনুযায়ী  আবাসনের নিকাশি পাইপ, সেপটিক ট্যাংক তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা হয়। আবাসনের বাথরুমের পাইপ খুলে পরীক্ষা করা হয়। কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্মীরা জঙ্গল সাফ করে খোঁজাখুঁজি করেন সঞ্জিবা গার্ডেনের আশপাশে। 
উল্লেখ্য, ঢাকায় গ্রেপ্তার আমানুল্লাহ গত সোমবার এবং গতকাল মঙ্গলবার দুই বাংলার যৌথ তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, এমপি আনারের দেহের কিছু অংশ তারা কমোডে ফেলে বারবার ফ্ল্যাশ করেছেন।

এদিকে গতকাল এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, সিআইডি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে যে তথ্য মিলেছে, তার সঙ্গে এখানকার তথ্যপ্রমাণ, গ্রেপ্তারদের বয়ান মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া একাধিক ডিজিটাল প্রমাণ হাতে এসেছে। তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হারুন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে এখানে ধরা পড়া আসামির সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখছি। শনাক্তকরণের কাজ বিস্তারিতভাবেই চলছে। আমাদের হাতে ইতোমধ্যে যা তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাতে এই অপরাধীদের সাজা দিতে বেগ পেতে হবে না।’

এদিকে গতকালই এমপি আনার খুনের মূল ষড়যন্ত্রকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন, সিয়াম ও মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিশ জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি। তবে এখনই কসাই জিহাদকে হেফাজতে নিচ্ছে না ডিবি। হারুন বলেন, পরে প্রয়োজনমতো তাকে হেফাজতে নেওয়া হতে পারে।

গতকাল নিউ টাউনের অ্যাক্সিস মলের একাধিক দোকানে যায় দুই দেশের গোয়েন্দা দল। ইতোমধ্যে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, খুনের আগে বেশ কিছুদিন নিউ টাউনের একটি হোটেলে ছিলেন সন্দেহভাজনরা। সেখান থেকে ওই শপিং মলে গিয়ে বিভিন্ন জিনিস কিনেছিলেন তারা।

এ পর্যন্ত সিআইডির কাছে আসা তথ্য অনুসারে, কলকাতার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙড়ের রাস্তায় বাগজোলা খালের কৃষ্ণমাটি ব্রিজের কাছে ফেলা হয়েছিল আনারের দেহাংশ। তার মোবাইল ফোন এবং পোশাক ফেলা হয় গাবতলা বাজারের কাছে। তার মাথার খুলি টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছিল শাসনের কাছে একটি ভেড়িতে। সোমবার ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে খুনের দিনের ঘটনার রিক্রিয়েট বা পুনর্নির্মাণ করান সিআইডির তদন্তকারীরা। 

সেখানেই এই কথা জানান কসাই জিহাদ। সেই মতো গতকাল সকাল থেকেই ভাঙড়ের পোলেরহাটসংলগ্ন জিরানগাছা, কৃষ্ণমাটি এলাকায় জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে আবার নতুন করে ওই ঘটনার পুনর্নির্মাণ করেন পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি এবং ঢাকার ডিবির কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে চলে রুটিন তল্লাশিও। ড্রোন, ডুবুরি, মৎস্যজীবী, বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগের সাহায্য নিয়ে চলে দিনভর তল্লাশি। 

সিআইডি সূত্রের খবর, খুনের দিন দুপুরে ফয়সাল ও আমানুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে সঞ্জিবা গার্ডেন আবাসনের ফ্ল্যাটে ঢোকেন আনার। দোতলার ফ্ল্যাটের ওপর তলার ঘরে তখন ছিলেন খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার শিলাস্তি রহমান। বাইরে জুতা খুলে এই তিনজন ঢোকেন ফ্ল্যাটে। নিচের ঘরে তখন উপস্থিত ছিলেন জিহাদ ও সিয়াম ওরফে সাইম। জিহাদ অর্থাৎ যাকে দিয়ে আনারের দেহ টুকরো টুকরো করে হয়েছিল, তার বয়ান অনুযায়ী এমনই তথ্য পেয়েছেন ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দারা।

সিআইডি আরও জানায়, জিহাদের বর্ণনা থেকে জানা গেছে, ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করে ফেলা হয় সংসদ সদস্যকে। এরপর শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। রান্নাঘরসংলগ্ন একটা তাকে হলওয়েতে খুন করে আততায়ীরা। দুই দেশের গোয়েন্দা অফিসারদের উপস্থিতিতে জিহাদ জানান, সেই জায়গায় একটি সিসিটিভিও ছিল, যেটিকে আগে থেকেই কাপড় এবং লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন শিলাস্তি রহমান। খুন করার পর সোজা রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হয় দেহ। সেখানেই টুকরো টুকরো করা হয়। দেহ থেকে হাড় মাংস আলাদা করে পৃথক প্যাকেটে ঢোকানো হয়।

শিলাস্তি ঢাকায় ডিবির জেরায় বলেছিলেন, সে সময়টা তিনি ওপরে ছিলেন। নেমে এসে আর দেখেননি আনারকে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গোয়েন্দারা বলছেন, বিকেল ৪টা নাগাদ আনারের জুতা, যেটা বাইরে খোলা ছিল, সেটা আততায়ীরা ভেতরে নিয়ে যান। খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণ-প্রক্রিয়া চলাকালীন ঢাকায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলেন তদন্তকারীরা।

গোয়েন্দাদের দাবি, সিয়াম আনারের সিম কার্ড নিয়ে পালিয়ে যান নেপালে। নিজের মোবাইলে বার কয়েক অ্যাক্টিভও করেন। তাই মুজাফফরপুরে আনারের মোবাইল অ্যাকটিভ পাওয়া গিয়েছিল।

সিআইডির তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গেছে, ট্রলিতে আনারের হলুদমাখা দেহের টুকরো প্রথমে ফেলা হয়েছিল নিউ টাউনের একটি পাবলিক টয়লেটে। খুনের মূল অভিযুক্ত বাংলাদেশের কুখ্যাত সুপার কিলার আমানুল্লাহ ওই পাবলিক টয়লেটেই তার সঙ্গী জিহাদ হাওলাদারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ওই ট্রলি। সোমবার জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে ওই পাবলিক টয়লেটেও যান বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। 

খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় ফ্ল্যাটে বসেই বাংলাদেশের গোয়েন্দাকর্তা হারুন অর রশিদ ভিডিও কল করে মূল অভিযুক্ত আমানুল্লাহকে ঘটনাস্থল দেখিয়ে প্রশ্ন করেন। আমানুল্লাহ ও জিহাদের বয়ান যাচাই করেন তারা।

গত ১৩ মে খুন ও দেহাংশ টুকরো করার পর আমানুল্লাহ, জিহাদ ও সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে দেহের টুকরোভর্তি ট্রলি নিয়ে আবাসন থেকে গাড়ি করে বের হন। আবাসন থেকে কিছুটা দূরে একটি পাবলিক টয়লেটে জিহাদের হাতে ওই ট্রলি তুলে দিয়ে আবার ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন আমানুল্লাহ। জিহাদ অন্য একটি গাড়িতে ভাঙড়ের কৃষ্ণমাটি গ্রাম, পোলেরহাটের বাগজোলা খাল, রাজারহাটের একটি ভেড়িতে দেহাংশ ফেলে দেন। 

>এমপি আজীম হত্যারহস্যের জট খুলছে