পাহাড় কেটে প্লট এবং মাটি বিক্রি করে টাকার পাহাড় গড়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম। আকবরশাহ এলাকায় নিজস্ব বাহিনী দিয়ে গড়েছেন সাম্রাজ্য। তার এতই দাপট ছিল যে, ২০২৩ সালে বেলার প্রধান নির্বাহী (বর্তমান পরিবেশ উপদেষ্টা) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান টিম নিয়ে পাহাড় কাটা পরিদর্শনে গেলে তার ওপর হামলা করতে দ্বিধা করেনি তার বাহিনী। ওই ঘটনা তখন সারা দেশে আলোচনার জন্ম দেয়। তার বিরুদ্ধে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন অপরাধে ২০টির অধিক মামলা রয়েছে। ফিরোজশাহ এলাকায় নিজের বসবাসের জন্য যে সাত তলা ভবন নির্মাণ করেছেন, সেই ভবনের কিছু অংশ সরকারি জায়গায় পড়েছে বলে অভিযোগ আছে।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত জসিমকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারেনি। পরে এম রেজাউল করিম চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হলে তখনও জসিমের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। ৫ আগস্টের পর জসিম গা-ঢাকা দিলেও তার অবৈধ ব্যবসা থেকে আয় বন্ধ হয়নি। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মী তার পক্ষে তার সাম্রাজ্য দেখাশোনা করছেন বলে জানা গেছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে জসিম বিনিয়োগ করেছেন। সেখানে তার হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে। আত্মীয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায়ও বিনিয়োগ আছে বলে জানা গেছে। গত ২৪ জানুয়ারি জসিমকে কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে একটি কারখানায় কাজ করা জসিমের ভাগ্য মাত্র এক দশকে ঘুরে গেছে। পাহাড় কেটে প্লট ও মাটি বিক্রি করা ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং সরকারি পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপনের ব্যবসা তার অন্যতম আয়ের উৎস। কালিরছড়া খাল ভরাট করে গরুর খামার, অফিস, বাগান ও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। সম্প্রতি ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে সেসব উচ্ছেদ করেন। অথচ খালটি রক্ষার জন্য বায়েজিদ লিংক রোডে ৬টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতু নির্মাণের পর আকবরশাহ অংশ ভরাট করে করা হয়েছে প্লট।
ভুক্তভোগীরা জানান, এলাকায় আর্থিকভাবে দুর্বল অথচ ভূমি-সম্পত্তি রয়েছে এমন পরিবারগুলোকে টার্গেট করে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা ছিল জসিমের দখল পদ্ধতির একটা দিক। এলাকায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে গেলে নানা হয়রানির মধ্যে ফেলে তার কাছ থেকে রড, সিমেন্ট, বালুসহ নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য করত জসিম।
আকবরশাহ এলাকার লেকসিটি সংলগ্ন প্রায় আড়াই একর খাস জমি দখল করে কলোনি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাড়া ও বিক্রি করে জসিম প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নিজের পকেটে ভরেছেন। সাবাড় করেছেন পাহাড়ের হাজারও গাছ।
জসিম মার্কেট
গৃহায়ণের অন্তত দেড় শতাধিক প্লট তার দখলে রয়েছে। পার্কিং স্থলে অবৈধ বাজার বসিয়ে মাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন তিনি। ছোট-বড় ৪ শতাধিক দোকান থেকে এককালীন ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নিয়েছেন জসিম। ওই মার্কেটের নাম দিয়েছেন জসিম মার্কেট।
এ ছাড়া বেলতলীঘোণা, গোলপাহাড়, ১, ২, ৩ নং ঝিল, বিজয়নগর, জিয়ানগর, হারবাতলী, মিরপুর, শাপলা এলাকায় শ শ একর সরকারি জায়গা দখল করে বিক্রি ও ভাড়া দিয়েছেন জসিম। ইস্পাহানী সি এলাকার রেলগেটের পাশে রেলের জায়গা দখল করে ইট-বালু-সিমেন্টের ব্যবসা খুলেছেন। এই ব্যবসা দেখাশোনা করেন তার শ্যালক।
অবৈধ বিদ্যুৎ থেকে বড় আয়
অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পেতে হলে জসিমের শরণাপন্ন হতে হতো। এই খাতেও জসিমের প্রতি মাসে বড় অঙ্কের আয় আছে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কে কয়টি বাল্ব এবং টিভি ফ্রিজ চালাচ্ছে সে হিসাব করে টাকা আদায় করা হয়।
কিশোর গ্যাং
গডফাদার জসিম আকবরশাহ এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ৩০টি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করে। এসব কিশোর গ্যাংকে দিয়ে মানুষকে হুমকি-ধমকি, দখল-বেদখল, মাদক বিক্রি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবহন, রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারসহ নানা অপরাধে ব্যবহার করা হয়।
অবৈধ পানির ব্যবসা
অননুমোদিত গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানির ব্যবসা করেন জসিম। কোনো স্থায়ী বাসিন্দা নিজ উদ্যোগে ওয়াসার পানির লাইন আনতে গেলেই বাধা হয়ে দাঁড়াতেন জসিম। তার কাছ থেকেই পানির সংযোগ ও পানি কিনতে বাধ্য করা হতো। এমনকি তার মেয়ের নামে আরিবাহ্ ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্যবসাটিও অবৈধ গভীর নলকূপের ব্যবসা।
চসিক থেকে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প
অবৈধভাবে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা আবাসিক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে চসিকের মাধ্যমে নিয়েছেন প্রকল্প। প্লটের মূল্য বাড়াতে প্রকল্পের ৯নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বেলতলীঘোণা, বিজয় ও জিয়া নগরে সড়ক নির্মাণের কাজ করা হয় মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে। এই সড়ক নির্মাণ করতে কাটা হয় পাহাড়। পরে সমালোচনার মুখে চসিক সেই কাজ বন্ধ করে দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক মো. সফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে জানান, জসিম সবচাইতে বেশি ক্রাইম করেছে উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে। চসিকের লেকসিটির পাশের সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলো দখল করে উত্তর লেকসিটি নাম দিয়ে পুরো এলাকাটি পাহাড়শূন্য করেছে। এলাকার অসংখ্য মানুষের জমি দখল, বেদখল, হুমকি-ধমকি দিয়ে চাঁদাবাজি করেছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্তের ১৫০টি দোকান, ৭০টির মতো প্লট দখল করে এখনো ভাড়া তুলছে। সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ৯৭৮ নম্বর দাগের ২ একর ৪৮ শতক জায়গা দখল করে কলোনি করেছে যা এখনো আছে। কালীর ছড়া খাল ভরাট করে প্লট বানিয়ে প্রতারণা এবং অসংখ্য মানুষকে নিঃস্ব করেছে। কালীর ছড়া খাল দখল করে দোকান, ভবন, বিভিন্ন ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া বা বিক্রি করেছে। রেলের মালিকানাধীন জায়গা দখল ও বিক্রির সঙ্গেও জসিম জড়িত ছিল। এলাকায় তার কিশোর গ্যাং চক্র, মাদক ও সন্ত্রাসী বাহিনী আছে।
উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের গাউছিয়া লেকসিটিতে সরকারি পাহাড় সাবাড়, পাহাড় ও জলাশয়ের শ্রেণি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করেছে। আকবরশাহর ১, ২, ৩ নং ঝিলে রেলের পাহাড় বিক্রি করে কলোনি করেছে। এই কলোনির মানুষদের সে তার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।
সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম ও তার স্ত্রী জেলে থাকায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।