জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশন এবার দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উভয়কেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে (ইসি)। গত ২১ ডিসেম্বর ইসি সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ৩২টি দেশের নির্বাচন কমিশনের প্রধানদের নাম, যোগাযোগের ঠিকানা ও ই-মেইল চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি পাঠিয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ভোটের প্রতি আস্থা দৃঢ় করা।
ইসি যে সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বিবেচনা করছে সেগুলো হলো–এফইএমবিওএসএ, ওআইসি, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট, আনফ্রেল, এ-ওয়েব, আইআরআই ও এনডিআই। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, জাপান, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, মিসর, ফ্রান্স, জর্জিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, ফিলিপিন্স, রুমানিয়া, সাউথ আফ্রিকা, সাউথ কোরিয়া, কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, উজবেকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় চাওয়া হয়েছে।
ভোট পর্যবেক্ষণে কেন এত গুরুত্ব?
নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব ও সীমারেখা নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ উঠেছে। তাই এবার ইসি কাঠামোবদ্ধ ও আগাম প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষকরা নজর রাখেন। তবে পর্যবেক্ষকরা যেন নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করেন এবং নিরপেক্ষ থাকেন, তা নিশ্চিত করা হবে প্রশিক্ষণে।
দেশি পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ: দায়িত্ব ও মানদণ্ড
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার ৮১টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নিবন্ধন দিয়েছে ইসি। আইন অনুযায়ী এসব সংস্থার প্রতিনিধিরা আগামী পাঁচ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিগত দিনে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠায় এবার দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদেরও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নিবন্ধিত ৮১টি সংস্থার একজন করে প্রতিনিধির (সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক) প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
এ বিষয়ে ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা, আচরণবিধি শেখানো এবং ভোট পর্যবেক্ষণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করা। নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের আশা, এ ধরনের প্রশিক্ষণ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেকোনো প্রকার হস্তক্ষেপ রোধ এবং অযাচিত বিতর্ক কমানো সম্ভব হবে।
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের প্রস্তুতি
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের আবেদন গ্রহণ চলবে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ১৫০-২০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইআরআই ও এনডিআই ৫০ জনের দল পাঠাবে, আর কমনওয়েলথ থেকে প্রায় ৩০ জনের আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকুক, যাতে ভোটের সময় কেউ গণ্ডগোল করতে না পারে। এটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
ইসি সচিবও জানিয়েছেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক আশা করছি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দায়িত্ব ও সীমারেখা স্পষ্ট করা গেলে অযাচিত বিতর্ক কমবে এবং নির্বাচন সম্পর্কে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন পাওয়া যাবে।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া, বিতর্ক ও দায়িত্বের সীমারেখা
নিবন্ধিত দেশি সংস্থাগুলোর যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। তবে কিছু সংস্থাকে নিবন্ধন না দেওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইসি জানিয়েছে, সমস্ত কার্যক্রম আইন ও বিধিমালার আলোকে সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন এবং ভোট গণনার সময়ও উপস্থিত থাকতে পারবেন। তবে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করলে তাদের ভোটকেন্দ্র ত্যাগ করতে বলা হবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রভাব
ইসি আশা করছে, ২০০৮ সালের পর এবার সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসবেন। কমিশনের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে বিতর্কমুক্ত রাখতে এবার রেকর্ডসংখ্যক দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।