নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচনি প্রচারের শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাদের বক্তব্যে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শুরুর দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ থাকলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণুতার চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। ভোটারদের কাছে কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে আক্রমণ করাই এখন মূল কাজ হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রচারে এ পর্যন্ত ইশতেহার বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পুরোনো রাজনৈতিক ইতিহাস, বিতর্কিত বক্তব্য ও অভিযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক সফরে গিয়ে একে অপরকে লক্ষ্য করে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন।
এই প্রতিযোগিতায় আরও এক ধাপ এগিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। তারা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী আসনগুলোতে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের উদ্দেশে কড়া বক্তব্য ও প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। নির্বাচনি অঙ্গীকারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় অনুভূতি যুক্ত করা হচ্ছে, এমনকি পাল্টা বক্তব্য দিতে গিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড় করানোর অভিযোগও উঠেছে।
ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, বক্তব্যের ভাষা ততই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই উত্তেজনা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনি প্রচারকে ঘিরে হামলা, পাল্টা ধাওয়া এবং প্রার্থীদের ওপর ডিম নিক্ষেপ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ আবারও সহিংসতা ও সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে যে সংযম, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এই ধারা থেকে বেরিয়ে না এলে আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে, এমন আশাবাদ প্রকাশ করতে পারছেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূলের প্রার্থীরাও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন।
জামায়াতের উদ্দেশ্যে গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহে নির্বাচনি জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক দল স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করছে বিএনপির বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রতি তাদের বক্তব্য, দুর্নীতিতে বলে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও তো দুজন সদস্য বিএনপির সরকারে ছিল। বিএনপি যদি অতই খারাপ হয় তাহলে ওই দুই ব্যক্তি কেন পদত্যাগ করে চলে যাননি?’ এর আগে জামায়াতের আমির বিএনপি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বলে মন্তব্য করেন।
গতকাল যশোর ঈদগাহ ময়দানে নির্বাচনি জনসভায় বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এক দিকে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে মহিলাদের গায়ে হাত, দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। এটিই বার্তা, তারা জিতলে কেউ নিরাপদ থাকবে না। যারা নিজেদের দলকে সামলে রাখতে পারে না, কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই দল যত বড়ই হোক তাদের কাছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। এ সময় তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে গণহারে মামলা-বাণিজ্য, নিরীহ মানুষকে হয়রানি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ তোলেন।
কেউ যদি অন্যায়ের দিকে হাত বাড়ায়, তাহলে নীরব থাকা সম্ভব নয় উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘পায়ে পাড়া দিয়ে, মুখে বা শরীরে আঘাত করে কেউ যদি আশা করে আমরা চুপ করে থাকব, তা হবে না। আমরা ঝগড়া চাই না, কিন্তু সেই কালো হাত যদি সামনে বাড়ানোর চেষ্টা করেন, আমরা গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে পারি না, পারব না ভাই।’ গতকাল খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে নির্বাচনি সভায় জামায়াত নেতা এসব বলেন।
গত কয়েক দিন ধরে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনি প্রচারে বিএনপির প্রার্থীদের সমালোচনা ও হুঁশিয়ারি দিয়ে কড়া ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
শনিবার নির্বাচনি প্রচারে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে উদ্দেশ্য করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নাসীরুদ্দীনকে ক্ষেপাবেন তো আপনার হাফপ্যান্ট খুলে যাবে। আমার সঙ্গে কখনো হাংকিপাংকি করবেন না।’ আবার পরের দিন জামায়াতের সমাবেশে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে উদ্দেশ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বলেন, ‘খোকা-পুত্রের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজির বিরুদ্ধে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে হবে। জমিদারি প্রথা উপড়ে দিতে হবে।’
এই বিষয়ে সোমবার ঢাকা–৬ আসনের বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমরা যদি ঘোষণা দেই, তাহলে ঢাকা শহরে জামায়াতের প্রার্থী রাস্তায় নামতে পারবেন না।’
গতকাল নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে এ ঘটনায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কর্মীরাই পরিকল্পিতভাবে এই হামলায় জড়িত। এর আগেও গত শুক্রবার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রচার চলাকালে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় গণসংযোগে ডিম মারা হয়।
এ ছাড়াও নির্বাচনি প্রচারের শুরু থেকেই এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। তারেক রহমানের এক বক্তব্যের সমালোচনা করে গত সোমবার নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেছেন, ‘বলা হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে। তাহাজ্জুদের পরেই তারা সিল মারার পরিকল্পনা করছে। ভোটকেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। সে জন্য ১১-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকবেন। যারা ভোটদানে বাধা সৃষ্টি করবেন কিংবা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবেন, তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড একটি প্রতারণার প্যাকেজ। বাংলাদেশের সংকট এখন ফ্যামিলি কার্ড নয়। দেশের রাজনীতিকদের এখন কাজ হলো– অর্থনীতিকে চাঙা করা, ঋণখেলাপি ও লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।
গত সোমবার রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ডুমনি বাজার এলাকায় ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবের উপর বিএনপি নেতা দিদার মোল্লার নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘খিলক্ষেত থানার ডুমনি নূরপাড়া এলাকায় বিএনপির লোকজন হামলা করেছে।’
এদিকে খুলনায় এক কর্মসূচিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে বলেন, লন্ডন থেকে মুফতি ডিগ্রি নিয়ে আসা একজন আমাদের কুফরি ফতোয়া দিচ্ছেন। এটি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে ছিলাম বলে অনেক কথার জবাব দেইনি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বিএনপি ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, কেউ ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে বাসায় গেলে তাকে আটকে রাখবেন।
গতকাল নির্বাচনি প্রচারে ঢাকা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বিকাশে টাকা পাঠিয়ে নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছেন। বিকাশে টাকা দেওয়া ছাড়া আরেকটি দলের অপতৎপরতা আছে। তারা পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী। তারা চাইছে, মানুষ যাতে ভোটমুখী না হয়। এই দুটি চ্যালেঞ্জ আমাদের নিতে হচ্ছে। একই অভিযোগ করেন ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক।
নির্বাচন ঘিরে মাঠের পরিস্থিতি অসহিষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অসহিষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নতুন নয়, তবে এবার আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন রূপ নিয়েছে। তার মতে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া নতুন দলগুলো এতদিন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মদদে রাজনৈতিক কার্যক্রম করেছে। কিন্তু নির্বাচনি মাঠ বিশাল হয়- তাই সরাসরি ভোটের মাঠের তারা চাপ সামলাতে পারছে না। পর্যাপ্ত জনসমর্থন ও ভোটারভিত্তি না থাকায় তারা তুলনামূলক ছোট ঘটনাকেও বড় সংকট হিসেবে দেখছে।
জামায়াত প্রসঙ্গে অধ্যাপক মামুন বলেন, দলটি বর্তমানে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে থেকে রাজনীতি করছে। পাশাপাশি সরকারের একটি অংশের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ পাচ্ছে দলটি। তারা সহিংসার মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারে- সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। বড় দল হিসেবে তাদের বিএনপিকে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।