তাবলিগ জামাতের ঐতিহ্যবাহী ‘বিশ্ব ইজতেমার’ আয়োজন ও নেতৃত্ব ঘিরে দুই পক্ষের সংকট ধীরে ধীরে আরও বাড়ছে। এ নিয়ে মাওলানা সা’দপন্থি ও মাওলানা যুবায়ের সমর্থকদের মধ্যে ইতোমধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল থেকে কাকরাইল ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন যুবায়েরপন্থিরা। তারা সা’দপন্থিদের প্রতিহত করারও ঘোষণা দেন। এর ফলে নতুন করে উত্তেজনা ও উদ্বেগ বেড়েছে। তবে এত কিছুর পরও দুই পক্ষই বলছে, যথাসময়ে ইজতেমার আয়োজন করবে তারা।
গত ১৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে টঙ্গীর তুরাগ ময়দানে (বিশ্ব ইজমেতার মাঠ) ওই দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত ও বহুজন আহত হন। নিহতরা সবাই যুবায়েরপন্থি ছিলেন বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে সা’দপন্থিরাও ঘটনার পর তাদের একজন সাথি নিহত হওয়ার অভিযোগ করেন। তবে টঙ্গী থানায় তিনজন নিহতের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। মামলা হওয়ায় সা’দপন্থিরা আইনগত দিক থেকে তুলনামূলক কিছুটা চাপে আছেন বলে জানা গেছে। যদিও সা’দপন্থিরা চাপে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেননি। কিন্তু গতকাল এ প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের জন্য সা’দপন্থি অন্তত পাঁচজনকে তাদের মুঠোফোনে সরাসরি কল করা হলেও চারজনেরই নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
কথা হয় সা’দপন্থি অপরজন শাইখ আল মুরছালিনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা কোনো হানাহানি বা সংঘাত চাই না। সব সময়ই বলে আসছি সমঝোতার কথা। যেসব সংকট আছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে কাটিয়ে উঠে আমরা আগের মতো করে ইজতেমার আয়োজন করতে চাই। সে লক্ষ্যে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
অন্যদিকে আজকের কাকরাইলে অবস্থান ও ইজতেমা আয়োজন নিয়ে কথা হয় যুবায়েরপন্থিদের অন্যতম একজন গণমাধ্যম সমন্বয়ক মুফতি জহীর ইবনে মুসলিমের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সব সময় সংযম দেখিয়ে এসেছি। তারপরও তারা বারবার উসকানি, হামলাসহ নানা ঘটনা ঘটিয়েছে। এর ফলে এখন বাধ্য হয়ে আমাদের শীর্ষ ওলামায়ে কেরামরা কঠোর কর্মসূচি বা দাবি তুলে ধরেছেন।’
মাওলানা জহীর ইবনে মুসলিম আরও বলেন, ‘সংঘর্ষ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তুরাগ ময়দানে যা ঘটেছে বা যা কিছু হচ্ছে তাতে ইসলামেরই ক্ষতি হচ্ছে। সে কারণে এ বিষয়ে প্রশাসন বা সরকারকেই মূল দায়িত্ব নিয়ে শান্তি স্থাপনে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু আমরা গত ১৭ ডিসেম্বরের সংঘর্ষকালেও দেখেছি, পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে, যা রহস্যজনক।’
ইজতেমার আয়োজন নিয়ে কী ভাবছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইজতেমা আয়োজনের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। আমরা মূলত প্রথম পর্ব (৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি) আয়োজন করে থাকি। এবারও সেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
সা’দপন্থিদের সঙ্গে যে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সে ক্ষেত্রে তাদের আয়োজনকে বাধা দেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জহীর ইবনে মুসলিম বলেন, ‘সরকার যদি তাদের অনুমতি দেয়, সেটা তাদের ব্যাপার। সংকট দূর করতে সরকার চাইলে সা’দপন্থিদের তুরাগ ময়দানের মতো এবং কাকরাইলের মতো আলাদা স্থান বরাদ্দ দিতে পারে। তবে আমরা যারা তাবলিগ জামাত (সা’দপন্থি ও যুবায়েরপন্থি উভয়ে) করি, তাদের মধ্যে মারামারি হলে গোটা ইসলাম কলঙ্কিত হয়।’
উভয় পক্ষই জানায়, প্রায় ৯ বছর ধরে চলে আসা এই দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে তুরাগের ইজতেমা মাঠের নিয়ন্ত্রণ, ইজতেমার প্রধান মুরব্বি বা আমিরের নেতৃত্ব, কাকরাইল মসজিদের নিয়ন্ত্রণ এবং দিল্লির মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ কান্ধলভীর খুতবার কিছু ‘বিতর্কিত’ অংশ। এ পরিস্থিতিতে গত ১৭ ডিসেম্বর তুরাগ মাঠে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও হতাহতের প্রেক্ষাপটে দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয়েছে। এর আগে-পরে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, দোষারোপ, সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তার মধ্যে আবার নতুন করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কাকরাইলে যুবায়েরপন্থিদের অবস্থান কর্মসূচি নতুন করে সংঘাতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সব সময় সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। বৃহস্পতিবারও ওই এলাকায় (কাকরাইলসহ আশপাশে) অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক থাকবে।’
এ ছাড়া তুরাগ ময়দানের পরিস্থিতি সম্পর্কে গতকাল মুঠোফোনে গাজীপুর মহনগর পুলিশের (জিএমপি) উপকমিশনার (দক্ষিণ) এন এম নাসিরুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওই ঘটনার (১৭ ডিসেম্বর) পর থেকে তুরাগ ময়দানের পরিস্থিতি শান্ত-স্বাভাবিক আছে। জিএমপি কমিশনার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন সেটাও অফিশিয়ালি এখনো তুলে নেওয়া হয়নি। তা ছাড়া কোনো পক্ষই আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। তবে ওই সংঘর্ষে তিনজন নিহত হলে একটি মামলা হয়েছিল, সেই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’