সাত বছর পর আবারও মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু’র ভাইরাস (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা) পাওয়া গেছে। যা উদ্বেগজনক বলছে আইসিডিডিআরবি ও আইইডিসিআর। শুধু তাই নয়; আইসিডিডিআরবি এক গবেষণায় ঢাকা ও গাজীপুরের লাইভ বার্ড মার্কেট বা জীবিত হাঁস-মুরগির বাজারে বাতাসের নমুনার ৯১ শতাংশ বার্ড ফ্লু পজিটিভ পেয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, বাজারে পাওয়া মৃত মুরগির প্রায় অর্ধেকই বার্ড ফ্লুর সাবটাইপ এইচফাইভে আক্রান্ত ছিল। এসব বাজারকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্ড ফ্লুর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এবং জাতীয় গবেষণা কৌশল চূড়ান্তে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অংশীদারদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠকও করেছে আইসিডিডিআরবি। সেখানে মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পাখির মাধ্যমে ছড়ায়। লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লুয়ের মতোই হতে পারে, তবে গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি এবং মাথাব্যথা। বার্ড ফ্লু প্রাণঘাতী। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য লুইজিয়ানায় বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। সেখানে বার্ড ফ্লুতে এই প্রথম মৃত্যু। এপ্রিলে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ২ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। মে মাসে উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর চিড়িয়াখানায় মৃত্যু হয় এক বাঘিনীর। এর আগে ২০২৪ সালে মেক্সিকোতে ৫৯ বছরের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে চীনেও মানুষের মৃত্যু হয়। ওই বছর বিভিন্ন দেশে গণহারে হাঁস-মুরগি মেরে ফেলা হয়।
আইসিডিডিআরবি বলছে, বার্ড ফ্লু কেবল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের সমস্যা নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে এটি আবারও মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আটটি দেশের ৩০ জন মানুষের মধ্যে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ জন শনাক্ত হয়েছে কম্বোডিয়ায় এবং বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছে ৪ জন।
আইসিডিডিআরবি জানায়, এবারই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ৮ মাসে ৪ জনের দেহে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। ৪ জনই শিশু। তাদের বয়স এক থেকে আট বছরের মধ্যে। ২০০৩ সালে থেকে এই পর্যন্ত এ নিয়ে ১২ জনের শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে ৭ জনই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সে কারণে আইসিডিডিআরবি বলছে এটি শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
আইইডিসিআর এর পরিচালক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, এ বছর শনাক্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ১৩ মার্চ যশোরের একটি সরকারি মুরগির খামারেও বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। সেটি ছিল বার্ড ফ্লুর টাইপ-এ। বাংলাদেশের খামারে প্রথম বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে ২০০৭ সালে। ওই বছর ১০ লাখের বেশি হাঁস-মুরগি মেরে ফেলা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়েই বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। হাঁস-মুরগি মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে। চলতি বছরের আগে ২০১৮ সালে খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয় । ওই বছর দেশে মানুষের দেহেও বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়।
বার্ড ফ্লুর বর্তমান পরিস্থিতি জানতে ২০২৪–২০২৫ সালে ঢাকা ও গাজীপুরের লাইভ বার্ড মার্কেট বা জীবিত হাঁস-মুরগির বাজারে গবেষণা পরিচালনা করে আইসিডিডিআরবি। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁস-মুরগির বাজার থেকে সংগৃহীত বাতাসের নমুনার ৯১ শতাংশ বার্ড ফ্লু পজিটিভ। এসব বাজারকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাজারে পাওয়া মৃত মুরগির প্রায় অর্ধেকই বার্ড ফ্লুর সাবটাইপ এইচফাইভে আক্রান্ত ছিল।
গবেষণার অংশ হিসেবে করা একটি সিস্টেমেটিক রিভিউতে পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার বড় তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি। এর মধ্যে রয়েছে অসুস্থ পাখিকে আলাদা না রাখা, বর্জ্য সঠিকভাবে ফেলা বা চাপা না দেওয়া এবং পোলট্রি রাখার জায়গায় অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনস অব বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মুরগি থেকে শুরু করে সব ধরনের পাখি গরু ছাগল আমরা জবাই করি। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো সঠিক পদ্ধতিতে হয় না। আমাদের দেশে উন্মুক্ত জায়গায়, বাজারে জবাই এবং প্রস্তুতের কাজটি হয়। আমি মনে করি এটা খুবই আনহাইজিনিক ও ক্ষতিকর। হাঁস-মুরগি বাজারে জবাই করা উচিত নয়। স্লটারিং হাউসে যাবে, সেখান থেকে হালাল উপায়ে জবাই হয়ে প্যাকেজিং হয়ে বাজারে আসবে। এটা করতে পারলে বাজার থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও নানা ধরনের পলুশন অনেক ক্ষেত্রে রোধ হয়ে যাবে। এসব জায়গায় সরকারের নজর দেওয়া উচিত।’
আইসিডিডিআরবির সিনিয়র ম্যানেজার (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনস) এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে পাবলিকের জন্য লাইভ মার্কেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জীবন্ত হাঁস-মুরগি কিনে নিয়ে জবাই করে খাওয়ার সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘এটা প্রাণঘাতী। আমাদের দেশে আগে থেকেই বার্ড ফ্লু আছে। কেয়ারফুল থাকতে হবে। দেশে সাত বছর আগে মানুষের দেহে শনাক্ত হয়। তারপর আবার পাওয়া গেছে। বার্ড ফ্লুতে দেশে কেউ মারা গেছে কি না সেই তথ্য জানা নেই। তবে গ্লোবালি ডেথ কেইস আছে। আগেও দেশে যখন বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয় তখন লাখ লাখ মুরগি মেরে ফেলতে হয়েছিল।’ মানুষের মধ্যে এত দিনে ব্যাপক আকারে ছড়ায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তো আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি এবার ছড়িয়ে পড়া সাধারণ ইফ্লুয়েঞ্জার কথা উল্লেখ করেন। আগে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্তের বার্ষিক গড় হার ছিল ১৬ শতাংশের মতো। এ বছর প্রায় ৬০ শতাংশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত পাওয়া গেছে। এর আগে এত কখনোই পাওয়া যায়নি। সে জন্য কখন কোনটি ছড়িয়ে পড়বে তা বলা যায় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (অতি. দা.) ডা. নিশাত পারভীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বাজারগুলোয় নজরদারি বৃদ্ধি করব। আগেও যখন বার্ড ফ্লু ছড়িয়েছিল তখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এখনো আমরা দেখি কীভাবে কি করা যায়। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশেষ করে মুরগির বাজারগুলোর নজর দিতে হবে।’
বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে নড়েচড়ে বসেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিষয়ে গত বুধবার আইসিডিডিআরবি আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, আইইডিসিআরবি, বন অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ, আইইউসিএন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এফএও, সিডিসি এবং অন্য অংশীদারদের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে আইসিডিডিআরবির সায়েন্টিস্ট ড. সুকান্ত চৌধুরী বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং ২০২৪–২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির সহায়তায়, আইসিডিডিআরবির ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিট পরিচালিত যৌথ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন যার উদ্দেশ্য ছিল এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য একটি জাতীয় গবেষণা কৌশল প্রণয়ন।
অংশগ্রহণকারীরা গবেষণার অগ্রাধিকার সংক্রান্ত মূল্যবান মতামত প্রদান করেন, যার মধ্যে ছিল পর্যবেক্ষণ, হস্তক্ষেপ, ভ্যাকসিন, ঝুঁকির কারণ, ওয়ান হেলথ ও নীতি-নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয়।