ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তায় কে এগিয়ে, তা নিয়ে জনমনে বেশ আগ্রহ রয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, মাঠপর্যায়ে জনসমর্থনের দিক দিয়ে প্রথম অবস্থানে আছে বিএনপি। বিএনপির তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) জরিপেও এগিয়ে আছে বিএনপি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে জরিপ চালায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইআরআই। এই জরিপে ৬৩টি জেলার ৪ হাজার ৯৮৫ জন ভোটার অংশ নেন। এদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪১০ ও নারী ২ হাজার ৫৭৫ জন। গত ২ ডিসেম্বর জরিপের প্রকাশিত তথ্য মতে, জামায়াতকে পছন্দ করেন ৫৩ শতাংশ মানুষ আর বিএনপিকে ৫১ শতাংশ মানুষ। তবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশির ভাগই বেছে নিয়েছেন বিএনপিকে। দলটিকে ভোট দেওয়ার পক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষ এবং জামায়াতকে ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ৬ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে চান।
গত বছরের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসব্যাপী যৌথ উদ্যোগে জরিপ চালিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)। এই জরিপ পরিচালনায় যৌথভাবে কাজ করেছে প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন ও ন্যারাটিভ নামে একটি সংস্থা। জরিপে ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের ২২ হাজার ১৭৪ ভোটার অংশ নেন। গত ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ভোটারদের ৩৪ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দিতে চান, আর জামায়াতকে ৩৩ শতাংশ ভোট দিতে চান। এ ছাড়া এনসিপিকে ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ইসলামী আন্দোলনকে ৩ দশমিক ১ শতাংশ ভোট দিতে চান। তবে কাকে ভোট দেবেন–এমন সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন ১৭ শতাংশ ভোটার।
বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (ইএএসডি) গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি জনমত যাচাইয়ে জরিপ করে। এতে ৬৪টি জেলা থেকে অংশ নেন ২০ হাজার ৪৯৫ ভোটার। ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, নির্বাচনে ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। অন্যদিকে জামায়াতকে ১৯ শতাংশ মানুষ এবং এনসিপিকে ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে চান। এমনকি আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের ৬০ শতাংশ এবার ধানের শীষে ভোট দিতে আগ্রহী। নারী ভোটারদের ৭১ শতাংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন।
সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের ভাবনা নিয়ে তৃতীয় ধাপে জরিপ চালিয়েছে ‘ইনোভেশন কনসাল্টিং’ নামে একটি সংস্থা। এতে অংশ নেন ৫ হাজার ১৪৭ জন। গত ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনে ৫২ দশমিক ৮০ শতাংশ ভোটার বিএনপি জোটকে ভোট দেবেন। আর জামায়াত ও এনসিপি জোটকে ভোট দিতে চান ৩১ শতাংশ ভোটার। আর ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন আছে ১ শতাংশ মানুষের। তবে ভোট নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সরকারপ্রধান হিসেবে এগিয়ে রেখেছেন ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে এগিয়ে রেখেছেন ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার।
‘ইনোভেশন কনসাল্টিং’ নির্বাচন নিয়ে গত বছরও বিভিন্ন বয়সী ভোটারের ওপর জরিপ চালায়। এতে অংশ নেন ১০ হাজার ৪১৩ ভোটার। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জরিপের প্রকাশিত ফলাফলের তথ্যমতে, বিএনপিকে সমর্থন করেছেন ৪১.১ শতাংশ ভোটার। জামায়াতকে ৩০.৩ শতাংশ এবং এনসিপিকে ৪.১ শতাংশ ভোটার সমর্থন করেছেন। এদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার মনে করেন বিএনপি সরকার গঠন করবে। আর ২৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার মনে করেন জামায়াত সরকার গঠন করবে।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের যৌথ জরিপে অংশ নিয়েছিলেন ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার। দুই ধাপে এ জরিপ চালানো হয় গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জরিপের ফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগকে যারা আগে ভোট দিতেন, তাদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন। ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার জামায়াতকে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার এনসিপিকে ভোট দেবেন। ২০০৮ সালের পর প্রথম ভোট দেবেন–এমন ভোটারদের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াত, ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে সমর্থন দিয়েছেন।
দেশের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর জরিপ চালিয়েছে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি)। গত বছরের ১০ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে চালানো জরিপে অংশ নিয়েছিলেন ২ হাজার ৫৪৫ ভোটার। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপিকে ২০ শতাংশ এবং জামায়াতকে ১৭ শতাংশ ভোটার সমর্থন দিয়েছেন। তবে ৩০ শতাংশ ভোটার কোনো দলকে বেছে নেননি এবং ১৮ শতাংশ ভোটার তাদের পছন্দের দল প্রকাশ করতে চাননি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে নিয়ে তাদের ওয়েবসাইটে জরিপ চালিয়েছিল। এসব জরিপেও সরকার গঠনের পথে এগিয়ে ছিল বিএনপি।
সিআরএফের সহসভাপতি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে, যা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি। তবে মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে এখনো উদ্বেগ আছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের টেনশন কাজ করছে যে, ভোটটা সুষ্ঠু হবে কি না, নিরপেক্ষ হবে কি না, ব্যালট বাক্স দখল হয়ে যায় কি না, কোনো ধরনের সংঘাত হয় কি না।’